কুয়েতের এরাবিয়ান গালফ স্ট্রীটের মেরিনামল (শপিং সেন্টার) এর আশেপাশের ট্র্যাফিক সিগন্যালে একজন বাংলাদেশীকে সাত সকালে ময়লার বিন হাতে প্রায়ই ঘুরতে দেখা যায়! কালমত সুঠাম দেহের ২৫-৩০ বছরের এক যুবক, পরনে হলুদ পোশাক।
সকালের লম্বা সিগন্যাল, যুবক সিগন্যাল পড়লেই বিন হাতে সিগারেটের অবশিষ্ট অংশ, হাবিযাবি গাড়ির আশপাশ থেকে বিনে তুলছে, আর প্রত্যেক গাড়ি লক্ষ্য করে করুনভাবে হাত তুলে সালাম দিচ্ছে! গাড়িতে বসা কেউ কেউ ফিরেও তাকায় না! আবার কেউ কেউ গাড়ীর গ্লাস নামিয়ে ১০০, ২০০ পয়সা অথবা আধা দিনার হাতে গুঁজে দিচ্ছে! মিনিট পরে সবুজ বাতি এবং সিগন্যাল ক্লিয়ার।
যুবক এবার ধীরে ধীরে অন্য পাশে যাচ্ছে, আশপাশ থেকে কিছু কুড়িয়ে বিনে ভরছে! সেই অংশেও একই প্র্যাকটিস! এই দৃশ্যগুলো অভিজাত এলাকার সিগন্যালগুলোতে হরহামেশা দেখা যায়! অথচ ফজর আযানের সাথে সাথেই এলাকাভিত্তিক অত্যাধুনিক রোড সুইপার গাড়িগুলো প্রতিটি রাস্তা ইঞ্চি বাই ইঞ্চি ব্রাশ করে ক্লিন করে যায়! গ্লাস খুলে সেই যুবককে কাছে আসতে ইশারা করলাম, সে হয়তো বুঝতে পারছে আমি স্বদেশী তাই আসতে চায়নি, দুবার ইশারা করাতে কাছে আসলো, জিজ্ঞেস করলাম এ সময় তো এখানে আপনাদের ডিউটি করার কথা নয়, আর কেন মানুষজন থেকে হাত পেতে পয়সা নিচ্ছেন? কথাটা শেষ না করতে সিগন্যাল খুলে গেল। অনেক কিছু বলার থাকলেও বলা হয়নি!
আমার পাশে বসা মিশরীয় অফিস কলিগ ঘটনা বুঝতে পেরে বলল, এদের প্রায়ই দেখি গাড়ি থেকে হাত পেতে পেতে পয়সা নেয়, আমি জানি তুমি বিব্রত, কিন্তু এরা কারো কথা শুনবে না, এটা অভ্যাস হয়ে গেছে! এসময়ে ডিউটি না থাকলেও এই যুবককে আমিও প্রায়ই দেখি এখানে নানা ছুতায় ভিক্ষা করতে!
মিশরীয় বন্ধুর কথা শুনে দীর্ঘশ্বাস আরো বেড়ে গেল! কিন্তু কিছুই করার নেই, এদের থামান যাবে না, লাখ লাখ টাকা খরচ করে ক্লিনিং কোম্পানিতে এসেছে ৬০ দিনার বেতনে, যা থেকে নিম্নে ২০ দিনার পারসোনাল খরচ আছে, বাঁচে ৪০ দিনার, যা বাংলাদেশের ১০ হাজার টাকার সমতুল্য!
পরিবার চলবে কিভাবে? তাই ডিউটির পরে এদের কেউ কেউ নানা ছুতায় রাস্তায় ভিক্ষা করে, কেউ কেউ বিধিবিধান অমান্য করে রাস্তার পাশে সবজি বিক্রি করে, কেউ কেউ আবার সিগন্যালে টিস্যু বক্স বিক্রি করে, কেউ আবার রাস্তায় বড় বড় ডাস্টবিনে কাগজ-পেপসি ক্যান, কার্টুন কুড়াতে দেখা যায়! এ সব কিনে নেয় তাঁদেরই সুপারভাইজার অথবা অন্য প্রতিনিধি, নানা হাত বদলে কিছু পয়সা পায় আর তা যোগ করে পরিবারের ভরণপোষণ চালিয়ে যাচ্ছে বছরের পর বছর, কে কার খবর রাখে!?
আপনারা কয়েক মাস আগে দেখেছেন ‘নাজের আল ইসলাম’ নামে এক ব্যাক্তিকে নিয়ে টুইটে হাসি ঠাট্টার ঝড় উঠেছিল! এই ব্যাক্তি অবাক হয়ে জুয়েলারি দোকানের শোকেসে তাকিয়ে আছে, কেউ একজন ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোষ্ট করে লিখেছে ময়লার গারবেজে তাকিয়ে আছে বাংলাদেশী!! তাঁকে ভিক্ষা দেয়ার জন্য অনেকেই এগিয়ে এসেছে মানবতা উড়াতে! আরবিরা সারা দুনিয়ায় খবর ছড়িয়েছে বাঙালীর প্রতি দয়া দেখিয়েছে! বাঙালিরা কবে দয়া নেয়া বন্ধ করবে? বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করা বীরের জাতির এই সব বাঙালী কি কখনো বুঝবে না যে ভিক্ষা করে খাওয়ার চেয়ে উপাস থাকা ভাল!?
অথচ এই কাজে ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল বা অন্য দেশের কাউকে দেখা যায় না! পাকিস্তান, ভারত, ফিলিপাইনের শত শত ডাক্তার-নার্স-ইঞ্জিনিয়ার-শিক্ষক গালফে সেবা দিয়ে যাচ্ছে!
ডিজিটাল বাংলাদেশ! বড় বড় কর্তারা তর্কে লিপ্ত হচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশ নিয়ে, টিভি খুললেই এগুলো নিয়ে হাতাহাতি দেখি! কাউকে কোন দিন তর্কে লিপ্ত হতে দেখি না ফরেন এমপ্লয়িদের সুযোগ সুবিধা নিয়ে! আমরা বাঙালী, আমরাই শুধু ক্লিনার, বাঙালী ক্লিনার ছাড়া পরিষ্কার হয় না গালফের রাজপথ!


সর্বশেষ এডিট : ২০ শে মার্চ, ২০১৭ সন্ধ্যা ৬:৩০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



