......শাহবাগ শেরাটন ক্রসিং এ দীর্ঘক্ষন ট্রাফ্রিক সিগন্যালে পড়ে আছেন, কিন্তু আপনার খুব দ্রুত গুলশান ২ নম্বরে যেতে হবে, সমস্যা কি.. আপনার গাড়ির এক্সট্রা পাওয়ার ফ্যান চালু করে দিন, আপনার গাড়ির উপরের পাখা দুটি দুদিকে মেলে যাবে, আপনি উড়ে চলে যাবেন, কোন ট্রাফিক জ্যাম আপনার জন্য সমস্যা হবে না। বাংলাদেশে এটাকে হয়ত গল্প মনে হতে পারে, কিন্তু জাপান, রাশিয়া, জার্মানীর মত দেশে এটা বাস্তব, যদিও অনেক ব্যয় বহুল । কিন্তু তারপরেও তো প্রযুক্তির উৎকর্ষতায় আর বিজ্ঞানীরদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এসব উদ্ভাবন আর সৃষ্টি এগিয়ে চলছে মানব কল্যানে।বাংলাদেশ নামের এই ভূখন্ডে কবে প্রথম প্রথম প্রযুক্তির পরশ লেগেছিল, তা ঠিকমত বলা না গেলেও রেডিও’র ব্যবহারই এ ভূখন্ডের মানুষকে প্রথম প্রযুক্তির ছোয়া দিয়েছিল, এটা অনেকটা নিশ্চিত। বৃটিশ ভারত শাসন আমলে এ অঞ্চলের মানুষ প্রযুক্তির তেমন কোন সুবিধা না পেলেও শুরু হয়েছিল মূলত তখন থেকেই। এরপর পূর্ব পাকিস্তান...৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে রণক্ষেত্রের অনেক খবরই স্বাধীন বাংলা কেন্দ্রের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা এবং সাধারন মানুষ জানতে পারত, সেভাবে শত্রুর মোকাবেলা করার জন্য যুদ্ধের প্রস্তুতিও নিতে পারত তা। আসলে তখনকার রেডিও আমাদের মুক্তিযুদ্ধে প্রযুক্তির অনেক বড় অবদান। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে নিজস্ব চিন্তা, মনন ও সৃষ্টির মিশেলে আধুনিক বিজ্ঞানমনস্কতার চর্চা। আসলে বর্তমানে যদি কাউকে প্রশ্ন করা হয়, বাংলাদেশ প্রযুক্তির সব চেয়ে বড় কোন আবিষ্কারকে বেশি ব্যবহার করছে কিংবা সুবিধা ভোগ করছে, তাহলে এক নিমিশেই হয়ত অনেকে বলে দিবেন মোবাইল ফোন বা সেল ফোন। হ্যা, ৮০’র দশকে এর প্রথম যাত্রা শুরু হলেও ৯০ দশকের শেষ দিকে মোবাইল বিপ্লব ঘটে বাংলাদেশে। আর এখন তো বাংলাদেশের কারো কাছে মোবাইল ফোন না থাকাকে বিস্ময়কর মনে হয়। অবশ্য বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, পরিবেশ আন্দোলনের নেতা অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ, বিশিষ্ট কলামিষ্ট আবুল মকসুদ এদের মোবাইল ব্যবহার না একটু ভিন্ন ব্যাপার। আচ্ছা বর্তমান সময়ে কি আপন কখনো নিজেকে মোবাইল ছাড়া চিন্তা করতে পারেন ? এ প্রশ্নে অনেকেই হয়ত একটু ধাধায় পড়ে যাবেন, কি করে এটা সম্ভব। আর বাড়ির বাইরে তো এটা চিন্তাও করা যায় না। এই যে মোবাইলের কল্যাণে প্রতিমূহুর্তে আমরা আত্মীয় স্বজন, অফিস কিংবা ব্যবসায়ীক অনেক জরুরী কাজ অল্প সময়ই করে ফেলছি, কতটা সহজ হয়ে গেছে আমাদের জীবন।এর ফলে চিঠি পত্রের সংস্কৃতি উঠে যেতে বসেছে। যে কারনে টেলিগ্রাম সিষ্টেমকে বন্ধ করে দিয়েছে ডাক বিভাগ, আর চিঠিপত্র বিলিও কমে গেছে ডাকপিয়নদের। শুধু সরকারি কিছূ কাগজপত্র নামমাত্র ডাকে চালাচালির কারনে এখনও টিকে আছে দেশের সবচেয়ে পুরোনো যোগাযোগের মাধ্যম ডাক বিভাগটি। আসলে মোবাইলের সুফল এখন আর লিখে বোঝানোর বিষয় নেই, ব্যবহারের বিষয়। গ্রামে থাকা আপনার মা সকালের নাস্তাটা করেছে কিনা, লন্ডনে থাকা আপনার ভুলোমন ভাই ওষুধটা ঠিকমত খাচ্ছে কিনা, সব কিছুর খোজ খবর নেয়া তো নিত্যকার কাজ। আর বর্তমানের বিভিন্ন কোম্পানীর মোবাইল ফোন সেটের বিভিন্ন অপশনের কারনে মোবাইল তো পুরোদস্তুর এক কম্পিউটার বনে গেছে। শেয়ার বাজারের আপডেট, ইমেইল চেক করা, টিভি খবর দেখা, নামাজের সময় সূচি, ইফতার সেহেরীর এলার্ট আরো কত কি। তবে একই সাথে কিছু লোকের এ প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারনে অনেকের জীবন আবার বিষিয়ে উঠছে, যেমন, মোবাইলে অপরিচিত কাউকে ডিষ্টার্ব করা, ফোনে চাঁদা চেয়ে হুমকি দেয়া, ব্যাংক থেকে টাকা তুলে বের হওয়া ব্যক্তির অবস্থান ছিনতাইকারীদের জানিয়ে দেয়াসহ নানা অপরাধ কর্মকান্ডে অপব্যবহার হচ্ছে মোবাইল ফোন।কিন্তু তার পরেও অপরাধীদের ধরতে , চোরাই মোবাইল উদ্ধারের জন্যও এখন আবিষ্কার হয়েছে মোবাইল ট্রাকার, যা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রযুক্তি নির্ভর করে দ্রুত কাজ করতে সহায়তা করছে।এরই অংশ হিসেবে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে ডিজিটালাইজড করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। যে খানে পুলিশ কমিশনার ডিএমপি সদর দপ্তরে বসেই সারা ঢাকা শহরের সার্বিক অবস্থা দেখতে পাবেন ক্লোজসার্কিট ক্যামেরার স্ক্রিনে। কোথায় কিভাবে চুরি ছিনতাই কিংবা গাড়ি দূঘর্টনা ঘটছে, কিংবা কোন গাড়ি ট্রাফিন আইন অমান্য করলে তারও রেকর্ড থাকবে এই সিসিক্যামেরার মেমোরীতে। আর এজন্য পুরো ঢাকা শহরের ৩৫ টি থানার মধ্যে ৩৩ টি থানায় কম্পিউটার বসানো হয়েছে, ৫৯ টি পয়েন্টে থাকছে ১৫৫ টি সিসি ক্যামেরা, ইলেকট্রনিক ট্রাফিক সাইনবোর্ড থাকবে ৩১ টি। শুধু মোবাইলই না ইন্টারনেট ইমেইলও আমাদের জীবনের গতি পাল্টে দিয়েছে। নিয়ে এসেছে প্রগতির স্পর্শ।কিন্তু বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে ইন্টারনেট পেনিট্রেশনের দিক থেকে আমরা এখনও অনেক পিছিয়ে। আমাদের দেশে অনলাইন সেবার সুযোগ পরিমিতভাবে গ্রাহকদের কাছে এখনও পৌছাতে পারেনি। এজন্য অবশ্য সরকারি উদ্যোগের ঘাটতি, সচেতনতার অভাব, ইন্টারনেট সেবার উচ্চমূল্য দায়ী। যে টুকুবা ইন্টারনেট সেবা আমরা পাচ্ছি তাও অপ্রতুল, যে খানে দক্ষিন কোরিয়ার মত দেশ ৩২.৩৩ মেগাবাইট ফাইল প্রতি সেকেন্ড ডাউনলোড করছে সেখানে আমরা বাংলাদেশে পাচ্ছি প্রতি সেকেন্ড ১.০৫ মেগাবাইট, যা বিশ্বের ইন্টারনেট গতির তালিকায় ১৪৩ তম স্থানে। ইন্টারনেট গতি এ অবস্থা রেখে দেশকে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন আসলে অধরা থেকে যাবে। কারন আরো একটি দুখের সংবাদ আছে বাংলাদেশী ইন্টারনেট সেবা ব্যবহারকারীদের জন্য তা হল, অবৈধ ভিওআইপি বন্ধের জন্য ভিস্যাট সংযোগ বন্ধ করে দিয়েছে বাংলাদেশ। অবৈধ ভিওআইপি ব্যবহারের অভিযোগে এই ভিস্যাট বন্ধ করা হলেও এর মাধ্যমে অবৈধ ভিএআইপি হত ০.৩-০.৫%। যেখানে প্রায়ই বাংলাদেশের সাবমেরিন ক্যাবল কাটা পড়ে, আন্তজার্তিক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে বাংলাদেশের সে প্রেক্ষাপটে আমাদের দেশের জন্য ভিস্যাট বন্ধ কোন ভাবেই যৌক্তিক নয়, বরং নতুন সংযোগ চালু করা উচিত। ভারতের মত দেশে ১১ টি স্যাটেলাইট থাকার পরেও ১ লাখেরও বেশি ভিস্যাট ব্যবহার করা হচ্ছে। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব কোন স্যাটেলাইট না থাকা অবস্থায় ভিস্যাট বন্ধ করে দেয়া কোন ভাবেই সরকারের যৌক্তিক সিদ্ধান্ত হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন বিষেজ্ঞরা। আর এই ভংগুড় অবস্থা দিয়ে বাংলাদেশকে ডিজিটালাইজড করা ছেড়া কাথায় শুয়ে রাজভোগের স্বপ্ন দেখার চেয়ে খুব বেশি কিছূ না।তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে এক গবেষণা প্রতিবেদনে সম্প্রতী দেখা গেছে, তথ্যপ্রযুক্তিগত অবস্থানে বাংলাদেশ তার অবস্থান ১৩০ থেকে গত কয়েক বছরে ১১৮ তে উন্নীত হয়েছে। কিন্ত সঠিক পরিকল্পনা আর যতসুই অবকাঠামো উন্নয়ন ও সুযোগ সুবিধা সৃষ্টি করতে না পারলে তাও নষ্ট হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। গত ৩০ জুন বাংলাদেশ ইউনিকোডের সদস্যপদ লাভ করে, যা বাংলাদেশের প্রযুক্তি উন্নয়নের পথে আকেটি বিপ্লবের পথ খুলে দিয়েছে। এখন দরকারে সরকারি বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানে ইউনিকোডের ব্যবহার নিশ্চিত করে বাংলায় সমস্ত তথ্য গুলো সংরক্ষন এবং প্রাতিষ্ঠানিক আন্তসংযোগ বৃদ্ধি করা, নইলে এর সুফল থেকে বাইরে থেকে যাবে দেশের মানুষ। আর পাইরেসির বিষয়ে বাংলাদেশের চলমান দূর্নামরোধে প্রযুক্তিবিদদের এগিয়ে আসতে হবে , নইলে এ লজ্জা আরো অনেক দিন বয়ে বেড়াতে হবে এ বীরের জাতিকে। গুটিকতক মানুষের জন্য এ দূর্নাম বয়ে না বেরিয়ে তা থেকে মুক্ত হওয়াটা জরুরী।আমাদের খুব কাছের দেশ শ্রীলংকা ২০১২ সালের মধ্যে আইসিটি খাতে ২০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষমাত্রা নির্ধারন করেছে, এরফলে সে দেশের লাখো তরুনের কর্মসংস্থান আপনাআপনিই সৃষ্টি হচ্ছে। লাখো শিক্ষিত বেকারের এই দেশে আইসিটি খাতের ওমন বিপ্লব কবে হবে, ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টারা কি এব্যাপারে দ্রুত কোন উদ্যোগ নিবেন ? উদ্যোগ নিলেই এটা বাস্তবায়ন সম্ভব, কারন এখন কলসেন্টার চালু করেই দেশের অনেক বেকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টির পাশাপাশি তাদেরকে প্রযুক্তিজ্ঞানে আরো দক্ষ কর গড়ে তোলা সম্ভব। যা দেশকে দিতে পারে আরো নতুন কোন সম্ভাবনার দিকদর্শন।
[email protected]

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


