somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ট্যাক্সিক্যাব দুর্ঘটনা: দুটি স্বপ্নের মৃত্যু

০৩ রা মার্চ, ২০১২ দুপুর ১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাল টা ছিল ২০০৬ এর শীত কাল এবং ডিসেম্বর মাস। কিন্তু দিন তারিখ টা ঠিক মনে নেই। চ্যানেল এস ( যুক্তরাজ্য ভিত্তিক টেলিভিশন এর ঢাকা অফিস) এর নাইট শিফট চালু ছিল না। তবুও মাঝে মধ্যে বিশেষ কোন কারনে নাইট ডিউটি দেয়া হত। ঐ দিন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ( তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী) যুক্তরাষ্ট্রসহ আরো বেশ কয়েকটি দেশ সফর শেষে ঢাকায় ফিরবেন ভোর ৪ টার ফ্লাইটে। আর তখন রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার কারনে বিরোধীদলীয় নেত্রীর যে কোন বক্তব্যই মিডিয়ার জন্য খুবই গুরূত্বপূর্ন। তাই রাত ৩ টার দিকে আমাকে এ্যাসাইনমেন্ট দেয়া হল জিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট এর ভিআইপি লাউঞ্জে ( বর্তমান হযরত শাহজালাল (র.) ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোট)। সাথে ক্যামেরাম্যান মাসুম। আর ড্রাইভার রাজু। ভোর ঠিক ৩ টার দিকে ক্যামেরা ও প্রয়োজনীয় আনুসঙ্গিকসহ ক্যামেরাম্যান মাসুমকে নিয়ে গাড়ি আমার বাসায় আসল। ফার্মগেটের তেজকুনীপাড়া ( র্যাংগস ভবনের পেছনে) তখন র্যাংগস ভবন ছিল। তো শীতের ভোরে উষ্ণতার স্বাদ পরিহার করে চললাম নিউজ কাভার করতে। ফার্মগেট বিজয়সরণী, জাহাঙ্গির গেট, মহাখালী, কাকলি পার হয়ে আমাদের গাড়ি ছুটছে জিয়া বিমানবন্দরের দিকে (বর্তমান হযরত শাহজালাল (র.) বিমানবন্দর) । কিন্তু বনানী পার হয়ে স্টাফ রোডের কাছে আসতেই ড্রাইভার রাজু হঠাৎ গাড়িটি থামিয়ে পেছনের দিকে যেতে থাকল, তত সময়ে ঘুমে কিছুটা তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু রাজুর ডাকে সজাগ হয়ে যা দেখলাম, তা যে কাউকেই বিস্মিত করে দিবে। একটি নীল ট্যাক্সি ক্যাব। সামনে ড্রাইভার মাথা ফেটে এবং নাক মুখ গাল কেটে রক্ত ঝড়ছে, বাম পাশের সিটে একজন মানুষ যার শুধু মাত্র মুখ অর্থাৎ চেয়ালের নিচের অংশ আছে ওপরের অংশ কেটে ঝুলে আছে, প্রচন্ড গোঙানির শব্দ..আর রক্ত ঝড়ে পড়ছে তার শরীর বেয়ে। অন্ধকারে এর চেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছিল না। তখন আমাদের গাড়িটি ঘুরিয়ে হেডলাইট জ্বালিয়ে ভেতরে দেখলাম পেছনের সিটে মহিলা শিশুসহ আরো ৩ জন, তারাও গুরূতর আহত। শুধু মহিলা এই টুকু বলছিল তারা কুমিল্লা থেকে সায়দাবাদ নেমে এই ট্যাক্সিতে করে টঙ্গি যাচ্ছিল। তখন হঠাৎ তাদের সামনে লোহার পাইপ ও টিন বোঝাই ভ্যানের সাথে ধাক্কা লাগলে সামনের সিটে বসা ড্রাইভার এবং আরো একজনের নাক মুখ গাল কেটে গেছে। স্টাফরোডের রেল ক্রসিংএ উঠতে গিয়ে ট্রাক্সিটি তাড়াতাড়ি যেতে থাকলে পাশে থাকা ভ্যান ভর্তি ২/৩ ইঞ্চি মোটা লোহার পাইপ ও টিন দেখতে পায়নি ট্যাক্সি চালক, আর ঐ ভ্যানের সাথে ধাক্কা লেগেই এ মারাত্মক দূর্ঘটনা। আহত সামনের সিটের দুজন এতটাই রক্তমাখা ছিল যে তাদের ওখান থেকে ওঠানো এবং গাড়িতে তোলা আমাদের সম্ভব ছিল না। তখন পেছন সিটের তিনজনকে আমাদের গাড়িতে বসিয়ে তাড়াতাড়ি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ’এ) ভর্তি করিয়ে দিয়ে আসি আর যাওয়ার সময়ে স্টাফ রোডে কর্তব্যরত এমপি (মিলিটারী পুলিশ)কে দূর্ঘটনার কথা বলে যাই , যাতে তারা এ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে মারাত্মক আহত ঐ দুই ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনার ব্যবস্থা করে। আমরা ৩ জনকে সিএমএইচ’এ ভর্তি করিয়ে ক্যান্টনমেন্ট থেকে বের হয়ে আসতেই দেখলাম সেনাবাহিনীর একটি এ্যাম্বুলেন্স ঐ দু’জনকে সিএমএইচএ নিয়ে যাচ্ছে। এবার ক্যান্টনমেন্ট থেকে আমরা খুব তাড়াতাড়ি করে বিমানবন্দরের দিকে রওয়ানা হলাম। কারণ পাছে এ্যাসাইনমেন্ট মিস না করি। যাক ভোর ৪.৪৫ মিনিটে গিয়ে আমরা বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জে পৌছলাম। ভাগ্যিস কি এক কারনে যেন বিমান দেরী করছিল। তাই আওয়ামীলীগ সভানেত্রী তখনও এসে পৌছাননি। পরে প্রায় ২০ মিনিট পরেই শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি এসে পৌচাল। তিনি আসলেন, ভিআইপি লাউঞ্জে সাংবাদিকদের সাথে কথা বললেন। রাজনৈতিক টালমাটাল অবস্থার সম্পর্কেও ছিল তার অনেক গুরূত্বপূর্ন বক্তব্য। কিন্তু আমার যেন ঔসব কোন নিউজই মাথায় কাজ করছিল না। শুধু ট্যাক্সি ক্যাবের আহত লোকগুলোর কথা এবং চিত্রগুলো চোখের সামনে ভাসছিল। বিমান বন্দরের এ্যাসাইনমেন্ট শেষ করে ফেরার পথে সিএমএইচ এ গেলাম। গিয়ে শুনলাম চোয়ালের ওপরের অংশসহ মাথা ঘাড় কেটে যাওয়া লোকটি মারা গেছে, আর ড্রাইভারের অবস্থাও আশংকাজনক। ইচ্ছা থাকলেও বেশি সময় থাকতে পারলাম না। অন্য এ্যাসাইনমেন্ট ও নিউজ ধরানোর তাড়া থেকেই ফিরে এলাম অফিসে। নিউজ এডিট করা, স্ক্রিপ্ট করাসহ অন্যান্য কাজের ঝামেলা শেষে দুপুরের দিকে ফোন করলাম সিএমএইচ’এ। ততসময়ে ড্রাইভারও মারা গেছেন। মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আসলে মৃত্যুটা কত স্বাভাবিক। রাতে বউ বাচ্চা রেখে টাকা উপার্জনের জন্য ট্যাক্সি নিয়ে বের হওয়ার সময়ও কি ড্রাইভার ভাবছিল, এটা তার শেষ বের হওয়া। আর ফেরা হবে না।যাত্রীরা যারা গ্রামের বাড়ি থেকে কর্মস্থলে যাচ্ছিল আবারো কর্মচঞ্চল হয়ে ওঠার জন্য। তারা কি এ ধরনের দূর্ঘটনার জন্য, মৃত্যুর কথা ভেবেছিল। না নিয়তিই ডেকে এনেছে সব কিছু। তবুও যাত্রা পথে সড়ক, জল কিংবা বিমান পথে বেশ কিছু সাবধানতা অবশ্যই মেনে চলা উচিৎ। কারন আজকাল যে পরিমানে দূর্ঘটনা বেড়েছে, বিশেষ করে সড়ক দূর্ঘটনা, তাতে ঘর থেকে বের হতে প্রতিমূহুর্তেই এক অনিশ্চয়তা তাড়া করে ফেরে সবাইকেই। তবে গাড়ির চালকদের একটু সচেতনতাই এসব দূর্ঘটনা কমিয়ে আনতে পারে বহুগুনে। কারন একটি মৃত্যু শুধু একটি মৃত্যুই না, একটি মৃত্যু একটি স্বপ্নের বিনাশ, একটি পরিবারের অনিশ্চয়তা , কারো সারা জীবনের কান্না। তাই দূর্ঘটনা প্রতিরোধে সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এগিয়ে আসতে হবে, নিতে হবে দায়িত্ব।


লেখক : টিভি সাংবাদিক
[email protected] :-B :-B
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×