somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী পালকি এখন শুধুই ইতিহাস

১৪ ই মার্চ, ২০১৭ দুপুর ১:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কালের বিবর্তনে ঐতিহ্যবাহী পালকি এখন শুধুই ইতিহাস। পালকি মানুষ বহনের একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন বাহন। এই বাহনে ১ বা ২ জন যাত্রী নিয়ে ২, ৪ বা ৮ জন বাহক এটিকে কাঁধে তুলে একস্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে যায়। পালকি শব্দটি সংস্কৃত ‘পল্যঙ্ক’ বা ‘পর্যঙ্ক’ থেকে উদ্ভূত। পালি ভাষায এই যানের নাম ‘পালাঙ্কো’। হিন্দি ও বাংলায় এটি পালকি নামে পরিচিত। বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা এবং চতুর্দশ শতকের পর্যটক জন ম্যাগনোলি ভ্রমণের সময পালকি ব্যবহার করতেন বলে জানা যায়। সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে এবং পরবর্তী সমযে সেনাধ্যক্ষদের যাতাযাতের অন্যতম বাহন ছিল পালকি। আধুনিক যানবাহন আবিষ্কৃত হওয়ার আগে অভিজাত শ্রেণীর লোকেরা পালকিতে চড়েই যাতায়াত করতেন। জেলার প্রত্যান্ত অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বিয়েতে ও অন্যান্য শুভ অনুষ্ঠানে বর-কনের জন্য পালকি ব্যবহারের প্রথা চালু ছিল।
জেলার সিরাজদিখানের ৭০ বছরের বৃদ্ধা আম্বিয়া বেগম জানান, ২০ বছর বয়সে পালকিতে চড়ে বাপের বাড়ী ছেড়ে স্বামীর বাড়ীতে এসেছি। বয়স হয়ে গেছে এখন মনে পরে সেই দিনের কথা । গ্রামে বিয়ে হলেই বর কনে কে পালকিতে করে গান গাইতে গাইতে নিয়ে আসতো দেখে খুব আনন্দ পেতাম এখন আর পালকি দেখা যায় না। কালের বিবর্তনে বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য সব হারিয়ে যাচ্ছে।
মুন্সীগঞ্জের টংগীবাড়ী উপজেলার পূরা বাজারে থাকা পালকি চালক গমরেস বলেন, আমাদের বাপ দাদারা প্রাচীন কাল থেকে পালকি দিয়ে বিবাহের সময় বর কনেকে বহন করতেন। আমরা এক কালের কলকাতার লোক ছিলাম কাজের তাগিদে বংসের ধারাবাহিকতা রক্ষার্থে আমরাও পালকি চালিয়ে জীবীকা নির্বাহ করার জন্য বাংলাদেশে চলে আসি। এখন আর আগের মতো বিবাহ অনুষ্টানে আমাদেরকে ডাকা হয়না। অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতে হয় আমাদের। মাসে দু”একটা বিবাহে আমাদের ডাক পরে। যা পাই তা দিয়ে কোনমতে সংসার চলে ।
পালকি বিভিন্ন আকৃতি ও ডিজাইনের হয়ে থাকে। সবচেয়ে ছোট ও সাধারণ পালকি (ডুলি) দুজনে বহন করে। সবচেয়ে বড পালকি বহন করে চার থেকে আটজন পালকি বাহক। পালকি বাহকদের বলা হয় বেহারা বা কাহার। হাডি, মাল, দুলে, বাগদি, বাউডি প্রভৃতি সম্প্রদায়ের লোক পালকি বহন করে। পালকি বহনের সময তারা বিশেষ ছন্দে গান গায়। তাদের চলার গতির সঙ্গে তাল মিলিযে গানের তাল-লয় পরিবর্তিত হয়।
কাঠমিস্ত্রীরা সেগুন কাঠ, শিমুল কাঠ, প্রবৃতি কাঠ দিয়েও পালকি তৈরি করে। বটগাছের বড ঝুরি দিয়ে তৈরি হয় পালকির বাঁট বা বহন করার দন্ড। পালকি সচরাচর তিন ধরনের হযে থাকে যেমন, সাধারণ পালকি, আযনা পালকি এবং ময়ূরপঙ্খি পালকি। সাধারণ পালকি আয়তাকার। চারদিক কাঠ দিযে আবৃত এবং ছাদ ঢালু।
এর দুদিকে দুটি দরজা থাকে। কোন কোনটিতে জানালাও থাকে। পালকির বাইরের দিকে আলপনা আঁকা থাকে। ভেতরে চেয়ারের মতো দুটি আসন ও একটি টেবিল থাকে। ময়ূরপঙ্খি পালকির আয়তন সবচেয়ে বড়। এই পালকি ময়ূরের আকৃতিতে তৈরি করা হয় ভিতরে দুটি চেয়ার, একটি টেবিল ও তাক থাকে। এ পালকির বাঁটটি বাঁকানো এবং এর বাইরের দিকে কাঠের তৈরি পাখি, পুতুল ও লতাপাতার নকশা থাকে।
সে যুগের পালকি ছিল এ যুগের মোটরগাড়ি অনুরূপ। স্টিমার ও রেলগাড়ি আবির্ভাবের পূর্বে ভারতের গভর্নর জেনারেলও পালকিতে চড়ে যাতায়াত করতেন। উনিশ শতকের প্রথমদিকে ডাক ও যাত্রী বহনের জন্য ডাকবিভাগ ‘স্টেজ পালকি’ চালু করে। এই প্রথা উনিশ শতকের শেষ নাগাদ প্রচলিত ছিল। দূরের যাত্রীরা ডাকঘর থেকে স্টেজ পালকির টিকেট ক্রয় করত। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সমযে ইংরেজরা পালকিতে চড়া প্রায় বন্ধ করে দেয়। তবে উনিশ শতকের শেষাবধি স্থানীয় বাবু এবং অভিজাত শ্রেণীর ব্যক্তিবর্গ যাতায়াতের জন্য পালকিই ব্যবহার করতেন। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহ অবস্থানকালে তাঁর জমিদারি কাচারি পরিদর্শনের সময যে পালকি ব্যবহার করতেন, তা এখনও কুঠিবাড়িতে সংরক্ষিত রয়েছে। সে যুগে স্বছল পরিবারের নিজস্ব পালকি থাকত এবং তাদের ভৃত্যরাই তা বহন করত। সাধারণ মানুষ পালকি ভাড়া করত।
উনিশ শতকের চতুর্থ দশকে দাসপ্রথা বিলোপের পর বিহার, উড়িষ্যা, ছোটনাগপুর এবং মধ্যপ্রদেশ থেকে পালকি বাহকরা বাংলায় আসতে থাকে। বহু সাঁওতাল পালকি বাহকের কাজ নেয়। শুষ্ক মৌসুমে তারা নিজেদের এলাকা থেকে এদেশে আসত এবং বর্ষা মৌসুমে আবার চলে যেত। প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমের শেষে তারা কয়েকটি এলাকায় যেত এবং কোথাও কোথাও অস্থায়ী কুঁড়েঘর বানিয়ে সাময়িক আবাসের ব্যবস্থা করে নিত।
উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে যাতায়াতের মাধ্যম হিসেবে স্টিমার ও রেলগাড়ি চালু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পালকির ব্যবহার কমতে থাকে। ক্রমশ সড়ক ব্যবস্থার উন্নতি এবং পশুচালিত যান চালু হলে যাতায়াতের বাহন হিসেবে পালকির ব্যবহার প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্রমাগত প্রসার, সডক ও নদীপথে মোটর ও অন্যান্য যানের চলাচল এবং প্যাডেল চালিত রিকশা জনপ্রিয় হওয়ার ফলে পালকির ব্যবহার বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে পালকি বাংলাদেশের অতীত ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবেই পরিচিত। এখন পালকির বদলে ঘোড়ার গাড়ী দিয়ে বিবাহের বর কনেকে বহন করতে দেখা যায়।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই মার্চ, ২০১৭ দুপুর ১:২৫
৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিএনপি একটি বেঈমান আর গাদ্দারদের দল।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫০

‘বিএনপি ৭৫এর যোদ্ধাদের রক্ষা করেনি, ২৪ এর যোদ্ধাদেরও রক্ষা করবে না।’ ...বাকিটুকু পড়ুন

এলপিজি কার্ডে সংকট কমবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:১৬


অনেক হতাশার মধ্যেও মাঝেমধ্যে সরকারের কোনো ভালো উদ্যোগের খবর দেখলে ভালো লাগে। অন্তত মনে হয়, সাধারণ মানুষের কষ্টের জায়গাগুলো নিয়ে সরকার কিছুটা হলেও ভাবতে শুরু করেছে। তেমনই একটি খবর... ...বাকিটুকু পড়ুন

আত্মহনন ও পক্ষপাতিত্ব

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:২৮


রবীন্দ্রনাথ কি বাংলাদেশের নাগরিক ??!! শুধুমাত্র জাতীয় সংগীতের রচয়িতা এবং বাংলাদেশে কিছু সুশীলদের (ভালো নাপিত) তাকে নিয়ে নানা রকমের কলহ-বিবাদ-বিভক্তি তৈরী ব্যতিত; বাংলাদেশে তার আর অবদান কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

তারা ভারতের এই সফট টুলস রবীন্দ্রনাথকে রক্ষা করবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৩


কয়েকদিন আগে পাকিস্তান রাষ্ট্রের জাতীর পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি ছিঁড়ে ফেলা হলো, সেখানে তো গ্রেপ্তার দেখলাম না! সেখানে কি পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের অবণতির শঙ্কা ছিলো না? পাকিস্তানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

এআই মন্তব্যের পর ব্লগারগণের পোষ্ঠ ভালো বুঝে আসে

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১২ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২০



চাঁদগাজী/সোনাগাজী বলতেন অনেক ব্লগার গরুর রচনা এবং অনেক ব্লগার গার্বেজ লেখেন। তাঁর এমন মন্তব্যের কারণে তাঁর বিরোধী ব্লগার সংখ্যা বেড়ে যায়। ফলে তিনি বার বার ব্যানের শিকার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×