প্রায় সোয়া দুই কোটির বেশী মানুষের বাস রাজধানী ঢাকায়।
শত শত বছরের পুরোনো এই শহরে সময়ের সাথে সাথে মানুষের জীবনযাত্রা থেকে শুরু করে সব বিষয়েই ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। ঢাকাবাসীর জীবনযাত্রার পরিবর্তন, তৈরি হওয়া বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা - শব্দ দূষন।
যে শব্দে মানুষ ও প্রাণী ক্ষতির শিকার হয় তা-ই হলো শব্দ দূষণ। শব্দ দূষণ হলো পরিবেশ দূষণের অন্যতম প্রধান কারণ যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অপ্রয়োজনীয় উচ্চ শব্দের কারণে শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, ইউনিসেফ ও বিশ্বব্যাংক পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকায় ৩০টি কঠিন রোগের উৎস ১২ ধরনের পরিবেশ দূষণ। আর এর মধ্যে অন্যতম হলো শব্দ দূষণ। মানুষের জন্য শব্দের সহনীয় মাত্রা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা নির্ধারণ করেছে ৪৫ ডেসিবেল।

উল্লেখ্য, ডেসিবেল হচ্ছে কোনো শব্দ তরঙ্গের চাপ যদি এক সেকেন্ডে এক গ্রাম ওজনবিশিষ্ট কোনো বস্তুকে এক সেন্টিমিটার দূরত্বে সরিয়ে দিতে পারে তাহলে সেই পরিমাণ শব্দ চাপকে এক ডেসিবেল বলা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গবেষণায় প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, নিয়মিত শ্রবণে সাধারণত ৬০ ডেসিবেল শব্দের তীব্রতায় মানুষ সাময়িক বধির এবং ১০০ ডেসিবেল স্থায়ী বধির হয়ে যেতে পারে। এছাড়া শব্দ দূষণের কারণে টিনিটাস বা শ্রবণশক্তি হ্রাস, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হƒদস্পন্দন, মাথা ধরা, বদহজম, অজীর্ণ, পেপটিক আলসার, ফুসফুসের রোগ, দুশ্চিন্তা, উগ্রতা, অনিদ্রা, ভুলোমন, মানসিক ভারসাম্যহীনতা, অবসাদগ্রস্ততা ইত্যাদি নানা মানসিক রোগে ঢাকার মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদফতরের পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬-এর গেজেটের নির্দেশনা অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন এলাকার শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে। এই আইনে হাসপাতাল, ক্লিনিক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পার্শ্ববর্তী ১০০ মিটার এলাকাকে নীরব এলাকা ঘোষণা করা হয়েছে। নগরীর ব্যস্ততম ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকাকে মিশ্র এলাকা, আবাসিক ও বাণিজ্যিক এবং অন্যান্য এলাকার জন্যও আইনে শব্দের মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। নীরব এলাকায় শব্দের মাত্রা দিনে ৪৫ ও রাতে ৩৫ ডেসিবেল, আবাসিক এলাকায় দিনে ৫০ ও রাতে ৪০ ডেসিবেল, মিশ্র এলাকায় দিনে ৬০ ও রাতে ৫০ ডেসিবেল, বাণিজ্যিক এলাকায় দিনে ৭০ ও রাতে ৬০ ডেসিবেল এবং শিল্প এলাকায় দিনে ৭৫ ও রাতে ৭০ ডেসিবেল।

আইনে নীরব এলাকার ১০০ মিটারের মধ্যে হর্ন বাজানো, আবাসিক এলাকার ৫০০ মিটারের মধ্যে ইট বা পাথর ভাঙার যন্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ। কোনো উৎসব, সামাজিক বা রাজনৈতিক অনুষ্ঠানে মাইক, এমপ্লিফায়ার ব্যবহার করতে হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতির প্রয়োজন। আইন ভঙ্গকারীর জন্য কারা ও অর্থ উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
রাজধানীসহ দেশের অন্যান্য জনবহুল শহরে শব্দ দূষণের প্রধান কারণ, যানবাহনের জোরালো হর্ন, ইঞ্জিনের ও নির্মাণ কাজের শব্দ এবং ভবন ভাঙার শব্দ। আরো শব্দ দূষণ ঘটছে মূলত যানবাহনে ব্যবহূত হাইড্রোলিক ভেঁপু অথবা মাইক্রোফোন অথবা শ্রুতি বাদন যন্ত্র (ক্যাসেট পেয়ার) দ্বারা। বাস, ট্রাক এবং স্কুটারে ব্যবহূত হাইড্রোলিক ভেঁপু শহরের জনপূর্ণ সড়কে চলমান নারী-পুরুষের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়।
ঢাকা শহরের শব্দ দূষণ এভাবেই প্রতি মুহূর্তে হাজার হাজার শিশুর শ্রবণ ক্ষমতাকে ধ্বংস করছে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, যদি তিন বছরের কম বয়স্ক শিশু কাছাকাছি দূরত্ব থেকে ১০০ ডিবি মাত্রার শব্দ শোনে, তাহলে সে তার শ্রবণ ক্ষমতা হারাতে পারে। শিশুর স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর অন্যান্য উপাদানগুলো হলো বেতার, টেলিভিশন, ক্যাসেট পেয়ার ও মাইক্রোফোনের উচ্চ শব্দ; কলকারখানার শব্দ এবং উচ্চ মাত্রার চিৎকার, হৈচৈ, গোলমাল। শব্দ স্পন্দনের একক হল হার্টজ। মানুষ সাধারণত ১৫ থেকে ২০ কিলোহার্টজ (কেএইচজেড) স্পন্দনের শব্দ শোনে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতানুসারে, সাধারণত ৬০ ডিবি শব্দ একজন মানুষকে সাময়িকভাবে বধির করে ফেলতে পারে এবং ১০০ ডিবি শব্দ সম্পূর্ণ বধিরতা সৃষ্টি করতে পারে। সেক্ষেত্রে হিসাব করে দেখা গেছে যে, ঢাকা শহরের যেকোন ব্যস্ত সড়কে সৃষ্ট শব্দের মাত্রা ৬০ থেকে ৮০ ডিবি, যানবাহনের শব্দ মিলে তা ৯৫ ডিবিতে দাঁড়ায়; লাউড স্পিকারের সৃষ্ট শব্দ ৯০ থেকে ১০০ ডিবি, কল কারখানায় ৮০ থেকে ৯০ ডিবি, রেস্তোরাঁ এবং সিনেমা হলে ৭৫ থেকে ৯০ ডিবি, মেলা-উৎসবে ৮৫ থেকে ৯০ ডিবি, স্কুটার বা মটরসাইকেলের ৮৭ থেকে ৯২ ডিবি এবং ট্রাক-বাসের সৃষ্ট শব্দ ৯২ থেকে ৯৪ ডিবি। কিন্তু শব্দের বাঞ্ছনীয় মাত্রা হলো: শয়নকক্ষে ২৫ ডিবি, বসবার ও খাবার ঘরে ৪০ ডিবি, কার্যালয়ে ৩৫-৪০ ডিবি, শ্রেণীকক্ষে ৩০-৪০ ডিবি, গ্রন্থাগারে ৩৫-৪০ ডিবি, হাসপাতালে ২০-৩৫ ডিবি, রেস্তোরাঁয় ৪০-৬০ ডিবি এবং রাত্রিকালে শহর এলাকায় ৪৫ ডিবি।

যখন শব্দ এই সীমা অতিক্রম করে তখনই শব্দ দূষণ ঘটে। সীমার বাইরের শব্দ দূষণ শ্রবণ ক্ষমতা ধ্বংস করে, যা কারো মানসিক ভারসাম্যকেও বিনষ্ট করতে পারে। শব্দ দূষণ খিটখিটে মেজাজ সৃষ্টিরও কারণ, এছাড়া এর দ্বারা ফুসফুস আক্রান্ত হয়, শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বাধাগ্রস্ত হয় এবং তাদের লেখাপড়ায় উদাসীন করে তোলে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের জরিপ অনুসারে বাংলাদেশের জন্য যথার্থ শব্দমাত্রা শান্ত এলাকায় দিবাভাগে ৪৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৩৫ ডিবি, আবাসিক এলাকায় দিবাভাগে ৫০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৪০ ডিবি, মিশ্র এলাকায় (আবাসিক, বাণিজ্যিক ও শিল্প এলাকা) দিবাভাগে ৬০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৫০ ডিবি, বাণিজ্যিক এলাকায় দিবাভাগে ৭০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬০ ডিবি এবং শিল্প এলাকায় দিবাভাগে ৭৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭০ ডিবি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের অপর একটি জরিপে দেখা যায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন অংশে শব্দ দূষণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। জরিপে চিহ্নিত করা হয়েছে দিবাভাগে শাহীন স্কুল এলাকায় এ মাত্রা ৮৩ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৪ ডিবি, মতিঝিল সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে দিবাভাগে ৮৩ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৯ ডিবি, ধানমন্ডি সরকারি বালক বিদ্যালয়ে দিবাভাগে ৮০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৫ ডিবি, আজিমপুর মহিলা কলেজে দিবাভাগে ৮০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৪ ডিবি, তেজগাঁও মহিলা কলেজে দিবাভাগে ৭৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬৭ ডিবি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে দিবাভাগে ৮২ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৪ ডিবি, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে দিবাভাগে ৮০ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬৯ ডিবি, মিটফোর্ড হাসপাতালে দিবাভাগে ৭৫ ডিবি ও রাত্রিকালে ৭৩ ডিবি এবং শিশু হাসপাতালে দিবাভাগে ৭২ ডিবি ও রাত্রিকালে ৬৯ ডিবি।

শব্দ দূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬ এ হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালত বা একই জাতীয় অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান এবং এর চারপাশের ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা ‘নীরব এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নীরব এলাকায় চলাচলকালে যানবাহনে কোনো প্রকার হর্ন বাজানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অথচ আইন লংঘন করে এসব প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে চলছে ফিটনেসবীহিন সব গাড়ি আর সেই সাথে বাড়ছে শব্দ দূষনের মাত্রা।
@ শব্দ দূষনের জন্য চাই আরও ব্যাপক মিডিয়া কাউন্সিলিং।
@ চাই গাড়ীর মালিকদের সচেতনতা।
@ চাই ড্রাইভারদের জন্য কর্মশালা!
@ অডিও ভিডিও, প্রেজেন্টেশন।
@ ব্যাপক প্রচারণা।
@ নিয়মিত গাড়ীর হর্ণ চেকআপ,
@ ফিটনেস পরিক্ষাকে দূর্নীতি মুক্ত করা।
@ গাড়ীর পার্টস বিক্রির দোকান গুলোতে তল্লাশি, আমদানীর সময় মাত্রা নির্ধারণ করে দেয়া.. তার অতিরিক্ত মাত্রার হর্ণ জব্দ করা। হাইওয়ে কারের জন্য অনুমোদন সাপেক্ষে তা ব্যবহার। আবার শহরাঞ্চলে তার ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ। যানজটেই হোক বা সাধারন চলমান সময়ে কম হর্ণ ব্যবহারের উৎসাহ, প্রণোদনা, রাজনৈতিক সভা সমাবেশে মাইক ব্যবহারের লাগাম। সর্বোপরি ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যপক সচেতনতা তৈরি।
এতো গেল তত্ত্ব এবং তথ্যগত দিক। এই বাইরে যেটা আমরা অনুভব করি আমাদের মানসিক গ্রহণ বর্জনের ইচ্ছাও প্রভাবক হিসাবে কম গুরুত্বপূর্ন নয়। যেমন আমি যখন কনসার্টে যাই মনকে তৈরী করেই নিয়ে যাই বিশাল শব্দ তরঙ্গে ভাসব বলে- তখন শব্দটা আর আমার জন্য পীড়াদায়ক হয়না। অথচ একই সময় তা অন্যের জন্য তেমনি হতে পারে। অনুষ্ঠানে, আতশ উৎসবে আমরা বিরক্তির বদলে আনন্দ অনুভব করি। আমাদের গ্রহণ বর্জনের মাত্রাটা তখনকার জন্য বদলে যায়। যার জন্য তা আমাদের পীড়া না দিয়ে আনন্দ দেয়।
একই বিষয় আমাদের মান্যবর ইত্তেফাক সম্পাদক সাহেবার বিবৃতি সম্পর্কে প্রযোজ্য। এই দেশের ৮০-৯০ ভাগ মানুষের ধর্ম বিশ্বাসের কারণেই আজান সমধুর হিসাবেই গৃহিত। তাই তা প্রচলিত দূষন সংগায় পড়েনি.. পড়েনা। কারণ আমাদের মানসিক মাত্রায় তার জন্য গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে।
এখন সেই গ্রহণ যোগ্যতা একজন অবিশ্বাসীর মাঝে থাকবেনা এটাই স্বাভাবিক। (আমাদের আলোচিত সম্পাদিকা কি ভিন্ন বিশ্বােসর!!! ?? ) কিন্তু তাই বলে সামাজিক সহনশীলতা, সাম্যতা স্থিতাবস্থাকে ভূলে গেলে অসম্মান করলে চলবে কেন? যেমন আমরা পূজোর দিনের ব্যাপক বাজনায় দেশবাসী বিরক্ত হইনা, যেমন মন্দিরের ঘন্টা ধ্বনি দূষনের আওতায় পড়ে না। যেমন গীর্জার ঘন্টা! তেমনি আজানও।
তাই অযথা বির্তকিত হতে চাওয়ার মানসিকতা না থাকলে এই ধরনের বিবৃতি সামাজিক অশান্তি আর বিরক্তিই সৃষ্টি করে কেবল। বৈতো নয়!
পোষ্টে তথ্য সহায়তা কৃতজ্ঞতা:
গুগল
বাংলাপিডিয়া
বিডিএনভায়রনমেন্ট.কম
বিভিন্ন অনলাইন পত্রিকা
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ দুপুর ১২:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



