সরকারি চাকুরীজীবী বাবা-মা এর একমাত্র মেয়ে হওয়ায় আমার শৈশব কাটে মফস্বল শহরের চার দেওয়ালে ঘেরা বাড়িতে চরম নিঃসঙ্গতা আর একাকিত্তের সাথে। অত্যন্ত ঘরকুনো, স্বাধীনচেতা, শান্ত এবং ভয়ঙ্কর রকমের আঁতেল ছিলাম বলে আমার সারাটা দিন কাটতো লেখাপড়া ,গল্পের বই আর ছবি আঁকা নিয়ে।
২০০৬ সাল। আমার এস এস সি পরীক্ষার পর বাবা বাসায় ইন্টারনেট সংযোগ লাগান। ফলে আমার সারাদিনের কাজগুলোর সাথে নতুন একটি কাজ সংযুক্ত হয়_ ইন্টারনেট ব্রাওজিং। ২০০৬ সালের শেষের দিকে একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে কৌতূহল বশত খুলি আমার প্রথম ফেসবুক আইডি। ফেসবুক তখনও বাংলাদেশে এতটা জনপ্রিয় ছিল না। আইডি খুললেও কিভাবে সেটা ব্যাবহার করে জানতাম না বলে শুধু ইনফো অ্যাড করে রেখে দেই। এক সপ্তাহ পরে লগ ইন করে দেখি একটা অপরিচিত আইডি থেকে বন্ধুত্তের আহ্বান জানান হয়েছে। এভাবেই ভার্চুয়াল দুনিয়ায় আমার যাত্রা শুরু।
বাস্তব জীবনে খুব শান্ত আর পড়ুয়া মেয়ে ছিলাম বলে আমার কাছের কোন বন্ধু ছিল না, সবায় শুধু লেখাপড়ার স্বার্থের জন্য আমার সাথে বন্ধুত্ব করত। স্বার্থ শেষ, বন্ধুত্তের সমাপ্তি। ফলে ভার্চুয়াল জগতে অপরিচিত মানুষের বন্ধুত্তের আহ্বানে সাড়া দিতে প্রথম প্রথম অস্বস্তি লাগলেও পরে বিষয়টা ভীষণ ভাবে উপভোগ্য হয়ে ওঠে। যদিও আমার বন্ধুদের অধিকাংশ আমার থেকে বয়সে অনেক বড় ছিল তারপরও তাদের বন্ধুসুলভ আচরণ আমাকে খুব অল্প দিনে বন্ধু বাৎসল করে তোলে।
২০০৭ এর মাঝামাঝি সময়। একদিন একজন বড় ভাইয়ার ফটোতে সায়েম নামের একটা ছেলের সাথে তুমুল ঝগড়া করি। বড় ভাইয়ার মধ্যস্থতায় সায়েমের সাথে ঝগড়ার অবসান হয়। এরপর ভাইয়ার স্ট্যাটাস, ফটোতে মাঝে মাঝেই কথা হতে থাকে সায়েমের সাথে।
সায়েমের সাথে বন্ধুত্তের মাধ্যমেশুরু হয় আমার জীবনের অন্যতম একটি অধ্যায়।
সায়েম ঢাকার একটি স্বনামধন্য স্কুল এর ছাত্র, আমার থেকে ১ বছরের জুনিয়র। আমারই মত চাকুরীজীবী বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে। বয়সের পার্থক্য থাকলেও খুব অল্প দিনে আমরা একে অপরের ভাল বন্ধু হয়ে যায়। সায়েমের ভালবাসার মানুষটির নাম ছিল জেরিন। সায়েমের কল্যাণে জেরিন ও আমার খুব ভাল বন্ধু হয়েযাই। ভালই চলছিল আমাদের তিনজনের ভার্চুয়াল বন্ধুত্ব।
২০০৮ এ এইচ এস সি পরীক্ষার দিনগুলোতে ফেসবুকে আসতাম না, তাই আমার সাথে ওদের যোগাযোগ হত ফোনে কথা বলে এবং এস এম এস এর মাধ্যমে। এইচ এস সি পাশের পর ভর্তি হলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
২০০৯ এর এক বৃষ্টি মুখর দিনে ধানমন্ডি্র এক রেস্তোরাঁয় দেখা হল সায়েম এবং জেরিন এর সাথে। আমি সায়েম এবং জেরিনকে ছবিতে দেখলেও ওরা সেদিন আমাকে প্রথম দেখে। মন খারাপের সময় গুলোতে মন ভাল করে দেওয়ার এক অপূর্ব জাদুকরি ক্ষমতার কারনেহইত ধীরে ধীরে সায়েম এর সাথে আমার বন্ধুত্ব আরও গভীর হতে থাকে। দুজন দুজনার সাথে সব সুখ, দুঃখ, ভাললাগা, মন খারাপ ভাগাভাগি করে নিতে থাকি।
সায়েমের এইচ এস সি পরীক্ষার এক মাস আগে আমরা জানতে পারলাম জেরিন হিন্দু এবং একজনের বাগদত্তা। নিজের ধর্মের কথা লুকিয়ে সে সায়েমের সাথে ৩ বছর ধরে প্রেম করেছে সায়েমের এক শত্রুর কথা মত। মূলত জেরিন সায়েমের সাথে অভিনয় করেছে সায়েমের জীবন টা নষ্ট করে দেওয়ার উদ্দেশ্য নিয়ে।
পুরো বিষয়টা সায়েমকে প্রচণ্ড মানসিক বিপর্যস্ত করে দেয়। জেরিন কে হারিয়ে সায়েম তখন পাগলপ্রায়, নিজের জীবন টা ধ্বংস করে দেওয়ার এক নেশায় উন্মত্ত। এরকম এক ভয়ঙ্কর অবস্থা থেকে সায়েমকে বের করে নিয়ে আসার জন্য সারাদিন ওর সাথে থাকা শুরু করলাম। সবসময় ওকে বেঁচে থাকার,জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রেরণা দিতে লাগলাম। ফলাফল যে ছেলে এইচ এস সি পরীক্ষা দিত না, সে গোল্ডেন এ+পেয়ে এইচ এস সি পাস করে এবং ঢাকা মেডিকেলে ভর্তি হয়।
তবে সেই উচ্ছল, প্রানবন্ত ছেলেটিকোথায় যেন হারিয়ে যায়, সব কিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেয়। অসম্ভব মেধাবী এই ছেলেটি নিজের চারপাশে তুলে দেয় এক দুর্ভেদ্য দেওয়াল যেটা ভেদ করার ক্ষমতা শুধু আমার ছিল। আমাকে ছাড়া আর কাউকে সে বিশ্বাস করতে পারত না। ধীরে ধীরে আমিও সবকিছু দূরে ঠেলে দিয়ে সায়েমের একাকিত্তের দুনিয়ার বাসিন্দা হয়ে গেলাম।দুজনের জীবন আবর্তিত হওয়া শুরু করে লেখাপড়া আর একমাত্র বন্ধুর বন্ধুত্ব উপভোগের মধ্যেদিয়ে। সারাদিন ক্লাস করা, ক্লাস এর ফাকে ফাকে এস এম এস দিজপ্রতি মুহূর্তে একে অপরের খোঁজ রাখা, সন্ধায় ফেসবুকে আড্ডা, ছুটির দিনগুলোতে এক সাথে বিভিন্ন অ্যাডভেঞ্চার করে বেড়ানো, খুনসুটি, ঝগড়া - এভাবেই কেটে গেল ৩ বছর।
সায়েম এখন ঢাকা মেডিকেলের ৪র্থ বর্ষের ছাত্র আর আমি মাস্টারসের ছাত্রী। ছুটিতে বাসায় যাওয়ায় মা বাবা বিয়ের জন্য কয়েকজন পাত্রের কথা বলে। হটাত করে নিজের মাঝে অন্যরকম একটা অনুভুতির অস্তিত্ব টের পাই। প্রথমে মানতে না চাইলেও পরে বুঝতে পারি সায়েম নামের এই অসম্ভব মায়াবী এই ছেলেটিকে আমি ভালবেসে ফেলেছি নিজের অজান্তে। সায়েম ছাড়া একটা মুহূর্ত কল্পনা করলে আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। আমার জীবনের পুরোটা জুড়ে শুধু সায়েম যেখানে আর কাউকে কখনও বসানো সম্ভব না। আমার প্রথম এবং শেষ ভালবাসা। আমি এখনও জানি না এই ভালবাসার পরিনতি কি...............।
পরিশিষ্টঃ
এটা কোন গল্প নয়, একজন মানুষের জীবনের নির্মম বাস্তবতা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



