(প্রচন্ড হতাশা আর ব্যর্থতার কারণে নিজের অস্তিত্বের প্রতি এক প্রবল ঘৃণাবোধ জন্ম হয়। তার উপরে চারপাশে মিথ্যাচার, পাপাচার, ভন্ডামি , অবিচার আর দুঃস্বপ্নের বেসাতি দেখে নাস্তিক হবার প্রবল অনুপ্রেরণা পাই।
কিন্তু ভাগ্য আর অভিশাপের অনিবার্য উপস্থিতি , প্রাণান্তকর কিন্তু নিস্ফল পরিশ্রম, বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতো দৈব ব্যাপার গুলো আমাকে অদৃশ্য শক্তির বিশ্বাস ও দাসত্ব করতে বাধ্য করে।)
রাত এখন সাড়ে এগারোটা। পঞ্চম শ্রেণীতে উত্তর্ীণ হবার পর আমার বন্ধু বান্ধব , খেলার মাঠ আমাকে ছেড়ে চলে যায়। এতটুকুন বয়সে ঘরের জানালার গ্রিল ধরে শূণ্যতা উপভোগ করার সাধনা করেছি। বার্ষিক পরীক্ষা শেষে মাসের পর মাস ছুটি। চির ঘরবন্দী আমি শারীরিক প্রতিবন্ধীর মতো বিছানায় শুয়ে থেকে নষ্ট করেছি আনন্দ আর উৎসব করার সুবর্ণ সময়। কোথাও যাওয়া হয়নি আমার। আজও বই মেলা বাণিজ্য মেলার কথা শুনলে মানুষের ভিড়ের কথা ভেবে কুকড়ে যাই, আনন্দস্নাত মানুষের মুখ গুলোর দিকে তাকাতে পারিনা। শব্দ, মানুষের উপস্থিতি কোলাহল সহ্য করতে পারিনা, শ্বাস রুদ্ধ হয়ে পড়ি শূণ্যতা আর নৈঃশব্দের অন্বেষায়। আমার ঘরের চার সফেদ দেয়ালের মাঝেই আমি সুখী আর বেচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই।
রাত এখন বারোটা বেজে চলি্লশ। আমি নিমগ্ন থাকি আমার পড়ার টেবিলে। হঠাৎ এক বৃদ্ধের হাউমাউ কান্না শুনতে পাই।
"বাবারা আমি ব্ল্লাড ক্যান্সারের রোগী। আমাকে বাচান।"
আমি এগিয়ে গেলাম, হাতে ঢামেকের কাগজপত্র, ব্লাড গ্রুপ ও নেগেটিভ। সুস্পষ্ট করে ব্ল্লাড ক্যান্সারের কথা লিখা।
বৃদ্ধ অশু্র ফেলে আমার সামনে কাপতে থাকে। তাকে ঝোল মাংস দিতে চাইলাম। জানালো পানিতে ভেজা রুটি ছাড়া কিছুই খেতে পারেনা সে।
বিবাহিত ছেলেমেয়েরা নিঃস্ব করে অসুস্থ বাবাকে রাস্তার ভবঘুরে বানিয়ে ছেড়ে দিয়েছে।
নিশ্চিত মৃতু্যর পথ ধরে বৃদ্ধ চলে গেল অজানা গন্তব্যে । কান্না ভাঙ্গা কন্ঠস্বর মিলিয়ে গেলো রাতের অন্ধকারে।
আমি ঘরে এসে খুজি বেচে থাকার অর্থ, স্বার্থপর বিবাহিত জীবনের কুৎসিত বৈধতা। কোন তথাকথিত দয়া বা করুণা , সুখ বা ভালোবাসা নয়, মানুষের কষ্টার্জিত অনুভূতিগুলোর সাথে একাত্ম হবার প্রবল ইচ্ছা জাগে মনে।
ঘড়িতে এখন একটা। আমি আমার সব ফুফুদের দেখিনি, সবার নামও জানিনা। চাচাদেরও দেখিনি বহুদিন। চাচীদের কোন স্মৃতিই নাই মনে। ছোট চাচীর মৃতু্যর পর চাচা আবার বিয়ে করেছেন শুনেছি। নারায়ণগঞ্জে ছোট ফুফু থাকেন। শেষ কথা হয়েছিল বছর চারেক আগে। কখনও বলেননি তার বাসায় যেতে। কাজিনরাও আমাকে চেনেনা, নামও হয়তো বলা হয়নি তাদের। 3য় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় শেষ দেখা পিতামহের চেহারাটা মনে পড়েনা।
2002 সালে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন পিজিতে। ডাকা হয়নি আমাকে।
ভাবলাম কী দরকার এত বছর পর অসুস্থ মানুষের আবেগের অশ্রু নামিয়ে। তার অতৃপ্তি নিয়ে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাবার খবরও আমাকে দেয়া হয়নি।
দল বেধে ছেলেমেয়েরা চলে যায় পিকনিক, মেলায়, নানা বাড়ি, দাদা বাড়ি। আমি আমার ছোট জানালা দিয়ে দেখি অদ্ভুত পৃথিবী, যেখানে বাপ হারা, মা হারা আট বছরের ছেলে পানি বিক্রি করে নিজের ছোট ভাইয়ের দুধের টাকা জোগাড়ের জন্য, কর্মব্যস্ত মায়ের কোল ছেড়ে বেরিয়ে পড়া দুরন্ত শিশু ট্রেনে কাটা লাশ, বড়লোকের গাছ পড়া বরই কুড়িয়ে ক্ষুধর্াত ফকিরের বেধড়ক পিটুনি খাওয়ার দৃশ্য . . . . . . . আরো অনেক অনেক. . . . . .
আমি এখন চুপচাপ মন খারাপ করে বসে থাকতে থাকতে ভালোবাসি। অব্যক্ত অভিমান আর বিশাল জীবন কষ্টের বোঝা নিয়ে ফরেস্ট গাম্প মন খারাপ করে চুপচাপ নিথর বসে থাকে পার্কের বেঞ্চে হাত দুটো পায়ের উপরে রেখে .. ..
সে এক অসাধারণ অসহায় অভিব্যক্তি।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


