somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অবিশ্বাস করার অধিকার

২০ শে অক্টোবর, ২০১৪ ভোর ৫:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মুক্তিযুদ্ধের উপ সর্বাধিনায়ক একে খন্দকারের বইয়ের মাত্র ২২ পৃষ্ঠা পড়ার পর একটা অনুভূতি হলো। 'মুক্তিযুদ্ধ' বনাম 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা'র একটা আলাদা অস্তিত্বও অনুভূত হলো।'মুক্তিযুদ্ধ' একটা ঘটনা, ইতিহাস, সত্য। আর 'মুক্তিযুদ্ধের চেতনা' একটা রাজনৈতিক দলীয় মতাদর্শ --পুব আর পশ্চিমকে পৃথকভাবে তুলে ধরার জন্য শক্তিশালী কিছু নীতি আদর্শ দাড় করানোর প্রয়োজন পড়েছিল যুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দলটির।তাই একটা রাজনৈতিক দল তাদের নিজেদের আদর্শ, বিশ্বাস, ম্যানিফ্যাস্টো অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধের প্রয়োজনীয় চেতনার ভিত্তি দাড় করালেন।

কাজেই একটা রাজনৈতিক দলের দলীয় আদর্শকে ৭২ এর সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হলো। কারণ তারা বিজয়ী শক্তি। বাংলার মানুষ মুক্তি চেয়েছিল। আর একটা রাজনৈতিক দল চেয়েছিল শাসন করার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। 'স্বাধীনতা'--- এই দুটো বিষয়ের সম্মিলিত ফসল। যারা এ দুটোর এক বা উভয়টি চায়নি--তারা স্বাধীনতাবিরোধী।

একে খন্দকারের বই মতে প্রশ্ন হওয়া উচিৎ ছিল যে শেখ মুজিবের কাছে ক্ষমতা হস্তারন্ত করলে পাকিস্তানিদের এত বছরের বৈষম্য, নির্যাতন, নিপীড়নের কথা হয়তো মানুষ গায়ে সয়ে নিতো। প্রধানমন্ত্রী হবার স্বপ্ন পূরণ হবার পরে আর স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখাটা বা দাবি করার পুরোপুরি অবান্তর হয়ে যেত।

দেশ স্বাধীন হবার পর অনিবার্যভাবে দেশটি এক দল, এক দেশ, এক নেতার মূর্তি নিয়ে দাড়ালো। তখন শ্লোগান ছিল

--বিশ্বে এল একবাদ, মুজিববাদ, মুজিববাদ।

অর্থাৎ নেতা কখনও ভুল বলতে পারেন না, বা নেতা যা বলেন সেটাই বাংলাদেশ, দেশপ্রেম । ফলে বাংলাদেশের অনুকূলে যত আদর্শ, সংস্কৃতি, কৃষ্টি, 'জিন্দাবাদের' বদলে 'জয় মহারাজার জয়' বলার এক দলীয় অনুপ্রেরণা সব কিছুই নির্মাণ করেছিল একটা দল, তাদের দলীয় আদর্শ-বিশ্বাস-সুবিধা-ক্ষোভ-জাতীয়তাবাদ থেকে।


ফলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বলে এ দেশের মানুষদের যা শেখানো, পড়ানো, বা গলাধঃকরণ করানো হয়েছে তার পুরোটাই একটা রাজনৈতিক দলের স্তুতিমূলকে ভিত্তি করে, যেখানে দলের প্রধান একজন নিষ্কলঙ্ক মহামানব এবং তার অনুসারীরা জাতির ভাগ্য দেব-দেবী রূপে অসুর বিনাশে আবির্ভূত হয়েছেন।

যুদ্ধে বিজয়ীরা যখন ইতিহাসের বয়ান দেয়, সেটা একাডেমিক্যালি হাস্যকর উপস্থাপনা হয়। একে থন্দকারের মত ড্যান ব্রাউন ভিঞ্চি কোডে খ্রিস্ট ধর্মের ব্যাপারে এমন 'একাডেমিক ব্লাসফেমি' করে ফেলেছেন। খ্রিস্ট ধর্মের প্রবর্তক ঠিক যীশু নন, যীশুর অন্তর্ধানের ৪০০ বছর পরে সূর্য পূজারি রোমান প‌্যাগান সম্রাটের উদ্যোগে বাইবেলের যেসব পংক্তি যীশুকে স্রেফ মানুষ, মরণশীল, মানবদূত হিসেবে দেখায়--সেগুলো ধ্বংস-বিলুপ্ত করা হয়। কারণ এমন একটা ধর্মকে শক্ত পোক্তভাবে প্রতিষ্ঠা করা দরকার যেখানে যীশু একজন ঈশ্বর, মানব নন। ফলে যখন যীশুর সহচর বার্নাবাসের বাইবেল পাওয়া গেল, শোরগোল করে সেটাকে মিথ্যাচার বলে বাতিলও করে দেয়া হলো।


একটা বিজয়ী রাজনৈতিক দলের অনুচর-ভক্তের রচিত ইতিহাসের পাঠ জাতিকে এমনভাবে অন্ধ করে রেখেছে, যে ইতিহাসের 'নিষিদ্ধ', 'অপ্রচারিত', 'বিলুপ্ত' করা পাঠগুলো তুলে ধরলেই আমরা বিব্রত হয়ে 'না', 'না' ---'মিথ্যে কথা'-- বলে চিৎকার করি। 'সত্য' বলতে ততটুকুই বিশ্বাস করি যেটা একটা রাজনৈতিক দল নিজস্ব বয়ানে, বিজয়ের জৌলুসে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। অত্যন্ত সংকীর্ণ, এক দলীয়ভাবে । কখনও বিকৃত।

যে রাজনৈতিক দলের দর্শন যুদ্ধে ভুক্তভোগী গণমানুষ ও তাদের আবেগ-বিবেককে পুজি করে নির্মিত --'দেশ' এবং 'দল' যেখানে একে অপরের পরিপূরক--সেখানে দেশটা শুধু একটা দলে্র দলীয় সম্পত্তি হিসেবে থাকে। বাংলার মাটিতে জন্মালেই তাকে এ দেশেল নাগরিক বলা যায়না, বা নাগরিক অধিকার-সম্মান দেয়া যায়না। তাকে ঐ বিশেষ রাজনৈতিক দলের আদর্শে, অর্থাৎ মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ব্যাপ্টাইজড হতে হয়।

এই ব্যাপ্টাইজেশনের ফলে মুক্তিযুদ্ধে যাই ভূমিকা থাকুক--এই দলের একজন নেতার কথা মুক্তিযোদ্ধাদের মতই পবিত্র, গ্রহণযোগ্য, এবং ইতিহাসের 'প্রকৃত' ভাষণ। আপনি ছোট খাট রাজাকার হয়েও একালে এ দলের নমিনেশন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক সনদপত্র বিলানোর সম্মানজনক অধিকার রাখেন। এবং সেই সাথে রাগ-বিরাগে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় যে কাউকে রাজাকার দন্ড দিতে পারেন।

জনগণ এখানে বিচার করতে যাবেনা জাহিদ হোসেন আসলেই রাজাকার ছিল কিনা। কারণ সেই রাজ্য শাসনকারী রাজনৈতিক দল যখন জাহিদকে রাজাকার বলেছে---তার নাম কোনদিন নাও শুনলেও তার ফাঁসি চাইবে।

পিয়াস করিমের বাবাকে শান্তি কমিটিতে যোগ দিতে বাধ্য করা হয়েছিল কথাটি যখন সেই রাজনৈতিক দলের মুখপাত্রের কাছ থেকে আসলো--আমরা চোখ বুজে সেটাকে ইতিহাসের দলিল হিসেবে গ্রহণ করলাম। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে লিফলেট বিলি করা, বা রাজাকার হতে বাধ্য করা, বা মুনীর চৌধুরীর মত নামজাদা স্বাধীনতা পদক পাওয়া ২৫ জন বুদ্ধিজীবীর পাকিস্তানের পক্ষে সাক্ষর করার 'নিষিদ্ধ' ইতিহাস গুলো আমাদের বিব্রত, বিরক্ত, বিক্ষুদ্ধ করে।
তখন নির্বিচারে বিহারী নিধনযজ্ঞকে বীরোচিত হিসেবে দেখা হয়। অথবা পাকিস্তানীর চড় খেয়ে সেই চড়ের দাগ দেখাতে পারাটাও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষেই যায়।

যুদ্ধে জিতে গেলে যুদ্ধের আগে মানুষের নিরাপত্তা, ভয়, ডিলেমা, সংশয়, চাপ এবং অপরাপর প্রেক্ষাপটগুলো অবান্তর হয়ে যায়। যেই ভয় থেকে মুজিব স্বাধীনতা ঘোষনা পত্রে সাক্ষর না করে তাজউদ্দিনকে হতাশ করেছিলেন। যুদ্ধে জিতে গেলে ইতিহাস হয়ে ওঠে সাদা-কালো, তুমি আমার শত্রু বা মিত্র।

ঠিক এই মুহূর্তে যদি আমাকে বলা হয় জননেত্রীর নেতৃত্বে 'দেশের জন্য' একটা যুদ্ধ হবে, আপনি থাকবেন কিনা। আমি বিনয়ের সাথে প্রত্যাখ্যান করবো। যে দলের রাজনৈতিক আদর্শে আমার বিশ্বাস নেই, তাদের রচিত চেতনার নিচে আমি দাড়াতে বাধ্য নই। কাউকে আহত, ক্ষত, আঘাত না করেই আমি এই বিশ্বাস ধারণ করতে চাই।

তাহলে অন্যরা কী বলবেন?

"তুমি ইজরায়েলকে সমর্থন করোনা, মানেই তুমি হিটলারের সমর্থক"





১০টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশভাগের পর-

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:০৮



সময় তখন ১৯৫০ সাল।
ওমর আলীর জ্বর এসেছে। জ্বর নিয়েই তিনি পত্রিকা পড়ছেন। দীর্ঘদিনের অভ্যাস। টারজান গিয়েছে বাজার করতে। এর আগেও টারজান বেশ কয়েকবার বাজার করেছে। বাজার করতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

হায়ার সেলফ্‌

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৪১


শীতের সময়ে রাত ১০ টা অনেক রাত। আর তা যদি হয় শহর থেকে দূরে শহরতলীতে,আবাসিক এলাকার আশপাশে,তাহলে তো কথাই নেই। রাত আটটা বাজতে না বাজতেই পাড়ার সকলে সেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এফএম রেডিও

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:২০

২০০৯ সাল। একটি ছেলে। সে তার নানা নানীর সাথে মুন্সীগঞ্জ এ থাকতো। নানা তার নাতিকে একটি মোবাইল উপহার দেয়। নকিয়া ১৬৬১। সেই মোবাইলে এফএম রেডিও ছিলো। সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন কার ভয়ে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৮


থাপ্পড়-কাণ্ডের পর দেশ ছেড়েছেন শাহজালাল রুমি। টঙ্গীতে নিজের মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর জন্য। গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি, ব্যক্তিগত বার্তায় ভয়ভীতি প্রদর্শন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×