সেই চরম মুহূর্তের কথা আমি ভুলতে পারবো না, যখন স্ত্রী ও তিন শিশুসন্তানের কাছ থেকে আমি বিদায় নিচ্ছিলাম। আমি তাদের বিদায়ী চুমু দেই এবং তাদের মঙ্গল কামনা করি। সেই সময় আমি অনুভব করছিলাম বেঁচে থাকাকেই বিদায় জানাচ্ছি। সুতরাং এই অবস্থা থেকে টিকে যাবার পর এটা কী সম্ভবপর এরকম কিছুতে আবারও রঞ্জিত হবার, কখনো না?
আমার শৈশব ছিল বড় আনন্দময়। একদিনের জন্যও শৈশবে ফিরে যাওয়ার বিনিময়ে আমি সব কিছু দিতে রাজি আছি। আমি ছিলাম এক গরিব শিশু, কৃষক সন্তান; তাসত্ত্বেও আমি আমার দাদীর জন্য আহলাদিত। তিনি ভালাবাসা এবং নিবিঢ়তায় আমাকে পূর্ণ করেন।
আমরা বেড়ে উঠেছিলাম নদী পাড়ের গরীব এক শহরে, খুবই গরীব এক পরিবারে। অনেক কিছুর মধ্যে নদী আমি খুবই ভালোবাসি, ভালবাসি এর জলপ্রবাহ, স্রোত। আমি প্রচুর মাছ ধরতাম, এবং তা আমাদের গ্রামের প্রতিবেশিদের মধ্যে বিলিয়ে দিতাম, যেন তারা খেতে পারে। আমরা বনে যেতাম এবং আম পেড়ে আনতাম, যেন এগুলো নষ্ট হয়ে না যায়। আমি কোনরূপ অবদমন অনুভব করতাম না। আমি দারিদ্রতার সহিত খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমি প্রচুর কেঁদেছি।
আমার জর্জের কথা মনে পড়ে। একদিন সে স্কুলে আসল না। আমরা জানতে চাইলাম কেন? জানতে পারলাম বাচ্চা জন্ম দিতে যেয়ে তার মা মারা গেছেন। এরকম প্রচুর ঘটতো, কেননা কারও জন্যই ডাক্তার ছিল না। অতপর তার বাবা মারা গেল। তখন সে জীবিকাকর্মে নিয়োজিত হতে বাধ্য হল, এবং এর ফলে শিশুশ্রমিকে পরিণত হল। তার ছোট ছোট ভাই-বোন ছিল, তাদের খাদ্যের দরকার ছিল। হঁ্যা, আমিও দারিদ্রতার বেদনা দেখেছি। আমার ছোট ভাইয়ের নাম ছিল এনসো, দেখতে ছিল খুবই সুন্দর, অসুস্থ হয়ে পড়ল। তাকে দড়ির দোলনা-বিছানায় শোয়ানো হল। সে ছিল সবসময় হাসিখুশি। কিন্তু সে মারা গেল। কোনোরূপ ডাক্তারি চিকিৎসা ছাড়া। আমরা তাকে ব্যাগে ভরে কবরস্ত করলাম। সে ছিল অনেকের মধ্যে এরকম একজন দারিদ্র যাকে গ্রাস করেছিল।
যখন আমি 21 বছরের যুবা, সদ্য মিলিটারি একাডেমি থেকে ছাড়পত্রপ্রাপ্ত, আমাকে পাঠানো হল আমার শহরে মাওবাদি তৎপরতা দমন করতে। সেখানে আমি দেখলাম কৃষকরা ভীষণভাবে নিপীড়িত হচ্ছে। আর্মিরা তাদের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দিচ্ছে, আইন-কানুনের তোয়াক্কা না করে তাদের অভিযুক্ত করা হচ্ছে। আমি দেখলাম আমাদের প থেকে কৃষকরা কিভাবে নির্যাতিত হচ্ছে। আমি আরও প্রত্য করলাম গেরিলারা, বিদ্রোহীরা আমাদের সৈনিকদের হত্যা করছে। তাদের একজন আমার অস্ত্রঘাতে প্রাণ হারালো। সে ছিল একজন কৃষক, একজন মানবসন্তান, কিন্তু আমি মিলিটারির লোক। আমি তাকে স্মরণ করলাম আর নিজেকে প্রবোধ দেই, 'এটা হল অ্যামবুশ, আমাকে মরতে দিতে পারি না।' একজন সৈনিক আমার কাঁধে ঢলে পড়েছিল। তার বুকে তিন তিনটি গুলি লেগেছিল। সে মারা যায়।
এই সব রক্তপাত আমার মনে দাগ কাটে। নিজেকে প্রশ্ন করি, এখানে কে সঠিক? কে বেঠিক? আমরা কি সঠিক? আমাদের লোকজন যেমন কৃষকদের অত্যাচার করে, খুন করে, অপরদিকে গেরিলারাও কৃষকদের অত্যাচার করে। এটা ছিল আমার চিন্তার প্রাথমিক পর্যায়। অতপর আমি র্যাডিকেল রাজনীতি বিষয়ক পড়াশোনা শুরু করি, এবং উনিশ শতকের বিপ্লবী নেতা বলিভার দ্বারা অনুপ্রাণিত হই। তিনি স্পেনীয় উপনিবেশের বিরুদ্ধে উদার ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, বলিভিয়া ও পেরু গড়ার জন্য সংগ্রাম করেছিলেন। কিন্তু যেই মাত্র আনর্্তজাতিক অর্থলগি্নকারি প্রতিষ্ঠান আইএমএফ মঞ্চে আবির্ভূত হল, আমিও পেয়ে যাই আমার রাজনৈতিক মঞ্চ। আমি ছিলাম আর্মির লোক, কিন্তু নিজেকে প্রশ্ন করি_ এটা কোন কিসিমের আর্মি? এটা কী বলিভারের আর্মি? না, ইহা কখনো ভেনেজুয়েলার আত্মরায় ব্যবহৃত হয় না, বরং এর বিপ েথাকে, ভেনেজুয়েলাবাসিকে পদদলিত করে। সিমোন বলিভার বলতেন: সে সৈনিক ধ্বংশ হোক, যে তার অস্ত্র নিজের জনগনের প্রতি তাক করে রাখে। সৈন্যদের বাধ্য করা হচ্ছিল আইএমএফ-এর বর্বর নয়া-উদারবাদ বাস্তবায়িত করতে। আমি তা করতাম না। এর পরিবর্তে আমি আইএমএফ-এর ঔদ্ধত্য সমর্থনকারি দুর্নীতিপরায়ন সংঘগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করতে পছন্দ করলাম। আমি অরাজক শাষনের বিরুদ্ধে অভু্যত্থান করলাম এবং মৃতু্যর জন্য প্রস্তুতি নিলাম। কিন্তু আমি বেঁচে আছি। ঋণ-করা সময় নিয়ে আমি বিপদের পর বিপদ পাড়ি দিচ্ছি। অভু্যত্থানের পর দুই বছর আমি রবিন আইল্যাণ্ডের বিভৎস ইয়ারে প্রিজনে বিষবৎ সময় কাটাই। আমি একা ছিলাম না। অনেকেইর আমার সঙ্গ নিয়েছিল। অনেকেই যুদ্ধ করেছিল। অনেকে মারা গিয়েছিল। এই জন্য আমি বীর নই। কেননা একজন মানব সন্তান হিসাবে আপনি তা করবেন। জেল হল এমন এক চুলি্ল যেখানে আপনি নিজের পরিকল্পনা রুটি-সেঁকা করতে পারেন। জেল-ক েবসে আমি সরকার গঠনের রূপরেখা তৈরি করি।
অবশেষে, 1998 সালে জেলে থাকাকালিন তৈরি রুটি-সেঁকা পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ দিতে পারি। অবাধ ও নিরপে নির্বাচনের মাধ্যমে আমি মতায় আসি। আমার ল্য চলমান পৃথিবীর গতিপথ পরিবর্তন নয়, বরং পুঁজিবাদি পৃথিবীর ধ্বংসাত্মক মডেলের বিরুদ্ধে। আমি খুবই অন্যরকম কিছু করতে চাই, জর্জ এবং এনোসদের জন্য দেশের তেলসম্পদ বিনিয়োগ করতে চাই।
পুঁজিবাদি ব্যবস্থায় প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সমাজতন্ত্রের কাঠামোর মধ্যেই প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। আমাদের প্রকল্প দৈশিক নয়, নয়া-উদারিও নয়। আমরা মধ্য-ভূমি চাই, যেখানে বাজারের অদৃশ্য হাত রাষ্ট্রের দৃশ্যমান হাতের সাথে মিলিত হয়_ রাষ্ট্রের যতটা প্রয়োজন, এবং বাজারের প েযতটা সম্ভব। আইএমএফ-চালিত বিশ্বে, উন্নয়নশীল দেশের জন্য এই প্রকল্প বিশ্বে যুগান্তকারি সামাজিক গণতন্ত্রের সূচনা করেছে।
এইসব করতে যেয়ে আমি খুবই শক্তিশালি শত্রু বানিয়েছি। বুশ প্রশাসন আমাকে স্তব্ধ করে দিতে চায়, কেননা তারা রাজনৈতিক তহবিলের জন্য যেসব তেল কোম্পানির উপর নির্ভরশীল আমার কার্যক্রমের ফলে তাদের লাভালাভ সংকটময়। তেল কোম্পানির অর্থে আমেরিকার রাজনীতিকদের প্রচারাভিযান, থিংঙ্ক ট্যাংকদের 'কমন সেন্স' উৎপাদন সম্পন্ন হয়। তেল হতে আয়ের অর্থ গরীবদের জন্য খরচ করাতে তারা ভীত, তারা চায় এই অর্থ ব্যাংকে চালান করতে। ইহা ইতোমধ্যে বলিভিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, এবং মেক্সিকোয় জয়ী হতে চলেছে। হায় মেক্সিকো! ঈশ্বর এত দূরে, আর আমেরিকা এত কাছে।
আমি মনে করি না কিউবায় বাক্ স্বাধীনতার কমতি রয়েছে। যদি আপনি কিউবাকে পশ্চিমা পৃথিবীর প্রেেিত দেখেন, আপনি তেমন ভাবতেই পারেন। কিন্তু সেখানে জনগন নিজেদের বিভিন্ন উপাদানে প্রকাশ করে। কিউবায় কোন অবদমন নেই। কিউবায় রয়েছে বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট মডেল। আমরা কিউবার জনগন ও এর প্রতিষ্ঠানসমূহের প্রতি খুবই সশ্রদ্ধ। কিউবার তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত নির্বাচনের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রতি পাঁচ বছর অন্তর একজন প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হলেই কী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হয়? সংবাদপত্র আছে, টিভি চ্যানেল আছে, এই কারণেই কী বাক্ স্বাধীনতা বিরাজ করে? এর অন্তরালে রয়েছে প্রচুর নৈরাশ্য। এর অন্তরালে রয়েছে অগুণতি মিথ্যাচার। প্রতিটি দেশেরই রয়েছে নিজস্ব মডেল।
রবার্ট মুগাবে একজন মুক্তিযোদ্ধা। তিনি আমার বন্ধু। আমি মনে করি তাকে দানবীয়ভাবে চিত্রিত করা হয়েছে। আপনি কী তাঁর সাথে মিলিত হয়েছেন? আমরা সবাই ভুল করি। আমি মনে করি আপনার উচিত তাঁর মুখোমুখি হওয়া; তখন তাঁর সম্বন্ধে ও তাঁর বিষয়ে আপনার চমৎকার অভিজ্ঞতা হবে। আপনাকে বুঝতে হবে জিম্বাবুয়ে উপনিবেশ ছিল কৃষ্ণাঙ্গ জনগনের বিরুদ্ধে, তিনি এমন একটা পৃথিবী চেয়েছিলেন যেখানে বর্ণবাদমুক্ত সমানাধিকারী জনগন বসবাস করবে; এটা আমার অভিমত।
আমি পণ করেছি, যদি বুশ প্রশাসন কোন নয়া অভু্যত্থানের পাঁয়তারা চালায়, আমি দেশের সব তেলকূপ জ্বালিয়ে দেব। আমরা অপো করছি। যদি তারা তেলের জন্য আসে, তারা তেল পারে না।
্য হুগো স্যাভেজ: ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট, সামাজিক গণতন্ত্রের প্রবক্তা
ব্রিটেনের বেলফাস্ট টেলিগ্রাফ পত্রিকায় দেয়া সাাতকারের ভিত্তিতে নিবন্ধটি তৈরি করেছেন ফকরুল চৌধুরী
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




