লেখক তাঁর লেখার মধ্যেই প্রকাশমান। লেখকের মন, চৈতন্য, দার্শনিক অভিব্যক্তি তাঁর রচনাবলিতে সংগুপ্ত থাকে। আর তা যদি হয় সাাৎকার, তবে ব্যাপারগুলো আরো সহজে খোলসমুক্ত হয়। আমরা সরাসরি লেখকের মন নিয়ে সার-সিদ্ধান্তে পেঁৗছুতে পারি। লেখককে চেনার জন্য সাাৎকারগুলো আয়নার মতো কাজ করে। লেখকের অনেক কথা-ভাবনা থাকে, লেখার সাহিত্য প্রকরণে কখনও চিহ্নিতভাবে কখনো ইনিয়েবিনিয়ে তা বিধৃত হয়। কিন্তু সাাৎকারের মাধ্যমে প্রতিপ পাঠকের কাছে তাঁকে সরাসরি উপস্থিত হতে হয়। অনেক অকথিত কথামালা তাকে ফাঁস করে দিতে হয়। অথবা অনেক না-বলার কথা তাঁকে বলতে হয়। অথবা লেখাজোকার ভাবনাগুলো সাাৎকারের মাধ্যমে পাঠকের সামনে সরাসরি ব্যাখ্যা করতে হয়। আমরা যখন আমাদের সময়ের এক সুদীপ্ত লেখক হুমায়ন আজাদের সাাৎকারগুলো পড়ি, তখন এর সাথে আরো কিছু যুক্ত করতে হয়, তা হলো হুমায়ুন আজাদের লেখা ও সাাৎকারের মধ্যে কথামালার বিভিন্নতা বা চালাকি পরিত্যজ্য। এমনকি বিভিন্ন সাাৎকারগুলোতে কোনরূপ তথ্য-ফারাক নেই। লেখা ও ব্যক্তিগত কথামালায় তিনি আশ্চর্যরকম সততার পরিচয় দিয়েছেন। কোনরূপ হেঁয়ালি কিংবা ভণ্ডামির প্রশ্রয় নেই। নিজের মানষিকতাকে এভাবে ভাঁজ খুলে দেখাবার মতা কম মানুষেরই থাকে। অর্থাৎ আমাদের পরিচিত প্রথায় নেই, তাই আমরা এই 'জ্যোর্তিময় বহুমুখি' লেখককে সীমাবদ্ধ করেছি 'প্রথাবিরোধী লেখক' হিসাবে। এই সাাৎকার গ্রন্থের অনেক প্রশ্নকর্তাই তাঁকে বিগলিত চিত্তে প্রথাবিরোধি চারিত্র্যে মুড়িয়ে দিতে সন্তুষ্টিবোধ করেছেন; বেশিরভাগ েেত্রই একমাত্র পরিচয় হিসাবে অভিধিত করেছেন। এর বিপরীতে বলা যায়, হুমায়ুন আজাদ আসলে আমাদের সময়ের একমাত্র 'আধুনিক' মানুষ ছিলেন। এই আধুনিক মানুষটি ইউরোপীয় এনলাইটমেন্টের আলোয় ঋদ্ধ হয়েছেন। আলোকায়ন পর্বের বিচ্ছুরণে জীবন, সমাজ ও দেশকে বুঝতে চেয়েছেন। ব্যাক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের পূর্ণায়ত অবয়ব এই বাংলাদেশে আমরা তাঁর মধ্যেই বলা যায় 'একমাত্র' হিসাবে ল্য করি। ফলে এই 'আধুনিক মানুষ'টিকে আমরা প্রচলিত সমাজ-কাঠামোয় মেলাতে পারি না, তাই আমরা অনেকেই তাঁকে মেনে নিতে পারি না, আবার আমরা অনেকে নিরাপদ রফায় থাকতে 'প্রথা বিরোধী' গণ্ডিতে ফেলে তাকে 'প্রান্তীয়' করি। ফলে আমরা দেখি এই 'আধুনিক মানুষ' কে মৃতু্যপূর্বমুহূর্তে ব্যতিরেকে (বন্ধুভাগ্য অর্জনের জন্য তাঁর দরকার হয়ে পড়েছিল চাপাতির আঘাত!) সারাটি জীবনই 'নিঃসঙ্গ শেরপা' হয়ে থাকতে হয়েছে।
এবারের একুশে বইমেলা (ফেব্রুয়ারি 2006) বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দেয়া হুমায়ুন আজাদের সাাৎকারসমূহ নিয়ে গ্রন্থিত বই 'একুশ আমাদের অঘোষিত স্বাধীনতা'। এতে নানা মাত্রিকতায় হুমায়ুন আজাদ পাঠকদের সামনে উপস্থাপিত হয়েছেন। অকপটে বয়ান করেছেন নিজের বিশ্বাস(অ-বিশ্বাস), ভাবনা, বিবেচনাসমূহ। তিনি কথা বলতে পছন্দ করতেন, কথায় থাকতে পছন্দ করতেন। পত্রিকায় তাঁর সাাৎকার মানে নতুন কথার জন্ম, নতুন কথার বিস্তার। সে-সব কথামালা যখন একত্রে গ্রন্থিত হয়, তা অবশ্যই আগ্রহের বিষয় হয়। বইটি পড়ে তাই আমরা নিরাশ হই না। একজন মানুষ নিজের কথায় অনঢ় থেকেই মরে গেলেন, কথার জন্যই তো তাকে তবিত রক্তাক্ত হতে হল। অতপর ভগ্নশরীরে ইহলোক ত্যাগ করলেন। কি এমন কথা বলতেন তিনি, যার জন্য তাকে আজীবন মৃতু্যশীতল গহ্বরবাসি হয়ে থাকতে হল? তিনি তো কোন দল করেননি, কিংবা ভাড়াটে বুদ্ধিজীবিও ছিলেন না। তিনি শুধু কথা বলতেন, আর লিখতেন নিজের সত্যগুলো। তিনি সবাইকে নিয়েই লিখেছেন, বলেছেন; এই তালিকায় তো অনেকেই ছিলেন। বাঙালি চরিত্র ও প্রতিষ্ঠনের এমন কোন দিক নেই যা নিয়ে তিনি কথা বলেন নি। অসঙ্গতি তুলে ধরেন নি। প্রগতিশীল হতে মৌলবাদি, রাজনীতি হতে ব্যবসানীতি, বুদ্ধিজীবি হতে ঠিকাদার, পুরুষতন্ত্র থেকে নারীবাদ এমনি আরো অনেক কিছুই ছিল তাঁর কথার বিষয়। যা সত্য মনে করতেন বারবার বলতেন, শিশুর মতো, সরলভাবে।
এবার আমরা হুমায়ুন আজাদের কতিপয় সাহসী উচ্চারণে চোখ বুলাই: আমাদের অনেকেরই থাকার কথা ছিল মফস্বলের কোনো অসরকারি মহাবিদ্যালয়ে, কিন্তু পড়াচ্ছি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পৃষ্ঠা 13)। বাঙালি মুসলমান মোটামুটি একটি দরিদ্র ও আনন্দহীন গোত্র। তার জীবনপাত্র কখনো উচ্ছলিত হয় না (পৃ: 19)। আমাদের একটি চাষী ও একটি উচ্চ আমলা বা একটি জেলে ও একটি মন্ত্রীর মধ্যে মেধার প্রার্থক্য বিশেষ নেই (পৃ: 21)। অর্থাৎ একুশের চেতনাটি একান্তভাবেই মধ্যবিত্ত, শিতি বাঙালির চেতনা।... মোদ্দাকথা পরিশীলতা, আধুনিকতা, ধর্মনিরপেতা এবং অতীতকে বরণ করাই একুশের চেতনা (পৃ: 23)। বাঙালি খুব বেশি মৌলিক চিন্তাভাবনার স্রষ্টা নয় এবং একবার কোন চিন্তা কোনো বাঙালিকে পেয়ে বসলে তার পুনরাবৃত্তি দশক দশক ধরে ঘটে (পৃ: 26)। ধর্মান্ধরা যদি আগামী একশ বছর টিকে থাকে তাহলে এটা নিশ্চিত যে তারা আমাকেও মুসলমান বলে দাবী করবে, যদিও কপট ধর্মান্ধ মুসলমানরা আমাকে শাস্তি দিতে পারলে খুশি হয় (পৃ: 39)। আমি চলচ্চিত্রকে একটা গৌণ শিল্প এবং গৌণ মাধ্যম বলে মনে করি (পৃ: 69)। বড়ুচণ্ডী দাসকে আমি মনে করি বাঙলা ভাষার প্রধান মহাকবি এবং রবিঠাকুরেরর প্রথম পূর্বসরী (পৃ: 70)। আমার চেয়ে শামসুর রাহমানের কবিতা গভীর ও উৎকৃষ্ট নয়। তিনি সাধারণের আবেগ ধরার জন্য শ্লোগানধর্মী কবিতা লেখেন (পৃ: 86)। বাংলাদেশ হচ্ছে পাকিস্তানের সংশোধন (পৃ: 90)। বুদ্ধিজীবিদের নিয়ে সমস্যা হচ্ছে, তারা বিভিন্ন দলভুক্ত। কেউ আওয়ামী লীগের, কেউ বিএনপির।... নিরপে বুদ্ধিজীবি আমাদের নেই। আর কথিত বুদ্ধিজীবি যারা আছেন তারা এনজিও নিয়ে ব্যস্ত (পৃ: 95)। আমাদের রাজনীতি আমলা, ব্যবসায়ী, কিছু বিখ্যাত গুণ্ডাদের দখলে_ এ ব্যাপারটা চলছে। এটা একটি চূড়ান্ত অনৈতিক ব্যবসা (পৃ: 96)। ...শেখ হাসিনার হিউমার বোধ রয়েছে।... আর খালেদা জিয়া হচ্ছেন_ আক্রমণাত্মক, কৌতুকবোধহীন (পৃ: 98)। এই মুহূর্তে বাঙলাদেশ সম্পর্কে আশা করার কিছু নেই। আমি কখনোই গভীর হতাশা বোধ করি নি। কারণ বাঙলাদেশ সম্পর্কে হতাশা বোধ করার মতো কোনো আবেগ নেই (পৃ: 107)। আমাদের যে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল আছে_ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি_ তাদের দায়িত্ব হবে নিজেদের দল থেকে রাজাকারদের বের করে দেওয়া (পৃ: 109)। ইউরোপীয় আধুনিকতা পদটি বিভ্রান্তিকর। কারণ আধুনিকতা মানেই হচ্ছে ইউরোপীয়। ... আমি নিজে ইউরোপীয় আধুনিকতার খুব অনুরাগী (পৃ: 113)। আমেরিকা খণ্ডকালীনভাবে ইরাক দখল করেছে, তাতে মঙ্গল হয়েছে (পৃ: 115)। আমরা হচ্ছি ভিখিরি মনোভাবসম্পন্ন। আমরা নিজেরা কিছু সৃষ্টি করতে চাই না। আমদানি করতে চাই, ভিা করতে চাই (পৃ: 120)। সবচেয়ে প্রধান এনজিও এবং সবচেয়ে যা হাস্যকর সেটি হচ্ছে গ্রামীণ ব্যাংক।... ব্যাংক এমন কিছু মহাগৌরবের কিছু হতে পরে না (পৃ: 144)। আমাদের সাহিত্য সীমাবদ্ধ সাহিত্য। মিথ্যাচারই এর প্রধান বৈশিষ্ট। সত্যকে ভয় পায় (পৃ: 147)। সারা পৃথিবীতেই এখন আমার পর্যায়ের ব্যক্তিত্ব খুবই কম। আমার স্কুল জীবনের এক শিক বলেছিলেন, হুমায়ুনের জন্ম নেয়া উচিত ছিল ইউরোপে (পৃ: 149)। গান্ধি হিন্দু মৌলবাদকে উসকে দিয়েছিল, যার পরিণতি দেখছে ভারত। গান্ধি এই মৌলবাদের সূচনা করে গেছে ভারতবর্ষে (পৃ: 158)। বাঙালি কথা দিয়ে কথা রাখে না, টাকা ধার দিয়ে পরিশোধ করে না, অত্যন্ত কামুক যদিও তার কাম চরিতার্থ হয় না, অন্যের দিকে তার কান পড়ে থাকে চোখ পড়ে থাকে ইত্যাদি। এরা ধার্মিক এবং অসৎ; এখন বাঙালি খুব ঘুষ খায়, আর নামাজ পড়ে, হজ করে (160)।
বাংলাদেশ নামক যে ভূ-খণ্ডে তিনি বাস করতেন এর কোন কিছুতেই তাঁর আস্থা ছিল না। তাই এখানে তিনি কোন আশার আলো দেখতেন না, কথার চাবুকে আক্রমণে তিনি তা-ই বলতেন। তাঁর ব্যথা প্রকাশের জায়গা আর ছিল না, তাই বাঙালি জাতিই হয় তাঁর আক্রমণের বিষয়। তাঁর কথায়: "বাঙালি আজো প্রথাগতভাবে সভ্য একটি সমাজরাষ্ট্রও প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি, উন্নত ও শোষনহীন সমাজ তো দূরের। বাঙালিকে আক্রমণ করার অধিকার আমার আছে, আর কোন জাতিকে আক্রমণ করার অধিকার আমার নেই; তাই আক্রমণ করি বাঙালিকেই।" এই থেকে আমরা বুঝে যাই ােভ, এই ােভ হৃদয়াবেগ উৎসারিত। এখানে যদিও উপর থেকে পাখিচোখে দৃশ্য দেখার একটা সাধারণীকরণের ব্যাপার ঘটে, এক পাল্লায় অনেক কিছু মাপার ঘটনা ঘটে যায়, তারপরও যেটুকু 'সত্য' তা বিশাল ব্যাপার। এখানেই হুমায়ুন আজাদ 'অন্যরকম', তিনি যে ব্যাপারে সাহসি, অন্যেরা সেখানে আপোষকামি। হুমায়ুন আজাদ নিজের অ-বিশ্বাসের সাথে আপোষ করেন নি। তাঁর আধুনিক কবিতার সংকলনে তিনি আল মাহমুদকে স্থান দেননি, কেননা তাঁর বিশ্বাসে আল মাহমুদ আধুনিক নন। একজন আধুনিক মানুষ (তাঁর বিবেচনায়) একজন অনাধুনিক মানুষকে খারিজ করেছেন। তেমনি তিনি বাঙালি জাতির সমাজ-জীবন ও স্বভাবের অনাধুনিক প্রভাবকে খারিজ করেছেন; তাঁর ইউরোপীয় আধুনিকতায় অনুরাগী মন বাঙালি প্রথায় আস্থা রাখেনি, কেননা এখানে ইউরোপীয় আধুনিকতার নেই। চাবুকে কথামালায় তিনি তা বিবৃত করেছেন, আমরা এগুলোকে আখ্যায়িত করেছি 'প্রথাবিরোধী' কথাবলি। হয়তো আমাদের প্রথায় তিনি 'প্রথাবিরোধী' কিন্তু ইউরোপীয় প্রথায় তিনি 'প্রথাসিদ্ধ'। কিন্তু বাঙালি জাতিকে আলোকায়নের কোন উপায় তিনি বাতলে দেন নি। কোন উপদেশ দেননি, পথ দেখান নি। তারপরও আমরা ধরে নিতে পারি তিনি বাঙালি জাতিকে (ইউরোপীয়) আধুনিকতায় দেখতে চেয়েছিলেন, তিনি যা রপ্ত করতে পেরেছিলেন, যাতে অবগাহন করেছিলেন। এই ছিল তাঁর ব্রত। তিনি তা মান্য করেছেন। কথায় ও ব্যবহারিকজীবনে এরকম মিলেমিশে একাকার আর কয়জনা আছে আমাদের সমাজে? এখানেই তিনি অনন্য, তিনি জয়ী।
একুশ আমাদের অঘোষিত স্বাধীনতা দিবস : হুমায়ুন আজাদ
প্রথম প্রকাশ: ফাল্গুন 1812 ফ্রেব্রুয়ারি 2006, আগামী প্রকাশনী, প্রচ্ছদ: মাসুক হেলাল, মূল্য: 160.00
ফকরুল চৌধুরী
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




