শিল্পের চতুষ্কোণ। অনু হোসেন। ঐতিহ্য প্রকাশনী। প্রকাশ: ফ্রেব্রুয়ারি 2005। প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ। মূল্য: 125 টাকা বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্যের মান উৎকৃষ্ট নয়_ এরকম একটা কথা প্রায়ই শোনা যায় এবং সাহিত্যালোকের কেউ কেউ বিশ্বাসও করেন। সামপ্রতিক প্রবন্ধ সাহিত্যের সংখ্যাল্পে নজর রেখে একথা মেনে নেয়া যায়, কিন্তু পেছনের দিকে তাকালে তা মনে হয় না। মাত্র দুইশ' বছরের বাংলাগদ্য চর্চায় মননশীল সাহিত্যের অর্জন কম নয়। এবং বাংলা ভাষা যে সৃজনশীল চর্চার পাশাপাশি মননচর্চ্ায় মতাশালী এর প্রমাণ রয়েছে প্রচুর। এই েেত্র পূর্বজ কয়েকজন পথিকৃৎ হলেন: রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, অয়কুমার দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, মীর মশাররফ হোসেন, স্বামী বিবেকানন্দ, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, প্রমথ চৌধুরী, আবদুল ওদুদ প্রমুখ। এবং আলাদাভাবে ও বিশেষভাবে অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বর্তমানে আমাদের প্রবন্ধগুলো অনেকটা সাহিত্যকেন্দ্রিক, কিন্তু তাঁদের বিষয়ে ছিল বৈচিত্র, ছিল নানা বিদ্যা ও তত্ত্ব। বাংলা প্রবন্ধসাহিত্য এর পথপরিক্রমায় অর্জিত শক্তি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরে পরিপূর্ণতা পেয়েছে। তিনি বাংলা মনন সাহিত্যকে এমন এক উচ্চতায় নিয়ে গেছেন, তাঁর ভাব ও ভাষা জ্ঞানে-অজ্ঞানে-অর্ধজ্ঞানে আজও উত্তর-প্রজন্ম বয়ে চলেছে। রবীন্দ্রপরবর্তী পূর্ববাংলা হালের বাংলাদেশ স্বভাবে, চেতনে ও ভাষায় অনেক বদলে গেছে। দেশভাগ হল, অতপর পাকিস্তানি উপনিবেশে নিষ্পেষিত হল দীর্ঘ 26 বছর, তারপর মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত হল স্বাধীন বাংলাদেশ। আত্মপ্রকাশ করল ঢাকাকেন্দ্রিক মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সাহিত্যের নানা প্রকরণে নয়া মাত্রা পেল, প্রবন্ধসাহিত্যেও এর প্রভাব পড়ল। এই পটভূমিতে শুরু হয় বাংলাদেশের সৃজনচর্চা ও মননচর্চা। আর অনিবার্যভাবে এর মধ্যেই প্রাবন্ধিক অনু হোসেনের বিকাশ ও তাঁর চর্চার ভূমি। অনু হোসেনের শিল্পের চতুষ্কোণ গ্রন্থে সর্বমোট 13টি প্রবন্ধ অন্তর্ভুক্ত। সূচি দেখে বুঝা যায় প্রবন্ধগুলো 4টি পর্বে বিভক্ত। এগুলোতে তিনি নন্দনভূবনের কিছু তত্ত্ব উপস্থাপন করেছেন, বর্ণনা করেছেন শিল্পসৃষ্টির অনর্্তগত প্রকৌশল, বিচার করেছেন পূর্বজ ও সামপ্রতিক কয়েকজন কালউত্তীর্ণ কবির কাব্যভাষ্য। প্রবন্ধগুলো শিল্পরীতিশাসিত, প্রকরণ মান্য। মনন সাহিত্যের েেত্র এটাই স্বাভাবিক, আবেগ নয় শিল্পরীতির মাপঝোকই হয় এর নির্মাণ উপাদান। অনু হোসেনের মনন চর্চায় প্রধান পথচিত্র হয় ইয়ুংয়ের চেতনা বিশ্বের রূপরেখা। এর সাথে যুক্ত হয় (ফুকো উত্থাপিত) ব্যক্তিক-মতা ধারণা, এবং ডিকন্সট্রাকশনিজম (দেরিদা প্রযোজিত)। এই ত্রিমাত্রিক শিল্প-চিন্তা-সমালোচনারীতির মিশ্রণে যে বোধ উদ্ভূত হয়, তাই তাঁর মনন জগত গঠন করে, তাঁর শিল্প বিচারের ধ্রুবক হয়। সিদ্ধান্ত গ্রহণের েেত্র বিশেষ করে কাব্যভাষ্য বিনির্মাণে তাঁর রয়েছে অ-গতানুগতিক ব্যাখ্যান; এখানে তিনি সাবলীল। আর তত্ত্ব উপস্থাপনায় আয়াসবোধ্য ভাষা ও কৌশল সহজেই পাঠককে করে আকৃষ্ট। সমালোচনা বিচার ও মিমাংসায় তিনি অর্জিতবোধের আস্থাশীলতায় মতা প্রয়োগ ও বিনির্মাণে সক্রিয় থাকেন। যদিও কিছু কিছু েেত্র লেখার ওপর তাঁর সার্বভৌম নিয়ন্ত্রন শিথিল হয়, শিল্প ও তত্ত্বের দ্বারা তাড়িত হয়ে কিছু সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়। ফ্রয়েড মনকে তিনটি অংশে বিভক্ত করেছেন চেতন, অচেতন আর অবচেতন। মন যেন এক দৈহিক স্তরের বিণ্যাস, এর গভীরতম স্তর হচ্ছে অচেতন যাকে সহজে চেতন স্তরে আনা যায় না; এর উপরের স্তরটির নাম অবচেতন, যেটি সহজে চেতন স্তরে আনা যায়; যার মধ্যে স্মৃতি প্রভৃতির ধারণাগুলো থাকে। আর মনের উপরি স্তর হচ্ছে চেতন। ফ্রয়েড মনকে ভাসমান একটি হিমশৈল'র সঙ্গে তুলনা করেছেন। সমুদ্রের তলদেশে যেমন এই হৈমশৈল'র দশভাগের ন'ভাগ থাকে তেমনি মনের দশভাগের ন'ভাগ থাকে অচেতন স্তরে। ফ্রয়েডের মতে এই অচেতন মন মানুষের চেতন মনকে প্রভাবিত করে। সুতরাং অচেতন মনের ধারণাগুলো চুপটি মেরে থাকে না, রোগ লণ ও ব্যক্তিত্বের প্রলণগুলি উৎপন্ন করে। ফ্রয়েডের কাছে অচেতনের ক্রিয়াশীলতা ব্যাপক। অচেতনের এমন প্রভাব বিস্তারি অস্তিত্ব নিয়ে অনেক আপত্তি উঠলেও ফ্রয়েড নানা যুক্তির সাহায্যে অচেতন মনের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার করেন। কিন্তু ফ্রয়েডের সাগরেদ কার্ল গুস্তাব ইয়ুং কিন্তু ওস্তাদের সাথে সহমত পোষন করেননি। ইয়ুং বরং ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে 'লঘু' ও 'আদি-অবশেষ' অবচেতন মনকে অধিক গুরুত্ব দেন, স্বপ্নব্যাখ্যার কেন্দ্রবিন্দু করেন। এবং এর উত্তরণ ঘটিয়ে 'যৌথ অবচেতন' ধারণা উপস্থাপন করেন। 'ইয়ুংয়ের দৃষ্টিতে শিল্পীর মনোজগৎ' প্রবন্ধে এই ধারণাটি কেন্দ্রবিন্দু ধরে ইয়ুংয়ের চিন্তাকে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এই প্রবন্ধের সাথে যদি 'শিল্পের স্বপ্নপ্রতীক ও চিত্রকল্প' প্রবন্ধটি যুক্ত করে পড়ি তাহলে ইয়ুংয়ের চিন্তার একটি পূর্ণাঙ্গ অবয়ব আমরা পাব এবং এর থেকে শিল্পবিচারের একটি মানচিত্রও পেয়ে যাব। সে-ই অবয়ব ও মানচিত্র এবং সর্বোপরি প্রয়োগ প্রাবন্ধিক সূচারুভাবে উপস্থাপন করেছেন। আধুনিক মনস্তত্ত্ব শিল্প ও শিল্পবিষয়ক নানা প্রশ্নের উত্তর সন্ধানে সহজ পথ বাতলে দিয়েছে। এই েেত্র ফ্রয়েড শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞানের কথা বলেন। তাঁর মতে শিল্পকর্মের বিভিন্ন জিজ্ঞাসার উত্তর নিহিত থাকে শিল্পীর ব্যক্তিসত্তার নানা বৈশিষ্ট্যের মধ্যে। তিনি শিল্পের রূপকল্পবিচারে এই প্রক্রিয়াকে মূল উৎস বলে বিবেচনা করেন। অন্যদিকে ইয়ুং বলেন শিল্পের েেত্র ব্যক্তিসত্তার প্রভাব গৌণ। তাঁর মতে একজন সাধারণ মানুষের থাকে ব্যক্তিজীবন ও তার কতিপয় ল্য; অপরদিকে একজন শিল্পী এমন মানব যিনি উচ্চ জ্ঞানের অধিকারি এবং গভীর অর্থে তাকে বলা যায় 'সমষ্টিমানব'। এই সমষ্টিমানব বহন করে নির্জ্ঞান বা অবচেতনের প্রত্নরূপীয় সংগঠন ও মানবীয় গুনের আকর। সমষ্টিমানব নৈর্ব্যক্তিক পথে পরিচালিত হয়ে বস্তনিষ্ঠ চিন্তনে উদ্বোদিত। সর্বমানবের হিতার্থে তাঁর চিন্তাগুচ্ছ ও উপলব্ধিরাশি শিল্পীর অজ্ঞাতসারে মনের অবচেতন স্তরে বা নির্জ্ঞানে ঢুকে পড়ে। এইভাবে বৃহত্তর জীবনাভিজ্ঞতার পরিশোধনে কবি-শিল্পী সৃষ্টিশীল চেতনায় অবতীর্ণ হন এবং অবচেতনের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন সামষ্টিক মানবের গৌরবময় প্রতিনিধি। অবচেতন ও সমষ্টিমানবের অনিঃশেষ প্রভাবে কবির চেতনায় জাগ্রত হয় প্রতীকগুচ্ছ। প্রতীকের সাহায্যে অবশেষে শিল্পী সৃষ্টি করেন চিত্রকল্প। এইভাবে অবচেতন ও যৌথঅবচেতনে শিল্পীর মনে অস্তিত্বশীল রহস্যময় জগতের গূঢ়তা ইয়ুং আবিস্কার করেন। প্রাবন্ধিক অনু হোসেন ইয়ুংয়ের এই আবিস্কারগুলো আমাদের সামনে বয়ান করেন। শুধু তাই নয়, ইয়ুংয়ের 'অবচেতন' ও 'যৌথ অবচেতন' ধারণা অনু হোসেনর শিল্পবিচার ও সমালোচনার প্রকৌশল হয়। আমরা যদি কবি শামসুর রাহমান, আবুজাফর ওবায়দুল্লাহ, আল মাহমুদ ও শহীদ কাদরী'র কবিতা বিষয়ক আলোচনাসমূহ ল্য করি তবে এই ধারণা প্রকট হয়। এখানে ইয়ুংয়ের ধারণাসমূহ প্রয়োগ করা হয়, এতে করে সমালোচনার ধারার ভিন্ন মাত্রা পায়, এবং কতিপয় কবির সৃষ্টিপ্রক্রিয়ার নতুন ব্যাখ্যান তৈরি হয়। ফলে অনিবার্যভাবেই এইসব কবি বিষয়ক চিন্তার প্রচলিত সাধারণীকরণের েেত্র বিনির্মান ঘটে। নাগরিক কবি'র অভিধায় খ্যাত শামসুর রাহমানের কবিতায় লোকবাংলার জলহাওয়া শনাক্তকরণে তিনি অনুসন্ধান চালান কবির মনোজগতের রহস্যময় অবচেতন তলে। তিনি কবির আন্তর অনুকরনের প্রবনতাগুলো পর্যবেণ করে তাঁর শিল্পীসত্তার আদল খোলাসা করেন। আবু জাফর ওবায়দুল্লা'র কবিতা বিশ্লেষনে তিনি ইয়ুংয়ের মাতৃকল্প বা মাতৃপ্রত্নরূপ শব্দদ্বৈতের প্রসঙ্গ উপস্থিত করেন। কবির শিল্পীমন অবচেতনের অতল থেকে বয়ে আনে শিল্পময় বা নান্দনিক উপাদান-উপকরণ। ইয়ুংয়ের ভাষায়, কবির নান্দনিক বোধে যে রূপক-প্রতীকাশ্রয়ী উপকরণগুচ্ছ উদিত হয়, এর উৎসস্তর মাতৃচেতনা। যৌথ অবচেতনার প্রতিনিধিত্বে শিল্পীর মনে মাতৃচেতনার প্রকাশ ঘটে। আর মাতৃচেতনাজাত উপলব্ধিসমূহ শিল্পায়িত হয় মাতৃকল্পে। প্রাবন্ধিক কবির কবিসত্তায় মাতৃকল্পের রূপ ও রূপান্তর দেখতে পান। তিনি দেখান কিভাবে ব্যক্তিগত মায়ের অভাবজনিত আবেগসত্তা জাতীয় মাতৃকল্পে রূপান্তরিত হয়। এবং মীমাংসায় পৌছেন: কবির অবচেতনের প্রত্নমাতৃকা বাংলার ঐতিহ্যের ভেতর অস্তিত্বশীল। কবি আল মাহমুদ-এর মৌলিকত্ব নির্ধারণে প্রাবন্ধিকের বিবেচনা: নারীপুরাণাশ্রিত অনুপ্রেরণা এবং এবং এর সঙ্গে সংযোজিত শিল্পী-অঙ্গীকার। তাঁর মতে: কবির মানস-অভিজ্ঞানে সঞ্চিত কামনার অবদমন ও ভোগস্পৃহা কখনো চেতনে, কখনো অবচেতনে, আবার কখনো-কখনো যৌথ অবচেতনে নারীর কামাসক্তির প্রত্নরূপের গঠন থেকে নানাবিধ উপমানচিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়। আরেক শাহরিক কবি শহীদ কাদরি'র পরবাসে বিদ্ধ পরান বুঝাতে যেয়ে প্রাবন্ধিক 'কবির না ঘরকা না ঘাটকা' মানষিকতার দ্বন্দ্ব উপস্থাপন করেছেন। তাঁর মতে: একদিকে মেধা আর অন্যদিকে অবচেতন ও অবচেতনজনিত আবেগ কবিকে দ্বিধান্বিত করে। মেধা কবির পাশ্চাত্য-পঠন ও প্রভাবের ফল, আর অবচেতন ও অবচেতনজনিত আবেগ কবির মৃত্তিকায় শিকড় সঞ্চারের আকর্ষণ। আবার: অবচেতনের লোক-প্রকরণ ও সচেতন মনের নগরানুভূতি_ এই দুই বিপরীত মেরুর ভাবনাকে কবি একই বিন্দুতে বিন্যস্ত করেন। উপরন্তু: কোনো দার্শনিক বিশ্বাসে তিনি স্থিত হতে পারেননি, সমস্ত কাব্যেই তাঁর চেতনা যেন জিজ্ঞাসাচিহ্নযুক্ত। এইভাবে প্রাবন্ধিক অনু হোসেন নানা সিদ্ধান্ত মিমাংসার েেত্র ব্যাক্তিক-মতার সমতা প্রকাশ করেন। জ্ঞানকান্ডের দুই পুরোধা ফুকো ও দেরিদা বিষয়ক দুটো প্রবন্ধ (মিশেল ফুকোর নন্দনভুবন, পোষ্ট-স্ট্রাকচারালিজম ডিকন্সট্রাকশনিজম ও জ্যাক দেরিদা) পাঠককে সামপ্রতিক চিন্তনের সাথে যুক্ত করে। 'কোর্স ইন জেনারেল লিঙ্গুইস্টিক্স্' এ ফার্দিনান্দ দ্য সসু্যর কালানুক্রমিক(ডায়াক্রনিক), স্থানানুক্রমিক(সিনক্রনিক), বাচন(প্যারোল), ভাষাতন্ত্র(লাং)_ এই চার তত্ত্বমূলের দুটিকে রেখে এবং দুটিকে গায়েব করে, 'ভাষাতন্ত্রের স্থানানুক্রমিক বিশ্লেষন'_ এই বীজমন্ত্রে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন 'গঠনবাদী' (ষ্ট্রাকচারালিজম) ভাষাতত্ত্বের; সহসাই এ-মন্ত্রে আকৃষ্ট হন অন্যান্য বিষয়ের পণ্ডিতগণ। ভাষাতাত্তি্বক তদন্ত যাতে বাক-বৈভিন্নে বাকনৈরাজ্যে পরিণত না হয়, 'বাচন' জিনিষটাকে তাই আলোচনার বহিভর্ূত করেন। আর ভাষার কালানুক্রমিক অবিধেয়, এমন চুড়ান্ত সিদ্ধান্তে না যেয়ে তিনি একে শুধু পাশ কাটিয়ে যান। ফলে ব্যাপারটা দাঁড়ায়, 'কালানুক্রমিক' ও 'বাচন' এই দুই তত্ত্বমূলকে হাজির করে গায়েব করা, ফলে এদের পুনঃহাজিরের সম্ভাবনা থেকেই যায়। এবং ফ্রয়েডীয় 'অবদমিতের প্রত্যাবর্তন' সূত্রে তা ঘটেই যায়। শুরু হয় পোষ্ট-ষ্ট্রাকচারালিজম(উত্তর-কাঠামোবাদি) প্রতিক্রিয়া ও প্রতিনির্মাণ; এর পথচিত্র তৈরি করে স্বয়ং সসু্যরই, তাঁর চিহ্নবিষয়ক প্রস্তাবনা। তাঁর মতে, প্রত্যেক ভাষা-চিহ্নই দ্বিঅঙ্গ-বিশিষ্ট, চিহ্নক(সিগনিফায়ার) ও চিহ্নন( সিগনিফায়েড)। একটি অঙ্গের সাথে আরেকটির আবশ্যিক, চিরস্থায়ী কোন সম্পর্ক নেই। 6-এর দশকে গঠনবাদ কঠোর প্রশ্নের সম্মুখে পড়ে, এবং নতুন এক সমীপট, আরম্ভ-বিন্দু হিসাবে দানা বাঁধে পোষ্ট-ষ্ট্রাকশনিজম(উত্তর-গঠনবাদ)। এ েেত্র জ্যাক দেরিদা অগ্রগন্য। শব্দ ও অর্থ সংক্রান্ত সসু্যরীয় উপপাদ্যটি তিনি চরম সীমায় নিয়ে যান। সিদ্ধান্ত দেন, অপরিমেয় চিহ্ননের সঙ্গে, চিহ্ননের অনন্তসম্ভাব্যতার মধ্যে বাঁচে চিহ্নক। দেরিদার এই কৃতিত্ব আলোচ্য প্রবন্ধে সবিস্তারে উপস্থাপিত। প্রাসঙ্গিকক্রমে এর সাথে আলোচিত হয় তাঁর ডিকন্সট্রাকশনিজম, দর্শন বা সাহিত্যসমালোচনার একটি বিশেষ পদ্ধতি বা প্রক্রিয়া। এর দ্বারা দেরিদা পাশ্চাত্য দর্শনের লোগোসেন্ট্রিজমকে অস্বীকার করেছেন। লোগোসেন্ট্রিজম হল এমন এক বিশ্বাস যা উচ্চারণ ও লেখনের মধ্যে দ্বন্দ্ববোধ সৃষ্টি করে, উচ্চারণকে লেখনের উপর স্থান দেয়। গতানুগতিক দার্শনিক পদ্ধতিতে এক প্রত্যয়ের উপর আরেকটির বলপূর্বক আধিপত্য-স্থাপন ক্রিয়াশীল। ডিকন্সট্রাকশনিজম এই আধিপত্য ভেঙে দেয়। ইহা গৃহিত প্রত্যয়গুলোর ইতিহাস তদন্ত করে দেখে, সে ইতিহাসে কী কী বিলুপ্ত বা উপেতি হয়েছে। ফুকো বিষয়ক প্রবন্ধে তিনি তাঁর নন্দন পরিসর নিয়ে আলোচনা করেন। ফুকোর এই চিন্তার মূলে রয়েছে মতার নয়া বিবেচনা। মানবসত্তামাত্রই সৃজনম, শিল্পসৃষ্টিতে মতা রাখে; শুধু প্রয়োজন সঠিক ব্যবহার ও পরিচর্যা। সৃজনশীল সত্তা অবিরত নিজেকে নির্মানের মধ্যে যুক্ত রাখে, নতুন ভাবে আবিস্কার করে, ব্যক্তিস্বাধীনতার উপযুক্ত প্রয়োগ ঘটায়। এভাবে অনুশীলনের মাধ্যমে সৃজনপ্রণেতা সত্তার বিনির্মানে শিল্পীত হয়। ফুকোর এই ধারণা উপস্থাপনের মাধ্যমে স্বভাবজাত বা অলৌকিক শিল্প-সম্ভাব্যতা অস্বীকার করেন। উপরোক্ত দুটো প্রবন্ধই চৈতন্যে প্রশ্নের ভাঁজ তোলে, চিন্তার নিস্তরঙ্গতায় ঢিল ছুড়ে। ফলে লেখা দুটো বোদ্ধা পাঠকের নিকট অবশ্যই-পাঠ্য হয়ে পড়ে। এবং পাঠ শেষে অবশ্যই অগ্রসর চিন্তার আঁচ অনুভব করবে। এই গ্রন্থে জীবনানন্দ পাঠ বিষয়ে ('জীবনানন্দ পাঠের নতুন খসড়া') একটি ভিন্ন ত্রিমাত্রিক প্রস্তবনা উপস্থাপন করা হয়েছে। তা এরূপ: এক. মস্তিষ্কে তাঁর পঠনজনিত আধুনিক বিশ্ব; দুই. কোষকলায় ভারতীয় ঐতিহ্যের প্রতি আকর্ষণ; তিন. সমকালের কোলকাতায় কলোনিশাসিত ব্যর্থতা। এর সাথে হয়তো আমরা কবির ব্যক্তি ও সাংসারিক জীবনের অতৃপ্তিকেও যুক্ত করতে পারি। তাঁর প্রস্তাবনা জীবনানন্দ-বিশেষজ্ঞরা ভেবে দেখতে পারেন। এই গ্রন্থের একটি উল্লেখযোগ্য ও অনুসন্ধানি প্রবন্ধ হল, 'বিশ্বকাব্যভূমির লোকবীজ'। আধুনিক কবির কবিতায় কিভাবে লোকসংস্কৃতি অন্তর্ভূক্ত হয় এখানে তা ভাষ্য পায়। তাঁর কথায়: লোকসংস্কৃতি যেমন মানুষের আদি ও মৌলিক সম্পদ, কবিতাও তেমনি মানুষের সাহিত্যধারার আদি অর্জনরূপে পরিগণিত। এই সৃষ্টি-উৎসবিচারে কবিতা ও লোকসংস্কৃতি পরস্পর বিশেষভাবে ওতপ্রোত। তিনি এখানে বিশ্লেষনের েেত্র ইয়ুংয়ের যৌথ অবচেতন ও সামষ্টিক মানবের ধারণা বিবেচনায় আনেন। এবং দেখান যে আধুনিক কবিতা মানেই ঐতিহ্যকে অস্বীকার করা নয়, অস্তিত্বসংলগ্ন বাস্তবতাই হল ভাল কবিতার লণ। এই প্রবন্ধটি কথিত আধুনিক রাগী কবিদের অনেক ভ্রান্ত ধারণা অবলুপ্ত করবে। স্বদেশচেতনায় আধুনিক কবি হবার প্রেরণা যোগাবে। 'বের্টল্ট ব্রেশটের কবিতা: শিল্প ভাঙার শিল্প' প্রবন্ধে আমরা অতিপরিচিত নাট্যকার ব্রেশটের আরেকটি শিল্পসত্তার ধারণা পাই, তিনি একজন কবি। ব্রেশটকে তিনি দলছুট কবি হিসাবে চিহ্নিত করেন, কোন ইজমের সাথে তিনি সংশ্লিষ্ট ছিলেন না, এমনকি মার্কসীয় চিন্তায় দীা নেয়ার পরও। ব্রেশট ছিলেন বিরুদ্ধ সময়ের কবি। 'রবীন্দ্র ও পঁচিশে বৈশাখ' প্রবন্ধে নিজের জন্মদিন নিয়ে রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব চিন্তনকে বিশ্লেষন করেন। কবির কবিতার নিবিঢ় পাঠ থেকে কতিপয় সিদ্ধান্ত ব্যক্ত হয়। কবিমনের সঞ্চিত অনুভূতিগুচ্ছ ও ঘটনারাশি না-হারিয়ে অবচেতন ও যৌথ অবচেতনের উধর্্বচাপে মানবস্বপ্নে নানা প্রতীকে উপস্থাপিত হয়। ইয়ুংকৃত চেতনালোকের পরিসর থেকে সুপ্তাবস্থায় থাকা কবির নানাঅনুসঙ্গ পঁচিশে বৈশাখে উত্থিত হয়। এই রচনাটি রবীন্দ্রবিষয়ে আমাদের ভিন্ন স্বাদ দেয়। 'মধুসূদন দত্তের সৃষ্টিবৈচিত্র' প্রবন্ধে মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রাচ্য ও প্রতীচ্যপুরাণের সমন্বয়ে কিভাবে সৃষ্টিশীলতার েেত্র হয়ে উঠেন আধুনিকতার পথিকৃৎ এবং জাতীয়তার েেত্র প্রথম স্বাধীন বাঙালি তার পথচিত্র দেখান হয়। মধুসূদন আমাদের সাহিত্যালোকের বিভিন্ন কোঠরে ভিন্নমাত্রা যোগ করেন। অনেক েেত্রই তিনি প্রথম। পাশ্চাত্য শিল্প আঙ্গিককে স্বদেশভূমে অভিযোজিত করার েেত্র তাঁর দতা অতুলনীয়। এমনই এক সমৃদ্ধজনকে নিয়ে লেখাটি উপভোগ্য হয়ে উঠে। প্রাবন্ধিক অনু হোসেন তাঁর মনন চর্চায় ইয়ুংয়ের মনোবিশ্লেষন শিল্পের ব্যবচ্ছেদে ব্যবহার করে ফ্রয়েডিয় মনোসমীণ থেকে উত্তরনের একটি অভিযাত্রা সূচনা করেন। এই সূচনাকে আমরা অভিনন্দিত করতে পারি। সে-সাথে ফ্রয়েডিয় ঘোরের একতরফা মান্য সন্ধি থেকে মনস্তাত্তি্বক সমালোচনা ধারাকে তিনি অগ্রবর্তী চিন্তনের পরিসরে প্রতিস্থাপন করেন এবং ইয়ুং এ েেত্র তাঁর বিশ্লেষনে মান্য হয়। প্রাগ্রসর এই শিল্পচিন্তনের সাথে অভিযোজিত হওয়ার প্রকৌশল হল আলোচ্য এই গ্রন্থটির সুপ্রাপ্য দিক। ইয়ুং এর মনোচিন্তনকে তিনি প্রায় প্রতিটি প্রবন্ধেই একটু-আকটু সংশ্লিষ্ট করেছেন, কিছু েেত্র যা পুনরাবৃত্তিও হতে থাকে, এভাবে ইয়ুংকে বিপ্তি না-করলেও হত, কেননা ইয়ুংকে কেন্দ্র করে লিখিত দুটো প্রবন্ধেই (ইয়ুংয়ের দৃষ্টিতে শিল্পীর মনোজগৎ, শিল্পের স্বপ্নপ্রতীক ও চিত্রকল্প) তাঁকে মোটামুটি উপস্থাপন করা হয়েছে। শেষপ্রান্তে সংযোজিত সহায়ক সূত্র ও নির্ঘণ্ট গ্রন্থটিকে পূর্ণতা দিয়েছে। এই দিকগুলো সামপ্রতিক প্রকাশনাগুলো এড়িয়ে চলে। সে-েেত্র লেখকের সচেতনতা গ্রন্থপাঠে আমাদের আরও মনোযোগী করে। শিল্পরীতি ও শিল্পপ্রকরণে আস্থাশীল এমন একটি গ্রন্থ যা অবশ্যাম্ভাবীভাবে মননশীল, আমাদের বোধ আশ্বস্ত করে, প্রাবন্ধিকের বোধ পাঠকের বোধে সংক্রমিত হয়। পাঠকের চিন্তার কোষ-কলায় তরঙ্গ তোলে, বাড়িয়ে দেয় মননের বৈভব-পরিসর; এখানেই লেখাগুলোর সফলতা, লেখাগুলোর প্রাসঙ্গিকতা।
ফকরুল চৌধুরী ফকরুল চৌধুরী 0177170486
সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুলাই, ২০০৬ ভোর ৫:২২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




