মৃতু্যর পূর্ব-মুহূর্তে সক্রেটিস ছিলেন শিষ্য-পরিবেষ্টিত_ যুথবদ্ধ এক মানুষ; নিশ্চিত মৃতু্যর সামনেও অচঞ্চল, শান্ত_ অন্যান্য দিনের মত। কিন্তু যখন তিনি বললেন তিনি মারা যাচ্ছে এথেনীয়রা বেঁচে থাকবে, তখনই তিনি প্রিয় এথেনীয়দের থেকে নিজেকে আলাদা করে ফেলালন। অতপর হ্যামলকে চুমুক দিয়ে মৃতু্যবরণ করলেন তিনি এবং মৃতু্যর পূর্বেই আর সব এথেনীয় ও নিজের মধ্যে অলঙ্ঘনীয় ব্যবধান রচনা করে গেলেন।
মৃতু্যকালীন সক্রেটিসের নৈঃসঙ্গ আমার কাছে বুদ্ধিজীবীর অমোঘ একাকিত্বের লোভনীয় উদাহরণ বলে মনে হয়। যদি তিনি হ্যামলক পান না করে সব কিছু মেনে নিতেন তাহলে তিনি হতেন আর সকল এথেনীয়দের একজন। তা না করে তিনি জীবনের উপলব্ধ সত্য উচ্চারণ করলেন মতার মুখের উপর এবং তা করতে গিয়ে মৃতু্যকে বরণ করলেন হাসতে হাসতে, সমপূর্ণ একাকী। সক্রেটিস আমাদের জানা ইতিহাসে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী, মতা যাকে নোয়াতে না পেরে ধ্বংস করেছে। আবার, নিশ্চিহ্ন হওয়ার পূর্বেই তিনি মতা-বিরোধী প্রতিবাদের বোধ ছড়িয়ে দিয়ে গেছেন এথেনীয়দের মধ্যে যা ধ্বংসহীন।
সক্রেটিসের মৃতু্য আমাদের বলে: প্রথমত_ বুদ্ধিজীবী সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে তাদের প্রতিনিধিত্ব করেন, কিন্তু তিনি মূলত একা, দ্বিতীয়ত_মতা বা আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবীর সংগ্রাম আমৃতু্য এবং প্রজন্মক্রমিক।
আধুনিক সমাজে সুসংগঠিত রাষ্ট্রযন্ত্র, এর সহায়ক সংস্থাসমূহ এবং মতামুখী অন্যান্য সংগঠনের স্বভাব ও তৎপরতাই এমন যে বুদ্ধিজীবী জড়িয়ে থাকেন সার্বণিক সংঘাতে, কেননা ঐসব সংস্থার স্বেচ্ছাচরিতা এবং সাধারণ মানুষকে শোষণ-পীড়নের প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে অবিরাম। এজন্য বুদ্ধিজীবী এক পবিত্র যোদ্ধা_ প্রধানত ভাষিক অস্ত্রে তিনি যুদ্ধ করেন; যুদ্ধে উপলব্ধিযোগ্য তার অস্তিত্ব_ এখন, প্রতিনিয়ত, আগামীকাল বা আগামী বছরগুলোতেও। তার দায়িত্ব মতার বিশাল ও হিংস্র 'হা'-এর সামনে দাঁড়িয়ে নির্ভয়ে যথাযথ রীতিতে সত্য উচ্চারণ, মিথ্যার প্রতিবাদ; এবং এইভাবে ঐসব সংস্থা/ব্যক্তির আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিগ্রস্ত ব্যক্তি/সমপ্রদায়কে সচেতন করে কার্যকর প্রতিবাদের পটভূমি সৃষ্টি।
(অংশবিশেষ:: প্রবন্ধ: বুদ্ধিজীবী ও তার দায়ভার, লেখক : ফয়েজ আলম, পর্ব 1ম বর্ষ 1ম সংখ্যা।)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


