
ঝাপসা চোখ,দেখতে মনে হয় অসুবিধা ই হচ্ছে।কিন্তু এমন তো হওয়ার কথা না,চোখে ভালো দেখতে পাই।চোখে হাত দিলাম, ও...... অশ্রু, তাইতো চোখে দেখতে অসুবিধা হচ্ছে। না পারিনি আমি।আমি পারতাম কি? কত দিন শুরু করেছিলাম কিন্তু ঠিক গন্তব্যে কখনো পৌঁছা হয়নি।কি হতো?
রাহির আম্মু আজ ই ফোন দিয়ে বললো কোথায় আছ ?খুব জরুরী কাজ আছে বাসায় আসতে হবে একটু। কখনো না বলতে পারিনি এই মহিলাটাকে।হাজির হলাম বাসায়।বাসাটা এমনিতেই সাজানো গুছানো থাকে তবে আজ আরো বেশী সাজানো গুছানো।শুধু সাজানো গুছানো দেখালোনা রাহি কে।একটু উদ্ভ্রান্ত লাগছে ওকে।মেয়েটা এমনিতেই কালো ।আর এলোমেলো থাকলে তাকে আরো কালো মনে হয়।অদ্ভুত লাগলো আমার কাছে,মেয়েটা আজ এতদিন পর সালাম দিয়ে জিজ্ঞেস করলো কেমন আছেন স্যার?কান্না চেপে রাখা গলা যেমন তেমনি মনে হচ্ছে।।কান্না লুকোলেও মেয়েটি চোখের টলমল টা লুকোতে পারেনি।পরিস্থিতির আকস্মিকতায় আমি কিছুই বলতে পারিনি,শুধু তাকিয়েই ছিলাম।
রাহির আম্মু বললো আরে এত দেরী করলে যে? তোমাকে ফোনে বলিনি, আজ রাহিকে ছেলে পক্ষ দেখতে আসছে,
ভূল শুনলাম কি?না ভূল শুনিনি ,ঠিক ই শুনেছি।নিজেক সামলে নিলাম মুহুর্তেই।ও.।.।.।.।.।.।
মেহমান আসতে দেরী হবে মনে হচ্ছে,ছাদে গেলাম সেখানে খোলা আকাশ, প্রাণ ভরে কথা বলা যায় আকাশের সাথে। চোখে ভেসে আসছে প্রথম এ বাড়ি আসার স্মৃতি,
গ্রাম থেকে শহরে এসে উঠেছিলাম।একটা টিউশন দরকার ছিল খুব, এলাকার একভাইয়ের মাধ্যমে পেলাম একটি টিউশন।বিকাল ৪ টার কিছুটা আগে টিউশন এ গেলাম। প্রথমে একজন সুশ্রী মহিলা আসলেন। নাম ধাম পড়ালেখা ইত্যাদি জেনে নিলেন।তারপর ভিতরে একটা রুম দেখিয়ে বললেন ওখানে বসুন।একটু পর কাঁধে ব্যাগ নিয়ে থ্রী কোয়ার্টার আর গেঞ্জি পরা কুচকুচে কালো আর রোগা একটা বাচ্ছা আসলো। দেখে বুঝা যাচ্ছিলোনা ছেলে না মেয়ে।গদ গদ করে এলো।সালামটা এমনভাবে দিল মনে হয় কেউ গলা চিপে আছে।বুঝাই যাচ্ছে সে পড়তে আসতে চাইছিলোনা।নাম জিজ্ঞেস করলাম বললো রাহি এতক্ষণে বুঝলাম সে একটা মেয়ে ।ক্লাস ফোরে পড়ে।প্রথমদিন কোন পড়ালেখা হলোনা ,কিছুক্ষণ থেকে চলে আসলাম। কথা বলে যা বুঝলাম মেয়েটি মেধাবী তবে অমনোযোগী।আসছি যাচ্ছি পড়ালেখা চলছে, বার্ষিক পরীক্ষায় সে ফার্স্ট হয়ে গেল এবং সেই সাথে পুরো স্কুলের প্রায় ১৫০০ স্টুডেন্ট এর মধ্যে সর্বোচ্ছ মার্ক পেলো।সেটার ক্রেডিট রাহির পরিবার পুরোটাই আমাকে দিল। অথচ এখানে আমি জানি আমি তেমন কিছুই করিনি।রাহি তার মেধার জোরেই এটা করেছে।তাকে শুধু আমি এটুকু বুঝাতে সক্ষম হয়েছিলাম যে তুমি পারবে।এই আত্মবিশ্বাস টা তাকে তৈরি করে দিয়েছিলাম। তারপর আমার কাজ শুধু আসা যাওয়া আর নাস্তা করে আসার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।বসে থাকতাম আর সে মাঝে মধ্যে তার কোন প্রব্লেম থাকলে আমাকে বলত সেটা সল্ভ করে দিতাম আর না হয় বসে থাকতাম নাস্তা করে চলে আসতাম।
কোনভাই বোন না থাকায় মেয়েটা কিছুটা নিভৃতচারী ছিল। আর আমার অভ্যাস ছিল থাপ্পড় মারা,মাঝে মাঝে খুব একগুঁয়েমী আচরণ করতো তখন থাপ্পড় মারতাম বেশ জোরেশোরেই,টিউশনে স্টুডেন্ট মারার প্রচলন না থাকলে ও আমি হাত চালাতাম খুব,অবশ্য এ নিয়ে প্রথম প্রথম ওর আম্মুর আপত্তি থাকলে ও পরে কেন জানি এটা স্টাবলিশ হয়ে গিয়েছিল।আমি ও বেশী ঘাঁটাতামনা তাকে।ক্লাস ফোর থেকে ক্লাস এইট। ৪ বছর পার হয়ে গেল। আরো ২ বছর গিয়ে ক্লাস টেন এ রাহি এখন। টিউশনটা ছাড়তে হলো।ইতিমধ্যে ওদের পরিবারের সাথে কেনজানি একটু বেশীই কাছাকাছি হয়ে গেলাম।সববিষয় রাহির আম্মু আমার সাথে শেয়ার করতো।ওদের পরিবারের একজন এর মতই হয়ে গিয়েছিলাম। একটু দূরে যাওয়ার প্রয়োজন হলো। ৬ বছরের টিউশন এর পরিসমাপ্তি।
দূরে এসে বুঝতে পারলাম কোথাও কিছু একটা হয়েছে। নিজকে নিজের মধ্যে পাচ্ছিলাম না। বারবার হারিয়ে যাচ্ছিলাম কোথাও। কোন নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কাজে অমনোযোগী,মেজাজ খিটখিটে, নির্জনতা একটু ভালো লাগতো তবে খুব অস্থিরতায় কাটতো।কান্না আসতে চাইতো, ঠিক কান্না না ধুমড়ে মুচড়ে দেয়ার মত একটা অবস্থা এককথায় ভাষায় প্রকাশের অযোগ্য এক অসহায় অবস্থা। আবছা মনে পড়লো যেদিন রাহিদের বাসা থেকে চলে আসছিলাম রাহির ছলছল নয়ন দেখেছিলাম।হয়তো আমার চোখ ও এমনি ছিল। হতেই পারে দীর্ঘ ৬ বছর মানে ৭২ মাস গড়ে প্রতিদিন ৯০ মিনিট করে হিসাব করলে খুব বেশী না হলে ও বেশ কিছু সময় একসাথে থাকার সুবাধে বিদায়লগ্নে মন খারাপ হওয়াটা ই স্বাভাবিক ছিল।কিন্তু এখন বুঝলাম না, সেটা কারোর ই স্বাভাবিক বিষাদ লাগা ছিলনা।
এ কি ভাবছি আমি ,৬ বছরে যেটা একবারের জন্য ও মনে উঁকি মারেনি সেটাই ভাবছি আমি।হারিয়েছি আমি মনের অজান্তেই।না এটা আমি ভাবতে পারিনা। ভাবা ঠিক না। কিন্তু না ভেবে ও পারছিনা । মনের সাথে পাল্লা দিয়ে জিততে পারা মানুষের সংখ্যা খুব হাতে গোনা। আমি ও পারিনি।আমি যেভাবে হারিয়েছি আমার নিজেকে খুঁজে পাওয়া দূষ্কর ছিল।কত রাত নিরঘুম কাটিয়েছি অস্থিরতায়।
একরাতে একটা টেক্সট এলো মোবাইলে,অপরিচিত নাম্বার। লেখা ছিল কেমন আছেন?কেন জানি মনে হচ্ছিলো এটা সে ই হবে ।রিপ্লাই দিলাম- রাহি? বললো-জ্বি।একমুহুর্তের জন্য মনে হচ্ছে কিছু দেখছিলাম না,শুনছিলাম না,বুঝতেছিলাম না।নিজেকে সামলে নিয়ে স্বাভাবিক খবরা খবর নিলাম, দিলাম। পড়ালেখায় মনেযোগী হওয়ার উপদেশ দিয়ে ঐদিনকার মত মেসেজিং পর্বের সমাপ্তি। এরপর থেকে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় ধরে মেসেজিং চলতো। ঘুরে ফিরে একই বিষয়গুলা আসতো সবাই কেমন আছে পড়ালেখা কেমন চলছে।মাঝে মাঝে ওর আম্মু ফোন দিত আর বলত রাহিকে একটু বুঝাবেন আর ভালোভাবে পড়ালেখা করতে বলবেন।ও আপনাকে ছাড়া কাউকে ভয় পায়না।আর আমি ও প্রতিদিন নিয়মকরে পড়ালেখায় মনোযোগী হতে উপদেশ দিয়ে মেসেজিং পর্বের সমাপ্তি টানতাম।কখনো সরাসরি কথা হতোনা ।কিন্তু এই কিছুক্ষণের মেসেজিং ই আমি ভালো থাকতাম।বুঝতে পারলাম আমি ধীরে ধীরে নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছি।প্রায় বছর খানেক এভাবেই চললো ,নিয়ম করে রোজ মেসেজিং। কিন্তু আগের যায়গায় ই থেকে গেলাম ভালো খারাপ আর পড়ালেখার উপদেশ। না পারছিলাম তাকে বলতে আর না পারছিলাম নিজের মাঝে লুকিয়ে রাখতে।মেয়েটি ও কিছু বলছেনা, কিন্তু একটা মেয়ে নিয়ম করে রোজ একটা ছেলেকে টেক্সট করার মানে টা না বুঝার মত অতটা ও বোকা ছিলাম না। আবার আবার এতটা সাহসী ও ছিলাম না যে তাকে হুটহাট করে বলে দিব আমি তোমাকে……………………..
মনের সাথে অনেক দেনদরবার করে সিদ্ধান্ত নিলাম বলেই দিব ওকে, যা হয় হোক। আবার ভাবছিলাম এখন তো একটা সম্পর্ক হলে ও আছে যদি এর জেরে সব সম্পর্কই নষ্ট হয়ে যায়??যা হয় হোক, এবার কোন না কোনভাবে ওকে বলতেই হবে।
ওর টেক্সটের অপেক্ষায় ছিলাম এমন সময় ওর আম্মুর ফোন,ভাবনায় পড়ে গেলাম কি ব্যাপার ???ধরবো কি ধরবোনা এটা ভাবতে ভাবতেই প্রথমবার রিং কেটে গেল।দ্বিতীয়বার রিং এ ধরলাম। বললো কেমন আছো?তোমার সাথে আমার জরুরী কিছু কথা আছে।চিন্তায় পড়ে গেলাম।বললাম বলুন ।
বললো রাহির ব্যাপারে কিছু বলার আছে তোমাকে ,আমি তো ঢোক গিলতে লাগলাম।সব শেষ হয়তো। উনি বলতে লাগলেন- রাহিকে নিয়ে আমাদের স্বপ্ন অনেক, ও আমাদের সব। বেশকিছু দিন থেকে তার মতিগতি ভালো ঠেকছেনা আমার। পড়ালেখায় ও চূড়ান্ত রকমের অমনোযোগী। এমন টা আমি কখনো দেখিনি। তার ড্রয়ারে আমি একটি সিমকার্ড পেয়েছি। আর আমার পুরাতন মোবাইল টা। কারো সাথে সে রিলেশন এ জড়িয়েছে।তুমি তার সাথে কথা বলো। ও তোমার কথা খুব মানে।তুমি বুঝিয়ে বল। আমার এই উপকার টা তুমি কর।
আপনি তাকে কি কিছু বলেছেন?
তিনি বললেন না, আমি এখনো কিছু বলিনি।তোমাকেই প্রথম জানালাম।আচ্ছা ঠিক আছে বলে ফোন রাখলাম।
মনে হচ্ছে ভূমিকম্পে পুরো পৃথিবীটা চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পরে বুঝলাম পৃথিবী না আমার হৃদয়টা ই চূর্নবিচুর্ণ হচ্ছে।বুঝতে পারছিলাম না কারো বিশ্বাসের মুল্য দিব নাকি নিজেই নিজের স্বপ্ন আর ভালোবাসার পরিসমাপ্তি ঘটাবো।কোনটাই আমার জন্য সহজ ছিলোনা।এরমাঝেই রাহি টেক্সট করলো।ওকে বুজতেই দিলাম না যে ওর আম্মুর সাথে আমার কথা হয়েছে।খুব বেশী কিছু বলার দরকার হয়নি তাকে।বললাম দেখ প্রতিদিন খুব বেশী দরকার না হলে টেক্সট করোনা।।এটাই শেষ মেসেজ ছিল তাকে করা।তার ও আর মেসেজ পাইনি কখনো ।শেষ পর্যন্ত জব টা ও করতে পারিনি।এতটা অমনোযোগী মানুষের দ্বারা আসলে কোন কাজ ই সম্ভব নয়।কিন্তু মনোযোগ টা গেল কোথায়?ক্লাসের সবচেয়ে মেধাবী আর মনোযোগী ছাত্রটার মনোযোগ কোথায় হা্রালো??
চলে আসলাম আবার আগের যায়গায় ,একটা প্রাইভেট কলেজে শিক্ষকতা শুরু করলাম। মাঝে মাঝে ওদের বাসায় যাওয়া হতো কিন্তু ও আর কখনো আমার সামনে আসেনি যদি ও আমি শুধু একটি আকাঙ্খা নিয়েই যেতাম। সেটা হলো যদি ওকে দূর থেকে ও একটিবার দেখতে পাই।কখনো ওর ব্যাগ, কখনো টেবিলে সাজিয়ে রাখা ওর প্রিয় গল্পের বই গুলায় হাত বুলিয়ে আসতাম।আর বাসায় এসে ওর পিচ্ছি বেলার কিছু ছবি দেখতাম। দুষ্টুমির ছলে তোলা তার ক্লাস সিক্সেরে সময়কার কিছু ছবি গুগলে সেভ করাছিল। সেগুলাই আমার মন খারাপের আর উদাস হওয়ার গল্প।রাহি আমার কথা রেখেছিল।ভালোভাবেই পড়ালেখা করেছিল।একটা ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসাবে জয়েন করেছে। আজ তাকেই ছেলেপক্ষ দেখতে আসছে।হয়তো এ বিয়ের স্বাক্ষী হিসাবে ও আমাকে স্বাক্ষর করতে হবে।।ভালো থেকো আমার অব্যক্ত আর ভীরু ভালোবাসা।তোমাতেই আমার সব পূর্ণতা আর অপুর্ণতার গল্প।

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে ডিসেম্বর, ২০২০ সকাল ৯:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


