somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

** শব্দ ** [ ছোট গল্প ]

০৪ ঠা নভেম্বর, ২০১৪ দুপুর ১:০৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

" সম্পর্ক রচনা হল না তার বড় দুই সন্তানের সঙ্গেও। ব্যস্ততা বা সময়ের অভাব নয়, আগ্রহের অভাব নয়। অভাব পড়ল বাক্যের। অভাব পড়ল ভাব প্রকাশের" শীর্ষেন্দুর একটা উপন্যাস পড়ছিল রুদ্র। এই লাইনে এসে আটকে গেল সে। সত্যিই তার সাথেও কি এমন কিছু ঘটে নি ! কিছু পরিচয় দীর্ঘ হলে কথা ফুরিয়ে আসে, তাদেরও এসেছে। রুদ্র ভাবে ওর আর অদিতির সম্পর্কটাও ফুরিয়ে আসছে। বেশী দিন মনে হয় টিকবে না। আসলে ওদের মাঝে ক্ষুদ্র থেকে দীর্ঘতর একটি রাস্তা অগোচরে তৈরি হয়ে গেছে। দুজন দুদিকে হাঁটা দিয়েছে, এখন এই চরম মুহূর্তে বুঝতে পারে রুদ্র। কিছুতেই বাঁচানো যাবে না সম্পর্কটাকে। দুজনেই বিষণ্ণতাই ভুগছে। এর চেয়ে দূরে থাকা ভাল। আসলেই দূরে চলে এসেছে। এখন অপেক্ষা সুক্ষ চিকন সুতোতে নাড়ী ছিন্ন টান। অদিতিও আগের মত নেই, আমিও কি আছি? মাস্টার্স শেষ করে বেকার বসে আছি। আর্থিক সংকটে দিন পার হচ্ছে আগুনে পোড়া রুগীর মত। হাতে তিন চারটা টিউশনি। সারা দিন ছুটে চলতে আর ভাল লাগে না। একটা সমাধান খুব জরুরী। সবাই ভাল আছে, শুধু আমার ভাল থাকা হয় না। ভাল থাকলেই যেন আমি মারা জেতে পারি এমন ভাব ঈশ্বরের। এর মাঝে ওর ক্যানকানানি, দেখা কর না কেন? ভাল মত কথা বল না কেন? দুনিয়ার অভিযোগ। অর্থহীন জীবন সত্যিই অর্থহীন সেটা কিভাবে বোঝাবো। পরিবারের কথা নাই বাদই দিলাম। গত মাসে মনে হয় দিন পাঁচেক দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে তার চেয়ে একটু বেশী।
আমিও বুঝি এভাবে চলে না। মাত্র বছর দুয়েক সম্পর্ক। তার মাঝে এত সমস্যা। প্রথম বছর স্বপ্নের মত কেটে গেল। কত স্বপ্ন , রাত ফুরিয়ে গেল, গল্প গেল না। কবিতা লিখতাম অনেক, ছবিও আঁকতাম। বেশ গেল দিন গুলি। আহা ঝকঝকে স্বর্ণের মত দিন। আর এখন মরচে পড়তে পড়তে ক্ষয়ে গেছে সব। আর একবার বৃষ্টি হলে কিছুই থাকবে না।

গত সপ্তাহে দেখা হল ওদের। সত্যি কিছুই বলার মত ছিল না রুদ্র ও অদিতির। চুপচাপ শুধু বসে থাকা। মাঝে মধ্য কান খুঁচায় রুদ্র। আর অদিতি দূরে তাকিয়ে থাকে। পাশে বসে অথচ হারিয়ে গেছে অন্য কোথাও। রুদ্র বলতে চাইছে কিন্তু কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না। ওরা বসেছিল নদীর পাশে। কিছুটা নির্জনে। গত বছরেও এই নির্জনতা দারুণ লাগতো দুজনের। আজ দম আটকে দিচ্ছে। দেখতে দেখতে ন'টি নৌকো চলে গেল জল চিঁরে। বাতাস দক্ষিণ থেকে পূবে মোড় নিল। অবিবেচিক ক'টি মানুষ উঁকি মেরে গেল। কিন্তু সময় যেন থমকে গেল ওদের। রুদ্র ভাবছে কিছুই কি বলার নেই? বেশীক্ষণ থাকতে পারবে না। টিউশনি আছে, যেতে হবে। পরিবেশ ভারী হয়ে উঠছে। এই অসম্পূর্ণ সম্পর্কটা হিমালয়ের চেয়ে কয়েকগুণ ভারী লাগে, যদিও হিমালয় কাঁধে নিয়ে দেখেনি রুদ্র। আজই শেষ করতে হবে সব কিছু, তবুও শেষ হয়েও হয় না। অনেক দিন অদিতির হাতখানা ধরে না রুদ্র। এমন কি চোখে দৃষ্টি ফেলতে সংকোচ হয়। আর লুকিয়ে চুমু, সে অবাঞ্ছিত ইতিহাস। না, আর পারে না। সব কিছু শেষ হয় এটাও হতে হবে। রাতে ঘুম হয় না ভাল মত, কি যে ভাবনায় মগ্ন হয়ে রাস্তাতে হাটে নিজেও জানে না। জীবনটা বড্ড এলোমেলো হয়ে গেল। অথচ এই এলোমেলো সন্ন্যাসী জীবনযাপন কে ভালবাসত, ভাল লাগতো অদিতির। এখন সেটাই অসহ্য হয়ে উঠেছে তার কাছে। না দেখা হলেই ভাল লাগে ওর। ভালবাসা আগের জায়গাতে নেই। ফিরতে হবে নিজ দেহে নিজ ঘরে, রুদ্র এখন অনেক জানা। আর জানতে ইচ্ছে করে না।

আজও এভাবেই ফিরে আসে ওরা। হয়তো আরও কিছু দিন কিছু সপ্তাহ, কিছু মাস... কিংবা বছর। রুদ্র আটকে গেছে সময়হীন একটি ঘড়িতে। যার কাঁটা নেই, গতি নেই।
রুদ্র আটকে গেছে উপন্যাসের অক্ষরে। চোখ ফিরে গেছে দূরে, জানালা পেড়িয়ে, মাঠ পেড়িয়ে, বড় বড় রাস্তা পেড়িয়ে, বাস স্টপ, কারখানা, শপিং মল, ধূসর নীল আকাশ পেড়িয়ে, আটকে গেছে নদী বালুতে, কাঁদাতে ঘোলা জলে, নৌকার চূড়াতে, কাশ বনের মিহি গন্ধে। রুদ্র ফিরতে চাই না, ফেরার মত কিছু পেছনে কি আছে? নেই। রুদ্র ভাবে শেষ করতে হবে শেষ করতে হবেই। কি শেষ করবে নিজেকে না অদিতিকে? অভাব, শব্দের অভাব, ভাব প্রকাশের অভাব, জীবন কে নিংড়ে নেওয়ার অভাব। " অভাব " শব্দটি চরমতম মধুর সুরে ফিরে আসছে কানে। সে জানে এই শব্দটি সমস্ত জীবন তার কানে লেগে থাকবে। মোবাইলের ভাইব্রেশনের কাঁপনে ফিরে আসে নদী থেকে। এই যন্ত্রটাকে ভয়ংকর লাগে ইদানিং। কখন কি দুঃখ এনে দেয় বলা মুস্কিল। অদিতির মেসেজ। পড়তে ইচ্ছে করছে না রুদ্রুর। অনেক মেসেজ জমে আছে ফোনে। আজও পরে থাকুক এভাবেই সময় জমতে থাকে ঘড়িতে। আধা ঘণ্টা পরে আবার একটি মেসেজ। রুদ্রর জিদ চেপে গেছে। না কোন মেসেজ সে পড়বে না। আজ শুধু অবহেলা করবে সব কিছু।

পরে থাকলো মোবাইল সাত দিন রুদ্রের পকেটে। একটি বারের জন্যও সে মেসেজ পড়েনি। ক্যাম্পাসে দেখা অনিকের সাথে। সপ্তাহখানেক বাদে ভার্সিটিতে আসলো সে।
সুমনের চায়ের দোকানে বসতেই আড্ডা জমে গেল। ভাল লাগছে না রুদ্রর। যেতে পারলে বাঁচে। কিন্তু বাঁচার অধিকার নিয়ে রুদ্র জন্মায় নি। খানিক বাদে রুদ্র ছুটছে, পাগলের মত ছুটছে, গরমে ঘেমে একাকার ওর শরীর। থামার লক্ষণ নেই। রেসের ঘোড়ার মত ছুটছে। বাতাসে চুল উড়ছে পতাকার মত, স্যান্ডেল আজ ছিঁড়েই যাবে মনে হয়। গত ঈদে কেনা। তবুও ছুটছে, মানুষ জন তাকিয়ে আছে ওর দিকে। রুদ্রর হুস নেই। রুদ্র বসে আছে নদীর পাশে, হাতে মুঠোফোন। একটি মেসেজ খুলে বসে আছে নির্বাক নদীর মত, কাশ বনের মত, বাতাসের মত। চোখে জল বিঁধে আছে, চার বার গড়িয়ে পরেছে খোঁচা খোঁচা দাড়ি মধ্য দিয়ে। হঠাৎ ফোনটা জলে ছুড়ে মারে রুদ্র। কাছে জলের কিনারা ঘেঁষে ডুবে যায়। সাথে একটি মেসেজ। " রুদ্র আজ আমার বিয়ে, তুমি অনেক ভাল থেকো"।

রুদ্র ফিরে আসে ঘরে। উপন্যাসের পাতা ভাজ করা ছিল। অসমাপ্ত লাইন ধরে পড়তে থাকে। আকাশ ভারী, ঝুম জল ঝড়তে পারে চারিদিকে। সুতোর মত এক একটি জল।
তাই সব অভাবকে ছাপিয়ে আজ রুদ্রর ভাল ঘুম হবে মনে হয়।

@বনী ইসরাইল।
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাদ্রাসা শিক্ষাকে না বলুন। মাদ্রাসা শিক্ষা বন্ধ করুন।

লিখেছেন মুহাম্মদ মামুনূর রশীদ, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২

শুধু ভারত বিদ্বেষই না।

মাদ্রাসাগুলোতে কোনও ব্যতিক্রম ছাড়াই মোল্লারা ইসলামের দোহাই দিয়ে,

/নিজের দেশ তথা নিজের জন্মভূমি বাংলাদেশের প্রতি বিদ্বেষ করা শেখায়।

/মোল্লারা তাদের মাথায় এই ধারণা খুব অল্প বয়সেই ঢুকিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার নাফসকে আচ্ছা করে টাইট দিন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫৭

মানুষের ভিতরে এমন একটি অংশ আছে, যা মানুষকে খারাপ কাজ করতে উদ্বুদ্ধ করে, খারাপ কাজের বুদ্ধি দেয়। ইসলামী পরিভাষায়, আমরা মানুষের এই অংশকে নফস বলি। আপনি খারাপ কাজ থেকে দূরে... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×