মতিউর রহমান চৌধুরী, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে: ‘মেসি তার মাথায় মুকুট পরে বেরিয়ে পড়তে চলেছে।’ প্রিটোরিয়ায় মেসি সম্পর্কে গতকাল এই উচ্ছ্বাস যার, তিনি অবশ্যই দিয়েগো মারাদোনা।
মারাদোনা সত্যিই মেসি বলতে অজ্ঞান। তেইশে পা রাখার আগেই বিশ্ব ফুটবলের হার্টথ্রব বনে যাওয়া লিওনেল মেসির গতকাল ছিল তেইশতম জন্মদিন। প্রিটোরিয়ার মারাদোনা স্কোয়াডের ডেরায় কাল সকাল থেকেই নেমে আসে উৎসবের আমেজ। বলা বাহুল্য আর্জেন্টিনার মিডিয়ার একটু বেশি অবাধ প্রবেশাধিকার সেখানে। তাদের বিবরণীর ওপরই নির্ভর করতে হয় গতকালটা কেমন কেটেছিল মেসির।
তেইশটি মোমবাতি জ্বলেছিল। সেখানে আর্জেন্টিনা টিমের সতীর্থ ছাড়াও মেসির পরিবারের সদস্যরা ছিলেন। মেসি নিশ্চয়ই কাল তার দাদিকে খুব মিস করেছেন। কারণ প্রয়াত দাদিই ছিলেন তার ফুটবলের প্রেরণা। তিনি শৈশবেই আঁচ করেছিলেন ছোট্ট মেসির পায়ে বুঝি জাদু আছে। সেই দাদি মারা যান। মেসি দাদিকে একদিন স্বপ্ন দেখেন। সত্যি স্বপ্ন! তার ঘুম ভেঙে যায়। মেসি দাদিকে খুঁজেছিলেন। মেসি স্কুলে ভীষণ দুষ্ট ছিল। মেসিকে নিয়ে করা পনেরো মিনিটের প্রামাণ্যচিত্রে এসব ঘটনার উল্লেখ আছে। সেখানে মেসির নকল করার প্রতিভার বৃত্তান্তও কিন্তু ঠাঁই পেয়েছে। বিস্ময় বালক মেসি পরীক্ষা দেন। কিন্তু তিনি তার উত্তরপত্র চালান করে দিতেন সহপাঠিনীর কাছে। সেই সহপাঠিনীও অনিন্দ্য সুন্দরী। মেসি যে আকর্ষণীয়, সুপুরুষ সে নিয়েও তর্ক নেই। এই দুজনের মধ্যে যোগাযোগ আছে। তবে সেটা প্রেম নয়। কারণ গত বছরেই মেসি প্রথমবারের মতো স্বীকার করেন তিনি প্রেমে পড়েছেন। ‘আমার গার্লফ্রেন্ড আছে। সে আর্জেন্টিনায় থাকে। আমি সুখী।’ একটি টিভি শোতে মেসিরই ছিল উচ্চারণ। তবে পরিবারের সায় আছে বোঝাই যায়। তার নাম অ্যান্থোনিলা রকুজ্জো। পুষ্টিবিদ্যার ছাত্রী। তাকে কিন্তু গতকাল মেসির বাবা-মা ও ভাইদের সঙ্গে মেসির জন্মদিনে দেখা গেছে।
এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত ঐতিহ্যবাহী আর্জেন্টাইন প্রথায় জমকালো পরিবেশে জন্মদিন পালনের কর্মসূচি এগিয়ে যাচ্ছিল। রাতজুড়ে অনুষ্ঠান চলে। আর্জেন্টিনার প্রতিনিধি দল জন্মদিনের গান গাইবে। এ সময় মেসির কাছে তুলে দেয়া হবে জন্মদিনের ঐতিহ্যবাহী উপহার। এই উপহার হস্তান্তর করাটা যে একটু বেশি রাতের ব্যাপার তা সহজেই অনুমেয়। কারণ আর্জেন্টিনার প্রথা হচ্ছে, জন্মদিনের গিফট দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ করা। এ সময় তেইশটি মোমবাতির আলো একে একে নিভিয়ে দেয়া হবে। এটা সাধারণত ঘুমুতে যাওয়ার আগে ঘটে। তবে নিশ্চয় যথেষ্ট রাত করবেন না কোচ দিয়েগো। সামনেই যে মেক্সিকোর সঙ্গে খেলা।
মারাদোনার মতো বস্তিজীবন মেসির নয়। আবার ধনাঢ্য পরিবারেরও নন তিনি। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। স্কুলেই তার নেতৃত্ব গুণ প্রকাশ পায়। তেইশে পা দেয়ার আগেই তার ক্যাপ্টেন হওয়া ছিল সেই প্রতিভার স্ফুরণ। এত কম বয়সে তার আগে কেউ ক্যাপ্টেন হননি। মারাদোনা প্রায় প্রতিদিনই মেসি সম্পর্কে কোন না কোন উক্তি করছেন। মিডিয়া খোরাক পাচ্ছে। গতকাল মারাদোনার একটি সুদীর্ঘ সাক্ষাৎকার ছাপা হয়েছে আর্জেন্টিনার একটি দৈনিকে। কিন্তু সেই বিবরণ অনলাইনে প্রকাশ করা হয়নি। সেই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘মেসি ইতিমধ্যেই ছাঁচ ভেঙেছে। আমাদের এখন উচিত হবে, তাকে নিয়ে তুলনা করাটা বাদ দেয়া। মেসির মাথায় মুুকুট। তিনি গন্তব্যে বেরিয়ে পড়েছেন।’ বোঝাই যায়, মেসির মুকুট পরে বেরিয়ে পড়াটা কি জন্য? নতুন দেশ জয় নয় ঠিকই। তার চেয়ে কম নয় বা তার চেয়ে বেশি। চ্যাম্পিয়নশিপ। স্বপ্ন তাদের এখন একটাই।
মারাদোনা কিন্তু মেসির প্রতিভা সম্পর্কে মন্তব্য করতে সবসময়ই প্রগলভ। দ্বিধাহীন। দিলদরিয়া। ক’দিন অগেই বলেছিলেন, ‘এবারের বিশ্বকাপটা হবে তারই। কারণ আমার আছে মেসি। আমার টিমের অন্য কারও সঙ্গে তার (মেসির) তুলনা করা যাবে না। এমনকি চল্লিশ ভাগ প্রতিভাও অন্য কারও নেই যা একজন মেসির মধ্যে আছে।’ দিয়েগো মারাদোনা মেসি সম্পর্কে এমনই অন্ধ। মেসি গোল পায়নি। তবুও মেসি মেসিই। যেমন মারাদোনা মারাদোনাই।
মারাদানো গতকাল তার সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘আমি সোনালী কাপটাই চুমু খেতে চাই সবার শেষে। কারণ ওটা তো তারাই (খেলোয়াড়রা) জয় করে আনবে। আমি শুধু আর্জেন্টিনার জার্সি পরে আছি। সেই গর্বেই মাটিতে আমার পা পড়ে না।’
গতকাল একজন সাংবাদিক বলেন, জন্মদিনের ঘরোয়া উৎসবে মেসির পরিবারের অনেকই ছিলেন। আর ছিলেন তার খুবই ব্যক্তিগত পর্যায়ের। মারাদোনা বিশেষ কলমে একটি শার্টের ওপর লিখেন মেসি-পঙ্ক্তিমালা।’ আমার সবটুকু হে ও অনুরাগসহ। লিও-র জন্য। তোমারই দিয়েগো।’
১৯৮৭ সালের ২৩শে জুন। দিনটা ছিল ‘ঈশ্বরের হাত’ দিয়ে গোল করার এক বছর একদিন পরের ঘটনা। সন্তানসম্ভবা সিলিয়া কাসিথিনি তার স্বামী জর্জকে নিয়ে হাসপাতালে এলেন। ভূমিষ্ঠ হলো এই দম্পতির তৃতীয় সন্তান। ওজন তিনি কিলোগ্রাম। লম্বায় ৪৭ সেন্টিমিটার। এরপর তার বেড়ে ওঠা। লেখাপড়ায় অমনোযোগ। আটলান্টিক পাড়ি দেয়া। বার্সেলোনার মাঠের পাশে ঘুরঘুর করতে দেখা। এরপর ক্রমশ সবার নজরে। মেসির স্কুলের গেম টিচার স্মৃতিচারণ করেন, একদিন সে তার দাদির সঙ্গে এলা। আমি তাকে বল দিলাম। কি আশ্চর্য। বলটি নিয়ে সে মুহূর্তেই দুষ্টুমিতে মাতলো। তাকে বললাম, মেসি কিক, কিক, কিক। কিন্তু সে কিক করে না। তার সে কি ড্রিবলিং। প্রামাণ্যচিত্র এটা দেখাচ্ছে। ড্রিবলিংটা মেসির তেমনই, যেমনটা আজকের বিশ্ববাসী অবাক চোখে দেখে। তার প্রথম জন্মদিনে বাবা-মা তাকে উপহার দিয়েছিল একটি ফুটবল।
গোটা বিশ্বের মিডিয়া এতদিনে একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে, তাহলো বিশ্বকাপ হয়ে উঠেছে মেসি আর মারাদোনাময়। খেলায় অঘটন, আপসেট, নাটকীয়তা ভিন্ন বিষয়। চলতি ট্রেন্ড হলো মেসি ও মারাদোনাকেন্দ্রিক। উভয়ের মুখে উভয়ের প্রশস্তি খৈ হয়ে ফুটছে। আর্জেন্টিনার সাংবাদিকদের একটাই কাজ: মেসির দিকে নজর রাখা। মেসিকে সুখী দেখাচ্ছে। সেটাও সেদেশের প্রেসের অন্যতম বড় শিরোনাম হতে পারে।
সংবাদ সম্মেলনেও লক্ষ্য করি একই কৌতূহল। এরই মধ্যে গুজব রটেছিল, মেসি নাকি গ্রিসের বিরুদ্ধে খেলতে না নামার কথা ভেবেছিল। অবিশ্বাস্য। তারপর দেখা গেল মেসি শুধু খেলতেই নামেননি। অধিনায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। ফুটবলময় বিশ্বটাই ক্রমশ মারাদোনা ও মেসিময়। নাকি মারাদোনা ও মেসিময় বিশ্বটা হয়ে উঠছে ফুটবলময়। এটা সত্যি এক অভূতপূর্ব ক্রেজ। তবে গুরু-শিষ্যের মধুর সম্পর্ক, উষ্ণ আলিঙ্গন, উচ্ছ্বাসের আড়ালে কিছু কানাঘুষাও শোনা যায়। এর একটি হলো মাঝে-মধ্যে মেসির মন খারাপ হয়। নিন্দুকরা বলে বেড়ান, মেসি আর্জেন্টিনার খাস লোক নন। তার মন পড়ে থাকে বার্সেলোনায়। খেলা শেষে ফের ছুটে যাবেন সেখানেই। মেসি বসন্তের কোকিল ইত্যাদি। এসব কথাবার্তায় মেসি ঈষৎ বিষণ্ন। সেকারণেও কি দিয়েগো মেসিকে চাঙ্গা করতে নিরন্তর উৎসাহ জাগানিয়া পঙ্ক্তি রচনা করে চলেছেন?
‘মেসি খেলবে না? সে তো ভাবাই যায় না। মেসিকে মাঠে না নামানোটা যে পাপ হবে। গ্রিসের সঙ্গে ম্যাচপূর্ব এক সংবাদ সম্মেলনে মন্তব্য করেছিলেন মারাদোনা। তবে তিনি এও বলেছিলেন, ‘আমি তাকে ভালোবাসি। মেসি একটু বিশ্রাম নেয়ার পরিকল্পনা করেছিল বটে। কিন্তু আপনারাই বলুন, তার মতো উঁচু মাপের একজন তারকার কি বিশ্রাম নেয়া চলে। সারাবিশ্ব তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার জাদু দেখার জন্য।’ বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম খেলোয়াড়।’
মারাদোনার মেসি-বন্দনা এভাবেই ঝরে। মেসির কথা এলেই মারাদোনা আবেগাপ্লুত। কিন্তু মেসি তো এখনও গোল করতে পারেনি। তার ব্যাড লাক।’ কোন একজন সাংবাদিক কথাটি বলে শেষ করতে পারেননি। মারাদোনা তাকে থামিয়ে দেন। বলেন, ‘আজকের যুগটা প্রযুক্তির। সেকারণে আপনি সহজেই অনুমান করে নিচ্ছেন, মেসি কেন ওই জায়গাটায় থাকলো না, সে কল্পনাটা সহজ।’ তিনি বলেন, আমি এ ধরনের কল্পনা করি না। আপনারা মেসিকে নিয়ে কষ্ট পেতে পারেন। কিন্তু আমার সে কষ্ট নেই। আমার সাফ কথা, ব্যাড লাক যদি মেসির হয়ে থাকে, তাহলে এমন ব্যাড লাকই যেন তার হয়। যা আমার টিমকে জেতায়। আমার টিম সদস্যদের গোল করায়। আমার আর কিছু চাই না। আমি মেসির এই ব্যাড লাকটা দেখতে চাই।’ গ্রিসের সঙ্গে খেলা শেষে মারদোনা নয় মেসিই গোল না করা নিয়ে জবাব দেন। মেসি বলেন, তার পায়ে গোল আসবে। তিনি এদিন রেফারিং নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করেন। ইঙ্গিতটা স্পষ্ট। ফিফা যেন গ্রিসের সঙ্গে খেলার রেফারিংটার একটা তদন্ত করে। মারাদোনা তো মনেই করেন, মেসি শুধু ফাউলের কারণেই এতদিনেও গোল দিতে পারেনি। ‘আমি জানি গোল করতে পারিনি। তবে সেটা নিয়ে আমি চিন্তিত নই’ মন্তব্য করেছেন মেসি। ফুটবল বিশ্লেষকরা বলেছেন, মেসির জীবনের প্রথম অধিনায়কত্ব ভালোই কেটেছে। মেসি তার যোগ্যতার ছাপ রেখেছে। মারাদোনা সঠিক সিদ্ধান্তই নিয়েছেন।
তবে গল্পের পেছনে যেমন গল্প থাকে। তেমন একটি গল্প হলো, মেসি সম্পর্কে মারাদোনার দৃষ্টিভঙ্গি কিছুটা বাঁকাই ছিল এবং সেটা কিন্তু বেশি দিনের পুরনো কথা নয়। মারাদোনা কি মেসিকে ঈর্ষা করেন? মেসি এমন একটা সময় জন্ম নিয়েছেন যখন তার কৈশোরের খেলাও মানুষ ইউটিউবে দেখতে পায়। কিন্তু মারাদোনা, পেলেরা প্রযুক্তির সে সুযোগ পাননি। এমন নানা কথা চালু আছে। অবশ্য দুজনের বয়সের তফাৎ সিকি শতাব্দীর বেশি।
২০০৮ সালের ১১ই অক্টোবর। দিয়েগো মারাদোনা মেসি সম্পর্কে বলেছিলেন, ‘মেসি এত বেশি একরোখা যে তার সতীর্থদের কথা তিনি ভুলে যান।’ খেলার মাঠে মেসির একনায়ক হওয়ার প্রবণতা সম্পর্কে এমন মন্তব্য ছিল দিয়েগোর। ‘কখনও কখনও মেসি শুধু নিজের জন্য খেলে।’ অনেক বিশ্লেষক ধারণা করেন, মেসি দিয়েগোর সেই উক্তি থেকে হয়তো ইতিবাচক পাঠ নিয়েছেন। কারণ এতগুলো ম্যাচ গেলো, সবাই গোল করছে। কিন্তু তিনি গোলের জন্য মরিয়া হননি। বরং সতীর্থদের তিনি আলিঙ্গন করেছেন। হাসছেন প্রাণখোলা। তার গতকালের জন্মদিনটি সেই হাসিতেই ছিল উদ্ভাসিত।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

