somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা

১০ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৩৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সুপরিকল্পিত এক বিকেলের সূচনালগ্ন।
মতিঝিলের কর্মক্লান্ত জনস্রোত, যন্ত্রযানের দীর্ঘমিছিল পেছনে ফেলে ইত্তেফাক ভবনের দিকে এগোলাম আমরা। অভিসার সিনেমা হলের চিত্তাকর্ষক ব্যানারের হাতছানি এড়িয়ে পৌঁছলাম হাটখোলায় রাজধানী সুপার মার্কেটের উল্টোদিকে আর্ট হ্যাভেন নামের একটি ছোট্ট দোকানের সামনে। দোকানের স্বত্বাধিকারী ইকরাম হোসেন অতি সাধারন একজন মানুষ। কিন্তু নিয়তির বিচিত্র খেয়ালে কখনও কখনও অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে পৃথিবীতে! ইকরাম হোসেনের মতো আপাতঃঅপাঙক্তেয়, অতি সাধারন মানুষের হাতেও লেখা হয় সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা- স্বৈরাচার নীপাত যাক॥ গনতন্ত্র মুক্তি পাক॥

আর্ট হ্যাভেনের স্বল্পায়তন পরিসরে প্রবেশ করলাম আমরা। কথা হল একহারা গড়নের ইকরাম হোসেনের সাথে।
শুরুতেই ব্যাক্তিজীবনের বর্ণনা। ১৯৬৮ সালে মহানগরী ঢাকায় জন্ম তার। অল্পবয়সে পিতৃবিয়োগের কারণে ইকরাম হোসেনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগ্রহণ পরিপূর্ণভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বেঁচে থাকার তাগিদে বিভিন্ন কাজ করার চেষ্টা করেন তিনি। লেদ মেশিন কারখানায় কাজ করেন কিছুদিন, করেন গ্যাস ওয়েল্ডিং, ইঞ্জিন ডেন্টিংয়ের কাজ। তারপর মতিঝিল শাপলা চত্বরের কাছে আশরাফ মটরস নামের একটি গাড়ি মেরামত কারখানায় করেন শ্রম-প্রদান। আশরাফ মটরসেই অঙ্কনশিল্পী বাদশা মিয়ার সাথে পরিচয়। এই বাদশা মিয়ার হাত ধরেই মূলত পেশা বদল ঘটে ইকরাম হোসেনের। এরপর বছর চারেক অতিক্রান্ত হয়।

দিলকুশা বাণিজ্যিক এলাকায় বিসিআইসি ভবনের উল্টোদিকে ফাঁকা জায়গায় তখন সুউচ্চ ভবন ছিল না; ছিল গাড়ি মেরামত কারখানাসহ বিভিন্ন ধরনের অতি ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠান, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য স্বল্প ব্যয়ে নির্মিত প্রান্তনিবাস এবং কিছু ছোট দোকান।
এখানেই পপুলার পাবলিসিটি নামে একটি বাণিজ্যিক চিত্রাঙ্কন প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করলেন ইকরাম হোসেন। পপুলার পাবলিসিটির কাছেই ছিল ক্যাফে চায়নার গলি।
পুরোনো ঢাকার বনগ্রাম থেকে এসে সেখানে আড্ডায় মিলিত হতেন নূর হোসেন।
মতিঝিল-দিলকুশার বিভিন্ন অফিসে পুরোনো কাগজ, পরিত্যক্ত যন্ত্রাংশ ক্রয়-বিক্রয়ের সাথে জড়িত জলিল ভাইয়ের সাথে ভীষণ সখ্য ছিল ঝাঁকড়া চুলের এই যুবকটির।
নূর হোসেনের সাথে মাঝে মাঝেই দেখা হত ইকরাম হোসেনের, সৌজন্যমূলক বাক্য বিনিময়ও হত, তবে তার চাইতে বেশি ঘনিষ্ঠতার সুযোগ হয়নি কখনও কর্মব্যস্ততার কারণেই। ইকরাম হোসেন জানতেন, নূর হোসেন আওয়ামী লীগের একনিষ্ঠ কর্মী। রাজনৈতিক যে কোন কর্মসূচিতে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন তিনি সবসময়।

১৯৮৭ সাল। রাষ্ট্রক্ষমতায় অগণতান্ত্রিকভাবে অধিষ্ঠিত সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ দেশের সমস্ত রাজনৈতিক জোট। প্রজাতন্ত্রের নিয়ন্ত্রাশক্তির স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ জনসাধারণ। বিক্ষোভ-আন্দোলনে প্রায় প্রতিদিনই উত্তাল রাজপথ। মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের জীবনহানির সংখ্যা বাড়ছে আশঙ্কাজনকভাবে। পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে বিরোধী দলগুলো ১০ নভেম্বর ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত নিল। শুরু হল কর্মসূচি সফল করার প্রস্তুতি।

৮ নভেম্বর।
সকালে দোকানে কাজ করছিলেন ইকরাম হোসেন। এমন সময় কয়েকজন বন্ধুসহ সেখানে হঠাৎ উপস্থিত হলেন নূর হোসেন। একটা কাজ করে দেবার কথা বললেন ইকরাম হোসেনকে। সে সময় ব্যস্ত ছিলেন ইকরাম হোসেন। তাই তিনি পরদিন বিকেলে নূর হোসেনকে দোকানে আসতে বললেন।

৯ নভেম্বর।
শীতের পড়ন্ত বিকেলে নূর হোসেন এলেন পপুলার পাবলিসিটিতে। ঘণ্টাখানেক বসলেন। তারপর সন্ধ্যার ঠিক পূর্বমুহূর্তে ইকরাম হোসেনকে নিয়ে চললেন ক্যাফে চায়নার গলির পাশের প্রান্তনিবাসের একটি অংশে। সেখানে জামা খুলে উর্ধ্বাঙ্গ সম্পূর্ণ অনাবৃত করে দাঁড়ালেন নূর হোসেন। ইকরাম হোসেনকে বললেন, আজ আপনি এমন এক জায়গায় কিছু কথা লিখবেন, যা আপনি আপনার জীবনে কোনদিন লেখেননি।
নূর হোসেনের কথায় খানিকটা বিভ্রান্ত হলেন ইকরাম হোসেন! দ্বিধাগ্রস্ত হলেন! নূর হোসেনের অনাবৃত উর্ধ্বাঙ্গে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে নিশ্চিত হতে চাইলেন লেখার স্থান সম্পর্কে!
হ্যাঁ, নিশ্চিত করলেন নূর হোসেন, জানালেন, লিখতে হবে এই শরীরেই। কাছের একটা দেয়ালে স্বৈরাচার নীপাত যাক॥ গনতন্ত্র মুক্তি পাক॥ কথাগুলো লিখলেন। তারপর এই কথাগুলোই লিখে দিতে বললেন তাঁর বুকে-পিঠে। কারণ, আগামীকালের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিতে এভাবেই অংশ নিতে চান তিনি!

কিন্তু এই কাণ্ড যে নূর হোসেন নামের প্রাণোচ্ছল যুবকটির মৃত্যুর কারণ হতে পারে!
না! না! এ কাজ কিছুতেই করতে পারেন না ইকরাম হোসেন! তিনি ফিরে যেতে উদ্যত হতেই তার হাত চেপে ধরলেন নূর হোসেন, দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য তাঁর মতো শত প্রাণের বলিদান ভীষণ প্রয়োজন আজ!
নূর হোসেনের এ কথায় আকস্মিকভাবে দ্বিধামুক্তি ঘটল যেন ইকরাম হোসেনের! আপত্তির প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে কম্পিত হাতে তিনি তুলি তুলে নিলেন, সাদা এনামেল পেইন্টের কৌটার মুখ খুললেন, তারপর মিনিট বিশেকের মধ্যে লিখে ফেললেন সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা!

১০ নভেম্বর।
সকাল থেকেই ঢাকায় জারী ছিল ১৪৪ ধারা। কিন্তু সেই ধারাকে অগ্রাহ্য করে পথে নামলেন নূর হোসেন। স্বৈরাচার নিপাতের লক্ষ্যে, গণতন্ত্র মুক্তির দাবীতে মুষ্টিবদ্ধ হাত উর্ধ্বে তুলে স্লোগানে স্লোগানে মুখরিত করলেন দশদিগন্ত। অবধারিতভাবে পুলিশ গুলি চালাল। সেই গুলিতে নূর হোসেনের নিষ্প্রাণ দেহ মাটিতে লুটাল ঠিকই, কিন্তু সময়ের শ্রেষ্ঠ কবিতা শরীরে ধারণ করে নূর হোসেন পৌঁছে গেলেন অমরাবতীর অনিন্দ্যসুন্দর উপকূলে।


ছবি: সংগৃহীত
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই নভেম্বর, ২০১৫ রাত ৯:৩৩
১৯টি মন্তব্য ১৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

এটাই কি সামুর প্রথম পোস্ট?

লিখেছেন অধীতি, ১২ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৩১


https://www.somewhereinblog.net/blog/deborah/9
২০১৩ সালের দিকে ঢাকায় আসি। তখন মাত্র মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করেছি। ঢাকায় এসে যেই বিষয়টা নেশার মত হয়ে যায় তা হলো বিভিন্ন জায়গায় কম্পিউটার চালানোর জায়গা ছিল। ডেমরা রানী মহল... ...বাকিটুকু পড়ুন

পদ্মা ব্যারাজের ডিজাইনার : খাল বাবা স্বয়ং

লিখেছেন অপলক , ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৮

আসন্ন বিসিএস পরীক্ষার কমন প্রশ্ন ফাঁস করে দিলাম। পদ্মা ব্যারাজের ডিজাইনার মহাপ্রতিভাবান খাম্বা/খাল বাবা। তিনি HSC ডিগ্রীধারী হলেও তার প্রতিভা আকাশচুম্বী। রবিঠাকুর বা নজরুলের সাথে তার কোন তুলনা হয় না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগ ডেভেলপমেন্টে করণীয় কি?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:৪৬



গত কয়েক বছর ধরে সামহোয়্যারইন ব্লগ সহ দেশের সকল পত্রিকা ও টিভি চ্যানলে রাজনৈতিক লেখা বেশি আসছে যা সকলের কাছে ভালো লাগার বিষয় না। রাজনীতি ভালো লাগবে শুধুমাত্র জেনজি’দের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফ্যাসিবাদ মোকাবেলায় এআই প্রশিক্ষণ দিচ্ছে সরকার

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৫৬


ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করা গেছে, কিন্তু পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি। অন্তত প্রযুক্তির দিকে তাকালে এমনটাই মনে হচ্ছে। যে আওয়ামী লীগ এতদিন মানুষের ভোট, মতামত, রাজপথ, রাষ্ট্রযন্ত্র সবকিছুর ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা... ...বাকিটুকু পড়ুন

"টোকাই থেকে হিরো"

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ১৩ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১০:১৬



টোকাই থেকে হিরো! বাংলা ছবির  অশ্লীল যুগে মুক্তি পাওয়া এক ঢাকাইয়া চলচ্চিত্র। ছবিতে প্রেক্ষাপটে অনেকটা এইরকম - বস্তিতে বেড়ে উঠা; মানুষের লাথি- উষ্টা খেয়ে বড় হওয়া এক টোকাই (ছবির... ...বাকিটুকু পড়ুন

×