
ভীষণ দীনতা যেন যাপিত জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে! নিরাপত্তাহীনতা! অসহিষ্ণুতা! অসম্প্রীতি! অনিশ্চিতি!
দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বমুখি প্রবণতার কথাই বা বাকি থাকে কেন!! কথা, কথা আর কথা! অর্থহীন এক অর্থে!
এবং মতিঝিল থেকে চেপে বসা বাসের একেবারে পেছনের সিটে শরীর এলিয়ে অর্থহীন অজস্র কথা মনে হচ্ছিলো বারবার!
আচ্ছা! আমাদের কথাগুলো সব অর্থহীন হয় কেন?
আমাদের ব্যক্তিক-সামষ্টিক-সামাজিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক স্তরগুলো মেধাশূন্যতায় জর্জরিত বলেই কি?
ভাবতে ভাবতে ধানমন্ডি পনেরো নম্বর বাসস্ট্যান্ড পেছনে ফেলে শংকর নামলাম। নেমে যথারীতি রিকশা নিলাম। জাফরাবাদ, পুলপাড় বাজার পার হয়ে নানা ধরনের অপরিকল্পিত আবাস, প্রান্তনিবাস, দোকানপাট অতিক্রম করতে না করতেই দৃষ্টিসীমা স্পর্শ করলো শহীদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধের নান্দনিক কাঠামো- যে কাঠামোর প্রতিটি ইটে প্রোথিত বেদনার মহাকাব্য- আমাদের উপলব্ধ অর্থহীনতা, মেধাশূন্যতা কিংবা অন্তসারশূন্য যাপিত জীবনের নেপথ্যসত্য।
১৯৭১। রাজনৈতিকভাবে পরাজিত পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যুদ্ধের প্রথম প্রহর থেকেই শুরু করে বাঙালি নিধনযজ্ঞ নির্বিচারে। সামরিক পরাজয়ও যখন নিশ্চিত তাদের, তখন তারা জন্ম সুনিশ্চিত হওয়া বাংলাদেশের অগ্রগতির ভবিষ্যত পথগুলো রুদ্ধ করে দেবার লক্ষ্যে পরিকল্পনামাফিক শুরু করে বুদ্ধিজীবী নিধনও। কারণ, তারা জানতো, একটি দেশকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে পঙ্গু করার অন্যতম উপায় মেধাশূন্যতা সৃষ্টি। এই হীন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সাহায্যের সশস্ত্র হাত প্রসারিত করে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী। তাদের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে দেশপ্রেমিক মানুষদের পাশাপাশি একে একে চিহ্নিত হতে থাকে বুদ্ধিজীবীরা। বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধী এই অপশক্তি তাঁদের ধরে নিয়ে যায় বধ্যভূমিতে এবং হত্যা করে পাশবিকভাবে, আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হত্যার পর লাশগুলো ফেলে রাখে বধ্যভূমিতেই।
পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের অব্যবহিত পূর্ব দিনগুলোতে, বিশেষত ১৪ ডিসেম্বর স্বাধীনতা বিরোধীদের সেই বর্বর, নৃশংস হত্যাযজ্ঞ পরিগ্রহ করে ভয়াবহ রূপ। ঢাকা শহরের বধ্যভূমিগুলোর অন্যতম মোহম্মদপুর বেড়িবাঁধসংলগ্ন রায়েরবাজারের এই চিহ্নিত স্থানটি যুদ্ধকালীন সেই ভয়াবহ, শোকার্ত সময়ের নির্বাক সাক্ষী!
শহীদ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিবিজড়িত এই বধ্যভূমিটি দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে পড়েছিলো অযত্নে, অবহেলায়। ১৯৯১ সালের ১৪ ডিসেম্বর প্রজন্ম ৭১ বুদ্ধিজীবীদের স্মৃতিরক্ষার দাবীতে একটি স্মৃতিফলক স্থাপন করে এখানে। পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয় সদিচ্ছায় গণপূর্ত অধিদপ্তর সুনির্দিষ্ট এই স্থানে সৌধ নির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয় পর্যায়ে নকশা আহবান করার পরিপ্রেক্ষিতে জমা পড়ে বিভিন্ন স্থপতির মোট ২২টি নকশা। নকশাগুলোর মধ্যে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়া অনন্যসাধারণ নকশাটির প্রণেতা যৌথভাবে স্থপতি ফরিদ উদ্দীন আহমেদ এবং জামী আল-সাফী।
১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯- এই তিন বছরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা স্থাপনাটি রায়েরবাজারের পুরোনো ইটখোলাসংলগ্ন একটি বিধ্বস্ত ঘরের প্রতীকী প্রকাশ- যে ঘরের ছাদসহ সমস্ত দেয়ালই মানবতা ভূলুণ্ঠিত করা ভয়ংকর আঘাতে গুড়িয়ে গেলেও প্রায় বৃত্তচাপ আকারের একটি দেয়াল অপরাজেয় অহংকারে অটল, অক্ষত, অবিচল।
৩ ফুট পুরু এবং ৩৮০ ফুট দীর্ঘ সেই দেয়ালের দক্ষিণ এবং উত্তর প্রান্ত ক্ষয়ে মিশে গেছে মাটিতে কিন্তু মাঝখানের বেশ খানিকটা অংশ যেন মাটি ভেদ করে হঠাৎই উঠে এসেছে ৫৮ ফুট উচ্চতায়। স্থাপনার উচ্চতর সেই স্থানে ২০ ফুট বর্গাকার একটি জানালা, যে জানালা দিয়ে দেখা যায় বাংলাদেশের স্বাধীন সার্বভৌম আকাশ।
রিকশা ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে এসে দাঁড়ালাম সৌধের কাছে। দেয়ালাকৃতির অনিন্দ্যসুন্দর সৌধটির সামনেই টলটলে জল, আর সেই জলের ভেতর কালো রংয়ের একটি শোকস্তম্ভ- নতমুখ, নয়নাভিরাম।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রনালয়ের গণপূর্ত অধিদপ্তরের সার্বিক তত্ত্বাবধানে রায়েরবাজার বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধটির রক্ষণাবেক্ষণের যাবতীয় কাজ পরিচালিত হলেও প্রকল্পের অর্থযোগানদাতা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রনালয়। স্মৃতিসৌধ প্রাঙ্গনের উত্তর-পূর্ব কোণে প্রকল্পের অফিস। অফিসের পাশেই নিরাপত্তা রক্ষীদের থাকার ব্যবস্থা। কথা হলো কয়েকজন নিরাপত্তা রক্ষীর সাথে। কথা হলো কয়েকজন দর্শনার্থীর সাথেও। তারা জানালেন, প্রকল্প অভ্যন্তরে বিরাজমান বেশ কিছু অসংগতির কথা। জানালেন সৌধপ্রাঙ্গণে বিরাজমান বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম বিশৃঙ্খলার কথা। জানালেন যতি-ব্যতিরিকে নানা রকম অভিযোগের কথা। কথা, কথা আর কথা! অর্থহীন এক অর্থে!
তবু সেই অর্থহীন কথাগুলো শুনতে শুনতে হৃদয়ভারাক্রান্ত ভাবনা ভিড় করে অবচেতনে, মনে হয়, কেবলই মনে হয় স্বাধীনতা অর্জনের প্রাক্কালে জাতিকে মেধাশূন্যতায় নিমজ্জিত করার নিদারুণ পরিকল্পনার বিষয়টি- অনিয়ম বিশৃঙ্খলায় এদেশের প্রতিটি ক্ষেত্র আক্রান্ত হবার যে বীজ রোপন করেছিলো স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিরা বুদ্ধিজীবী হত্যার মাধ্যমে, সেই বিষবৃক্ষের ফলই কি আজ ভোগ করতে হচ্ছে আমাদের?
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ডিসেম্বর, ২০১৫ রাত ১২:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





