somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ঢাকায় নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারের গল্প

২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ৮:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সৃষ্টির মাহাত্ম্য কখনও কখনও কি সৃষ্টিকর্তাকেও আড়াল করে দাঁড়ায় না?
স্বীয় ঔজ্জ্বল্যে কি ঢেকে দেয় না সৃষ্টির দিন-ক্ষণ, বিবরণ?
টিকাটুলী থেকে রিকশা নিয়ে প্রেসক্লাব অতিক্রম করতে করতে ভাবতে থাকি আমরা। ভাবতে ভাবতে হাইকোর্ট পার হই। দোয়েল চত্বর অতিক্রম করে একসময় পৌঁছে যাই বাঙালির প্রাণের মিনার শহীদ মিনারে।

রিকশা থেকে নেমে পা রাখি শহীদ মিনার চত্বরে। অনেকটা উৎসবমুখর পরিবেশ মিনারের চারপাশ জুড়ে। ধীরে ধীরে হাঁটতে থাকি। হাঁটার ফাঁকে ফাঁকে চোখ রাখি ভূমিপৃষ্ঠ থেকে বেশ খানিকটা উঁচুতে অবস্থিত মিনারের মনোমুগ্ধকর কাঠামোয়। তিনটি দূর্বাঘাসভরা লন বিশিষ্ট এই চত্বরে মিনারের যে কাঠামোটি দৃশ্যমান বর্তমানে, তার অন্তর্তলে কিন্তু ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মৃতিই কেবল নয়, বেশ কয়েকবার ভাঙচুরের বেদনাও বিদ্যমান।
আজকের এই মিনারটি গড়ে উঠেছে বাঙালির তৃতীয় নির্মাণ প্রয়াসে।
ঢাকায় প্রথম শহীদ মিনার নির্মিত হয় এ স্থানেই, ১৯৫২ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে।

ঘটনাবহুল ২১ এবং ২২ ফেব্রুয়ারির রেশ ধরে সে রাতেও কারফিউ বলবৎ ছিল ঢাকায়। পথে পথে ছিল সেনা প্রহরাও, তবু এরই মাঝে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে অবস্থানরত রাজনীতি সচেতন ছাত্ররা আকস্মিকভাবে সিদ্ধান্ত নেয় ভাষা আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে একটি মিনার নির্মাণের।
সর্বসম্মত সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র বদরুল আলম এই কলেজেরই আরেকজন ছাত্র সাইদ হায়দারের সহায়তায় প্রণয়ন করেন একটি মিনারের নকশা।
সেই নকশা অনুযায়ী সেখানে উপস্থিত সর্বসাধারণের যৌথ শ্রমে একরাতেই নির্মিত হয় প্রায় সাড়ে দশ ফুট উঁচু এবং ছয় ফুট চওড়া প্রথম শহীদ মিনারটি।
পরদিন ২৪ ফেব্রুয়ারি রবিবার, অনানুষ্ঠানিকভাবে মিনারটি উদ্ধোধন করলেন ভাষা শহীদ শফিউর রহমানের পিতা।
২৬ ফেব্রুয়ারি সকালে মিনারটি উদ্ধোধন হয় আনুষ্ঠানিকভাবে। উদ্ধোধন করেন আজাদ সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন।
কিন্তু সেই উদ্ধোধনের পর মিনারের সুদূরপ্রসারী গুরুত্ব এবং এর চেতনাবিকাশী শক্তির কথা দ্রুত অনুধাবন করে বিকেলেই শাসকগোষ্ঠী গুড়িয়ে দেয় বাঙালির প্রাণের আবেগজড়িত মিনারটি।
তবে মিনারের ভৌত কাঠামো ভেঙে দিয়ে খুব একটা সুবিধা অর্জন করতে পারলো না তারা, কারণ, মাত্র আড়াই দিন পরমায়ুর মধ্যেই মিনারটি তাঁর মমতার শেকড় প্রোথিত করতে সক্ষম হয়েছিল হাজার বছরের ইতিহাস সমৃদ্ধ বাঙালি জাতির চেতনার ভিত্তিভূমিতে।

১৯৫৫ সাল পর্যন্ত মানুষ কালো কাপড়ে ঘিরে রাখে স্মৃতির মিনারের বিদীর্ণ স্থানটি।
১৯৫৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি খানিকটা অনুকূল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ভাষা শহীদ আবদুল আউয়ালের কন্যা বসিরনকে দিয়ে বর্তমান মিনারের স্থানে স্থাপন করা হয় শহীদ মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর অনানুষ্ঠানিকভাবে।
পরদিন অর্থাৎ ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে আনুষ্ঠানিকভাবে মিনারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন পূর্ব বাংলার তৎকালীন মূখ্যমন্ত্রী আবু হোসেন সরকার।
তারপর ১৯৫৭ সালের নভেম্বরে ভাস্কর হামিদুর রহমান এবং ভাস্কর নভেরা আহমদের প্রাথমিক পরিকল্পিত নকশায় শুরু হয় মিনারের নির্মাণকাজ। অনেক ঘাত প্রতিঘাত অতিক্রম করে এই কাজ শেষ হয় ১৯৬৩ সালে। সেই বছরের ২১ ফেব্রুয়ারিতেই সদ্যসমাপ্ত মিনারটি উদ্বোাধন করেন ভাষা শহীদ আবুল বরকতের মা হাসিনা বেগম।

১৯৬৩ থেকে ১৯৭১- সুদীর্ঘ নয় বছর এই শহীদ মিনারই ছিল এদেশের প্রতিটি আন্দেলন-সংগ্রামের সূচনার প্রাণকেন্দ্র, বিজয়ের অনুপ্রেরণার অকৃত্রিম উৎস। সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনের চরম পরিণতির প্রকাশোন্মূখ দিনগুলোয় পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমনের অন্যতম লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয় এই মিনারটি।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ গণহত্যার শুরুতেই ভেঙে গুড়িয়ে দেয় তারা মিনারটি আবার।
কিন্তু যে মিনারের স্থান এ জাতির চিন্তা-চেতনায়, স্মৃতির মণিকোঠায়, সে মিনার ধ্বংস করার সাধ্য কার!
স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে ভগ্ন মিনারেই জাতি তাঁদের শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পন করলেও ১৯৭৩ সালেই আবার গড়ে ওঠে বাঙালি প্রাণের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠা শহীদ মিনারটি।



মিনারটিতে সর্বমোট পাঁচটি স্তম্ভ।
মাঝখানের বড় স্তম্ভটি শিল্পী হামিদুর রহমানের মূল নকশার অন্তর্নিহিত ভাব অনুযায়ীই বাংলা মায়ের প্রতীকি প্রকাশ। মায়ের দুই পাশে অর্ধবৃত্তাকারে দুটি করে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের আরো চারটি স্তম্ভ তাঁর সন্তান হিসেবেই বিবেচিত।
সন্তান পাশে নিয়ে দাঁড়ানো মা খানিকটা ঝুঁকে আছেন ভাষা আন্দোলনে শহীদ সন্তানদের আত্মত্যাগের মহিমার কথা স্মরণ করে। আত্মত্যাগের এই যে মহিমা, তার কথা কি না ছড়িয়ে পারে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে?
ভাবতে ভাবতে আমরা এগিয়ে যাই তানফিজের কাছে। বাবা খোরশেদ আলমের সাথে বাসাবো থেকে শহীদ মিনার দেখতে এসেছে তিন বছরের ছোট্ট তানফিজ। আমাদের দেখে সলাজ ভঙ্গীতে মাথা নাড়ায় সে এবং আনন্দে আন্দোলিত করে ছোট্ট হাতের মুঠোয় ধরে থাকা বাংলাদেশের লাল সবুজ পতাকাটিকে।



সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ৯:০৫
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০১৮ সালের পর ঢাকাতেই ৪টা এক্সপ্রেসওয়ে

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৩:৫৩



একটা দেশের উন্নয়ন কতটা এগিয়েছে, সেটা বোঝার অনেকগুলো উপায় আছে। তবে সবচেয়ে সহজ উপায় হলো সেই দেশের রাস্তা, সেতু আর যোগাযোগব্যবস্থা। কারণ এগুলোর পরিবর্তন সরাসরি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আজকের ডায়েরী- ১৯৭

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৪



শরতের সকাল! সকাল ৮ টা।
ভাদ্র মাস। ইংরেজি সেপ্টেম্বর মাস। ২০২৬ সাল। ঘটনাটা কি হয়েছে, আমি বলি। মোটামোটি ভয়াবহ ঘটনা বলা যেতে পারে! যে কোনো সময় রোদ উঠবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশে বর্তমান গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট: দায় কার?

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:০৭


সংক্ষিপ্ত রায় সবচেয়ে বড় দায় বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নীতির। এর মধ্যে ২০০৯–২০২৪ সময়কালের সরকারের সিদ্ধান্তগুলোর দায় তুলনামূলকভাবে বেশি, কারণ ওই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হলেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবন.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৭


১।মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, ব্রুনাই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশে জুম্মার নামাজ পড়ার সুযোগ হয়েছে। ১২.৫০ এ আজান তারপর ১.১৫ দিকে জুম্মার নামাজের সকল আনুষ্ঠানিকতা শেষ। আজানের কিছুক্ষণ পর খুতবা শুরু তারপর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×