
যদিও প্রায় দুই শ বছরের কষ্টিপাথরে যাচাই হয়েছে তাঁর সাহিত্যকর্ম, যদিও অর্থনৈতিক বিচারে অত্যন্ত সফল তাঁর কর্মসম্ভার, যদিও তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যের অন্তর্নিহিত উপাদানে অনুপ্রাণিত হয়ে নির্মিত হয়েছে অসংখ্য নাটক এবং চলচ্চিত্রও- কিন্তু এই একবিংশ শতকে সেই ধ্রুপদ সাহিত্যসমগ্রের রচয়িতা প্রাইড এন্ড প্রেজুডিসখ্যাত লেখিকা জেন অস্টেনও যদি ভিন্ন নামে তাঁর যে কোন একটি সাহিত্যকর্মের পাণ্ডুলিপি প্রকাশের অনুরোধ জ্ঞাপন করে পাঠাতেন খ্যাতনামা কোন প্রকাশকের কাছে, ঠিক কী ধরনের সাড়া মিলতো তাতে?
‘ইতিবাচক অবশ্যই’, এইতো জবাব হবে যে কোন চিন্তাশীল মানুষের, তাই না?
অথচ একজন অত্যুৎসাহী অস্টেনভক্তের ছোট্ট একটি পরীক্ষার ফলাফলের প্রকাশরূপ কিন্তু নেতিবাচক!
শুরুতেই ভুরু কুঁচকে উঠল তো!
চোখের তারায় ফুটল অবিশ্বাস!
অত্যুৎসাহী সেই অস্টেনভক্তের নাম ডেভিড লেসম্যান!
সম্মান কিংবা সামাজিক মর্যাদা বিবেচনায়ও কিন্তু অগ্রাহ্য করার উপায় নেই তাঁকে। কারণ, বেশ কয়েক বছর আগে ইংল্যান্ডের বাথে অনুষ্ঠিত জেন অস্টেন ফ্যাস্টিভ্যালের ডিরেক্টরও ছিলেন তিনিই।
সুতরাং বিষয়টাকে গুরুত্বের সাথে গ্রহণ করে বোঝার চেষ্টা করাই বরং ভালো ‘ঠিক কী ধরনের’ পরীক্ষা করেছিলেন ডেভিড লেসম্যান!
ডেভিড লেসম্যানও কথাসাহিত্যিক। ফ্রিডমস্ টেম্পল নামে একটি রোমাঞ্চকাহিনী লিখেছিলেন তিনি। তারপর ছাপার হরফে প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে পাণ্ডুলিপিটি তিনি পাঠিয়েছিলেন বেশ কয়েকজন প্রকাশক বরাবরে। এবং হতাশাজনকভাবে ফেরৎ এসেছিল সেগুলো!
তা আসতেই পারে। কারণ ‘আমার রচনা যে ধ্রুপদ কোন সৃষ্টি নয়, সেটা আমি বেশ ভালো ভাবেই জানতাম। তবে এটা অন্তত প্রকাশযোগ্য বলেই বিশ্বাস করতাম আমি-’, খানিকটা হতাশাই কি প্রকাশ পেয়েছিল লেসম্যানের বক্তব্যে?
তবে সেই হতাশার পাশাপাশি তীব্র একটা কৌতূহলও সৃষ্টি হয়েছিল লেসম্যানের মনের অতলে, তৈরি হয়েছিল ভিন্নধর্মী এক ভাবনার ঘূর্ণাবর্ত। ‘আচ্ছা! আমার কথা না হয় বাদই দিলাম! স্বয়ং জেন অস্টেন যদি হ্যারি পটার-এর দুনিয়া মাতানো সময় তাঁর একটি পাণ্ডুলিপি নিজ নাম গোপন করে পাঠাতেন কোন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কাছে, ঠিক কী ধরনের ফলাফলের মুখোমুখি হতো সেটা?’
ডেভিড লেসম্যান কর্মঠ মানুষ। সুতরাং ভাবনাটা শুধু ভাবনার জায়গায় আটকে থাকল না। শুরু হলো কাজ।
লেসম্যান আপাতভাবে নির্দোষ একটা কৌশল অবলম্বন করলেন। তিনি প্রথমে বেছে নিলেন জেন অস্টেনের সুপরিচিত রচনা নরদ্যাঙ্গার অ্যাবিকে। তিনি বইটির কয়েকটি পরিচ্ছদ মুদ্রণ করলেন কাগজে!
মূল রচনাকে অবিকল রেখে অবশ্যই নয়! চরিত্রের নামে খানিকটা রদবদল ঘটালেন ডেভিড লেসম্যান- রদবদল ঘটালেন শিরোনামেও! তিনি বইটির নাম দিলেন সুসান। রচয়িতার নামের ক্ষেত্রে লেসম্যান ব্যবহার করলেন ভিন্ন একটি নাম- ‘এ্যালিসন লেডি’।
কাজ মোটামুটি শেষ। এবার রচনার সারসংক্ষেপসহ তিনি সেটিকে পাঠিয়ে দিলেন লন্ডনের কয়েকটি বিখ্যাত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানে। সেইসব প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটির নাম ব্লুমসবেরী, যাঁদের খুব চেনা প্রকাশনা জে কে রাউলিংয়ের হ্যারি পটার। এরপর লেসম্যান ভীষণ রকম আশঙ্কায় থাকলেন, এই বুঝি তাঁকে প্রতারক হিসেবে আখ্যায়িত করে চিঠি পাঠানো হয়!
কিন্তু কী আশ্চর্য! প্রকাশকরা কি ব্যর্থ হলেন এটিকে জেনের রচনা হিসেবে চিহ্নিত করতে?
অনেকটা এভাবে প্রকাশকরা জানালেন, ‘আমরা ভীষণ আগ্রহ নিয়ে পড়েছি লেখাটি। তবে সত্যি বলতে কী, আমরা যে ধরনের রচনা প্রকাশে উৎসাহী, দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, আলোচ্য রচনাটি সে ধারার বাইরে-’
‘-জেন অস্টেনের এই রচনাটি হয়তো সুপরিজ্ঞাত নয় সর্বমহলে-’, ভাবলেন ডেভিড লেসম্যান। তাই এবার তিনি বেছে নিলেন জেন অস্টেনের অন্য একটি সাহিত্যকর্ম পারসুয়েশনকে।
শিরোনাম বদলে এবার তিনি এই পাণ্ডুলিপির নাম রাখলেন দ্যা ওয়াটসন। রচয়িতার নামের ক্ষেত্রে লেসম্যান ব্যবহার করলেন আগের নামটিই- ‘এ্যালিসন লেডি’।
কিন্তু খুব বেশি পরিবর্তন হলো না অবস্থার! বরং অব্যহতই থাকলো পাণ্ডুলিপির প্রত্যাখ্যাত হওয়া! ভীষণ নম্র, কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে ঋণাত্মক মতামত জ্ঞাপন করে জে কে রাউলিংয়ের নিজস্ব এজেন্ট ক্রিস্টোফার লিটলও জানালেন, ‘রচনাটি নিয়ে খুব বেশি আত্মবিশ্বাসী নই আমরা-’
মোটামুটি এই হলো পরীক্ষার প্রথম ধাপ।
প্রথম ধাপের পরীক্ষার ফলাফল ডেভিড লেসম্যানকে সাহস জোগাল প্রাইড এন্ড প্রেজুডিসকেও বিড়ম্বিত হবার সম্ভাবনায় টেনে আনতে।
এবার রচনার সারসংক্ষেপ অবিকৃত রেখে প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস-এর নাম বদলালেন তিনি। রচনার নতুন নাম দিলেন ফার্স্ট ইম্প্রেশনস। জেন অস্টেনও রচনার অতি প্রাথমিক পর্যায়ে বিখ্যাত এই উপন্যাসটির নাম দিয়েছিলেন ফার্স্ট ইম্প্রেশনস। সুবিখ্যাত এই রচনার প্রধান প্রধান চরিত্র আর ঘটনা সংঘটনের স্থাননাম পরিবর্তন করে প্রথম পরিচ্ছদের কিছু অংশ মুদ্রণ করলেন ডেভিড লেসম্যান। যেমন, মূল রচনার গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বেনেট হয়ে গেলেন বার্ণেট। ঘটনা সংঘটনের স্থাননাম পরিবর্তিত হলো।
ব্যাস! আর কিছুই বদলালেন না তিনি। অবিকৃত রাখলেন প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস-এর জগদ্বিখ্যাত বাক্য, IT is a truth universally acknowledged, that a single man in possession of a good fortune must be in want of a wife.
রচয়িতার নামের ক্ষেত্রে লেসম্যান এবারো ব্যবহার করলেন আগের নামটিই- ‘এ্যালিসন লেডি’।
পান্ডুলিপিটি তিনি পাঠালেন পেঙ্গুইন-এ। কে না জানে, পেঙ্গুইন হচ্ছে পৃথিবীব্যাপী ব্যবসাসফল প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর অন্যতম। সুতরাং এবার নিশ্চয়ই বিফল হবে পরীক্ষাটি? ভাবলেন লেসম্যান।
কিন্তু হায়! পেঙ্গুইন লিখে পাঠাল, ‘ধন্যবাদ আপনার অতি সম্প্রতি পাঠানো চিঠির জন্য এবং ধন্যবাদ আপনার পাণ্ডুলিপি ফার্স্ট ইম্প্রেশনস-এর কিছু অংশ তৎসঙ্গে যুক্ত করার জন্য। প্রকাশে অপারগতা সত্বেও আমরা আন্তরিকভাবেই জানাচ্ছি, রচনাটি বেশ ভালো এবং কৌতূহলোদ্দীপক-’
ঠিক এভাবেই পরীক্ষাটা চালিয়ে গেলেন ডেভিড লেসম্যান। ইংল্যান্ডের অনেকগুলো নামীদামী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের ওপর চলল পরীক্ষা। তবে সবাইকে তো আর এক পাল্লায় মাপা যায় না!
জোনাথন কেইপ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের এ্যালেক্স বোউলারের দৃষ্টিশক্তির প্রখরতা, স্মৃতিশক্তির গ্রহণযোগ্যতা প্রশংসনীয় নিঃসন্দেহে। তিনি ঠিক শনাক্ত করলেন জেন অস্টেনের রচনা প্রাইড এন্ড প্রেজুডিসকে।
এ্যালেক্স বোউলার ভীষণ সরস ভাষায় লেসম্যানকে লিখলেন, “আপনার প্রেরিত ফার্স্ট ইম্প্রেশনস পড়ার পর আমার ‘ফার্স্ট ইম্প্রেশনস’ হচ্ছে অবিশ্বাস্য, বিরক্তিরকর এবং অতি অবশ্যই হাস্য-উদ্রেককর। আমি আপনাকে অনুরোধ করছি জেন অস্টেনের লেখা প্রাইড এন্ড প্রেজুডিস বইটি সত্বর হাতে নিতে। অনুমান করছি বইটি আপনার হাতের কাছেই আছে এবং সবিনয় অনুরোধ করছি নিশ্চিত হতে যে, আপনার পাঠানো পাণ্ডুলিপিটি সেই রচনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কিনা-”
ডেভিড ব্যালডক, বাথের জেন অস্টেন সেন্টারের পরিচালক। তিনি পুরো বিষয়টিকে গ্রহণ করেছেন আনন্দ-বেদনার অপাপবিদ্ধ আয়োজন হিসেবে। তাঁর মতে, ‘আসলে এই পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের কিছু রন্ধ্র হয়তো চিহ্নিত হয় শুধু, এর বেশি আর কিছুই নয়! যদিও এটা নিশ্চিত যে, প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ব্যক্তিদের জ্ঞাতসারে ঘটনাগুলো ঘটেনি, ঘটেছে প্রতিষ্ঠানের একেবারেই প্রাথমিক স্তরে-’
এভাবেই বিষয়টির সমাপ্তি টানতে চাইলেন ডেভিড ব্যালডক।
তবে সমস্ত কাণ্ডটি গোচরিভূত হতেই ঘটনার সঙ্গে জড়িয়ে পড়া নামীদামী প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর টনক নড়ে উঠল। অতি দ্রুত সচেষ্ট হলেন তাঁরা আলোচ্য বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য সুস্পষ্ট করতে। সচেষ্ট হলেন পূর্বে প্রদান করা বক্তব্যের অন্তর্নিহিত ভাব ব্যাখ্যা করতে!
কিন্তু যে ঢিল একবার ছোড়া হয়ে যায় তা কি আর ফেরৎ আসে কখনো?
প্রশ্নের উত্তর নিঃসন্দেহে নেতিবাচক!
*দ্যা গার্ডিয়ান-এ প্রকাশিত স্টিভেন মরিসের রচনার ভাবানুবাদ
ছবি: সংগৃহীত
সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ১১:৫৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



