
আমার কাণ্ডজ্ঞান নিয়ে পরিচিত পরিমণ্ডলে দুশ্চিন্তার শেষ নেই! তাদের সার্বক্ষণিক দুশ্চিন্তা একসময় আমাকেও গ্রাস করল।
আরে তাই তো! কাণ্ডজ্ঞান দেখছি একেবারেই নেই আমার!
কী হবে এখন? কাণ্ডজ্ঞান ছাড়া আমি বাঁচব কীভাবে? ভাবতে ভাবতে রাতের ঘুম নষ্ট!
ঘুম নষ্ট হওয়ার কষ্ট একমাত্র ভুক্তভোগীরা জানে!
কী যে করি?
ভাগ্য আমার বেশ ভালো বলতে হবে!
ঘুম নষ্ট হবার কষ্ট থেকে আমাকে বাঁচাতে এগিয়ে এলেন জাহীদ ভাই!
তিনি আমাকে ডেকে বললেন, একটা কাজ নাও!
ব্যাস! কাজের কথায় আমার কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এল দ্রুতগতিতে! আমি কাণ্ডজ্ঞানী মানুষের মতো গোবেচারা মুখে বললাম, ভাই, আমার সময় নাই!
কয়দিন সময় দরকার তোমার? জাহীদ ভাইয়ের নিরুত্তাপ প্রশ্ন।
প্রশ্নটা কৌশলী! কৌশলে আমাকে কাজে জড়িয়ে ফেলার চেষ্টা!
কিন্তু না, আমার কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এসেছে পূর্ণোদ্যমে! আমি কাজের জালে নিজেকে জড়াতে নারাজ!
তবে সব কথা তো কাণ্ডজ্ঞানীদের সরাসরি বলতে নেই! তাই আমি সময়ক্ষেপণের কৌশল বেছে নিলাম! প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে কথা ঘুরাবার চেষ্টা করলাম, বললাম, সপ্তাহখানেক পরে আপনাকে জানাই ভাই!
জাহীদ ভাই নির্বিকারভাবে বললেন, আজ বৃহস্পতিবার, শনিবার তোমার পেস্টিং।
আমি আঁতকে উঠলাম! সেইফ সাইডে নিজেকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। বললাম, এ কী করে সম্ভব! আগামীকাল শুক্রবার আমাকে যেতে হবে বেলতলীর মেলায়!
কথা পুরোপুরি সত্য! মেলায় যাবার উদ্দেশ্য মানুষের মিলনস্রোতে দেহমন ভাসিয়ে দেয়া, মানুষের প্রাণের উষ্ণ প্লাবনে নিজেকে সিঞ্চিত করে নেয়া!
জাহীদ ভাই শুনলেন আমার কথা! বেশ খুশি খুশি মুখ তার!
জাহীদ ভাইয়ের হাসি মুখ দেখে আমিও খুশি!
যাক! অন্তত রক্ষা পাওয়া গেল এ যাত্রা!
কিন্তু আমার খুশিতে জল ঢেলে দিলেন তিনি, বললেন, বেলতলীর মেলা! খুব ভালো! টপিক হিসেবে ইন্টারেস্টিং হবে বেশ! শোনো, লেখার সাথে ছবিও কিন্তু ভালো হওয়া চাই!
আমি হতভম্ভ!
এবার! এবার কী অজুহাত দেখাব আমি!
বিচলিত ভঙ্গিতে দ্রুত বললাম, ছবি!
ছবি মানে! ভ্রু-কুঞ্চিত করে জানতে চাইলেন জাহীদ ভাই।
আমি আর্তকণ্ঠে বললাম, আমার তো ভাই ক্যামেরা নাই!
জাহীদ ভাই বললেন, কোনো সমস্যা নাই! ফটোগ্রাফার নিয়া যাও!
এইবার! এইবার কী বলব আমি?
আমি বিরসমুখে বলার চেষ্টা করলাম, ফটোগ্রাফার...
হ্যাঁ, যাও তো এবার। পাতা দেখতে হবে আমাকে। মনে রাখবা শনিবার পেস্টিং। (জাহীদ ভাই, এটা কিন্তু একটা গল্প)
আমি বুঝলাম কাণ্ডজ্ঞানী হয়ে কোনো লাভ নেই! কাজটা করতেই হবে আমাকে! আমার সমস্যা অনেক। প্রিয় মানুষগুলো কিছু বললে কেন যে শক্তভাবে না করতে পারি না আমি! (আমি, আমি মানে কিন্তু সর্বনাম)
পত্রিকা অফিসের ফটোগ্রাফারের পরিবর্তে আমি একজন প্রিয় মানুষের কথা ভাবলাম!
মাসুদ, আপনি কই?
উত্তরা! আপনি?
পাবলিক লাইব্রেরির সিঁড়িতে বইসা আছি! মন ভালো নাই!
ক্যান? কী হইছে?
সাক্ষাতে বলুম। এখন বলেন বেড়াইতে যাইবেন?
কবে? কই?
বেলতলীর মেলায় যাইতে চাই, আগামীকাল!
চলেন। শুক্রবার আমার ডে অফ!
লঞ্চে যাই, কী বলেন?
জোশ! রোমাঞ্চিত কণ্ঠ মাসুদের।
অন্যদিকে আমি বিরস কণ্ঠ, বললাম, সকাল সাড়ে আটটায় তাইলে চলে আসেন সদরঘাট!
পরদিন সকাল!
ফোন বাজাল! চোখ বন্ধ করে ফোন ধরলাম আমি! কে?
মাসুদ!
ও মাসুদ! তাড়াতাড়ি চোখ খুললাম! পৌনে নয়টা বাজে।
কই আপনি? মাসুদের উদ্বিগ্ন কণ্ঠ।
এই তো রে ভাই! আর পনেরো মিনিট! বিব্রত কণ্ঠে উত্তর দিয়ে দ্রুত ছুটলাম!
ছুটির দিন বলে রক্ষে! রাস্তায় কোনো যানজট নেই! নির্ঝঞ্ঝাট!
সদরঘাট!
মাসুদ পেশাদার ফটোগ্রাফার! অন্য পত্রিকায় কাজ করে! ছুটির দিনে ফ্রিল্যান্স!
লঞ্চের ছাদে দাঁড়িয়ে সে ছবি তোলায় ব্যস্ত!
লঞ্চের সারেং বেশ ভালো লোক! নয়টার লঞ্চ এগারোটায় ছাড়ল! মানুষজন বিরক্ত হলেও আমি বেশ কৃতজ্ঞ তার কাছে! লঞ্চ ছাড়তে দেরি না করলে আমার উপায় কী হতো! (মাসুদ, গল্পকে কিন্তু সত্যি মনে করবেন না)
বেলতলীর মেলা বেশ জমজমাট হয়!
পাঁচদিনের মেলা! এই লঞ্চটা স্পেশাল! মেলা উপলক্ষে লঞ্চ যাবে বেলতলী পর্যন্ত!
বুড়িগঙ্গা থেকে ধলেশ্বরীর জলে প্রবেশ করল লঞ্চ!
নদীর দু-ধারের নানা দৃশ্যে মাসুদ মুগ্ধ! ক্যামেরার শাটারের কোনো ক্লান্তি নেই! আমার মনে কোনো শান্তি নেই! কাজের চিন্তায় মনটা উদাস উদাস লাগে! কেমন জানি বৈরাগ্য বৈরাগ্য ভাব! মনে হয় লুকাই কোথাও!
লঞ্চের ডেকের নিচে জমজমাট গানের আসর! বাচ্চা একটা মেয়ে গান গাইছে! কামেলারা কাম ফালাইয়া কোথায় জানি লুকাইছে...
বেলতলী পৌঁছালাম বিকেলে!
মানুষ আর মানুষ চারদিকে! মানুষের মহাসমুদ্র অশান্ত মন প্রশান্ত করে দিলো! লেখার চিন্তা আমি ঝেড়ে ফেললাম মন থেকে! কাজের সাথে আড়ি তো বটেই, বাড়িও ফিরব না রাতে ঠিক করলাম!
অল্প সময়ের মধ্যে আবিষ্কার করলাম, কোলাহলমুখর জনারণ্যে ক্রমশ মিলিয়ে যাচ্ছি আমি!
সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনবদ্ধ হচ্ছে! দিকে দিকে মারেফতি গান, দেহতত্ত্ব-সৃষ্টিতত্ত্বের বাতেনি আলোচনা, জিকিরে জিকিরে উন্মাতাল বেলতলীর নদী তীরবর্তী জনপদ!
আমি নিমজ্জিত হলাম বারবার!
কাণ্ডজ্ঞানহীন হলাম অবলীলায়!
নির্ঘুম রাতের উত্তেজনা স্তিমিত হবার পর ঘুম ঘুম আর ঘুম!
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে শুনলাম, জাহীদ ভাই বলছেন, ভালো হইছে লেখা! আর শোনো, পরবর্তী কাজ কবে পাচ্ছি...
না না, আমার সময় নেই! কাণ্ডজ্ঞানহীন দুই চোখে রাজ্যের ঘুম...
ছবি: সংগৃহীত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

