
আমাদের গ্রামের গরীব পরিবারের মেয়েদের ১ জন হচ্ছে জিরাধন, সে খুবই সুন্দরী ছিলো; খুবই আশা করেছিলো, একটি ভালো বিয়ে হবে; এ'টি জিরাধনের কাহিনী।
জিরাধনের পুরোনাম জরিনা খাতুন, মা-বাবা আদর করে নাম দিয়েছিলেন জিরাধন; একবারেই গরীব পরিবারে জন্ম হয়েছিলো তার; এই অভাবের সংসারেও জিরাধনের রূপের অভাব ছিলো না, ৫/৬ বছর বয়সেই খুবই কমনীয় চেহারা, রহস্যভরা দুটি চোখ, হাসি হাসি মুখ। জিরাধনের বাবা দৈনিক কামলা হিসেবে চাষবাসে কাজ করতেন; যেদিন কাজ থাকতো না, পাহাড়ে গিয়ে বাঁশ এনে বাজারে বিক্রয় করতেন, পাথর নামাতেন কন্ট্রাকটরদের জন্য। জিরার বাবা আমার গ্রাম্য ভাই; আমাদের কাজ করতেন বেশীরভাগ সময়; দুপুরে যখন আমাদের বাড়ীতে খেতে আসতেন, ছোট মেয়ে জিরাধনকে সাথে নিয়ে আসতেন।
আমার ছোটবোন ও ছোট চাচাতোবোন জিরাধনকে খুবই আদর করতো; তারা জিরাধনের কোঁকড়ানো চুলে একটু তেল দিয়ে, চুল বেঁধে দিতো, মুখে স্নো-পাউডার, পায়ে আলতা পরায়ে দিতো। জিরাধনের বয়স যখন ১০/১১ বছর, তখন জিরাধন নিজেই সপ্তাহে ২/১ দিন আসতো আমাদের বাড়ীতে, গ্রামে সেই বয়সী সব মেয়ের মাঝে সে চোখে পড়ার মতো সুন্দরী ছিলো। আমি যখন শহরের কলেজে ভর্তি হয়েছি, জিরার বয়স হয়তো ১৩ বছর হবে; আমি সপ্তাহের ছুটির দিন বাড়ী চলে আসতাম; এক সন্ধ্যায় বাড়ী ফেরার পথে দেখি, জিরাধন তাদের বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে; তার ভাসসাব দেখে মনে হলো, সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো; সে হাসি দিয়ে, হাত বাড়ায়ে আমাকে ৮ আনা পয়সা দিয়ে বললো,
-আমার জন্য একটা স্নো কিনে আনবেন শহর থেকে।
-তুই পয়সা রেখেদে, আমি তোর জন্য স্নো কিনে নিয়ে আসবো আগামী সপ্তাহে! স্নো কেন, তুই এমনিতেই অনেক অনেক সুন্দরী!
-মিথ্যা বলছেন আপনি, আপনি কোনদিন আমার দিকে ভালো করে তাকয়েও দেখেননি।
-আমি তোর দিকে তাকাতে পারি না, তুই আমার ভাই-ঝি, ভাই-ঝি'র দিকে তাকানো নিষেধ।
-আমার কপাল খারাপ, গ্রামের সব যোয়ানই আমার চাচা; একটু সেজেগুজে থাকলে নাকি আমার ভালো বিয়ে হতে পারে।
-তাই?
আমি একটি তিব্বত স্নো, একটি পাউডার ও এক বোতল আলতা কিনে দিয়েছিলাম তাকে। সে কি পরিমাণ খুশী হয়েছিলো, সেটা আমি অনুভব করতাম ওর সাথে দেখা হলে। যুদ্ধের পর শুনলাম, যুদ্ধের মাঝেই জিরাধনের বিয়ে হয়ে গেছে শহুরে এক বেবীট্যাক্সী ড্রাইবারের সাথে। আমাদের গ্রামের একটা লোক শহরে বেবীট্যাক্সী চালাতেন, যুদ্ধের মাঝে সেই লোকের পরিচিত আরেক চালক আমাদের গ্রামে এসে লুকিয়েছিলো, সেই লোকের সাথে বিয়ে হয়ে গেছে; যুদ্ধ শেষ হওয়ার ২/১ দিন পরেই জিরাকে শহরে নিয়ে গেছে। যুদ্ধের পর আমি পরীক্ষা দিয়ে বাড়ী ফিরেছি, দেখি জিরাধন আমার চাচাতো বোনের সাথে; তবে, তার সেই হাসি হাসি মুখ নেই, আমি প্রশ্ন করলাম,
-জিরাধন, তোর জামাই দেখতে কি রকম?
সে একটু ম্লান হাসলো, তার দু'চোখ থেকে পানির ধারা নেমে আসলো; আমার চাচাতো বোন তাকে অন্য রুমে নিয়ে গেলো টেনে। জিরা চলে যাবার পর, আমার চাচাতো বোন আমাকে জানালো যে, জিরার স্বামীর আরেক বউ আছে গ্রামে, ১ টা বাচ্চাও আছে; স্বামী গ্রামের বাড়ী যায় না; আগের বউটা খবর পেয়েছিলো যে, তার স্বামী বিয়ে করেছে। সেই বউটা ময়লা একটা কাপড় পরে, ছোট বাচ্চাটাকে নিয়ে শহরে এসেছিলো জিরাকে দেখতে, স্বামী ঘরে ছিলো না; জিরাকে ধরে মেয়েটি অনেক কাঁদলো; জিরা ঘর থেকে বের হয়ে, বাস ধরে বাপের বাড়ী চলে এসেছে।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে ডিসেম্বর, ২০২০ দুপুর ১২:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


