এহাত্তরের এক রাইতে উনার (স্বামী) হাত ধইরা আমি হুইত্যা (শুয়ে) আছলাম। হারাদিন কাইজ-কাম কইর্যা শইল্যে বেদনায় কাতরাইয়া যহন চউে ঘুম আইছে তহনি দরজার মধ্যে জোরে শব্দ অইল। পতথম বার কিস্তাই (কিছুই) বুজি নাই। পরে যহন শব্দ অইছে তহন বুজঝি এইটা বুট জোতার লাত্তি। আমিও ডরাইয়া উনারে ডাক দিলাম। এই উড, কেলা জানি আইছে। উনি উইট্যাই দরজা খুইল্যা দিছেন। হরমর কইরা পাঁচ-সাত জন ভিতরে ঢুইক্যা জোরে থাবরা দিয়া উনারে ধইরা বাইরে ফালাইয়ে দিছে। হেরপর দুনিয়া ফাডানো এক শব্দ অইল। উনারে যহন দেহি তহন এক চিল্লান দিয়া আমি হাটপিল হরি। এসব কথা বলেই চোখের পানি মুছলেন বয়সের ভারে ন্যুজ সত্তর বছরের বৃদ্ধা জুলেখা বিবি।
পুনরায় তিনি বলা শুরু করলেন, এহাত্তরে রাজাকারদের লাইগ্যা আমার সোয়ামীরে হারায়ছি। হেরপর থাইক্যা বানের জলের মতন ভাসতেই আছি আমি। যেহময় আমার একটু জিরানির (বিশ্রাম) দরহার হেই হময় (সময়) আমি কাজ-কাম করি। জানিনা কোন হময় এর শেষ অইব। আল্লাগো রাজাকারদের বিচার দেইখ্যা কী আমার মরণ অইব ? এক নি:শ্বাসে কথাগুলো আেেপর সাথে বলে অন্যদিকে মন দেন জুলেখা বিবি।
১৯৭১ সালে স্বামী হারিয়ে যখন তিনি বিধবার সাদা শাড়ি গায়ে জড়িয়েছিলেন তখন কেউ থাকে ভাল চোখে দেখে নি। সবাই অপয়া বলে তার উপর থুথ ছিটিয়েছে। গ্রামে সালিশ বসিয়ে কলঙ্কের কালি লেপন করে তাকে ঘর থেকে বের করে দিয়েছে গ্রামের মাতব্বররা। তাতেও তিনি দমে যাননি। কোনদিন আধাবেলা খেয়ে আবার কোনদিন সারাদিন উপোস থেকেই দিন কেটেছে তার । কেউই তার খবর রাখে নি, খোঁজ নেয়নি। এভাবে বহুদিন চলার পর ভুল করে একদিন সিলেটের ট্রেনে চড়ে বসলেন জুলেখা বিবি। ট্রেন থেকে নেমে তিনি কিছুই চেনেন না। তখন একজনকে জিজ্ঞেস করে জানতে পারলেন তিনি সিলেটে এসে পড়েছেন। তবে এতে ভয় পেয়ে যাননি তিনি। কারণ সিলেটে আসা ওনার দীর্ঘদিনের শখ ছিল। ওনার স্বামী তাকে বলেছিলেন দেশের পরিস্থিতি ভাল হলে সিলেটে এসে তাকে নিয়ে অনেকদিন ঘুরে বেড়াবেন। কিন্তু সেই কালরাত্রিতে স্বামী মারা যাওয়ার পর তার শখও সহমরণে যায়। কিন্তু পরে যেহেতু সুযোগ এসেছে তিনি তা হাতছাড়া করেননি। একটি বাসায় কাজ জুটিয়ে টাকা জমাতে শুরু করলেন তিনি। সাথে একজন বান্ধবীও জুটে গেল তার। কিন্তু একমাস যেতে না যেতেই প্লেট ভাঙ্গার অপরাধে তাকে বেদম প্রহার করল বাড়ির মালিক। পনের দিনের মত হাসপাতালেও তাকে থাকতে হয়েছিল। এরপর তিনি আর পরনির্ভর থাকতে চান নি। বাসা থেকে মজুরী বাবদ পাওয়া কিছু টাকা দিয়ে সিলেট ভেটেনারী কলেজের (বর্তমানে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়) পাশে একটি দোকান ভাড়া নিলেন। সেখানে তিনি একটি চা স্টল দিলেন। সারাদিন চা বিক্রি করে রাতে বান্ধবীর সাথে ছোট এক বিছানায় গাদাগাদি করে ঘুমাতেন। ধীরে ধীরে তার ছোট্ট এ ব্যবসার প্রসার হতে লাগল। অল্পদিনেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থীদের প্রিয় পাত্র হয়ে গেলেন। সময় পেলেই গল্প করতে চলে আসেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়–য়া কোমল হৃদয়ের অনেক ছাত্রী। তবে এখানকার লোকজনের সাথে দীর্ঘদিন ধরেই তার কথা বলতে সমস্যা হচ্ছে। কারণ তিনি সিলেট থাকলেও তার স্বামীর বাড়ি ময়মনসিংহের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলেন। এজন্য তাদের কথা তিনি বুঝলেও তার কথা বুঝেননা অনেকেই। তবুও তিনি তাদের গল্প শোনান সেই একাত্তরের, শোনেন নিজেও। এরই মধ্যে তার নামেও হয়েছে পরিবর্তন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিার্থী ছাড়াও স্থানীয় লোকজন তাকে বীরঙ্গনা জুলেখা বুবু নামে সম্বোধন করেন। এতে তিনি খুশি হয়ে তৃপ্তির হাসি হাসেন। আবার পরণেই বেজার হয়ে যান। সেই কারণ সবারই জানা। আর সেটি হল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার।
যার জন্য তিনি স্বাধীনতা পরবর্তী ৩৯ টি বছর এক রঙ্গের শাড়ি গায়ে দিয়ে আছেন।
যার জন্য তার জীবন-যৌবন সবকিছুই উৎসর্গ করে দিয়েছেন।
এতকিছুর পরও তার ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যায় নি।
আর এজন্যইতো ময়মনসিংহের কুখ্যাত মোশারফ রাজাকার সহ সকল দোসরদেরই ফাঁসি চান তিনি।
তিনি আশাবাদী। তার আশা পূর্ণ হবে শীঘ্রই।
আলোচিত ব্লগ
স্পিরিট শোন বাই আমেরিকান এয়ারলাইন্স-এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত!

যে আয়না আর প্রতিচ্ছবি রাখে না

আমাদের ভালোবাসা ছিল এক গোপন সন্ধ্যার মতো,
জোনাকিরা তখন শব্দহীন কবিতা হয়ে বসত সিঁথির পাশে,
হাত ধরলেই হৃদয় জেগে উঠত,
বুকের ভেতর গুনগুন করত অনন্ত প্রতিশ্রুতির গান।
তুমি তখন আমার দেহে নয়,
আমার সত্তার স্পর্শে... ...বাকিটুকু পড়ুন
গল্পঃ আমাদের খারাপ দিনের পর

করোনার সময় নানান উত্থান পতন ছিল আমাদের, আব্বা মা ছোটবোন সহ আমি নিজেও করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রায় মরে যেতে যেতে বেঁচে গিয়েছিলাম শেষ মুহূর্তে, বেঁচে গিয়েছিল আমাদের ছোট্ট সোনার... ...বাকিটুকু পড়ুন
ডোগান- এক রহস্যময় জাতি

আফ্রিকার মালি এর হৃদয়ে, খাড়া পাথুরে পাহাড় আর নির্জন উপত্যকার মাঝে বাস করে এক বিস্ময়কর জনগোষ্ঠী ডোগান। বান্দিয়াগারা এস্কার্পমেন্ট অঞ্চলের গা ঘেঁষে তাদের বসতি । এরা যেন সময় কে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আল কোরআনের ১১৪ সূরায় হানাফী মাযহাবের সঠিকতার অকাট্য প্রমাণ (পর্ব-১৩)

সূরাঃ ১৩ রাদ, ১১ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১। মানুষের জন্য তার সম্মুখে ও পশ্চাতে একের পর এক প্রহরী থাকে। উহারা আল্লাহর আদেশে তার রক্ষণাবেক্ষণ করে। আর আল্লাহ কোন সম্প্রদায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।