somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাকিস্তান বাংলাদেশের তিক্ত সম্পর্কের শেষ কোথায়

০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ৯:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মাহবুবুল আলম //

পাকিস্তানের শিষ্টাচার বহির্ভূত নানা অপতৎপরতার কারণে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে বিদ্যমান কুটনৈতিক সম্পর্ক দিন দিন শিথিল থেকে শিথিলতর হচ্ছে। পাকিস্তান দূতাবাস কর্মকর্তাদের বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়া, জঙ্গিদের মদদ দেয়া, ভারতীয় জাল নোট ছাপিয়ে ও অস্ত্রশস্র দিয়ে ভাতীয় বিচ্ছিন্নতাবাদীর উস্কে দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বর্তমান সুসম্পর্কে ফাটল ধরানোসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত পাকিস্তান দূতাবাস। এমতাবস্থায় পাকিস্তানের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের দাবি জোরালো হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তবে একথা ঠিক পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক কোনদিনই মধুর ছিল না এ কথা আমরা সবাই জানি ও মানি।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের চরম পরাজয়ের পর কিছুতেই স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যূদ্বয়কে মেনে নিতে পারেনি পাকিস্তান। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর থেকে বাংলাদেশবিরোধী বিভিন্ন কর্মকান্ডে জড়িয়ে পরে দেশটি। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে অপতৎপরতার অংশ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহানায়ক বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে প্রথম প্রতিশোধ নেয় পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই। তারা স্বাধীনতা ও আওয়ামীলীগ বিরোধীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে যে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করেছিল তা আজ বিভিন্ন ঐতিহাসিক দলিলে প্রমাণিত। সেই থেকে আওয়ামী লীগ সরকার যখনই ক্ষমতায় থাকে তখনই আইএসআই তাদের এদেশীয় দোসরদের ছত্রছায়ায় তৎপর হয়ে ওঠে। কেননা, তারা চায়না স্বাধীতা ও মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী আওয়ামীলীগ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষতায় আসুক বা থাকুক। তাই তারা বার বার চেষ্টা করেছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার। যার বড় প্রমাণ ২০০৪ সালে একুশে আগস্ট তৎকালীন বিরোধী দলীয় নের্তৃ শেখ হাসিনার সন্ত্রাসবিরোধী জনসভায় ভয়াভহ গ্রেনেড হামলা। সেই ভয়াভহ গ্রেনেড হামলায় ভাগ্যজোরে শেখ হাসিনা বেঁচে গেলে আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেত্রী আইভি রহমানসহ বিভিন্নস্তরের ২৩ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছিল। সেই হত্যাকান্ডে যে পাকিস্তান গোয়েন্দাসংস্থা আইএসআই তৎকালীন বিএনপি সরকারের প্রচ্ছন্ন মদদে এ হামলা চালিয়েছিল তা গ্রেনেড হামলায় ব্যবহৃত পাকিস্তানী তৈরি আর্জেস গ্রেনেড সরবরাহের নানা নমুনা পরীক্ষা বাংলাদেশের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে।
এ ছাড়াও ১৯৭১ সালে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এদেশীয় কোলাবেরটর রাজাকার আল-বদর, আল-সামশ কতৃক সংগঠিত মানবতা বিরোধী অপরাধের জন্য ঠ্রাইব্যুনালে বিচারিক কর্যক্রম শুরুর পর থেকেই যুদ্ধাপরাধীদের পক্ষাবলম্ভন করে পাকিস্তানের বক্তব্য বিবৃতি সর্বোপরি কুখ্যাত রাজাকার আলী আহসান মুজাহিদ ও সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসির রায় কার্যকরের পর পাকিস্তানের জাতীয় সংসদে নিন্দাপ্রস্তাব পাশ এবং এই দুই কুখ্যাত রাজাকারকে পাকিস্তান তাদের বন্ধু বলে যে বক্তব্য বিবৃতি দেয়। যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকর হওয়ার পর পাকিস্তান সব শিষ্টাচার ভুলে গিয়ে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিবৃতি দিয়ে এই বিচারের বিরোধিতা করে। পাকিস্তান যুদ্ধাপরাধের বিচারকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ ও ‘বিরক্তিকর’ বলে উল্লেখ করে। তারা এই বিচারকে ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্পাদিত ত্রিদেশীয় চুক্তির চেতনা পরিপন্থী বলে মন্তব্য করে। এ ঘটনায় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে গত ২৩ নভেম্বর ঢাকায় নিযুক্ত পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করে তার কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়। এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের এহেন মন্তব্য বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নির্লজ্জ হস্তক্ষেপ। পাকিস্তান ১৯৭৪ সালের ত্রিপক্ষীয় চুক্তিকে বিকৃত করেছে বলে উল্লেখ করে বাংলাদেশ বলেছে, ত্রিপক্ষীয় চুক্তি মোতাবেক, গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই।
এ প্রেক্ষিতে পাকিস্তানের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি জোড়ালো হচ্ছে। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি করেছে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম, গণজাগরণ মঞ্চসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যা, নির্বিচারে ধ্বংসযজ্ঞ ও অগণিত নির্যাতনের দায় অস্বীকার করা পাকিস্তানের আরেক ঐতিহাসিক পাপ বলে মন্তব্য করেছেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১-এর মহাসচিব হারুন হাবিব। তিনি বলেন, বাংলাদেশে গণহত্যা ও বর্বরতার দায় অস্বীকার করে পাকিস্তান এটিই আবারও প্রমাণ করেছে যে, দেশটি ইতিহাস থেকে আজও কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। পাকিস্তান সরকারের এ ধরনের বিবৃতি ইতিহাসের চরম বিবৃতি শুধু নয়, একই সঙ্গে নির্লজ্জ মিথ্যাচারের শামিল। তিনি আরও বলেন, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে হানাদার পাকিস্তান বাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা যে বর্বরতা চালিয়েছে, পাকিস্তান সরকার অস্বীকার কলেও তা সারা বিশ্বেই বিংশ শতাব্দীর নিকৃষ্টতম গণহত্যা ও নারী নির্যাতন হিসেবে স্বীকৃত ও গ্রন্থিত। এমনকি পরবর্তীতে সরকার কর্তৃক নিয়োজিত হামদুর রহমান কমিশনের রিপোর্টেও এ ভয়াবহ গণহত্যার দায় স্বীকার করা হয়েছে এবং দোষী সামরিক ব্যক্তিদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবার সুপারিশ করা হয়েছে। কিন্তু পাকিস্তান সে বিচার করেনি। ফোরাম মহাসচিব বলেন, পাকিস্তানের বিবৃতিতে এটিই প্রমাণ করে যে, ৪৪ বছর পরও বাংলাদেশের স্বাধীন-সার্বভৌম অস্তিত্ব মেনে নিতে ব্যর্থ হয়েছে পাকিস্তান। কাজেই এমন একটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক রাখার কোনো যৌক্তিকতা থাকতে পারে না।
পাকিস্তানে নিযুক্ত বাংলাদেশের কাউন্সিলর মৌসুমী রহমানকে ডেকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশে গণহত্যায় পাকিস্তানের দায় অস্বীকার করার তীব্র সমালোচনা করেছে গণজাগরণ মঞ্চ। সংগঠনটির এক বিবৃতিতে সরকারের কাছে দাবি জানিয়ে বলা হয়, ‘একাত্তরে গণহত্যার দায় স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা এবং ক্ষতিপূরণ প্রদানের পূর্ব পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে সব ধরনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত করে দেয়া হোক’। পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের দাবি জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। পাশাপাশি সার্ক ও জাতিসংঘ থেকে পাকিস্তানের সদস্যপদ বাতিলে সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণেরও আহ্বান জানান তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পাকিস্তানের কোনো সম্পর্ক থাকবে না বলেও ঘোষণা দেন ভিসি। একটি রাষ্ট্র যখন আরেকটি রাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক মূল্যায়নের কথা বলে কূটনীতির ভাষায় তার কী অর্থ এ প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলার সাথে কূটনৈতিক বিশ্লেষক ড.আব্দুর রব খান বলেন, বাংলাদেশ মনে করে যুদ্ধাপরাধের বিচার নিয়ে পাকিস্তান বেশি রিএ্যাক্ট করেছে। যেটা অনেকটা কূটনীতিক শিষ্টাচারের বাইরে চলে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের উপরে যথেষ্ট চাপও ছিল, চাপ এখনও রয়েছে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করার ব্যাপারে। অনেকে মনে করে পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক রাখার কী মানে আছে যখন পাকিস্তান এমন অবন্ধুসুলভ আচরণ করছে। আমি নিশ্চিত না কতখানি এটা কথার পরিপ্রেক্ষিতে এসেছে আর কতখানি মিন করেছে। যখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা মন্ত্রিসভার ঊর্দ্ধতন সদস্যরা বলেন আমরা সম্পর্কের পুনমূল্যায়ন করছি সেটা দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে সেটার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষ করে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলির প্রেক্ষাপটে বলা যায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্কের অবনতি হয়েছে বা হচ্ছে।
ইদানিং লক্ষ করা যাচ্ছে যে, ঢাকা থেকে পাকিস্তানের কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করলে, পাকিস্তানও ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। আবার ঢাকার পাকিস্তানের কোন কর্মকর্তাকে বাংলাদেশ বহিষ্কার করলে, পাকিস্তানও ইসলামাবাদের বাংলাদেশ হাইকমিশনের সম পদের কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করছে। এছাড়া ঢাকার পাকিস্তানের হাইকমিশনারকে তলব করলে পাল্টা ব্যবস্থাস্বরূপ ইসলামাবাদে বাংলাদেশের হাইকমিশনারকে তলব করা হচ্ছে। সর্বশেষ সোমবার ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশনের প্রেস বিভাগের এক কর্মকর্তাকে আটকের পর ইসলামাবাদের বাংলাদেশ হাইকমিশনের প্রেস বিভাগের এক কর্মকর্তা সাত ঘণ্টা নিখোঁজ হন।
বাংলাদেশী কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে পাকিস্তান থেকে বহিষ্কারের পর ইসলামাবাদ ও করাচীর বাংলাদেশ মিশনের কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে দেশটি ষড়যন্ত্র শুরু করে। বাংলাদেশী কূটনীতিকদের বিরুদ্ধে অপরাধ খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পাকিস্তান। সে কারণে বাংলাদেশের ওই দুই মিশনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে গোয়েন্দা কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়। বাংলাদেশের কূটনীতিকরা যেখানেই যান সেখানেই তাদের পিছে পিছে গোয়েন্দাদের গাড়ি যাচ্ছে। আবার বাংলাদেশী কূটনীতিকদের বাড়ির আশপাশেও গোয়েন্দা নজরদারি বাড়িয়েছে পাকিস্তান। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে ইতোমধ্যেই পাকিস্তানের কাছে কড়া প্রতিবাদ জানানো হয়েছে। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাকিস্তান ভিয়েনা কনভেনশন লঙ্ঘন করছে। ইসলামাবাদ ও করাচীর মিশনে গোয়েন্দাদের মাধ্যমে বাংলাদেশের কূটনীতিকদের হয়রানি করা হচ্ছে। কোনভাবেই যেন বাংলাদেশের কূটনীতিকদের হয়রানি না করা হয়, সে বিষয়ে পাকিস্তানকে সতর্ক করে দেয়া হয়। তবে পাকিস্তান এ বিষয়ে কোন ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয়নি। সব মিলিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এখন চরম বিরূপ অবস্থানে।
মুক্তিযুদ্ধ ইস্যুতে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কে টানাপোড়েন এটাই প্রথম নয়। ইতিপূর্বে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় যাওয়ার পর মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করায় পাকিস্তানের তৎকালীন ডেপুটি হাইকমিশনার ইরফান রাজাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। কাদের মোল্লার ফাঁসির পর পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি উঠেছিল। উচ্চতর রাজনৈতিক পর্যায় থেকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর চাপও সৃষ্টি করা হয় সম্পর্ক ছিন্ন করার। তখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ইতিপূর্বে পাকিস্তানে যেসব কূটনীতিক দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের নিয়ে বৈঠকে বসে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে উপস্থিত প্রায় সবাই পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক বহাল রাখার পক্ষে মত দিয়েছিলেন। এ মতামত উচ্চতর রাজনৈতিক পর্যায়ে জানানোর পর ওই সময়ে সম্পর্ক ছিন্ন করা থেকে বিরত থাকে বাংলাদেশ।
এবার পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়ার পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম বলেছিলেন, ‘পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য তরুণ প্রজন্ম যে দাবি তুলছে সেই অনুভূতি বুঝতে পারি। কিন্তু কোনো একটি ইস্যুতে কোনো দেশের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা ঠিক নয়।’ তিনি বলেন, যখন দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধ চলে, তখনও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক বহাল থাকে। আর পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী মঙ্গলবার জানিয়েছেন, পাকিস্তান বরাবরই হতাশ করছে। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও এখনই বাংলাদেশ সম্পর্ক ছিন্ন করছে না। এদিকে ইসলামাবাদে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্মকর্তা জাহাঙ্গীর হোসেন প্রায় সাত ঘণ্টা নিখোঁজ থাকার ঘটনায় ঢাকায় পাকিস্তানের হাইকমিশনার সুজা আলমকে তলব করেছে সরকার।
সম্প্রতি ঢাকায় পাকিস্তান হাইকমিশনের এক কর্মকর্তার সন্দেহজনক গতিবিধির কারণে পুলিশের হাতে আটক হওয়ার পরপরই ইসলামাবাদে জাহাঙ্গীরের নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়। পাকিস্তান দূতাবাসের প্রেস সেকশনের এ্যাসিসটেন্ট প্রাইভেট সেক্রেটারি আবরার আহমেদ খানকে সোমবার দুপুরে গোয়েন্দা পুলিশ ধরে নেয়ার পর সন্ধ্যায় হাইকমিশনের কর্মকর্তাদের জিম্মায় ছেড়ে দেয়। তার কাছে অবৈধভাবে রাখা ভারতীয় রুপী পাওয়া গিয়েছিল বলে পুলিশ দাবি করলেও তা প্রত্যাখ্যান করে পাকিস্তান হাইকমিশন এই ঘটনার নিন্দা জানায়।
সোমবার রাতে ঢাকার পাকিস্তান হাইকমিশন থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, এই ঘটনাকে হয়রানি হিসেবেই দেখছে পাকিস্তান হাইকমিশন। অপবাদ ও মিডিয়া ট্রায়ালের পরিপ্রেক্ষিতে পাকিস্তান হাইকমিশনের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের এভাবে হেনস্থা করার এই ধরনটি দেখা যাচ্ছে। ২০১১ সাল থেকে আবরার আহমেদ ঢাকায় পাকিস্তান দূতাবাসের প্রেস সেকশনে কর্মরত রয়েছেন বলে জানায় পাকিস্তান হাইকমিশন।
এর আগেও ৩০ নবেম্বর ইসলামাবাদে নিযুক্ত বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার মৌসুমী রহমানকে তলব করে পাকিস্তান সরকার। তাকে তলবের পর ১৯৭১ সালের হত্যাকান্ড সম্পৃক্ততার অভিযোগ অস্বীকার করে পাকিস্তান। তলব ও পাল্টা তলব নিয়ে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়। এরই মধ্যে গত ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে পাকিস্তানের কূটনীতিক ফারিনা আরশাদকে বহিষ্কার করে বাংলাদেশ। ফারিনা আরশাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্টভাবে জঙ্গী তৎপরতার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ দেয় বাংলাদেশ। তাকে বাংলাদেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তারই পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইসলামাবাদ থেকে বাংলাদেশের কূটনীতিক মৌসুমী রহমানকে বহিষ্কার করে পাকিস্তান। দুই দেশের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য, তলব পাল্টা তলব, বহিষ্কার পাল্টা বহিষ্কারের পর সোমবার ঢাকা ও ইসলামাবাদে দূতাবাস কর্মকর্তাদের নিয়ে সর্বশেষ ওই ঘটনা ঘটে।

এই তিক্ত সম্পর্কের কারণেই হয়তো ৩০-৩১ জানুয়ারি ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় স্পীকার সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জাতীয় সংসদের সকল স্পীকার যোগ দিলেও পাকিস্তানের উচ্চকক্ষ সিনেটের সভাপতি মিয়া রাজা রাব্বানী এই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেননি। এছাড়া গত ১৩-১৪ জানুয়ারি ঢাকায় দক্ষিণ এশীয় পয়ঃনিষ্কাষণ সম্মেলনে সকল দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশকে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তবে ওই সম্মেলনে দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশ আসলেও পাকিস্তান অংশগ্রহণ করেননি। সে সময় পাকিস্তান জানিয়েছিল, তারা ৬০ সদস্যের প্রতিনিধি দল নিয়ে ঢাকায় আসবে। তবে শেষ পর্যন্ত পাকিস্তান ওই সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেননি। পাকিস্তানের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছিল, বাংলাদেশ তাদের প্রতিনিধি দলকে ভিসা দেয়নি। অবশ্য বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সে অভিযোগ অস্বীকার করা হয়। ফলে দুই দেশের মধ্যে টানাপোড়েনের বিষয়টি খুব স্পষ্ট হয়ে উঠে।
এমতাবস্থায় দুই দেশের মধ্যে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে যে দাবি ওঠেছে। দেশের ছাত্র, শিক্ষক পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের মত হচ্ছে পাকিস্তান বাংলাদেশের সাথে বারবার যে শিষ্টাচার বহির্ভূত কাজ করে আসছে এর প্রেক্ষিতে অচিরেই পাকিস্তানের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হোক। কিন্তু দেশের সাবেক কুটনীতিকদের মত হচ্ছে এখনই পাকিস্তানের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা ঠিক হবে না। কেননা, তাদের সাথে কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করা হলে বিশ্বের দরবারে পাকিস্তানের মুখোশ উন্মোচন করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাদের মতে পাকিস্তানের সাথে পুরোপুরি কুনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন না করে সম্পর্ক সীমিত করা যেতে পারে। এসব মতামত যৌক্তিক মনে হলেও এর শেষ পরিনতি কোথায় গিয়ে ঠেকবে তা নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারছেন না। পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কুটনৈতিক সম্পর্ক ছিন্নের পক্ষে বিপক্ষে যা ই বলা হোক না কেন, দুই দেশের সম্পর্ক দিন দিন যেভাবে অবনতির দিকে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে জোর করে আর কতদিন সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যাবে তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
সর্বশেষ এডিট : ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬ রাত ৯:২২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বেলাশেষে

লিখেছেন নীল-দর্পণ, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৪

বাসায় আত্নীয় আসলে চলে যাবার সময় কিংবা তাদের বাড়ী থেকে ফেরার সময় ঘরের ছোট সদস্যের হাতে টাকা গুঁজে দেবার যে চল ছিল নিশ্চই আমরা কম বেশি সবাই সেটা সাথে পরিচিত।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অসংখ্য মানুষের স্বপ্নের নায়িকা যিনি।

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ২:১২



একদিন যে বিয়েকে ঘিরে ছিল পাঁচতারকা হোটেলের ঝলমলে আলো, ক্যামেরার অসংখ্য ফ্ল্যাশ আর শত মানুষের করতালি, সেই সংসারের আকাশেই কয়েক বছরের মধ্যে জমেছিল বিচ্ছেদের মেঘ। ১৯৮৭ সালের মে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছায়াঘর: কেস ফাইল #১৯৯৬ (দ্য লাস্ট রিল)

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৬ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:২২


লেখকের নোট:
এই গল্পটি ৯০-এর দশকের জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুকে ঘিরে জনমনে দীর্ঘদিনের স্মৃতি, নস্টালজিয়া ও আলোচনার ওপর ভিত্তি করে নির্মিত একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ইনভেস্টিগেটিভ থ্রিলার । গল্পে উল্লেখিত... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারখানা বাঁচাতে পারিনি, তাই মানুষকে অটো চালাতে হচ্ছে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:৩৪


বাংলাদেশে এখন এমন এক অদ্ভুত অর্থনৈতিক সংকট চলছে, যেখানে একজন শ্রমিক কারখানায় বিদ্যুৎ না পেয়ে চাকরি হারিয়ে অটো রিকশা চালাচ্ছেন। সেই অটো আবার চার্জ দিতে বিদ্যুৎ খাচ্ছে। যে বিদ্যুৎ... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাসিনা কে রাখলে এমনি হবে...দাদা, যতদিন পারেন রাখেন

লিখেছেন অপলক , ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:৩২



২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে বাংলাদেশ ছাড়ার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর বিশেষ বিমানটি ভারতের দিল্লির উপকণ্ঠে উত্তর প্রদেশের গাজিয়াবাদের হিন্ডন বিমানঘাঁটিতে (Hindon Air... ...বাকিটুকু পড়ুন

×