somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছেলেমানুষ , মেয়েমানুষ এবং অতঃপর ''মানুষ''

১১ ই জুলাই, ২০১১ সকাল ১১:০৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

লেখালিখি আমি তেমন পারি না।বহুদিন আগে হালকা পাতলা কিছু লেখার চেষ্টা করতাম,এখন সেই চর্চাও নেই।তারপরও কিছু বিচ্ছিন্ন চিন্তা থেকে আজ অনেক অনেক বছর পর লেখতে বসলাম।

আমার ছেলেবেলাঃ
জন্মের পর থেকে জানি আমরা মানুষ।"homo sapiens" সৃষ্টিকর্তার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি!কিন্তু বুদ্ধি হবার প্রায় সাথে সাথেই শিখলাম আমি মেয়ে,আমি অনেক অনেক আদরের একটি ছোট মেয়ে।

সময়ের সাথে সাথে আমি এই মেয়ে শব্দটার আসল পরিচিতি আবিস্কার করতে থাকি। মেয়ে মানে কোমল, মেয়ে মানে মায়া, মেয়ে মানে প্রশান্তি, মেয়ে মানে সহনশীল। এ কারনেই পাড়ার ভিডিও গেমস এর দোকানে ধরা পড়লে ভাইয়ার চেয়ে বেশি গঞ্জনা শুনতে হত আমার, মেয়ে হবার দায়ে। মেয়েদের কি এভাবে পরদা টাঙ্গানো জায়গায় দম্বন্ধ অবস্থায় আর দশটা পাড়ার ছেলের সাথে দাড়িয়ে এসব গেমস খেলা মানায়? টাউন হল মাঠে ফুটবল খেলতে গিয়েও একই বিপত্তি। ঘরের নিচে লুকাচুরি খেল,ছোঁয়াছুয়ি খেল,ঘরের ভেতর হাঁড়িপাতিল খেল,কিন্তু মাঠে গিয়ে রোদে পুড়ে ছাই হওয়াটা নাকি মেয়েদের মানায় না! ছয়াছুয়ি আর হাঁড়িপাতিল আমি ঠিকই খেলতাম,কিন্তু সেই সাথে টাউন হল মাঠে সাতচাড়া খেলা আর ফুটবল খেলায় কি দোষ তা এখনও বুঝে উঠতে পারি না। কিছু বললেই শুনতে হত যে আমার বাসার লিজা আপু,পাশের বাসার এনি,কেউই তো এসব করে না। তাই আমার করাটাও বাদ!

আমার ভাইয়া ছিল আমার আঈডল।ও যা করবে তা তো আমার করা লাগবেই। একসাথে সকল বাঁদরামি করতাম,ভুলেও আমার ভাইএর শিশুমনে আসে নাই যে আমি মেয়ে। তাই আমার পা ধরে উল্টো করে বারান্দা থেকে ঝুলিএ রাখা ,ল্যাঙ মেরে ফেলে দেয়া, wwf খেলা,রেস্লিং খেলা, মারামারি এসব কিছুর কমতি ছিল না আমার ছেলেবেলায়।

ইস্কুল থেকে বাসায় আসার জন্যে যে টাকা দেয়া হত,তা কিছু বাঁচানোর জন্যে রিকশা না নিয়ে টেম্পো তে আসতাম। বাকি রাস্তা হেঁটে। একদিন আব্বুর কোন এক পরিচিত কেউ আমাকে দেখে ফেলল। বাসায় আব্বু কি বকা, এতোগুলো অপরিচিত মানুষের সাথে এভাবে টেম্পো তে আসা উচিৎ না,সেফ না, ইত্যাদি ইত্যাদি।আমি একা বকা খাচ্ছি দেখে ভাইয়ার কথা ফাস করে দিলাম যে ও তো টেম্পো করে আসে।তখন ভাইয়া কে আব্বু ডেকে প্রশংশা করল কারণ ভাইয়া টাকা পয়সার কদর করা জানে,কিন্তু কি দরকার কষ্ট করে টেম্পো তে আসার! আমি তো অবাক,তখন থেকেই এরকম ছোট ছোট ব্যাপার থেকে মাত্র বুঝা শুরু করলাম যে আমি মেয়ে! ছোট হই,আদরের হই,ভাল হই,মন্দ হই,আমার এসব পরিচয়ের চেয়ে অনেক বড় পরিচয় যা আমায় জোর করে সবাই চাপিয়ে দিচ্ছে,তা হল আমি মেয়ে!

মেয়ে হতে আমার কোন সমস্যা ছিল না,কিন্তু অন্যদের আমার মেয়ে হওয়া নিয়ে হাজারো সমস্যা ! মেয়ে হলাম তো হাফ প্যান্ট পড়ে ঘুরি কেন,কুরবানি ঈদ এ পাড়ায়ে গরু দেখতে দেখতে দিন পার করি কেন,ভাইয়া যাই করে তাই কেন করা লাগবে আমার এ সকল বিষয় নিয়ে প্রতিদিনের বকাঝকা।ভাইয়া যা করে তা দেখে আমি করি না, কিন্তু আমাদের দুজনের যে একই জিনিস ভাল লাগতে পারে, তা ভুলেও কেও ভাবতো না!
ঐ যে ছোটোবেলা থেকে ১টা Idea inject করে দেয়া সব বাচ্চার মাঝে ঃ যে ছেলে মেয়েঃ ২ জনের ২ নিয়ম!

আম্মু আব্বু বকা দিলেও ভাবত ছোটমানুষ।বয়সের সাথে সাথে বদলে যাব। আমিও বদলালাম, বন্ধু বাড়ল, বাঁদরামি বাড়ল,কিন্তু আম্মু আব্বু যে বদল এর আশা রাখছিল সেভাবে বদলালাম না।

কিন্তু একটা কাজ আমি কখনো করিনি আর এখনও পছন্দ করিনা তা হোল জোর কোরে দেখানো যে আমি ছেলেদের মতো। টম বয় ভাব করবো, ছেলেরা যা করে ঠিক তাই করে যেতে
হবে। নিজের অজান্তেই ছেলেদের আঈ ডল বানায় অনেক মেয়ে।এখনও কতো বোকা মেয়েদের দেখি যারা ভাবে ছেলেদের নকল করলেই নিজেকে STRONG,অথবা ROUGH AND TOUGH প্রমাণ করা যাবে।কিন্তু অন্যের ছাঁচে নিজেকে ফেলে দেয়া কি ভীষণ বোকামি!

ছোটোবেলা থেকেই আমাদের পারিপার্শ্বিকতা অনেক প্রভাব ফেলে আমাদের মনে।আর নিজের অজান্তেই আমরা নিজেকে ভুলভাবে প্রকাশ করতে থাকি।

আমার বদলে যাওয়াঃ

যতযাই বলি না কেন,আমি তো আসলে একটা মেয়ে,তা টের পেলাম প্রথম যখন সেই ছেলের চোখ ভাল লাগল,হঠাৎ
করেই সবকিছু বদলে গেল।সেই প্রথম একদিন ভাল করে আয়না দেখলাম, ইস্কুল ব্যাজ লাগাইসি কিনা,নেম প্লেট পরসি কিনা তা দেখার পাশাপাশি চুল ঠিকমত আঁচড়ান হল কিনা,জামার ইস্তিরি ঠিক আছে কিনা এসবও খেয়াল করা সুরু করলাম।নিজের বদলে যাওয়া উপলব্ধি করলাম যখন প্রথম তার হাত ধরলাম।

কিন্তু দেখি ছেলেটা আমাকে যতই পছন্দ করুক না কেন,আমায় আমার মতো থাকতে দিতে নারাজ! মেয়ে হয়ে খেলাধুলা!মেয়ে হয়ে এতগুলা ছেলে বন্ধু রাখা(যারা কিনা আমার বন্ধু,ছেলে হোক মেয়ে হোক,বন্ধু তো বন্ধু ই) আর হাজার সমস্যা!মাঝে মাঝে ভাবতাম, ধুর শালা।লাগবেনা আমার প্রেম!কিন্তু কিভাবে ! প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছি,পারি নাকি তারে ছাড়া থাকতে!

প্রেম চলে যায়, দিন কেটে যায়, কিন্তু মেয়েদেরকে কিছু নিয়ম এর মাঝে ফেলার প্রবণতা যায় না!

অনেক বন্ধু আছে যারা ছেলে,আমায় বুঝে। কিন্তু কেন জানি নিজের বোনের বেলায় কিংবা গার্ল ফ্রেন্ড এর বেলায় সবকিছু ভুলে যায়! তখন কীছূ বললে বলে ঃ'' আরে ও তোর মতো না! " কি আজব! আমার মতো হয়তো না! অন্যরকম ,কিন্তু কী রকম তা জানার চেষ্টা না কোরেই নিজের মতো করে ছাঁচে ফেলা শুরু করা ! এ কোন দিক থেকে ভালোবাসা?

আমিতো বদলালাম, কিন্তু আর কিছুই তো বদলাল না। আমার জন্যে আলাদা নিয়ম, আলাদা আশা ,এমনকি ভাল মন্দের সংজ্ঞা টাও দেখি আমার ক্ষেত্রে আলাদা!

অনেক বড় ১টা সমস্যা সব মেয়ে ফেঈস করে,তা হল সবার আশা পূরণ করতে করতে নিজের ইচ্ছা, আশা আর অস্তিত্ব ভূলে যায় অনেকেই!

এখন আজ ভাবি,কেন আমাদের যা ইচ্ছা তা করতে পারিনা? ছেলে হয়ে রান্না করা পাপ না, মেয়ে হয়ে সাইকেল চালানো অনেক বড় ব্যাপার না। যার যা শখ, তা করুক। কি আজাইরা ছেলে মেয়ে করে করে আমরা সময় নষ্ট করি,অথছ দিন শেষে আমরা সবাই মানুষ।মেয়ে হওয়া খারাপ কিছু না, ছেলে হওয়াটাও মস্ত কিছু না। মানুষ হওয়াটাই তো আসল। তো এসব ছেলে মেয়ে ক্ষুদ্রতার মাঝে নিজেদের আটকে রেখে কি লাভ?
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০১১ বিকাল ৪:৫৫
৪টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×