কি যে লেখব কিছুই বুঝতে পারছিনা।নিজের ভেতরে আটকে থাকা,জমে থাকা কথাগুলো কিভাবে প্রকাশ করব?
একটা দেশে রন্ধ্রে রন্ধ্রে যখন অপরাধের মেলা ,তখন সেখানকার মানুষও অনেকটা মানিয়ে যায় এসবের সাথে।কিন্তু এই মানিয়ে যাওয়াটাই যে অপরাধ বাড়াতে সবচাইতে বড় ভূমিকা রাখে,তা আমরা কিভাবে ভুলে যাই!?
আজ আমাদের মানিয়ে চলা, কাল আমাদের নিজেদের এবং সেইসাথে আপন জনের উপর বিপদ ডেকে আনার স্বরূপ।
রাতে গলি ঘুপচি তে ছিনতাই হল ! সে তো ঐ লোকের নির্বুদ্ধিতা,যে কিনা ছিনতাইকারীর কবলে পড়ে!কেন সে এত রাতে ঐ গলি তে গেল!একটু কমন সেন্স নাই নাকি লোকটার! সবাই ই তো জানে ওখানে গেলে এরকম হতেই পারে!দোষ টা যেন ছিনতাইকারির না,দোষ টা ঐ লোকের যে কিনা এত কিছু চিন্তা না করে অত রাতে ঐ রাস্তায় পা ফেলেছিল!
একজন মানুষের সাবধানে হাঁটা চলা করাই উচিত কিন্তু ছিনতাই হবার পর প্রথম প্রতিক্রিয়া হিসেবে ছিনতাই কারিকে দায়ী করাটাই কি স্বাভাবিক না?
ধরুন একটা মেয়ে রেপড হল।আমাদের প্রথম প্রতিক্রিয়া কি হয়? নিশ্চয়ই সে ঠিকমত কাপড় পড়ে নাই,অথবা ওড়নাটা ঠিকভাবে গায়ে দেয় নি।নইলে ছেলেটার সাথে ফস্টি নষ্টি কিছু ছিল।অথবা আরেকটু সাবধান থাকতে পারত,তাহলেই তো হত!
একটা রেপ কেস এ পরিস্থিতির শিকার অভাগা মেয়েটার কাপড়ের অথবা তার চরিত্রের ত্রুটি খুঁজে বের করার আগে কি যেই পশুরূপি মানুষ এই ঘৃন্য কাজ তা করে তার বিচার করাটাই বেশি জরুরি হয়ে পড়ে না?
কোন বাসায় ডাকাতি হল! আরে এত বেশি দেখিয়ে বেড়াবার কি দরকার!?দেখলেই বুঝা যায় আলমারি ভরতি গয়না,ড্রয়ার ভর্তি টাকা।এরকম নিশ্চিন্তে খোলামেলা ভাবে জীবন যাপন করা আর ডাকাতদের দাওয়াত করে ডাকা তো একই ব্যাপার।তাই না?
একটা বাসায় ডাকাতি হলে অপরাধিদের খুঁজে বের করার জন্যে বাবস্থা নেয়া জরুরি নাকি ঐ ডাকাতি হবার পেছনে ঐ বাসার মানুষের জীবন যাত্রার প্রণালীর সমালোচনা করা জরুরি?
কাজের মেয়ে নিখোঁজ!আরে কাজের মেয়ের মাথায় সমস্যা ছিল।আজকালকার কাজের মেয়ে!কি না কি করে বেড়ায় তাতো সকলের জানা কথা,এর সাথে প্রেম তার সাথে বেলেল্লেপনা!
একজন মানুষ নিখোঁজ হলে তাকে খুঁজে বের করাটাই কি সবচাইতে প্রাথমিক প্রচেষ্টা হওয়া উচিত না?অথচ খুঁজে বের করা দূরে থাক, সেই মেয়ে নিয়ে কুৎসা রটানই মানুষের প্রথম প্রতিক্রিয়া কিভাবে হয়?
একটা মেয়ের আত্মহত্যা! উফ্ফ্।ভারী অদ্ভুত মেয়ে তো ! এত সহজে আত্মহত্যা! কি হয় একটু মুখ বুজে প্রতিদিন যাওয়া আসার পথে ছেলেদের টিটকারি সহ্য করলে!?সবাই তো তাই করে।মানুষ তো এর চাইতেও কত খারাপ থাকে!
তাই বুঝি? আরে নির্লজ্জ, একটু তো সময় ব্যয় কর ,২ মিনিট অন্তত শোক পালন কর। এখানে একটা মানুষ মারা গিয়েছে!! একটা মানুষ! এখন তো ঐ বাজে নোংরা মুখটাকে ক্ষান্ত দে!
এই হল আমাদের চিত্র।অপরাধ হওয়ার পরে মানুষের কথার নমুনা!!!
প্রাথমিক পর্যায়ে যে হালকা সচেতনতা আসা দরকার তাও আসেনা আমাদের মাঝে!অপরাধ হলে আমরা অপরাধি কে নয়,বরং অপরাধের শিকার মানুষ কে ধিক্কার দেই। যে তার সব হারিয়েছে,তাকেই দায়ী করি তার ক্ষতির জন্যে! কি অমানবিক!!
সচেতনতা,দায়িত্ববোধ, মূল্যবোধ, এসব না হয় বাদ ই দিলাম।স্বাভাবিক সহানুভুতি,মানবিকতার ও কেন এত অভাব আমাদের মাঝে?
দারুন সমাজ ব্যবস্থা!! কালকে যখন নিজের বোন রেপড হবে,নিজের বাসায় ডাকাত পরবে। আর নিজে যখন কোন ছিনতাইকারীর হাতে পরবা,তখন নিজের মাথায় হাত না দিয়ে অপরের দুঃসময়ে নিজের নিষ্ঠুর প্রতিক্রিয়ার কথার কথা মনে করতে ভুলো না।
অপরাধ হলে সবার আগে অপরাধিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়াটাই আমাদের সবর্প্রথম প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত।সবসময় শুধু অবিবেচকের মত অন্যের আজাইরা ত্রুটি বের করে অপরাধিদের সমর্থন দেয়ার প্রথা আজকে,এখনই,এই মুহূর্তে আমাদের বন্ধ করা উচিত। এইটুকু সচেতনতা আমাদের সবার মাঝেই আসা উচিত যে আজ কে আমরা অন্যকে নিয়ে কুৎসা রটিয়ে আসল অপরাধীদের যেভাবে নৈতিক সমর্থন দিচ্ছি,কাল কিন্তু একি জিনিস আমার সাথে বা আমার নিকটজনের সাথে হতেই পারে।
আমাদের চারপাশে প্রতিদিন কত কিছু হচ্ছে যার এক বিন্দু বিদ্রোহ আমরা করি না।কবে শিখব আমরা আসল দোষীদের বিচার করা আর সংকটের সময় অন্যের দিকে সাহায্যের আর সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দেয়া।সময়মত মূল্যবোধের পরিচয় দেয়া কি বিশাল কিছু?খুব কঠিন কিছু কি চেয়ে ফেললাম আমি আমার সমাজের বিবেকবান মানুষদের কাছে?
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০১১ বিকাল ৪:৫৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


