বিশ্ববিদ্যালয়ের হল ছাড়ার পর আমার প্রথম মেস জীবন কল্যাণপুরে। আমাদের কল্যাণপুরের মেসে কাজের বুয়া হয়ে আসে পারভিনের মা নামক এক রমণী। আসলে তার নাম ছিল শান্তা। কিন্তু আমরা তাকে পারভিনের মা বলেই ডাকতাম। এই মহিলা ছিল অসাধারণ মমতাময়ী এবং তার রসবোধ ছিল। আমি খুব ঘন ঘন চা খেতাম এবং মেসের চিনির বোয়াম প্রায় সময় খালি থাকত। এটা নিয়ে পারভিনের মা রসিকতা করত। ‘চা বানাওত’ বললে সে সাথে সাথে ছন্দ মিলিয়ে বলত-চিনি আনেন ত! এছাড়াও সে তার বস্তির বাসায় আমরা মেস মেট দের একদিন দাওয়াত করে খাওয়ায়। ঝাল করে রান্না করা মুরগীর মাংসের সাথে পোলাও ভাত, সালাদ ত ছিলই। পরে কোকের বড় লিটার ও ছিল। যারা পান খায় তাদের জন্য বরাদ্দ ছিল পান। পারভিনের মা কে সেই সময়ে যেরকম দেখেছি এবং তার মুখে তার যে অতীত জীবনের গল্প শুনেছি তা নিয়ে আমি সেই সময় অর্থাৎ আজ থেকে তের বছর আগে একটা ছড়া লিখি। কোন রকম এডিট না করে হুবহু শেয়ার করলাম।
‘পারভীনের মা’
আমাদের ‘পারভীনের মা’
নামটি শানত
‘চা বানাওত’ বললে বলে
‘চিনি আনেন ত’
মাঝেসাঝে পান টাও খায়
সর্বদা লাল শাড়ী
পরনে তার; কিছু বললেই
হেসে যায় গড়াগড়ি
এককন্যার জননী সে
বাড়ী জামালপুর
ঢাকা হইতে বাসে গেলে
বেশ খানিক দূর
ঢাকায় আসার কাহিনী তার
অতি সংক্ষেপ
এসব শুনে দেশে কেও আর
করেনা আক্ষেপ
অল্প বয়সে দোজবরেতে
বিয়ে যে তার হয়
নতুন কনের অতি আদর
সতীনের না সয়
পরের অংশ; জানিনা’ত কি
ব্যাখ্যা যে তার হয়?
হুবহু বলছি ঠিক যেরূপ
পারভীনের মা কয়!
ইর্ষা বশতঃ সতীন তাকে
মারল নাকি বাণ-
অসহ ব্যাথা সারাটা দেহে
মাথাটা খান খান
পুকুরের মাঝে ডুবিয়ে মাথা
ছিল দু’তিন দিন
প্রানে বাঁচলেও স্বামীর থেকে
হল যে বিচ্ছিন;
যাবে কোথায়? অসহায় নারী
শেষ ঠিকানা ঢাকা
সেখানে নাকি যেভাবেই হোক
চলে জীবন চাকা!
একটিমাত্র কন্যাধনকে
মায়ের কাছে রেখে
উঠল বাসে; অনিশ্চিতের
লিখা ললাটে মেখে
ঢাকায় এসে তবু যাই হোক
জুটল ত কিছু শেষে
‘কাজের বুয়া’র চাকরি হল
ব্যাচেলর দের মেসে
‘রান্না কর’, ‘কাপড় ধোয়’
ঝাড় বিছানা-ম্যাট
মাঝে মাঝে দোকানে গিয়ে
‘নিয়ে আস সিগ্রেট’
দেখি একদিন বিকেল বেলায়
সবার মাথায় হাত
পার্ভীনের মা’র বাসায় সবার
আজ নাকি দাওয়াত!
দাওয়াত আবার? বুয়ার বাসায়!
অবাক সবে ভীষণ-
যাব কি যাবনা-সবার ই মধ্যে
আছেই কনফ্যুশন!
গেস্ট টেস্ট আসে কখনোসখনো
ঝামেলা ভীষণ হয়
কিছু বলে না ত! পারভীনের মা
মুখ বুজে সব সয়
কোন কোন দিন বাজার হয়না
সবার পকেটে টান
ব্যবস্থা সে করবেই কিছু
বলবে ‘আহুইন...খান!’
ঈদের ছুটিতে বছরে দু’বার
গেলে দেশের ভিটে
ফেরার সময় আনবেই সে
হাতের তৈরি পিঠে
কেও থেকে যায়, কেও চলে যায়
এটাই মেসের চল
‘যাবে চলে কেও’ শুনলেই তার
চোখের কোনেতে জল...
খুব মাঝে মাঝে একা একা বসে
কাঁদতে দেখি যে তাকে
সেই কান্নায় বেদনা তাহার
মাখামাখি হয়ে থাকে
দুঃস্থ রমণী একেলা কাঁদে
কি দেব তাহাকে বুঝ-
কতটুকু বা জানি আমরা
তাহার মনের খোঁজ...
কান্না থামলেই বলি তাকে
‘চা বানাও ত’
পারভীনের মা হেসে বলে
‘চিনি আনেন ত’
( ২৯/০৩/২০০২)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই জানুয়ারি, ২০১৫ বিকাল ৫:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




