somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কাঁচকলায় কান্না

১৬ ই জুলাই, ২০১৫ দুপুর ১:৪৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কাঁচকলাকে সবসময়ই আমার মনে হয়েছে আরেকজনকে দেখানোর জিনিস । বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের একপাশে ছোট্ট একটা ভ্যানে করে দোকান সাজিয়ে বসা স্বাস্থ্যবান, হাসিখুশি চেহারার মামা আস্ত এক কাঁচকলাকে সুনিপুন দক্ষতায় প্রায় আলোর গতিতে ছুরি দিয়ে ছুলে ধনিয়া পাতা, চিনি, কাঁচা মরিচ সহ আরও নানান উপাদান একসাথে হামান দিস্তায় ছেঁচে যে তালগোল পাকানো বস্তু পলিথিনে করে হাতে ধরিয়ে দিলেন তা অল্প একটু মুখে দিয়েই আগের ধারণাটা বদলাতে হয় । কাঁচকলার ভর্তা হয়, এবং তা অবিকল ও'হেনরির লেখা গল্পের আমেজের । আমার আরেক হাতে আবার তখন ছিলো আধ খাওয়া মাচো আইসক্রিম । ইগলু কোম্পানির এক বড়সড় হাসিখুশি পেঙ্গুইনের ছবিওয়ালা মোড়কে মোড়া ভালো মানের সে আইসক্রিম আর কাঁচকলার স্বাদ দুই মিলিয়ে মুখের ভেতর প্রাচ্য এবং প্রাতীচ্যর মিশ্র স্বাদ তৈরি করে আর করোটির ভেতর জন্ম দেয় ' আজ নাহয় বাসায় আর নাই ফিরি ' - ধরনের বিবাগী কোন অনুভূতি ।

এরমধ্যেই হঠাৎ কম্পন । না না ... হৃদয়ে নয় মোটেও, প্যান্টের পকেটে রাখা মুঠোফোনটাতে । দুই হাতে দুই খাবার। এমন মুহূর্তে ইথারে ডাক পাঠিয়ে কেউ আমাকে তথৈবচ অবস্থায় ফেলে দেয় এবং ফলস্বরুপ বিড়ালের ভাগ্যে শিঁকে ছেড়ার মতোই একটু দূরে দাড়িয়ে থাকা এক পথশিশুর কপালে আমার আধ খাওয়া আইসক্রিমটা জুঁটে যায়। নিজের এঁটো করা খাবার আরেকজনকে খেতে দিতে আমার একটুও বাঁধে না, বরং আমি ভ্রু কুঁচকে মনে মনে দ্রুত বেগে হিসেব কষি এই অসময়ের দূরের ডাকে সাড়া দেওয়ার জন্যে কতখানি Opportunity cost তথা সুযোগ ব্যয় বহন করলাম । হিসেবে আমি বেশ ভালো । দেখা গেলো অংকটা খুব একটা কম না ।
ফোনটা কানে ঠেকাই ।

অথচ না ঠেকালেও পারতাম বা চেষ্টা করেও ঠেকাতে ব্যর্থ হতে পারতাম । বাংলালিংক কোম্পানির অপরিচিত নম্বার থেকে অজানা কেউ একজনের পাঠানো ডাকটা মোবাইলটাকে ত্রিশ সেকেন্ড কম্পিত করে আমি প্রতিউত্তর করতে যাওয়ার ঠিক আগের মুহূর্তে ফুরিয়ে যেতে পারতো । ফোনটা ধরার সময় আমার হৃযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যেতে পারতো, ভূমিকম্পে পায়ের নিচের ভূপৃষ্ঠ ফাঁকা হয়ে গিয়ে বিরাট এক গহ্বর আমাকে তার মধ্যে টেনে নিতে পারতো । কিংবা এসবের কিছুই না, মুঠোফোনটাই আর সজাগ থাকতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আমাকে আর্থিক সমস্যার সাগরে ভাসিয়ে ঘুমিয়ে পড়তে পারতো চিরতরে ।

কিন্তু বাস্তবে এসবের কিছুই ঘটে না ... অথচ Murph's Law যদি আমরা মেনে নেই, যা বহুল প্রচলিত এবং প্রতিষ্ঠিত বলে মেনে নেওয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ, তাহলে আমরা জানি যা ঘটা সম্ভব তা ঘটবেই । অবশ্য Murph সাহেব বিশাল এক ফাঁকা রেখে গেছেন তার থিওরিতে । তিনি বস্তুজগতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন মাত্রা " সময় "- কে উপেক্ষা করেছেন পুরোপুরি ..... সে যাই হোক, ফোনটা কানে ঠেকানোর পর আমি শান্তি বর্ষিত করার আশীর্বাদ ছাড়াই একটু বিরক্ত ও অস্থির কন্ঠে জিজ্ঞাস করি কে? ওপাশ থেকে শব্দ পাওয়া যায় না। আমি আবারও ব্যস্ততার স্বরে জিজ্ঞাস করি আমাকে ডাক পাঠানো মানুষটার পরিচয় - অবেলায় আমার খোঁজ করার কারণ । এবার ওপাশের নীরবতা ভাঙ্গে, কিন্তু কোন স্পষ্ট কন্ঠস্বর ভেসে আসার বদলে ভেসে আসে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ । যুগপৎ অবাক এবং বিরক্ত হই । কি বলবো কথা খুঁজে পাই না ।

কিছু বিহ্বল মুহূর্ত কেটে যায় ।

তারপর আমি মুঠোফোনটা কান থেকে নামিয়ে রাখি এবং মনোনিবেশ করি হাতের খাদ্যবস্তুর দিকে । একটু হৃদয়হীন কাজ হয়ে গেলো বোধহয় । আমার সম্ভবত খুব কোমল গলায় ওপাশের চিনতে না পারা মানুষটাকে শান্ত হতে বলা উচিত ছিলো, শোনানো উচিত ছিলো চমৎকার চমৎকার কিছু সান্ত্বনা বানী। তাকে তো আমি চাইলেই চমৎকার কোন দু'লাইনের উর্দূ শায়রি শোনাতে পারতাম, বিষন্নতা কাটাতে প্রিয় গায়ক অঞ্জন দত্ত - জন ডেনভারের নির্দিষ্ট কোন গান শোনার পরামর্শ দিতে পারতাম, কিংবা গলায় আবেগ ঢেলে মৃদু স্বরে শোনাতে পারতাম কাহলিল জিবরানের লিখে যাওয়া সেই লাইনটা - " বিস্মৃতি স্বাধীনতার ", কাজেই ভুলে গিয়ে স্বাধীন হয়ে যাও ; অথবা - " ঈশ্বরের প্রথম ভাবনার প্রকাশ ছিলো একজন দেবদূত । ঈশ্বরের প্রথম শুদ্ধ উচ্চারন ছিলো একজন মানুষ । ", - যার হাসার নিয়ম সবাইকে নিয়ে, কিন্তু কাদঁতে হবে একা । আমাকে শুনিয়ে কাঁদার কিছু নেই । আমি নিজেই আকন্ঠ পানির সমুদ্রে ডুবে থাকা তৃষ্ণার্ত গ্রিক পুরাণের অভিশপ্ত টেনটেলাস, কারও ঠোঁটে চুমু খেয়ে তার শাপমোচন ঘটানো আমার পক্ষে সম্ভব নয় ।

কিন্তু কিছুই শেষ পর্যন্ত বলা হয় না । কারণ আমি তাকে চিনতে পারি নি, তার পরিচয় আমার কাছে ঠেকে চৈনিক অক্ষরের মতো দুর্বোধ্য । স্মৃতি হাতড়ে সম্ভাব্য একটা তালিকা তৈরি করতে চেষ্টা করি, যার ম্যালথাসের বলা যাওয়া জনসংখ্যা তত্ত্বের মতো জ্যামিতিক ক্রমবর্ধমানতার হার দেখে আমি থমকে যাই, যেতেই হয় । চুলোয় যাক সব ..... পুরোনো স্মৃতির খাতা হাতড়ানো অবসরপ্রাপ্ত কেরানীর কাজ । ও পথ আমি আর মড়াবো না কিছুতেই । স্মৃতির খাতা নির্ঘাত এক প্যান্ডোরার বাক্স যা একবার খুলে ফেললে পশ্চিমের আকাশে অস্তগামী সূর্যের অনুপম মেঘের কারুকার্যের এ বিকালটা অস্পষ্ট বিষন্নতায় তলিয়ে যাবে পুরোপুরি । বহু কষ্টে বিশ্ব - চরাচর ভাসিয়ে নেওয়ার মতো শক্তিশালী জলোচ্ছ্বাস আমি যে নিঃস্পৃহতার বাঁধ দিয়ে থামিয়ে রেখেছি, তার বুকে আবার কোদাল চালানোর মতো বোকা আমি নই । আমার এ প্যান্ডোরার বাক্স বন্ধই থাকুক চিরকাল ।

যাই হোক , সব চিন্তা পরে । আগে হাতের কাঁচ কলার ভর্তা খাওয়া শেষ হোক ।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০১৫ দুপুর ২:২৭
৫টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কঠিনতম সব চ্যালেঞ্জের মুখে বিএনপির ভবিষ্যৎ কি অন্ধকার??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১০



বিএনপির সামনে অনেক কঠিন সব চ্যালেঞ্জ...

তাদের মোকাবেলা করতে হচ্ছে দ্বিমুখী বিরোধী-দলীয় রাজনীতি বা কর্মকাণ্ড (যেটা কিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে আগে কখনো দেখা যায়নি)।

জামাত-এনসিপি যতই লীগের ফিরে আসার বিরুদ্ধে বিএনপির... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার নানা মরহুম শাহাবুদদীন মাহমুদ জায়গীরদার

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ৯:২৫



আমার আম্মার সেঝ চাচা’র লেখা ‘My life is not mine’ বইটি পড়ছি। বইটিতে ‘মাইজম ভাই’ নামের একটি অধ্যায় আছে। এতে সেঝ নানা আমার নানার বিভিন্ন সত্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

মৃত্যু পেরিয়ে আবার ব্লগে------

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ৩০ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:০৬




প্রায় ০৩ মাস হয়ে গেলো ব্লগে আসনা হয় না, আসা হয়না মানে লিখা হয়না। প্রিয়জনের মৃত্যু শোক কাটিয়ে ব্লগে উকি দেওয়া হয় কিন্তু পোস্ট দেওয়া হয় না।


গত... ...বাকিটুকু পড়ুন

×