চাঁদ নিয়ে লোকটার বাড়াবাড়ি ছিল খুব । আরে বাবা ,দুনিয়ায় এত জিনিস থাকতে চাঁদ নিয়ে বাড়াবাড়ি কেন? তাও আবার যে জিনিস মাসের ১৫ দিন গায়েব হয়ে থাকে ! কেন বাপু , সারাদিন ধরে গনগন করতে থাকা সূর্যটা তোমার চোখে পড়েনা? আর চাঁদ-সূর্য হেনো-তেনো নিয়ে আদিখ্যেতা খানিকটা থাকলইবা, সেই পাগলামী কী আমাদের মত ভোলাভালা মানুষের মাথায় ভরে দিতে হবে?
লোকটা এতকিছু নিয়ে ভাবেনি, খালি একটার পর একটা পাগলামী ফেরি করে বেড়িয়েছে । আর আমি? আমার মত ছেলে-ছোকরাদের কাছে কটকটি আর তার বই ছিল সমান পছন্দের। কলেজে পড়ুয়া মিনু আপাকেও দেখতাম তার বই পড়তে। আরে, তার লেখা বই অদল-বদল করতে গিয়েইতো পূবপাড়ার কাজল ভাইয়ের সাথে লজ্জাবতী মিনু আপার ভাব হয়ে গেল
বড়দেরকে এইজন্য তার কথা উঠতেই কেমন যেন ছ্যা ছ্যা ভাব করতে দেখতাম। বাবাতো প্রায়সময় ভারী গলায় আমাকে ধমকে উঠতেন 'সারাদিন এইসব আউটবই পড়লে মানুষ হতে পারবি?' মানুষ হব না পশু হব- আতশত টেনশন আমার ছিল না,শুধু পাঠক হতে চেয়েছিলাম।অমন রসগোল্লার মত বইয়ের টেস্ট পেলে ডায়বেটিসের কথা মনে থাকে? আর বাবা ধমকালেও জানি প্রতি সপ্তায় যখন 'আজ রবিবার' নাটকটা দেখায় তখন বাবা নিজেই সব কাজ ফেলে ঠিকই টিভির সামনে জুত করে বসে থাকেন! আর নাটক শুরু হলে তো কথাই নেই । তাঁর রাশভারী ভাবসাব যে কোথায় পালায় আল্লাহই মালুম,একটু পরপর বাচ্চাদের মত খিক খিক করে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়েন। আমার রাশভারী বাবার মাঝে যে একটা শিশু লুকিয়ে আছে, তিনি না থাকলে কী জানতে পারতাম?
যা বলছিলাম, পাগলামীর ফেরিওয়ালার কথা। আমি তখন ক্লাস নাইনে পড়ি । স্কুলে যাবার পথে ছাত্রবন্ধু লাইব্রেরীতে চোখে পড়ল গাবদা সাইজের একটা বই 'হিমু সমগ্র' । হিমু নামে একটা মারকুটে একটা ছেলে আমাদের ক্লাসে ছিল, কিন্তু হিমুসমগ্র জিনিসটা আমার কাছে ঠিক ক্লীয়ার হল না।তবে লেখকের নাম দেখে বুঝলাম, ভেতরে একটা ব্যপার নিশ্চয় আছে। তাই বেশ ক'দিন ধরে বাবার মানিব্যাগের টাকা সরিয়ে, মাটির ব্যংকে খুচরো সিকি-আধুলি জমিয়ে কিনে ফেললাম বইটা । তারপর? তার কিছুদিন পর থেকে লোকজন আমায় পাগল বলতে শুরু করল! পায়ে স্যন্ডেল পরি না,কিশোর বয়সের তুলতুলে দাড়ি শেভ করি না, হলুদ ফতুয়া পরে ঘুরি(বাজারে অনক খুঁজেও হলুদ পান্জাবী পাইনি), আর চেহারায় কেমন জানি একটা দার্শনিক ভাব চলে এসেছিল। সব মিলিয়ে অবস্থা যা দাঁড়িয়েছিল, লোকজন যে গায়ে ঢিল ছুঁড়তে শুরু করেনি, এটাই বেশী।
বয়:সন্ধির সাইডইফেক্ট ভেবে বাবা কিছু বলতেন না। শুধু একটা ব্যপার তিনি মানতে পারেননি- আকাশে ভরা পূর্ণিমার চাঁদ উঠলে আমাকে ঘরে বেঁধেও রাখা যেতো না; তৈয়ব হুজুরের পানিপড়া, ন্যাংটা পীরের তাবীজ- কিছুতেই কোন কাজ হয়নি। চলে যেতাম শঙ্খ নদীর পাড়ে। নদীর ওপারে বিশাল পাহাড়,তার ওপরে থালার মত চাঁদ।চাঁদের সাথেই আমার সুখ-দুখের আলাপ হত।
আজ আমার মনে খুব কষ্ট।কারণ, আজ আমার প্রিয় ফেরিওয়ালা আকাশের তারা হয়ে গিয়েছেন।মরচে রঙা কটকটির মত এক নিমেষে শেষ করার মত বই তিনি আর লিখবেন না। মধ্যবিত্ত জীবনের রংচটা আটপৌরে দিনযাপনের গল্প বইয়ের পাতায় আর প্রাণ পাবেনা।হ্যামিলনের বাঁশীওয়ালার মত মাতাল করে কেও আমাকে বলবে না- এই পটলা, চাঁদ ওঠেছে, শঙ্খপারে চল্ । ঊনি লিখেছিলেন 'চান্নিপসর রাইতে যেন আমার মরণ হয় ' । কিন্তু আজ ঊনিও নেই, আকাশে চাঁদও নেই । তাই আমার বুকের জমাট বাঁধা কষ্ট শেয়ার করারও কেউ নেই।তবে চাঁদ না থাকায় একদিক থেকে ভালই হয়েছে ! আমার চোখের জল কেউ দেখতে পাবে না, হিমুদেরতো আবার কাঁদতে হয় না।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


