somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পরী গফফার

০৯ ই নভেম্বর, ২০১২ বিকাল ৪:৫৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পরী গফফারকে ছোটবেলা থেকেই চিনতাম। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় তার ছেলে আসাদ আমাদের সাথেই পড়তো। আসাদকে দু-একবার জিজ্ঞাসাও করতাম, তার বাবার নামের আগে সবাই পরী যুক্ত করে কেন? আসাদ কিছু বলে না; শুধু হাসে।

একদিন বাড়ী ফিরে মাকে বললাম, ‘আমাদের সাথে আসাদ নামে একটা ছেলে পড়ে; তার বাবার নাম পরী গফফার’। মায়ের মুখ দেখে বুঝলাম মা পরী গফফারকে চেনে; মা বলে দিল, আসাদের সাথে বেশি না মিশতে। কারণ জিজ্ঞাসা করলে মা বললেন, ‘ছোট মানুষ, অতো কারণ জেনে কাজ নেই। মিশতে মানা করেছি, মিশবি না’। ধীরে ধীরে পরী গফফার সমন্ধে আমার কৌতুহল অবদমিত হয়ে গেল। ভাবলাম, পরী গফফার মানুষের নাম হতেই পারে। কারো বাবা-মা যদি কারো নাম রাখে, তো যে কারো নামের আগেই পরী, জ্বিন দৈত্য যে কোনো কিছু হতে পারে।
আসাদ বেশি লেখাপড়া করতে পারলো না। ওদের পরিবারে অভাব লেগেই থাকতো। ক্লাশ ফাইভের পর ও আর আমাদের মত হাই স্কুলে ভর্তি হলোনা। আমার মা যেন হাফ ছেড়ে বাঁচলেন। আমার মনে হলো, শুধু আমার নয়; আশেপাশের অনেকের অভিভাবকই যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল। কেউই চায় না তার সন্তান আসাদের সাথে মিশুক। কারণটা আসাদ নয়, তার বাবা পরী গফফার।
আমি যখন এসএসসি পরীক্ষা শেষ করলাম, বাড়ি থেকে বলা হলো, আমি মাস তিনেকের জন্য লেখাপড়া থেকে মুক্ত। ইচ্ছেমতো ঘোরাফেরা করতে পারি। নিজেকে বেশ স্বাধীন মনে হতে লাগলো। অভিভাবকের খবরদারিতে সত্যি বলতে কি আমি এতোদিনে নিজের গ্রামটাও ভাল করে দেখতে পারিনি, একটু কড়া শাসনে থাকতাম বলে। এসএসসি পরীক্ষার পর ঘোরাফেরা করার স্বাধীনতা পেয়ে নিজের গ্রামসহ আশেপাশের এলাকা চষে বেড়ালাম। আমার আরো দুই বন্ধু জুটেছিল, তছলিম আর মফিজ। আমাদের তিনজনের যেন এক নতুন জীবন শুরু হলো।
নানান রকম লোকের সাথে আমার ঐ সময়টায় পরিচয় হলো। তার মধ্যে একজন আমাদের গ্রামেরই ছাকা। ছোটবেলায় হয়তো তার নাম সাখাওয়াত জাতীয় কিছু রাখা হয়েছিল। তবে ছাকা হিসেবে এলাকায় সে একনামে পরিচিত। খেটে খাওয়া মানুষ। সারাদিনের কাজ শেষে প্রতি সন্ধ্যায় গল্প করতে বসে। মজার ব্যাপার হলো তার গল্পের শ্রোতারা কেউ তার বয়সী নয়। আমাদের মত ছেলে-ছোকড়ারা। তার বেশিরভাগ গল্পের বিষয়বস্তু জ্বিন, পরী, ভূত ইত্যাদি এবং সবগুলো ঘটনাতে সে নিজে কোনো না কোনোভাবে জড়িত। আমি জানি না, হয়তো সে ঘটনাগুলো বাড়িয়ে বাড়িয়ে বলতো।
ছাকার সাথে পরিচয় ঘটার পর পরী গফফার সমন্ধে আমার ছোটবেলার কৌতুহল আবার জেগে উঠল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আমাদের গ্রামের পরী গফফারকে চেনে কি না, তাকে সবাই পরী গফফার বলে কেন? আর কিছু জিজ্ঞাসা করতে হলো না। ছাকাই পরী গফফার সমন্ধে তার গল্পের হাঁড়ি খুলে দিল-
‘পরী গফফারকে তোরা এখন দেখিস একজন বুড়ো, রোগা লোক হিসেবে। ছোটবেলায় ও কিন্তু খুবই সুন্দর দেখতে ছিল। ওর দিকে তাকালে চোখ ফেরানো যেত না। তখন তো গ্রামে এত লোকজন ছিল না। তাই মানুষের চেয়ে জ্বিন-পরীদের আনাগোনা ছিল বেশি। গফফারের যখন বয়স ১২-১৩ বছর, ওর দিকে নজর পড়লো এক পরীর। যখনই গফফার একা থাকতো পরীটা ওকে দেখা দিতো। ওর সাথে গল্প করতো খেলা করতো। মানুষের আঁচ পেলেই উধাও হয়ে যেত। আমি নিজেও পরীটাকে দূর থেকে দেখেছি। গফফারের সাথে বসে আছে। আমি কাছে যেতেই আর নাই।’
আমরা তিন বন্ধু হুঁম হাঁ করে ছাকার গল্পে সায় দিতে লাগলাম। সে বলে চলল, ‘আমি একদিন গফফারের হাতে একটা আংটি দেখতে পাই। আংটির উপর আরবীতে কি যেন লেখা। আমি আংটি কোথায় পেলি জিজ্ঞাসা করতে গফফার আমাকে বলে আমি যেন কাউকে না বলি। ও আমাকে জানায় এটি তাকে তার পরী দিয়েছে, তার নাম ছায়াপরী। তার নামটিই আংটির উপর আরবীতে লেখা। গফফারের যখনই ছায়াপরীকে দেখতে ইচ্ছে করে তখন নাকি আংটির দিকে তাকিয়ে থাকেলই সে হাজির হয়। আমি কৌতুহলী হয়ে গফফারকে জিজ্ঞাসা করি, ‘ছায়াপরী কি তোকে বিয়ে করতে চায়?’ গফফার বললো, ছায়াপরী বলেছে মানুষের সাথে পরীদের বিয়ে সম্ভব নয়। কিন্তু সে যেন কখনও বিয়ে না করে। তাহলে সে গফফারের বংশ নির্বংশ করে দেবে।
এর কিছুদিন পরে একদিন গফফার হঠাৎ উধাও হয়ে যায়। সম্ভাব্য সব জায়গায় খুঁজেও তাকে পাওয়া যায় না। সবাই ধারণা করে গফফারকে পরী তুলে নিয়ে গেছে। গফফার ফিরে আসে তিন দিন পর। এক সন্ধ্যায় তাদের ঘরের চালে তাকে বসে থাকতে দেখা যায়। তার বাবা-মা তাকে নেমে আসতে বলে। কিন্তু মনে হয়, সে কিছু শুনতে পাচ্ছে না। শেষমেষ মসজিদের ইমাম সাহেবের পরামর্শে পরীকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়, গফফারকে ফিরিয়ে দিতে। তখন দেখা যায়, সে ধীরে ধীরে টিনের চাল বেয়ে নীচে নেমে আসছে। তার মা তাকে কোলে তুলে নেয়া মাত্রই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলে। মাথায় পানি ঢালার পর ধীরে ধীরে সে সুস্থ্য হয়ে ওঠে।
গফফার সুষ্থ্য হলে আমি তার প্রতি কৌতুহলী হয়ে উঠি। জিজ্ঞাসা করি ছায়াপরী তাকে কোথায় নিয়ে গিয়েছিল? গফফার সহজে বলতে চায় না। অনেক জোরাজোরি করার পরে সে জানায়, ছায়াপরী তাকে আকাশের উপরে নিয়ে গিয়েছিল সেখানে একটা বাগানের মধ্যে বসিয়ে তাকে অনেক মিষ্টি খাইয়েছে।
এরপর গফফার মাঝে মধ্যেই হারিয়ে যেত। ফিরে আসতো তিন চারদিন পর। প্রতিবার প্রায় একই রকম ভাবে তাকে পাওয়া যেত। কখনও ঘরের চালে, কখন গাছের মগডালে।
গফফার যুবক বয়সে পরিণত হলে তার পরিবার তাকে বিয়ে করাতে চায়। কিন্তু সে সবসময়ই বিয়ে করতে অসম্মতি জানায়। বলে বিয়ে করলে তাকে মেরে ফেলবে। পরিবারের অনুরোধে একসময় গফফার বিয়ে করে। কিন্তু তার উপর থেকে ছায়াপরীর নজর সরে না। পারিবারিক জীবনে সে সুখী হতে পারেনি। গফফারের বউ রাত বিরাতে নানান কিছু দেখে ভয় পেত। আসাদের জন্মের পর তার বউটি মারা যায়।
গফফারের সাথে কিন্তু এখনও ছায়াপরীর দেখা হয়। আশ্চর্য ব্যাপার হলো, ছায়াপরী নাকি এখনও দেখতে গফফারের ছোটবেলায় দেখা সেই পরীর মতোই। একটুও বয়স বাড়েনি। কারণটা কি তোরা কি জানিস? জ্বিন-পরীদের আয়ু হয় হাজার বছর। তাই একশ-দেড়শ বছর মানে জ্বিন-পরীদের কৈশোর।’
এতক্ষণে আমি একটু সুযোগ পাই ছাকাকে কিছু জিজ্ঞাসা করার। প্রশ্ন করি- ‘পরী গফফার তো আপনার বন্ধু মানুষ। তার কাছে কি সেই আংটিটা আছে? আমরা যদি দেখতে চাই তাহলে কি দেখাতে পারবে?’
‘ঐ হারামজাদা আংটিটা বেচে খেয়েছে বলেই তো ওর সারা জীবনে কোন উন্নতী হলো না। ছায়াপরী ওর উপর ভীষণ ক্ষ্যাপা। এমনকি ওর পরিবারের কারও সাথে যাদের বন্ধুত্ব, ছায়াপরী তাদেরও ক্ষতি করে।’ এতক্ষণে বুঝলাম, আসাদের সাথে মিশতে সবাই নিষেধ করে কেন?

প্রথম প্রকাশ: রহস্য পত্রিকা; অক্টোবর, ২০১২
১টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল: আমার বৈষয়িক ভাবনা

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৩০

এবার এসএসসিতে ৬ লাখ ৯০ হাজার পরীক্ষার্থী ফেল করেছে। ২২৬ মাদ্রাসায় একজনও পাশ করতে পারেনি। স্কুল মাদ্রাসা মিলিয়ে মোট সাড়ে তিনশোর কাছাকাছি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একজনও পাশ করেনি, শতভাগ ফেল!

এ নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

র-প্রধানের ঢাকা সফর: খবর শুনেই হাসপাতালে ভর্তি পাকিস্তানের হাইকমিশনার !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:১৭


রসিকতা বাদ দিয়ে বলি, দুটি ঘটনাই সত্যি। বাংলাদেশে RAW এর প্রধান পরাগ জৈন এসেছেন এবং পাকিস্তানের হাইকমিশনার এখন হাসপাতালে আছেন। দুটি ঘটনা আসলে পরস্পরবিচ্ছিন্ন, একটার সঙ্গে আরেকটার কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভেষজ চায়ের সঙ্গে আমার অব্যাহত প্রেম!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৩



ভেষজ চায়ের সঙ্গে আমার অব্যাহত প্রেম!

জীবনে অনেক কিছুই শেষ করেছি- কিন্তু ভেষজ চায়ের পরীক্ষা-নিরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি!
সবুজ চা, লেবু-আদা-তেজপাতা, দারুচিনি, এলাচ-লবঙ্গ, গোলমরিচ, পুদিনা-রোজেলা, জাফরান, জেসমিন থেকে শুরু... ...বাকিটুকু পড়ুন

আশা রাখি: কর্নেল (অব.) অলি আহমেদ রাষ্ট্রপতি হবেন

লিখেছেন অপলক , ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৮:৪০



আমার দেখা সকল রাষ্ট্রপতিগন ছিলেন ডায়াবেটিকস রোগীদের মত। যাদের রাজনৈতিক জীবনীশক্তি ছিল না বললেই চলে। প্রধানমন্ত্রীর অলিখিত আজ্ঞাবহ মাত্র। ফর্মালিটি আছে কিন্তু কাজের স্বকীয়তা ছিল না। কোন আইকোনিক ডিসিশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ মায়া

লিখেছেন সামিয়া, ১২ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৯:২৩


মানুষের জীবনে এমন কিছু মানুষ থাকে যাদের সঙ্গে সম্পর্কের কোনো পরিচয় দেওয়া যায় না। তাদের সঙ্গে ভালোবাসা থাকে, অথচ তাকে ভালোবাসা বলা যায় না। শ্রদ্ধা থাকে, অথচ শুধু শ্রদ্ধা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×