শীট গুলো হাতে নিয়ে আমি বললাম,"কয় কপি দোস্ত?"
রুপকথা হাসল,"তোর জন্য যদি করিস,তাইলে দুই কপি! লাগবে তোর?"
ক্লাসনোটগুলো নেড়ে চেড়ে দেখলাম এবার,আমার ও লাগবে।কিন্তু এইগুলো ফটোকপি করে পড়ার বিলাসিতা আমার নেই।বন্ধুর মোবাইল দিয়ে ছবি তুলে ল্যাপটপে পড়ব।কিন্তু সেই মধ্যবিত্ত তথ্যটুকু এই ধনীর দুলালিকে না দিলেও চলে।আমি বললাম,'লাগবে দোস্ত... দুই কপি করাবো তাইলে"
"আচ্ছা যা তাহলে,বিকালের মধ্যে দিলেই হবে"
আমি সপ্রশ্ন দৃষ্টিতে ওর দিকে কিছুক্ষন চেয়ে বললাম,"আচ্ছা যাই তাহলে,বিকেলে তোদের দারোয়ানের কাছে দিয়ে আসব"
রুপকথা আমার চোখের চুপকথা বুঝেনি,বুঝলে অন্তত ৫০ টা টাকা জোর করে ধরিয়ে দিয়ে বলত এইটা আমার ফটোকপি বিল... ও হয়ত ভেবেছে টাকাটা নিতে আমি অপমানিত বোধ করব... অথচ ও জানেনা এই ফটোকপির টাকাটার জন্য আমি আমার জাভা মোবাইলের ১৭ মেগাবাইট ইন্টারনেট এক সপ্তাহ নিতে পারবো না,বিকালে দুই দিন নাস্তা খেতে পারবো না!!
রুপকথা কোন দিনই আমাকে বোঝার চেষ্টা করেনি,আর সেই জন্যই আমি ঈশ্বরের কাছে খানিকটা কৃতজ্ঞ।যদি বোঝার চেষ্টা করত,তাহলে আমাকে কখনোই তার বেস্ট ফ্রেন্ড বানাতো না।
এই পর্যন্ত ৩৩ জন তাদের ভালবাসা প্রকাশ করে রুপকথার রাজ্যে ঝাটার বাড়ী খেয়েছে,আমি হতাম ৩৫ নাম্বার... আমাকেও ঝাটাবাড়ি খেয়ে ভাগতে হত।রুপকথা কখনো বোঝেনি আমি ওকে ভালবাসি,কখনো বুঝবেও না।
ও আচ্ছা,বলা হয়নি... ৩৫ বললাম,কারন ৩৪ নাম্বার জন হল কামরুল,সে এখন রুপকথার বয়ফ্রেন্ড!!
আমি ফটোকপি করে ওদের দারোয়ানকে দিতে যাচ্ছিলাম কপিগুলো,এমন সময় রুপকথা জানালা দিয়ে চিৎকার দিল,'নাফি!! বাসায় আয়! "
দরজা খুলতেই বলল,"দোস্ত একটা ভুল করে ফেলসি!"
"কি ভুল??"
"হারুন স্যারের খাতাটা তো তোকে দিতেই ভুলে গেছি... ওটাও এক কপি লাগবে!"
"অ আচ্ছা..."
"তুই তো এখন আবার কষ্ট করতে পারবি না... থাক,রাতে নাহয় আমিই যাবো"
আমি মনে মনে না হেসে পারলাম না,সরাসরি বললেই হয়...আমি বললাম,"আচ্ছা তোর যেতে হবেনা,আমিই করে দিব!!ব্যাপার না!! "
''উফফ নাফি... ইউ আর সো কিউট" বলে রুপকথা খুব স্বাভাবিকভাবেই আমাকে জড়িয়ে ধরল,এইটা নতুন কিছুনা... রুপকথার খুশির প্রকাশ এভাবেই,কিন্তু এত নিজের এত কাছে রুপকথাকে পেলে আমার মাথা ঝিম ঝিম করে,নরম শরীরটাকে বুকের সাথে শক্ত করে চেপে ধরার অস্থির রকমের একটা লোভ আমি আস্তে করে গোপন করি।আমি মুখে হাসি রেখে কপট রাগে বলি,"এই কুত্তি ছাড় তো!"
রাগ দেখে রুপকথা মজা পায়,"কেন??ছাড়বো না তোকে!"
"এতটা প্রশ্রয় সহ্য হবেনা তো!! "
এই কথা বলার পর রুপকথা আমাকে ছাড়লো,হাসি চেপে রেখে বলল,"খুব শেয়ানা হয়েছিস?তাই না?"
আমি ভেজা বিড়ালের মত তাকিয়ে থাকলাম,রুপকথা বলল,"তুই একটা বদ! আমার থেকে ১০০ হাত দূরে থাকবি!!"
আমি বললাম,"তোর গায়ে দুর্গন্ধ রে... এমনিতেই দূরে থাকতাম!"
রুপকথা এইবারে সত্যি সত্যি রাগ করে,তেড়ে এসে আমার চুল গুলো মুঠিতে নিয়ে বলে,"হারামী কুত্তা!!খুব কথা শিখেছিস , না??"
আমার ভাল লাগছিল... এই কপট ঝগড়ার তলে তলে যা আছে,সেইটাই পরম আস্বাদের বস্তু।এই ঝগড়া গুলোর জন্যই আমি ফটোকপিম্যান হয়ে থেকে যাই... পেইজের পর পেইজ ফটোকপি করে যাই এই কয়েকটা মুহুর্তের জন্যই।আমি জানি,মেয়েটা বন্ধুত্বের নাম দিয়ে আমাকে হয়তো ব্যবহার করছে,কিন্তু তার বিনিময়ে কিছু নির্ভেজাল বন্ধুত্বের সময় কাটাচ্ছি,এটাই আমার জন্য অনেক!
আমি জানি আমাদের রিলেশন সম্ভব নয়,রুপকথার উচিত ও না আমার মত ছন্নছাড়া কোন মধ্যবিত্ত ছেলেকে পছন্দ করা...আমার ও উচিত না ও কথা ভাবা,আগে পরে ফ্যামিলির দায়িত্ব নিতে হবে আমাকে,ছোট বোনটার বিয়ে দিতে হবে আমাকেই,অবসর নেয়া বৃদ্ধ পিতা আর কততুকু টেনে নেবে?
তবু এইসব সন্ধ্যে বেলায়... যখন রুপকথা ফোন করে বলে আমার মোবাইলে ২০ টা টাকা ভরে দিতে পা্রবি? আর আমি সেই টাকা ভরে দিয়ে এসে রুপকথার কথা চুপি চুপি ভাবি,এবং ঠিক সেই সময়ে আমার দেয়া টাকায় রুপকথা তার বয়ফ্রেন্ডের সাথে মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের কথা বলে,তখন কেন জানি... বুকের ভেতরে কোথায় যেন একটা অস্ফুট হাহাকার শুনতে পাই!!
এ সমাজে আসলে মধ্যবিত্ত হয়ে জন্মানোটা পাপ...আমরা কখনোই রুপকথাদের প্রেমিক হতে পারি না...
কখনো বেস্ট ফ্রেন্ড,কখনো শুধুই ফ্রেন্ড... এভারেজে ফটোকপিম্যান!!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


