somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বন্ধু তোমায় ভুলিনি আজো?

০৩ রা নভেম্বর, ২০১১ রাত ১১:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমার এক বন্ধু ছিল নাম বেলায়েত হোসেন। ২০০৬ সাল। বেলায়েত শেষ বর্ষের ছাত্র।বিশ্ববিদ্যালয়ে একসাথে পড়তাম একই বিষয়ে। এবং থাকতাম পাশা পাশি রুমে। পাশাপাশি থাকার করনে হৃদ্যতা যেটুকো হয় আমাদের মাঝেও তার কোন কমতি ছিলনা। ক্লাস এবং ক্লাসের বাইরে পড়াশোনাও একসাথেই হতো। আমরা এক ব্যাচে প্রাইভেট পড়তাম।
একবার তার পরামর্শে তিনদিনের জন্য তাবলিগেও যেতে রাজি হই। আমাদের পাঠানো হয় ঘোড়াশাল সার কারখানার আবাসিক এলাকার মসজিদে। তাবলিগের সাথে যাবার সময় সমরেশ মজুমদারের উত্তরাধিকার বইটি নিয়ে যাই। এবং মসজিদেই পড়ে শেষ করি। সারাদিন তাবলিগের নিয়ম শৃঙ্গলার মধ্যে থাকলেও রাত্র ফ্রি হয়ে যেতাম, আর আমরা দল বেধে হাটতে বের হতাম। রাতে যদিও কোন মেয়ে মানুষ থাকতোনা তবু আমাদের হাটতে ভালই লাগতো। বেলায়েতের সাথে সেই থেকেই সবচেয়ে ঘনিষ্টতা।

একদিন স্যারের বাসা থেকে পড়তে আসার পথে বেলায়েত আমাকে বলল আমার ঘাড়ে কেমন যেন ব্যথা করছে। আমি বলি রাত্রে ঘুমানোর সময় তোর ঘাড় বাঁকা হয়েছিল নিশ্চয়। কিন্তু তার দুইদিন পরও তার ব্যথা কমছেনা। সে চলে গেল বাড়িতে। আমাকে বলে গেল সবগুলো নোট সংগ্রহ করে রাখ আমি বাড়ি থেকে এসেই বেশি সময় নিয়ে সব শেষ করে ফেলবো। সে চলে গেল। আমিও সবই তার জন্য এক কপি করে রেখে দিচ্ছি। মাঝে মাঝে তার ফোন পাই। তার অবস্থা ভাল না। তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওযা হচ্ছে। আমি বললাম সমস্যা নেই । তোর নোট পত্তর যা কিছু আছে আমি ঠিক করে রখবো তুই নিশ্চিন্ত হতে পারিস। মাস খেনেক পরে সে আসলো গলায় মোটা একটি কি যেন লাগিয়ে।দেখতে অনেকটা ব্যান্ডেজের মতো। মাথা ঘাড় নাড়াচাড়া করা নিষেদ। আসছে জামা কাপর গুলো নিতে । বাড়িতে আরো কিছু দিন থাকা লাগবে। ডাক্তারের কাছে আরো যাওয়া লাগবে।

সে ডাক্তারের কাছে যাওয়া আসা করছে,আমিও তার কোন খোঁজ খবার নিচ্ছিনা। কিন্তু তার জন্য নোট সংগ্রহ করে যাচ্ছি সাধ্য মতো। এতদিন পরে আসবে যদি সব কিছু ঠিক ঠাক মতো না পায় তবে তো সমস্যা।

হঠাৎ একদিন খবর পেলাম বেলায়েত হাসপাতালে ভর্তি। তার বোন(bone) ক্যান্সার ধরা পরেছে। অপারেশন করাতে হবে।টাকার দরকার সাত লাখ। বেলায়েতের বাবা একজন কৃষক। সংসার কোন ভাবে চলে যায়। আমিও বেলায়েত দুজনই টিউশনি করে কোনরকমে টেনেটেনে নিজেদের চালাতাম। এই অবস্থায় অপারেশন? টাকা কোথায় পাব?
তার পর ডিপার্টমেন্ট থেকে কলেজ সবাই সহযোগিতার আশ্বাস দিল। আমরাও কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে হাত পাততে লাগলাম। কিন্তু কলেজে ছাত্র ছাত্রীদের কাছ থেকে যা পাওয়া গেল তা খুবই নগন্য। শিক্ষরাও দিল। কিন্তু সাত লক্ষ টাকা তো চারটি খানিক কথা নয়। আমরা দলে দলে দিন রাত কাজ করছি। চলে গেলাম বাজারে, দোকানে দোকানে, রাস্তায় রাস্তায়। সকালে বের হয়ে কোন রকমে ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরি। আবার সাকালে শুরো করি।
আমাদের মাঝে কেউ কেউ বেলায়েতের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে তার বাবা মায়েদের সাথে কথা বলে। আমি দীর্ঘ নিশ্বাস নিই। কেন জানি নিজেকে খুব অসহায় লাগে।
সকল সংগ্রহ একত্র করি। তবু অনেক টাকার সংকট। নানান জনের কাছে বুদ্ধি চাই। তারা নানা রকমের বুদ্ধি দেয়।একজন শিল্প বুদ্ধি দেয় ঢাকা থেকে ভাল কোন শিল্পি এনে কনসার্ট করা যেতে পারে, একজন তুলি শিল্প পরামর্শদেয় একটা একজিবিশন করা হতোক তার থেকে যত টাকা....। আমি মাথা দোলাই। মাস খানেক হতে চলল। আর কিছু দিন পর পর খবর পাই সময় খুব বেশি নয়। তার বাবা মা হাল ছেড়ে দিয়েছে। আমরাও কালেকশনে আর তেমন কোন সাড়া পাচ্ছিনা। দলের লোকজন কমতে শুরো করেছে। এই যে উৎসাহী লোকেরা ছিল। তারাও মনে হয় ক্লান্ত। ফোন দিলে বলে কাজ আছে কাল বের হবো। ইত্যাদি ইত্যাদি।

সিদ্ধান্ত নিলাম এবার বিত্তবানদের বাড়িতে হানা দেব। তাদের হাতের মুঠোয় যা ধরে তা দিয়েই হয়ে যাবে। যাদের এত বড় হাত এত বড় প্রাসাধ প্রতিম দালান। বিত্তবৈভব তারা নিশ্চয় আমাদের নিরাশ করবেন না।

নরসিংদী শহরের সকল ধনিদের দ্বারে দ্বারেই গিয়েছি। ধনিদের এপয়েন্টমেন্ট পাওয়া খুব কঠিন কাজ। এজন্য একদিনে তিন বারও যেতে হয়েছে। সবচেয়ে ধনি ,দানবীর বলে যারা পরিচিত ( ইচ্ছে করেই নাম বলাতেকে বিরত থাকলাম) তাদের কাছে ছুটে গেলাম। শুনেছি এদের বড় হাত আমাদের নিরাশ করবেন না। আমরা আর নিরাশ হতে চাইনা এবার সফল হতে চাই। গেটে গিয়ে শুনি " ছাব বড়ি নাই। কাইলকা আহেন"। কালকে গেলে বলে, একটা কাগজে সুন্দর করে সব লিখ্যা রাইখা যান ছাব এলে দেহামোনে" আমরা দরখাস্ত আকারে লিখে রেখে চলে আসি।

কোথাও কোথাও ড্রয়িং রুমে ঢুকতে পারলেও হাজার দুই এক টাকা নিয়েই চলে আসতে হয়েছে। আর বড় বাড়ি গুলোতে গেটেই দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে ঘন্টার পর ঘন্ট। মনে মনে একটা প্রশ্ন জাগে, আর কত টাকা হলে, আর কত বড় বাড়ি তৈরি করলে, সাধারণ মানুষের বাসার একটু জায়গা হবে??
এভাবে পাঁচ দিন গিয়ে এবার হাজার পাঁচেক টাকা পাওয়া গেছে। মনে হয় দশ দিন ঘোরলে দশ হাজার পেতে পারতাম। যা হোক টাকা পেয়ে আমরা ফিরে আসলাম কলেজে, পরদিন টাকা নিয়ে কে কে বেলায়েতের বাড়ি যাবে? সবাই গেলে খরচ বেশি হয়ে যাবে? মাস খানেক ধরে আমাদের টিউশনিও নিয়মিত যেতে পারছিনা। ঠিক হলো তিনজন যাবে। সর্বমোট কত টাকা সংগ্রহ করতে পেরেছি বা শেষ দিন কত টাকা নিয়েই যাচ্ছে আমার জানা নেই। টাকার হিসাব থেকে আমি খুব দুরে থাকি ।এই তিনজনই টাকার সকল হিসাব নিকাশ করছে, এবং পরিশ্রমটাও অনেকের তুলনায় বেশি করেছে।তারা বেলায়েতের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুও। সকালে যাবার পালা। কিন্তু রাতেই খবর এল বেলায়েত মারা গেছে।

সারা কলেজে শোক ঘোষনা করা হলো। কাল ব্যানার ঝুলিয়ে দেয়া হলো সকল ডিপার্টমেন্টে, কাল ব্যাজ ধারন করলে ছাত্র শিক্ষরা। কলেজ বাস সহ কয়েকটি বাস ভাড়া করা হলো বেলায়েতের শেষ আনুষ্ঠানিক বিদায় জানোর জন্য। চেনা অচেনা অনেকেউ গেল। কিন্তু আমি থেকে গেলাম । টাকা হলেই যাকে জীবন দিতে পারতাম। মাত্র তো সাত লক্ষ টাকা। কোন মুখ নিয়ে দাঁড়াতাম বন্ধুর সামনে?
৫টি মন্তব্য ৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×