২০০১ সাল। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হলো। আমার এইচএসসি পরীক্ষা শেষ হয়েছে। ফলাফলের জন্য বসে আছি। কোন কাজ নেই।বাবার দেয়া কাজ ছেলেরা যেমন না করে থাকার চেষ্টা করে , তেমনই আমিও। ফাঁকি দেই। কাজের সম্ভাবনা থাকলে সকালেই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যাই। আমাকে সরাদিন খুঁজে পাওয়াই কঠিন। অবসর আর জাতীয় নির্বাচন আসে এক সাথে। আমাদের পারিবারীক ভাবে সবাই আওয়ামিলীগ করে। উত্তরাধীকার সূত্রে আমি আওয়ামীলিগের করার প্রেরণা পাই।
নির্বাচনি উত্তেজনা আমার শরীর থেকে মনে এবং মন থেকে শরীরে। স্থানীয় এক বড় নেতার গোয়াল ঘর ছিল রাস্তার সাথেই। সেটাকে ধুয়ে মুছে তৈরি করি নির্বাচনি অফিস। গরুর ঘরকে নির্বাচনী অফিস করার ব্যপারে আমাদের মাঝে কোন আপত্তি এলনা। গরুর ঘরে মানুষ থাকাটা এতটা স্বাভাবিক কি করে হলো ? হয়তো গরু আর মানুষের মাঝে পার্থক্য কারা মতো অবস্থা ছিলনা। নির্বাচনি উত্তেজনা মনে হয় এমনই। মানুষ আর পশুর মাঝে যে পার্থক্য তা ভুলিয়ে দেয় তার উদাহরন অনেক আছে। যা হোক , রাত জেগে বানানো হয় বড় একটা নৌকা, সাজানো হয় লাল নীল কাপড়ে, রাতে মরিচ বাতিতে ঝকমক করে।
সকালে বেড়িয়ে রাতে ফিরি, কোন দিন পার্টি অফিসেই রাত কাটাই। সারাদিন পার্টির জন্য, খাটি। আমার বাবা আবার আওয়ামিলীগের ছোট খাট নেতা। যদিও কোন কমিটিতে ওনার নাম কখনো দেখিনি। কিন্তু এই পরিচয় দিতে বাবা খুব গর্ববোধ করতেন। এবং এমন বাবার পুত্র হিসেব আমিও অহংকার করতাম। অতএব আওয়ামীলীগের হয়ে কাজ করি এটা বাবার জন্য খুশির খবর। তিনি আমাকে আরো উৎসাহিত করেন। বাবা ছেলে একই মিছিলে নৌকা আর শেখহাসিনার বন্ধনা করি। আমার কলেজের এক স্যারও তখন আওয়ামীলিগের মাঠের কর্মী। তিনি মিছিলের সকল ব্যপার গুলো দেখাশোনা করেন। তিনি আমাদের জাকির স্যার। মিছিলে বাবার হাত ধরে না থাকতে পারলেও, স্যারের হাতে হাত রেখে মিছিল করেছি। এটা আমার গর্বের বিষয় ছিল।
আসলে এখনকার চেয়ে আগে অনেক হাবাগোবা ছিলাম। একবার সামনে তাকিয়ে থাকলে চারপাশে কিছু দেখতাম না। অতএব ছিলাম আওয়ামী অন্তপ্রাণ। রাত জেগে পোষ্টার লাগানো, দেয়ালে দেয়ালে নৌকা তৈরি করা। বড় বড় করে লিখতাম। "আসবে আবার শুভদিন নৌকা মার্কায় ভোট দিন"। তখন শুভদিন ব্যপারটা কি বুঝতাম না। আমার মনে হতো আওয়ামিলীগ নিশ্চয় শুভদিনের স্রস্টা। আওয়ামিলীগ ছাড়া কোন ভাবেই শুভ দিন আসতে পারেনা।
মিছিল করতে করতে আমার রাস্তা কাঁপিয়ে দিতাম। বিরোধি দলের বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আমাদের গলায় যতজোর আছে সবটাই ব্যবহার করতাম। ভাবটা এমন যেন এই চিৎকারের উপরই দলের জয় পরাজয় নির্ভর করছে। অতএব আমরা একটু খামখেয়ালি করে যদি আস্তে আস্তে বলি আর এই জন্য যদি দল পরাজিত হয় তবে মুখ দেখানো যাবেনা। রাত জেগে দেয়ালে চিকা মারার সময় সব সময় বিএনপি নেতাদের দেয়ালে নৌকা বানাতে বেশি আনন্দ পেতাম। একবার যদি কারো দেয়ালে নৌকা বানিয়ে দিতে পারি তবেই কাজ হয়েছে। মানুষ হয়তো মনে করবে তিনি নৌকাতে যোগদান করেছে। আর সকল নেতাকর্মীদের কেউ কেউ তাদের দেয়াল গুলোকে অন্য দলের আক্রমন থেকে রক্ষা করতে রাত জেগে পাহারাও দিতেন। আর সেই পাহারা ফাঁকি দিয়ে তার ঘরে নৌকা একে দেয়ার যে কি আনন্দ তা বলে বোঝানো যাবেনা।
জয়নাল হাজারি তখন সম্পুর্ন ফর্মে, তার স্তুতির গান ক্যাসেট আকারে বাজারে পাওয়া যাচ্ছে। শামিম ওসমানকে বলতাম বাঘের বাচ্চা।( নারায়নগঞ্জের সিটি নির্বাচনে অবশ্য সেই বাঘ শব্দটা নামের আগে রাখতে পারেন নাই। কিন্তু তিনি যে একটা বাচ্চা তা আমরা বুঝতে পেরেছি। অনেকেই এও বুঝতে পেরেছেন তিনি আসলে কিসের বাচ্চা)। এমনই নানা নেতা কর্মিদের গুনগান গেয়ে আমাদের দিন কাটছে। প্রতিদিন হিসেব করি , আওয়ামী লীগ কয়টা আসন পাচ্ছে? বি এনপি কয়টা আসন পাচ্ছে,জামাত,কয়টা, জাতীয় পার্টি কয়টা। প্রতিদিনই মিছিল করার পরে, অল্প কিছু বিস্কুট খেতে দিত। তাতেই আমরা খুশি। পাশের বিএনপি অফিসে এরচেয়ে অনেক কম দেয় এটা ভেবে আমরা তাদের উপহাস করতাম। রাত বাড়তে থাকলে আমাদের সিনিয়র নেতাকর্মীরা আসতেন, তারা হিসেব করে দেখাতেন , চারদলীয় জোট বড়জোর দশটা আসন পায়। খুব বেশি হলে পনেরটা। পনেরটা বলার সাথে সাথেই আমরা না না বলে উঠতাম। কোন ভাবেই পনেরটা আসন তাদের দিতে চাইতাম না। আমরা সবাই একমত হবে যে চারদলীয় জোট বড়জোর দশটাই পেতে পারে। এর বেশি কোন ভাবেই নয়। মানুষ কেন বিএনপি কে ভোট দিবে ? আওয়ামীলিগ কত ভাল রাষ্ট্র চালিয়েছে। সব দিকে কত সুনাম। এর পরও কেউ যদি পাগল না হয় তবে চারদলকে কোন ভোটই দেবেনা। এই দেশে পাগল আর হুজুর মিলেয়ে ১০টা আসনের বেশি ভোট কি ভাবে পাওয়া সম্ভব। এত পাগল আর এত জামাতী হুজুর থাকা সম্ভব নয়।
আমাদের দেশে জামাতি হুজুরের সংখ্যা এখনো কম। কিন্তু পাগলের সংখ্যা বেশি। পাগল যেমন নিজেকে কখনো পাগল বলেনা। আমরাও বলতাম না। এখন যখন বড় দুটি দলের ঘোর সমর্থকদের দেখি খুব হাসি পায়। আমি আমার পাগলামি সময়টাতে একবার ঘুড়ে আসি।
নির্বাচনে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতাম আমি এবং আমার এক বন্ধু আরাফাত ( এটা মিথ্যা নাম)। আমার তো পরীক্ষা শেষ কিন্তু আরাফাত তখন ডিগ্রী পরে, নিবার্চনের পরেই তার পরীক্ষা। সে সারাদিনই অফিসে আসা যাওয়া করে, আর বার বার বলে তার পরীক্ষা। নির্বাচন নিয়ে তারও আগ্রহ প্রচুর। কিন্তু বাড়ি থেকে রাজি করানোটা কঠিন। সে নিজেও পরীক্ষা নিয়ে অনেক চিন্তিত। একদিন আমরা দশ বারজন বসে আছি। আরাফাত এল। এসেই তার পরীক্ষার বয়ান শুরো করলো। পরীক্ষা না থাকলে সে এই করতো সেই করতো ইত্যাদি ইত্যাদি। আমরাও তার কথায় তাল দিই। এবং আমি বিশ্বাসই করতাম যে সে এসব করতো। আসলে অবিশ্বাস করার ক্ষমতা তখন আমার ছিলনা। এক সময় আমার এক চাচাত ভাই,শামিম বলল, দেখ আরাফাত। আমাদের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আসে প্রতি পাঁচ বছর পরে পরে। আর যদি এরশাদ সরকারের মতো কেউ ক্ষমতায় আসে তবে ধর দশ বছর পরে । আজ থেকে দশ বছর পরে যদি আবার নির্বাচন আসে তখন আমরা কে কি করবো তা কি বলতে পারি? নির্বাচনটা একটা অনেক বড় ব্যপার। দেশ শাসন করাটা তো চারটি খানিক কথা না। আমি তার সাথে মাথা দোলালাম। ঠিক, দেখলাম আরো কয়েক জনের মাথা নড়ছে। তারাও বলছে ঠিক।
শামিম আবারো শুরো করে। আর পরীক্ষাটা তো প্রতিবছরই হচ্ছে। তুই ইচ্ছে করলে সামনের বছরেই আর একটা পরীক্ষা দিতে পারবি। একবছর দেরি হলে কি এমন হবে? না হলে একবছর চাকরি কম করলি। আর বাড়িতে তোর ভাতের কোন অভাব নাই। আমার কাছে কথাটা খুব ভাল লাগলো। মনে হলো এমন কথা যদি আমার পরীক্ষার আগে কেউ বলতো আমি নিশ্চিত পরীক্ষাটা পরের বছর দিতাম। নির্বাচন করার এমন সুযোগ তো হাত ছাড়া করা যায়না। আমি সবার আগে বললাম আরাফাত শোন। তুমি কাল থেকে নিয়মিত আসো। আমরা নির্বাচনির যে প্রচারনা কমিটি করবো তোমাকে দেব সভাপতি। সবাই একসাথে রাজি হলো। একমাত্র আরাফাতই আমাদের মাঝে সবচেয়ে লেখাপড়া জানা মানুষ। তারই এই পদ নেয়া উচিত। যদিও আমার মনে মনে একটা কষ্ট লাগলো। সে না আসলে এই পদ আমিই পেতাম। তবু আমার বন্ধু হিসেবে খুব একটা খারাপ লাগলোনা। তাকে বরণ করে নিলাম। পরদিন থেকে আরাফাত কাজে লেগে গেল। আমরা মহা ধুমধামে নির্বাচন করতে লাগলাম।
নির্বাচনের পরে আরাফাত পরীক্ষায় অংশগ্রহন করে এবং কোন লেখাপড়া না করেও কি ভাবে যেন পাশ করে ফেলে। হতে পারে বড় নেত্রীর দোয়া থাকলে সবই হয়।
তো সেই নির্বাচনের ফলাফল সবাই জানেন। বিড়াট ব্যবধানে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। তবে খুশির কথা হচ্ছে। আমাদের প্রার্থি কিন্তু জয়লাভ করে। কিন্তু সরকার যেহেতু চারদলীয় জোট করছে তাই জয়ের উৎসবটা খুব সাদামাটা হল।
সেই উৎসব নিয়েও একটা মজার ঘটনা আছে।
https://chourongi.wordpress.com/
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই নভেম্বর, ২০১১ সকাল ৯:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


