আমার দুজন ক্লাসমেট এবং কলেজ মসজিদের ঈমাম আমাকে খুব করে ধরেছেন, তিন দিনের জন্য তাবলীগে যেতে। আমাকে শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হলো। কলেজ মসজিদ থেকে সবসময় বৃহস্পতিবার তাবলীগ যায় শনিবার বা রবিবার ফিরে আসে। আমি ঈমাম সাহেব কে বললাম। আচ্ছা শনিবারে গেলে হয়না? তিনি বিনয়ের সঙ্গে জানালেন, না হয়না। এটা নিয়ম, বৃহস্পতি বারই যেতে হয়। আমি প্রশ্ন করতে চাইছিলাম, অন্যদিন গেলে সমস্যা কোথায়? কিন্তু করিনি হুজুরেরা এসব প্রশ্নের উত্তর দিতে পছন্দ করেন না।
তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করলেন , বৃহস্পতিবার গেলে তোমার কি সমস্যা হয়?
আমি ততোধিক বিনয়ের সাথে বল্লাম, শিল্পকলায় আমার আবৃত্তি এবং নাটকের ক্লাস আছে। এসব মিস করতে ইচ্ছে করছেনা।
তিনি উত্তরে বললেন আল্লার পথে চলে আস এর চেয়ে অনেক বেশি মজা লাগবে। একবার এসে দেখ আর এসব আলতুফালতু কাজ করতে ইচ্ছেই করবেনা। আমি মাথা দুলিয়ে বললাম ঠিক আছে। বৃহস্পতিবারেই যাব।
আমরা সবাই একটা করে কম্বল,বালিশ এবং ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম। আমাদের লিডারের নিকট যাতায়ত, খাওয়া দাওয়া ও খরচ বাবদ একশত টাক দিলাম।(পুরো টাকাটা তিন দিনে খরচ হয়নি, কিছু টাকা আবার ফিরে পেয়েছি)।
না তখনো ধর্মের প্রতি আমার কোন আগ্রহ ছিলনা। কিন্তু আমার ডিপার্টমেন্টের এক মাস্তান স্যার এই গ্রুপে তাবলিগে যাচ্ছেন। আমার আর না যেয়ে উপায় ছিলনা।
স্যারকে মাস্তান বলা মনে হয় ঠিক হয়নি।
হুম, তা ঠিক হয়নি। কিন্তু আর ভাল কোন বিশেষণ এই মুহূর্তে মনে পরছেনা।
ধরি তার নাম নাসিরুদ্দিন হুজ্জা। গায়ের রং সাদা না হলেও তিনি সুদর্শন, প্রতিদিন ক্লিন সেভ করেন, আর্মিদের মতো চুল কাটেন,পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন সারাদিন। করেন শিক্ষক রাজনীতি, এবং নিবার্চনে বিজয়ী হন। আগে দু একটা ক্লাস করতেন, এখন আর সময় করতে পারেন না। রাজনীতিতে কি কাজের অভাব আছে? তার পর নানান ডিপার্টমেন্টে অনুষ্ঠানে ডাক পরে, তাকে কখনো ভাল বক্তব্য দিতে দেখিনি কিন্তু কোন অনুষ্ঠান মিস করতেও দেখিনি।
মনে হয় আবেগের বশে বেশি বদনাম বলে ফেললাম। কিন্তু তা নয় মাত্র শুরো করলাম। (যারা পরনিন্দা পছন্দ করেন না তারা বাকিটা পড়া থেকে বিরত থাকতে পারেন।)
তিনি ক্লাসে আসলেই বড়বড় কথার বহর ছুটতো,আমি ক্লাস করার পরে এসব আর দেখার দরকার হবেনা। আমি তো আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র না। চিটগাং বিশ্ববিদ্যালয় সেরা আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আবর্জনা। এই স্লোগানটা তিনি ইংরেজীতে দিতেন। এই তো আর দু একটা ক্লাস করলেই সিলেবাস শেষ হয়ে যাবে কিন্তু সেই দু একটা ক্লাস কখনোই করা হতো না।
আমরা তখন ২য় বর্ষে আমাদের নন-মেজর বিষয় হিসেবে নিতে হবে, পদার্থ অথবা রসায়ন। গণীতের ছাত্র ছাত্রীরা এই দুইটাই সচরাচর নিয়ে থাকে। আমরাও তাই নেব ভেবেছি। কিন্তু তিনি আমাদের প্রথমে উদ্ভুদ্ধ করলে পরিসংখ্যানের প্রতি এবং শেষে বাধ্য করলেন পরিসংখ্যান নিতে। আমাদের কলেজে তখনো পরিসংখ্যানে অনার্স চালু হয় নি। এই বিষয়ের কোন শিক্ষকও নেই। আমাদের মনে প্রশ্ন এসেছে তবে পড়াবে কে?
হুজ্জা স্যারের সহজ উত্তর। তিনি পড়াবেন, তার তার সাবসিডিয়ারি হিসেব পরিসংখ্যান ছিল। একটু দেখলেই তিনি পারবেন। আমাদের শিক্ষা নিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত জুয়া খেললেন,এবং আমাদে পথি বসিয়ে তবেই শান্তি পেলেন।
হুজ্জা তার পূর্ব কমিটমেন্টের মতো এটিও রক্ষা করলেন না। এক দিনের জন্যও ক্লাসে আসেন নি। বিপদ যখন মাথার উপর সবাই এদিক সেদিক, শিক্ষকের জন্য ছুটাছুটি করতে লাগলেন। দল বেঁধে সবাই ঢাকা এসে প্রাইভেট পরতে লাগলো। আমিও মাঝে মধ্যে তাদের সাথে আসি। বেশির ভাগ সময়ই আসা হয়না। সপ্তাহে তিন দিন ঢাকায় আসার মতো অর্থনৈতিক অবস্থা তখন ছিলনা।
পরীক্ষার পরে দেখা গেল একজনও ৪০% এর বেশী নাম্বার পায়নি, এবং ফেলের সংখ্যাও অনেক। আমাকে দ্বিতীয় বার দিয়েও ফল আরো খারাপ হলো। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের তখন নতুন কারিকোলামের কারনে অন্যান্য বিষয়ের নাম্বার দিয়ে কোন রকমে অনার্স পার পেলাম।
দু একজন আঁতেল ছাড়া কেউই হুজ্জাকে পছন্দ করতেন না। আমিও তাকে পছন্দ করতাম না, এবং হুজ্জা স্যারও আমাকে পছন্দ করতেন না।
ক্লাসে ঢুকে তিনি নিজের বিষয় পড়ানোর চেয়ে পান্ডিত্য জাহির করতে বেশি পছন্দ করতেন।আল্লার উপর হুজ্জার গভীর আস্থা সেটা সবাইকে দেখানোর চেষ্টায় থাকতেন। আইনস্টাইনের সুত্র দিয়ে দেখাতেন আল্লা আছে, নবী মেরাজ গিয়েছিল এটা বিজ্ঞান বিশ্বাস করে। ভুল ভাবে সবসময়ই মহাবিশ্বের ব্যখ্যা দিতেন। প্রশ্ন করলেই তিনি ক্ষপে যেতেন, পারত পক্ষে তার ক্লাসে কেউ প্রশ্ন করতোনা। ভাল ছাত্ররা স্যারের বিরাগ ভাজন হওয়ার ভয়ে সব কিছুতেই জ্বী হুজুর করতে থাকতো। আমি যেহেতু ভাল ছাত্র না এবং ধর্মের প্রতিও আস্থা নেই তাই আমি প্রশ্ন না করে থাকতে পারতাম না।
সেদিন আল্লার কুদরত বর্ণনা করতে করতে আর ব্যলেন্স করতে পারলেন না। বলে বসলেন মঙ্গল গ্রহে প্লট বুকিং চলছে। আমি সাথে সাথে বললাম স্যার চাঁদে হচ্ছে, মঙ্গলে না। মঙ্গল গ্রহে তো...
এই ছেলে,পড়াশোনা কর কিছু, নিজের বইতো পড়তে বসনা, হোস্টেলে খুঁজে পাওয়া যায়না, অন্য বই পড়বে কখন, এটা মঙ্গল গ্রহেই। না জেনে তর্ক করবেনা। মজার ব্যপার হলো আমার সহপাঠীদের অনেকেই স্যারের কথায় সম্মতি দিতে শুরো করলেন। আমি বাধ্য হয়ে চুপ করে গেলাম।
ব্যবহারিক পরীক্ষার ফি বাড়িয়ে তিন গুন করা হলো। প্রতিবাদ করে ক্লাসে জীবনের প্রথম কথা বললাম।এটা স্যারের কানে গেল(যদিও ফি কমাতে বাধ্য হয়েছিল) এবং আমাকে দেখে নেবার হুমকি পর্যন্ত তিনি দিলেন।
সবচেয়ে মজার ব্যপারটা ঘটেছে। হাইড্রো-ডাইনামিক্স পড়ানোর সময়। একটা থিউরি বুঝাতে তিনি দুইটা কোন কে সমান ধরে প্রমানের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। (সহজ করে বলি:মাটিতে যদি একটা বাঁশ পুতা হয়। বাঁশের উপরের মাথায় এবং ঠিক মাঝে যদি দুইটা রশি বাঁধা হয়। এবং রশির অপর দুই প্রান্ত এক সাথে করে দুরে মাটিতে একটি খুটিতে বাঁধা হয়। তবে রশি দুইটি বাঁশের সাথে যে কোন উৎপন্ন করবে তারা কখনোই সমান হবেনা।, ব্যপারটা ছিল এমন)কিন্তু আমাদের মহান স্যার বার বার সমান ধরে প্রমানের চেষ্টা করছেন। আমি দাঁড়িয়ে যখন বললাম স্যার এই দুটি কোন কখনোই সমান হতে পারেনা।
বলতেই প্রথম বাঁধাটি আসলো আমার পাশে বসা এক ছাত্রের কাছ থেকে। সে আমাকে টেনে বসিয়ে দিতে চাচ্ছে। এবং স্যার কে বলছে ঠিক আছে স্যার , তার পর কি হবে স্যার?
আমি এবার তার উপর চরম ক্ষেপে গেলাম। এই তুমি আমার হাত ধরে টানছ কেন? কি ভাবে হয় সমান? যাও বুঝিয়ে দাও। স্যার এইবার বললেন ঠিক আছে আমরা এটা অন্য ভাবেও প্রমান করতে পারি। তবু তিনি এটা বলেন নি যে এটা সমান হওয়া সম্ভব নয়।
সেই স্যার যদি বলেন তবে না যেয়ে উপায় আছে?
আমি রাজি হলাম, তিন দিনইতো সময়। সাথে নিলাম গর্ভধারিনী , এবং মসজিদে বসেই তা শেষ করলাম।(এজন্য আমাকে বইটার মলাটের উপর আরবি লেখা একটা মলাট লাগাতে হয়েছে)।এই ঘটনা আমি সহপাঠিদেরও বলিনি। ধর্ম নিয়ে তারা হয়তো কোন চোদরবোদর সহ্য করতেন না এই ভেবে।
আগে থেকেই নামাজ ঠিক মতো পড়তাম না। কিন্তু মাঝে মাঝে শুক্রবার সবার সাথে মসজিদে যেতাম। তাবলীগ থেকে আসার পর আনুষ্ঠানিক ভাবে তা বন্ধ করলাম।
৩য় বর্ষের ভাইভা পরীক্ষা দেয়ার সময় বিশেষ প্রয়োজনে হুজ্জা স্যার কলেজের বাইরে ছিলেন এবং কাকতালীয় ভাবে আমি সবচেয়ে বেশি নাম্বার পেয়ে যাই। আর যতগুলো ভাইভা হয়েছে প্রতিটাতেই তিনি ছিলেন , আর আমি কোন ভাবে পাশ করেছি।
হুজ্জা স্যারের সাথে আমার শেষ দেখা হলো ২০১১ বই মেলায়। আমার কলেজ ছেড়ে দেয়ার চার বছর পর । তিনি এখন আছেন নায়েম এ নায়েম এর একটি স্টলে বই বিক্রি করছেন। আমরা অনেকেই এসেছি মেলায়। প্রায় পনের জন। নোয়াখালী, মৌলভীবাজারে ,কুষ্টিয়ার বন্ধুরাও আছে। আমার সাথে আর একজন আছে যে স্যারে খুব প্রিয় ছিলেন। আমার এক বছরের সিনিয়র, গণিতে ফাস্ট ক্লাস পেয়েছেন। তাকে দেখেই স্যার কুশল জানতে চাইলেন, কথা বার্তা বললেন। এবার আমার দিকে ফিরে জানতে চইলেন: তুমি কি অনার্সটা শেষ করতে পেরেছ?
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে নভেম্বর, ২০১১ রাত ১২:১৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


