হোস্টেলে আমরা তখন শেষ বর্ষের ছাত্র। আরো নতুন দুটি ভবনের জন্য টাকা বরাদ্ধ হলো। দেখতে না দেখতে মাঠের পূর্বপাশে কাজ শুরো হয়ে গেল। ফাউন্ডেশানের কাজের জন্য গর্তকরে মাটি উপরে ফেলছে। আমরা দল বেঁধে এই বিষ্মিত হয়ে দেখি। এটা কি দেখার মতো কোন কাজ? গর্ত থেকে কামলারা মাটি কাটে। তবু ঘন্টার পর ঘন্টা তাকিয়ে থাকি। অকারনে সময় নষ্ট করার মাঝে একটা অনন্দ আছে।
হঠৎ একদিন দেখি কাজ বন্ধ। লোকজন নাই। সকালে যাই, বিকালে যাই। কোদাল নেই, শ্রমিক নেই, কাজ নেই। আমার সারাদিন আর কাটেনা।খোঁজে নিতে গেলাম।
যখন সময় আর কাটেই না । অল্প কয়েক দিনে এই মাটি কাটা দেখে মোটামোটি অভ্যস্ত হয়ে গেছি। এখন আর থাকাই যাচ্ছেনা, খোঁজে খবর করে জানতে পারলাম রাজনৈতিক নেতাদের সাথে এই ভবনের নির্মান কোম্পানির কি ঝামেলা হচ্ছে। পরের দিন দেখলাম কলেজ সংসদ ভবনে বেশ উত্তেজনা । কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কি এমন হতে পারে ?
এই ঘটনায় রটনাও হল অনেক। আমাদে হোস্টেলের ছাত্ররাও দেখলাম , কনট্রাকদারে উপর ভিষণ ক্ষেপা।ইন্জিনিয়ারা কি দুই নম্বার কাজ করছিল তাই আমাদের ছাত্র নেতারা বাধা দিয়েছে? এত ভাল কাজে তো তাদের কখনো দেখি নাই। মানুষের শুভ বুদ্ধি তো উদয় হতেপারে।
কিন্তু ভুল ভাঙ্গতে সময় লাগলোনা,এবং একটি ভুল ভাঙ্গার সাথে সাথে দুটো শিক্ষাও হলো। বলা যায় উচিৎ শিক্ষা। এই সুযোগে নিজের জ্ঞান কিছুটা বাড়িয়ে নিলাম।
প্রথমটা হচ্ছে, যে কোন নির্মাণ কাজে রাজনৈতিক ক্ষমাতাশীল দলের নেতাদের জন্য একটা বরাদ্ধ রাখতে হয়। এই বরাদ্ধ কম হলে কাজ শুরুর পরে যে কোন দিন কাজ থেমে যেতে পারে।
দ্বিতীয় হচ্ছে, আবাসিক হোটেলে নির্মাণ কাজের টাকা থেকে ছাত্রদের একবেলা বিশেষ খাবারের আয়োজন করতে হয়। এই আয়োজনটি ভিপি এবং জিএস এর তত্বাবধানে হয়ে থাকে।
দ্বিতীয় কারনটির জন্য প্রতিক্রিয়া কেমন হতেপারে তা অনুমান করতে পারি নাই। তাই অপেক্ষা করছি বিষয়টা কি হয় দেখার জন্য। নির্মাণ কাজ দেখতে না পারলেও রাজনৈতিক অথাব অনৈতিক উত্তেজনা দেখার সুযোগ পেলাম। এখানে সেখানে যেখানেই কয়েক জনের জটলা হয় আমি প্রবল উৎসাহে কাছে গিয়ে শুনি। আর অপেক্ষা করি বিশেষ খাবারটা কখন কি ভাবে আসে দেখার জন্য।
রাতে মিটিং ডাকা হলো। নানা বক্তৃতা দেয়া হচ্ছে, মত এবং মতামত নেয়া হচ্ছে। আমি শুনে যাচ্ছি, হঠাৎ নিজের অজান্তেই হাত তুললাম। এবার সবাই আমার দিকে তাকাল। এবং কিছু বলার জন্য সময় দিল। আমি আস্তে আস্তে চিঁচিঁ গলায় বললাম, আমরা নিজেরাই তো চাঁদা তুলে একটা আয়োজন করতে পারি, কনট্রাকদারের টাকার কি দরকার? একটা গুঞ্জন শুরো হলো। একজন আমাকে বসতে বলল। তার পর এক বড় ভাই বয়ান দিলেন এটাই নিয়ম, অনেক দিন ধরে আমাদের কলেজে কোন বড় কাজ হচ্ছেনা তাই আমরা এই সুযোগ পাচ্ছিনা। এবার হাত ছাড়া করবো কেন?
এরকম ঘটনা আগে কোথায় কোথায় ঘটেছে, ইত্যাদি নিয়ে অভিজ্ঞতা বর্ণনা শুরো হলো। আমি একটা দীর্ঘ নিশ্বাস নিয়ে বসে পরলাম । আর কিছু বললাম না। নিয়মের বাইরে তো আর কিছু করার নেই। পালন করাই সবচেয়ে ভাল। আমরা কত কিছুই তো ঐতিহ্য অনুসারে পালন করছি। বাংলা নববর্ষের দিন সকলে পান্তা ইলিশ, একুশে ফ্রেব্রয়ারীতে সেজে গুজে, আনন্দ করতে করতে, ফুল হাতে শোক উৎসব করতে যাই। বিজয় দিবসে মাইকে দেশের গান বাজাই।
আমার বন্ধু একবার অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পরে সব হারিয়েছে, সাত দিন হাসপাতালে থাকার পরে সুস্থ হয়ে হোস্টেলে ফিরে আসে। সবাই তাকে তার আহম্মকির জন্য উপদেশ দিতে থাকে।
একবার কয়েকজন ছিনতাইকারি আমার মানি ব্যগ এবং মাথা থেকে ক্যাপ খুলে নিয়ে যায়। এবাও আহম্মিকর জন্য সবার গাল মন্দ খেলাম।
চাঁদার টাকার জন্য যখন হোস্টেলের নির্মান কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ছাত্রদের একবেলা খাওয়ানোর জন্য যখন কটাকদারকে হুমকি দেয়া হয়। এসব ন্যায় নাকি অন্যায় সাধারন ছাত্ররা কি তা জানেনা? জানে। ভাল করেই জানে।
আমাদের ট্রেন সব সময়ই লেটে আসে। আমরা তাই বাসা থেকে লেটে বের হই। এবং কখনোই ট্রেন হারাই না। আমরাও অভ্যস্ত হয়ে গেছি। কিন্তু কখনো যদি ট্রেন সময় মতো আসে আমরা চরম বিরক্ত। হয়তো ট্রেনের চৌদ্দগুষ্টিকে গালাগালি করি।
ডাক ঘরে গাড়ির জন্য কর দিতে গেলে, সে কিছু টাকা চা পানির খরচ চায়। আমরা হাসি মুখে দিয়ে আসি। এবং হাসতে হাসতে বলি,ওনি লোক ভাল বিশ টাকা নিয়েই কাজটা করে দিয়েছে।
দশটাকা নিয়ে ট্রাফিক যখন আমার লাইসেন্সহীন মটর সাইকেল ছেড়ে দেয় আমি খুশি না হয়ে পারিনা। স্যার এক কাপ চা খাইতে আইসেন।
খুশির খবর হলো আমাদের সহ্যের সীমা বেড়েছে। গড়মের দিনে ৬ঘন্টা বিদ্যুত থাকবেনা এটাইতো নিয়ম। ট্রাফিক টাকা নিবে এটাই নিয়ম। বাড়ি বানাতে হলে চাঁদা দিতে হবে। ছিনতাই কারীদের কাছ থেকে বাঁচার কৌশল জানতে হবে।
কি অদ্ভুত? কত রকম কৌশল আমাদের শিখতে হয়? বাসের ভিড়ে কি করে পকেট সাবধানে রাখতে হয়। টাকার নিরাপত্তার জন্য ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করতে হয়। ছিনতাই প্রতিরোধে দিন থাকতে বাসায় ফিরতে হয়। এমন হাজার কৌশল। কিন্তু কখনোই প্রশ্ন করতে শেখায় না কেন এমন হয়? কেন বাড়ি বানাতে চাঁদা দিতে হয়? কেন ছিনতাকারীদের ছুরিতে আমি মরা পরবো? কেন আমার দেশের ভেতরে আমি এমন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবো? কেন আমি অজানা জুজুর ভয়ে রাতের বেলায় ঘাপটি মেরে বসে থাকতে হয়?
প্রতিদিন রাস্তার পাশে বস্তি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। পুলিশের নির্যাতন দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। শীতের রাতে ফুটপাতে ঘুমন্ত মানুষ দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। দামি গাড়ি,বাড়ি দেখতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, প্রতিদিন পত্রিকায় লাশের ছবি দেখতে দেখতে অভ্যস্ত হয়েগেছি।
তাই আর প্রশ্ন জাগে না। আমরা "কেন" কথাটা বলতে ভুলে গেছি।
আমাদে কি ক্ষোভ ছিলনা, জ্বলে উঠার জন্য কি কোন বারুদ ছিলনা? জ্বালিয়ে দেবার মতো কোন যৌবন ছিলনা? তবে কেন আমরা মেনে নিতে নিতে কেচু হয়ে গেলাম?
আমাদের ক্ষোভ ধ্বংস হতে হতে, আমাদের আত্মবিশ্বাস ধ্বংশ হতে হতে আমরা ভুলে গেলাম আমরাও মানুষ ছিলাম।এখন কেঁচু হয়েই বাঁচতে চাই।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে নভেম্বর, ২০১১ রাত ১২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


