পরিবর্তন মেনে নিতে এত কষ্ট হয় কেন? কেন আমি নিজের উপর এত বিশ্বস্ত থাকি? কেন মনে হয় সব কিছুই আমার ইচ্ছা মতো থাকবে বা চলবে?
এক বন্ধুর বিয়ের দাওয়াত পেলাম। বন্ধুদের মাঝে তিনিই ত অবিবাহীত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকেও হারালাম ।
অনার্সের ছয়টি অনন্দের বছর যে খানে কেটেছে । আমার ধারনা এই আমি হয়ে উঠেছি এই সময়টাতেই। আমার এই বর্তমান আমির ভিত্তি ঐ যৌবনদ্বিপ্ত বছর গুলো। আমি কি হব, কি হবো না, কি করবো কি করবো না, কোথায় যাব কোথায় যাবনা,এই সিদ্ধান্ত গুলো নিয়েছি এই সময়টাতে।যৌবনকে উপভোগ করার সময় ছিল এটা। এবং আমি তা উপভোগ করেছি। এখনো করে যাচ্ছি।এই সময়ের বন্ধুদের প্রতি তাই আমার প্রত্যাশা অনেক বেশি।
আমি যেহেতু ছাত্র হিসেবে মাঝারি টাইপের তাই কখনো ক্লাসমেটদের সাথে পড়া লেখা নিয়েই মত্ত থাকতে পারতাম না। চারপাশের বিচ্ছুরিত আলো আমাকে হাত নেড়ে ডাকতো। আমিও সেই ডাকে সাড়া দিতাম। শিল্পকলায়, থিয়েটারে,আবৃত্তি আর আমি কি রুমে বসে এসব শুনে যাব? বসে থাকি নাই। যত কিছুই পেয়েছি হাত পেতে নিয়েছি।
। এই রঙ্গিন পথের বন্ধুরা হয়ে উঠে জীবনের অনেক ঘনিষ্ট। হয়ে উঠে অন্তিম মুহূর্তের অবলম্বন। জীবনের বড় বড় সিদ্ধান্ত গুলো তাদের চিন্তার তাল মিলিয়ে হয়েছে। বিপদের মুর্হুর্তে তারা এগিয়ে এসেছে। উদ্ধার করেছে। তাদের এই সহযোগিতা আমাকে আরো বেশি সাহসিক করেছে। আমি পা বাড়িয়েছি, অনেক স্বপ্নিক ভুবনে। স্বপ্ন দেখতে আমার ভাল লাগতো। আমাদের ভাল লাগতো।
সেই সময়ের বুনা স্বপ্ন এখনো ডালপালা নিয়ে বিস্তার করে যাচ্ছে।পড়া লেখা লাটে তুলে আমি বেড়িয়ে পরি , দেশের এই সীমানা থাকে ঐ সীমানায় চাকরি নামের এক যন্ত্রনা তারিয়ে বেড়ায়। আমি জানাতাম এখানে আমাকে বেঁধে রাখতে পারবে না। এই চাকরি আমাকে সান্তনা বা আর্থিক উন্নতি কোন কিছুই করতে পারবে না। তবু কেন জানি ফেরা হয়নি। এই স্বপ্নিক মানুষ কেন যেন এই অনিশ্চিত পথেকে চলছে জানি না।
আমার প্রায় সব বন্ধুরাই ঐ এলাকার স্থানিয়।নিজের এলাকার বাইরে তাদের ঠিক আরাম হয়না। তাই তারা নিজের এলাকাতেই থিতু হয়। আমিও খুশি আমাদের বন্ধুরা এক সাথেই আছে। ভালই তো হল। সময় পেলে যখন তখন তাদের দেখতে পাওয়া যাবে। বছরে অন্তত একবার আড্ডা দেয়া যাবে।
সময়ের সাথে সাথে তারা বিয়ের মতো এমন একটা গতানোগতিক বন্ধনেই আবদ্ধ হলো। তারা নয়টা থেকে আটটা অফিস করে। কেউ ব্যবসা করে। কেউ শিক্ষকতা করে। কেউ কেউ নানা রকমের কোর্সের সার্টিফিকেট নিজের নামের সাথে যুক্ত করে।
তাতে কি? করুক না। কিন্তু তাদের স্বপ্নের হত্যা দেখলে মন তো খারাপ হতেই পারে। তাদের সবই হলো।,বাড়ি,নারী,টাকা, হয়তো গাড়িও হবে কিছু দিন পরে। এলাকায় সম্মানও হলো। কেবল চোখ থেকে হারিয়ে গেল স্বপ্ন। আমি কেবল সবকিছুহীন স্বপ্নই পেলাম।
এই স্বপ্ন নিয়েই ছুটে যাই তাদের টানে। আমি কোন এক টান অনুভব করে অনেক দূর থেকেও ছুটে আসি আমাদের বিয়ের করতে যাওয়া শেষ বন্ধুটির বিয়ের অনুষ্ঠানে। ভাবি এই বার নিশ্চয় হবে দেখা। অনেক দিন পরে সবাই এক সাথে হবো। অনন্দ করবো, আগে যেমন করতাম। দুষ্টুমি করবো আগে যেমন করতাম। এক জন আর একজনকে ঘায়েল করতে চেষ্টা করবো আগে যেমন করতাম।
কিন্ত সেই বিয়েতেও কেউ আসে নি? শুক্রবার থাকায় অনেকেই ব্যস্ত অনেক কাজে। হতে পারে বউ কে নিয়ে শপিংয়ে গেছে। কেউ তার নতুন চাকরির ইন্টারভিউয়ের তারিখ ঠিক রেখেছে। কাউকে তার কলেজের ভর্তিপরীক্ষার ডিউটিতে থাকতে হয়েছে। কাউকে অন্য অনকেক জরুরি,থেকে জরুরি কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়েছে।
তারা জানাতো আমি আসবো। ছয় ঘন্টা জার্নি করে আমি বিয়ের আসরে উপস্থিত হলাম। খালি হাতে। ভেবে ছিলাম সবাই মিলে কিছু একটা উপহার দিব। আগে যেমন দিতাম।
বর বেশে বন্ধুটিও একবার স্বাক্ষাত দিল। অন্যান্য বিয়ের যাত্রিদের সাথে যেমন দেয়। সারাদিন আর তার দেখা পাইনি। বিয়ের আসরে খাওয়া দাওয়া করে একা একাই এদিক সেদিক পায়চারি করলাম । তার পর একা একাই ফিরে আসলাম।
অথচ আমাদের বন্ধুদের নিয়ে আমরা যখন চায়ের স্টলে ঢুকতাম তখন কম করে হলেও তিনটি টেবিলই আমরা দখল করে রাখতাম।
ফিরে আসলাম একরাশ দুঃখ নিয়ে। না দুঃখ নিয়ে নয় হবে একরাশ নিরাশা নিয়ে। এক রাশ হতাশা নিয়ে। ফিরে আসলাম এক রাশ অভিমান নিয়ে। আমি জানি আমার আর কখনোই সেখানে ফিরা হবেনা। এখন একমাস পরপর তাদের সাথে ফোনে কথা হয়।সেটা হবে একবছর পরপর। তার পর আমরা কেউ কারো ফোন নম্বারও জানবো না। কি দরকার সবাইতো ভালই আছে। বিকালের নরম ঘাসের মাঠের চেয়ে বউএর হাতই এখন বেশি প্রিয়। সেই হাত যেহেতু বাসায়ই পাওয়া যায় বাইরে আসার কি দরকার?
আমি এই ভেবে খুশি যে আমি সামাজিক মানুষ নই। কে কি বল্ল তারউপর আমি কোন ধারধারিনা। কে কি ভাবলো আমি তার ধার ধারিনা। সমাজও আমার উপর থেকে হয়তো তার দ্বায়িত্ব প্রত্যাহার করে নিয়েছে। আমি ভালই আছি।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জানুয়ারি, ২০১২ দুপুর ১২:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


