somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ফিরে দেখা

১৬ ই আগস্ট, ২০১১ সকাল ৯:২৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কলকাতার পূজো দেখার অভিজ্ঞতা কম-বেশী এপার বাংলার অনেকেরই রয়েছে। পড়াশুনার সুবাদে দুবছর কলকাতায় থাকার দরুন সে দলে আমিও রয়েছি। প্রথম বছর যখন পূজোর ছুটিতে দেশে ফেরার কথা বললাম, সবারই কেমন যেন ভ্রুকুটি-- কলকাতার পূজা রেখে ঢাকায়! তাই পরবর্তী বছর পূজোর ছুটিতে স্ত্রী-পুত্র সমেত ওপার বাংলার পূজা দেখবো বলে স্থির করলাম।

ভারতীয়দের যে বিষয় আমাকে মুগ্ধ করেছে তা হলো - বছরে যে কোন একটি সময় ১০-১২দিনের জন্য কোথাও না কোথাও ঘুরতে যাওয়া। ঠিক করলাম পূজোর ছুটিটা কাজে লাগাবো। বিশাখাপত্তনম, যা ভাইজাগ নামেই সর্বাধিক পরিচিত, ভারতীয়দের অন্যতম একটি ট্যুরিস্ট স্পট। রামকৃষ্ণ ও ঋষিকোন্ডা দুটি বিচ রয়েছে এ শহরে। বঙ্গোপসাগরের তীরবর্তী এ শহরের উপকন্ঠে ভারতের অন্যতম পোতাশ্রয়। পূজা শুরুর একসপ্তাহ আগে ভাইজাগ আর জগদ্দলপুর দেখবো বলে অন্ধ্রপ্রদেশ আর ছত্রিশগড় এর উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পুরো দুদিনের রেল যাত্রা। দক্ষিণ ভারতের বিখ্যাত ইড্লি আর ধোসায় ব্রেকফাস্ট সেরে যাত্রাপথের অপূর্ব সৌন্দর্য ঠিক উপভোগ করতে পারলাম না। পৃথিবীর সর্বোচ্চ উচ্চতার ব্রডগেজ লাইনে চলতে চলতে ৪৮টি ট্যানেল পার হওয়ার অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতা যতটা রোমাঞ্চকর হবার কথা ছিল ঠিক ততটা হয়নি। মনে হচ্ছিল কখন যে যাত্রা শেষ হবে। আসলে সংসারের নিয়ম বোধকরি এমনই। নিজের মন দিয়েই আমরা বিশ্বসংসারকে বিচার করে যাই। একই সৃষ্টি তাই কারো চোখে সুন্দর আর কারো চোখে কদাকার। আর তাই কোন মহত্তের যারা বিরূপ সমালোচক তারা বুঝি কোন না কোন ভাবে ক্ষুধার্ত। শেষ পর্যন্ত জগদ্দলপুর হোটেলে লাগেজপত্র রেখে প্রায় আধঘন্টা হেঁটে খুঁজে বের করলাম বাঙালি খাবার। অবাক করার বিষয় হচ্ছে দক্ষিণ ভারতে তখন জগদম্ভা পূজা হচ্ছে। আর এটি দূর্গাপূজারই একটি সংস্করণ। এ অঞ্চলটি বাস্তার নামে পরিচিত ছিল। পরদিন তিরতগড় আর চিত্রকূট জলপ্রপাত দেখে আমরা বিমোহিত। তিরতগড়-এর মুগ্ধতা এতোটাই আমার আড়াই বছরে ছেলে ১০০ ফুট উঁচু প্রপাতের পাদদেশে যেতে প্রায় ৬০০ টি সিঁড়ি ভেঙ্গে পায়ে হেঁটে উঠা-নামা করেছে। আর চিত্রকূট জলপ্রপাত ভারতের নায়াগ্রা হিসেবেই বেশী পরিচিত। বালাজি মন্দির আর দন্তেশ্বরী মন্দির ধর্মপ্রাণ মানুষদের বিশেষ আকর্ষণ। জগদ্দলপুর হতে আরাকু ভ্যালী হয়ে ভাইজাগ যাবার পথে বোরা গুহা দেখার কথা মনে থাকবে আমৃত্যু। গুহার উপরের অংশে প্রাকৃতিকভাবে তৈরী শিবলিঙ্গটি দেখে বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হয় না সৃষ্টিকর্তা বলে কেউ নেই। এই গুহাটির ঠিক উপর দিয়ে চলে গেছে রেল লাইন। আমার মতো সাধারণের লেখায় এর সুনিপুন বর্ণনা দেয়া অসম্ভব। ভাইজাগ পৌঁছে রামকৃষ্ণ আর ঋষিকোন্ডা বিচ দেখে মনে হল কক্সবাজারকে আমরা মেলে ধরতে পারলাম না। কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত দেখলে কেউ আর ভাইজাগ যাবে না অন্ততঃ বঙ্গোপসাগরের জলে পা ভিজাতে। কিন্তু তারপরও মানুষ ভাইজাগ যাবে একটি পরিচ্ছন্ন দেখার আকাঙ্খায়, সিমাচলম মন্দিরে নরসিংহরূপী বালাজী নামক দেবতার দর্শনে। থাক, সে গল্প অন্য কোথাও করা যাবে।

ষষ্ঠিপূজোর শেষরাতে হাওড়ায় নেমে ট্যাক্সি করে ফিরতে ফিরতে কলকাতাকে অপরিচিত মনে হল। অদ্ভুত সব মঞ্চ আর আলোকসজ্জায় এ এক অন্য কলকাতা। কত রকমের থিম আর কনসেপ্ট যে মানুষের বাইশ জোড়া ক্রোমোজোমের মধ্যে লুকায়িত তা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। ভগবান মানুষকে সীমাহীন ধৈর্য ধরার ক্ষমতা দিয়ে যদি না পাঠাতেন তাহলে কি দীর্ঘ দু-ঘন্টা লাইনে দাঁড়িয়ে কেউ অপেক্ষা করতো একটি মাত্র মন্ডপ দেখার জন্য। তাইতো সল্টলেকের হ্যারিপটারের থিম নিয়ে পূজমন্ডপ দেখার জন্য ছেলেকে কোলে নিয়ে ভীড় ঠেলে হাঁটতে পেরেছি দু’কিলোমিটার। দক্ষিণ কলকাতার বড়িশা ক্লাবের সিরামিকের তৈরী প্রতিমা আর কলকাতার দাদা সৌরভের বাড়ীর পূজো দেখার অভিজ্ঞতা সত্যিই দু’ধরণের। বেলঘরিয়া, রাণীপার্ক, অভি আর দেবাদের সাথে ঢাক-শঙ্খধ্বনি, আরতি উপভোগের মুহূর্তগুলো যদি আবার ফিরে আসতো! পশ্চিম বঙ্গের মানুষের কৃপণতার বিভিন্ন কাহিনী এখনো এদেশের মানুষের মুখে মুখে। কিন্তু মায়ের পুজায় সবকিছু উজাড় করে দেয়ার জন্যই কি এ কৃপণতা!


হিন্দু শাস্ত্রে ‘দুর্গা’ নামের ব্যাখ্যা নিম্নরূপঃ
‘‘দৈত্যনাশার্থবচনো দকারঃ পরিকীর্তিতঃ।
উকারো বিঘ্ননাশস্য বাচকো বেদসম্মত।
রেফো রোগঘ্নবচনো গশ্চ পাপঘ্নবাচকঃ।
ভয়শত্রুঘ্নবচনশ্চাকারঃ পরিকীর্তিত।’’
‘দ’ অক্ষর দৈত্যনাশক, উ-কার বিঘ্ননাশক, ‘রেফ’ রোগনাশক, ‘গ’ অক্ষর পাপনাশক ও অ-কার ভয়-শত্রুনাশক। অর্থাৎ দৈত্য, বিঘ্ন, রোগ, পাপ ও ভয়-শত্রুর হাত থেকে যিনি রক্ষা করেন, তিনিই দুর্গা। আবার শ্রীশ্রীচন্ডী অনুসারে এই দেবী ‘নিঃশেষদেবগণশক্তিসমূহমুর্ত্যাঃ’ বা সকল দেবতার সম্নিলিত শক্তির প্রতিমুর্তি। দুর্গতিনাশিনী দুর্গা একসময় এ বাঙলার মানুষের মনের মন্ডপেও আসতো ঢাক-শঙ্খের ধ্বনিতে। কিন্তু কালের বিবর্তনে কেন যেন পুজা উৎসবের চেয়ে উপলক্ষই হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের হতো আর রাষ্ট্রধর্ম মানবধর্ম হতো তবে বোধকরি বাঙালির উৎসবের দিন আরো বেড়েই যেতো।

সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই আগস্ট, ২০১১ দুপুর ২:১৬
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

'ট্রিট' বা 'উদযাপন' মানে স্রেফ খাওয়া-দাওয়াই মূখ্য কেন??

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৭



আমাদের উদযাপনটা হয়ে গেছে অনেকটা খাওয়া-দাওয়া কেন্দ্রিক? 'ট্রিট' বা 'সেলিব্রেশন' বলতে আমরা কেবল খাওয়া-দাওয়াকেই বুঝি...কিন্তু এটা কিন্তু ভিন্নরকমভাবেও করা যায় নিঃসন্দেহে!

প্রিয় কেউ ভালো কোনোকিছু করলে, সফলতা পেলে বা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওলার দায়িত্ব পেয়ে সেই দায়িত্ব পালন না করায় হযরত আলীকে (রা.) মাওলা বলা ঠিক না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৮



সূরাঃ ৬ আনআম, ১৫৩ নং আয়াতের অনুবাদ-
১৫৩। আর এপথই আমার সিরাতিম মুসতাকিম (সরল পথ)। সুতরাং তোমরা এর অনুসরন করবে, এবং বিভিন্ন পথ অনুসরন করবে না, করলে তা’ তোমাদেরকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের নিজেদের না পাওয়া গুলো অন্যদের পেতে সাহায্য করা উচিত।

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ৯:৪২


আমরা মানুষেরা সবসময় ভালো থাকতে চাই। ভালো খেতে চাই, ভালো পড়তে চাই, ভালো চাকুরী/ব্যবসা করতে চাই। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই আমাদের চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল থাকেনা। এই চাওয়ার সাথে পাওয়ার মিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ৩১ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১১:২২

ধান ভানতে শীবের গীত : প্রজা বলে শীত ! শীত!!


সমুদ্রে বড় জাহাজ যখন ডুবতে থাকে, তখন কে ধনী বা কে গরীব প্রকৃতি তার বাছ-বিচার করেনা ।
বা বলা চলে, কে পাপী... ...বাকিটুকু পড়ুন

এতো সুর আর এতো গান - আমার কণ্ঠে

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ০১ লা এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০০

একটা হারানো দিনের গান গাওয়ার চেষ্টা করেছি (Cover Song)। আশা করি সবাই উপভোগ করবেন।

গান - এতো সুর আর এতো গান
মূল গায়ক - সুবীর সেন
গীতিকার এবং সুরকার - সুধিন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×