somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আন্তর্বয়নে আমার কবিতা // জিললুর রহমান

০৮ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১:০১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জিললুর রহমান
আন্তর্বয়নে আমার কবিতা
আমাকে টানেনা কোনো স্মৃতির অলিন্দ, আমি তবু ফিরে ফিরে যাই পুরনো তারার পানে। সুপ্রাচীন তারকারা আমাকে প্রশান্তি দেবে এমন ধারণা নিয়ে এগিয়েছি সময়ের অনেক প্রহর। ভাবনা বিলাসে কাটিয়ে বহুকাল – দেখেছি একদিন কবিতার আনন্দ সকট পৌঁছে গেলো বিষন্নতার ঘাটে, বিবমিষার ইঁদারায়। সেখান থেকে যে বিষন্ন বহর আমাদের দশকের পর দশক ঘুরিয়ে ফিরেছে তার থেকে উত্তরণের পথ খুঁজতে খুঁজতে একদিন আমরা পৌঁছেছিলাম এক নতুন অন্বয়ের কবিতার জগতে, উত্তর আধুনিকতায়। আজীবন এই অভীক্ষা টেনে বেরানোর যে খুব প্রয়োজন আছে তা নয়, তবে এই শব্দ-বন্ধের দ্যোতনা থেকে উৎসারিত চেতনার ক্রমবিকাশমানতাই এর সময়োপযোগী আবির্ভাবের প্রয়োজনীয়তা ঘোষণা করেছে। নব্বই দশকের শুরুতে লিরিক উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা যে ছোট্ট আহবানটি আমাদের জানিয়েছিলো তা সমসাময়িক অনেকের নিশ্চুপ পর্যবেক্ষণ আর কারো বা প্রবল আপত্তির ভেতরে পড়লেও, কালক্রমে তরুণ কবিদের লেখায় একটা মোড় ফেরার লক্ষণ আমাদের গোচরে আসে বৈকি!
আমরা খুঁজতে চেয়েছি পৃথিবীর কোন পথে আনন্দ বেঁধেছে বাসা, কোন বেদনার বাণী আমাদের হৃদয়ে টঙ্কার তোলে? আমরা ফিরতে চাইনা অতীতচারিতায়, অথচ আমরা ঘুরতেও চাইনা পোস্টকলোনিয়াল মরিচীকায়। আমাদের হারিয়ে যাওয়া সময়ের সাথে, আমাদের সামনে এগুনোর পথের কি রয়েছে কোনো মেলবন্ধন? এই সব অসংখ্য প্রশ্নমালা আমাদের আলোড়িত করেছে, যেমন করেছে সারা বাংলাময় সকল তরুণ কবিদের। আর সেই অনন্যসাধারন সময়ে যখন প্রথম লিরিক উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা বের হলো, সে যেন সারা বাংলায় বাজিয়ে দিলো অর্কেষ্ট্রার অনাবিল সুর। লিরিক উত্তর আধুনিক কবিতা সংখ্যা-২ যখন বের হতে যাচ্ছে, ১৯৯৫ সালের দিকে, আমাদের সম্পাদকীয় অফিসে বহু প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে, অনেক নতুন তরুণ এর কাছ থেকে যে চমৎকার কবিতার সম্মেলন ঘটতে থাকে, তা যেন অবারিত ঝর্ণা ধারার মতো নতুন কাব্যভাষার বিকাশ।
এই উত্তর আধুনিক চেতনার অন্বেষণে কবিতা খুঁজে ফিরেছে পূর্বসুরীদের সাথে সংযোগ ও অন্বয়, ভাষিক চেতনাবোধ, লোকজ অনুষঙ্গের ব্যবহার, মিথ - আরও নানা বিষয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় মোড় নিয়েছে কবিতায় আন্তর্বয়ন। কবিতা থেকে কবিতায়, উপমা থেকে উপমায় এক মেলবন্ধন রচিত হতে থাকে কবিতায় কবিতায়, সংস্কৃতির পরম্পরায়, বেদনায়, ভালোবাসায়। অন্য বয়ানকে নিজ কবিতার অন্তর্ভুক্ত করে নতুন মাত্রায় নতুন ব্যঞ্জনায় তাকে উপস্থাপন করার এই রীতি একান্তই নবীন কোনো চেষ্টা না হলেও এই সময়ের কবিতাগুলো এই কাজটি যতোটা সুচারুভাবে আর সচেতনভাবে করেছে, তা অবশ্যই সবিশেষ লক্ষ্যণীয়। আমাকে কবিতা লিখার কালে যখন আলোড়িত করে এলিয়ট, বোদলেয়র, তখন যে বিবমিষাময় জগতের হাতছানি এসে আমার মনোজগতে ছায়া ফেলে, তা কতোটা আমার পরিপার্শ্ব, ভাবতে ভাবতে আমি কি দেখি না আমার আঙ্গিনা জুড়ে প্রোজ্জ্বল কতো না নক্ষত্র আমাকে দিয়েছে আলো। আমার কবিতা তাই জুড়ে থাক আপন আলোর স্নিগ্ধতায়, আমার বেদনারা আমার আনন্দগুলো আমারই পিদিমের শিখায় আলোকিত হোক। তার অর্থ কিন্তু বাইরের জগৎ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া নয়। আমাকে প্রতিনিয়ত সংযোগ রাখতে হবে সমগ্র ভূবিশ্বে কি ঘটছে তার সাথে, কিন্তু আমার সৃষ্টিশীলতায় তা যেন আমার প্রতিবেশের প্রতিকুল হয়ে আবির্ভূত না হয়।
কবিতায় আমি তাই নিজের চিন্তাকে, স্বপ্নকে, বেদনাকে রূপ দিতে গিয়ে যে অনুসঙ্গ যে আবহ নিয়ে আসি তার সাথে যদি কোনো বিশেষ উক্তির সংযোগ লক্ষ্যণীয় হয়, কবিতায় তাকেও যুক্ত করে নিলে কবিতা অনেক সহজবোধ্য হয়ে ওঠে বৈ কি! এতে সেই কবিতার অর্থের সাথে আমার বাস্তবতা সহজে প্রকাশ করতে পারা যায়। যেমন, কবি আবুল হাসান এর একটি কবিতা আছে – ‘ঝিনুক নিরবে সহো’। এখানে কবি আবুল হাসান ঝিনুকের বেদনাকে উপলব্ধি করেছেন, ঝিনুক এই বেদনা সহ্য করে যে মুক্তা ফলাচ্ছে, তাকে বিবৃত করেছেন। কিন্তু ঝিনুকের সেই সয়ে যাওয়ার গল্প কি কেবলি ঝিনুকের? আমার চারপাশে কতো বিবর্ণ মানুষেরা যুগের পর যুগ প্রকৃতির বৈরিতা নিরবে সয়ে যাচ্ছে, সয়ে যাচ্ছে নানা সামাজিক অনিয়মের অত্যাচার। তারপরও কি আমি মেনে নেবো – ‘ঝিনুক নিরবে সয়ে যাও’? আমার তাই নতুন উচ্চারণ আসে, কিন্তু পূর্বসুরীকে বয়ান করেই বলি–
ঝিনুক সইতে পারে, আমি তো সইবো না।
মনসা ছোঁবল তুমি দিও না এ দুর্দৈবের দেশে
আমি তো বেহুলা নই, ভেলা ভেসে গাঙ পাড়ি দেবো
সাবিত্রীও নই আমি, হানা দেবো যমরাজপুরী।
সফেন ভাতের গন্ধে আমিতো আকুল
পাখির কাকলি শুনে দিনের দু’বেলা করি পার।
ঝিনুক সইতে পারে আমি তো সইবো না।
বুকের ভেতরে মুক্তা বেড়ে ওঠা জটিল ক্যান্সার
দেবে না দু’দন্ড শান্তি দারুণ বর্ষায়।
আমাদের এই দুর্দৈবের দেশে অভাবের অনন্ত অহম। তার উপর উপর্যুপরি প্রাকৃতিক বিপর্যয়, সামাজিক নিপীড়ন তো রয়েছেই। যে আমি সফেন ভাতের গন্ধে আকুল, যে আমি পাখির কাকলি শুনতে পাগল, সে আমি আর কতো ঝিনুকের মতো সয়ে যাবো, ক্যান্সারের মতো বেড়ে ওঠা বুকের যন্ত্রণা? এখানে আবুল হাসানের ‘ঝিনুক নিরবে সহো’ থেকে যেমন আন্তর্বয়ন হয়েছে, একই সাথে উঠে এসেছে বেহুলার লোককাহিনী, সাবিত্রীর মিথ।
আবার সমসাময়িকতাকেও আমরা ভুলে থাকি না। আমাদের রাজনীতিতে এমন একটা সময় এসেছিলো যখন সামরিক ছায়ার নিচে আমাদের শাসন করেছিলো একধরনের সিভিল সরকার। প্রথম দিকে আমাদের মনে হয়েছিলো, যাক, বাঁচা গেলো, আমাদের দেশে “শান্তি নামে দেখো প্রিয়তমা”। কিন্তু কালক্রমে, এই উজ্জ্বলতা, এই শাদা, এই শান্তিময়তার ভেতরে প্রোথিত প্রচন্ড অন্ধকার আমাদের প্রতিভাত হলো। আমার মনে পড়ে গেলো হোসে সারামাগো রচিত অন্ধত্ব উপন্যাসটির কথা, যেখানে হঠাৎ একটা জনগোষ্ঠির সকলে আকস্মিক অন্ধত্বের শিকার হয়ে গেলো। আর তার পরে গল্প এগিয়েছিলো নানা ঘটনা পরম্পরার ভেতর দিয়ে। আমরাও এই দারুণ অন্ধতায় নিপতিত হয়েছিলাম–
আমরা দেখিনা রাতে কতো দ্রৌপদীর লজ্জার বাজার দর কমে গেছে – শেয়ার মার্কেটে ধ্বস
শিশুর খাবার থেকে বাতিল দুধের নাম - কুপি আর জ্বলবে না ছলিমুল্লা মুদির দোকানে
শহরের ডাস্টবিনে খাবারের শীতল উচ্ছিষ্ট আজ তেমন আর পায় না টোকাই
ট্রেনের কুঝিক শুনে শিশুদের ছোটাছুটি নেই – তবে ভোরের কাগজগুলো
রেলে-কাটা মায়ের সংবাদ ছাপে - আমাদের নিউরনে বাজে না টঙ্কার কোনো, আমরা অন্ধ গো...
আমরা চিকিৎসক-অধ্যাপক-সাংবাদিক-কবি, আমরা লেঠেল-ছিঁচকে চোর-সন্ত্রাসী-দালাল, আমরা দেখি না–
---- ---- --- ---- --- ---
আমাদের সামনে শুধু শাদা অন্ধকার – সূর্যোদয়ে আজ আর আমাদের কিছুই আসে না
গোধুলি বিদায় নিলে ভেঁপু বাজে ‘এম ভি শিলা’র – তবু শরতে হেমন্তে কেন আমরা জাগি না কেউ!

এই কবিতায় হোসে সারামাগোর অন্ধত্ব আর নেই, রয়েছে এই ভূখন্ডের অন্ধত্ব। এখনো কি আমরা সেই অন্ধত্ব থেকে উত্তরণ ঘটাতে পেরেছি? এখনো কি প্রতিদিন আত্মহত্যা, খুন সহ নানা খবরে আমরা নির্বিকার থাকি না? এইভাবেই কালের কবিতা কি মহাকালের দাবি পুরণ করে না?

অনেককাল আগে কবি অমিয় চক্রবর্ত্তী ‘সংগতি’ কবিতায় বলেছিলেন, সব কিছু একদিন মিলে যাবে, অভাব অনটনের সমাধান একদিন হবে, ক্ষুধা ও ক্ষুধার যত পরিণাম, সব কিছু মেলাবেন কেউ একজন।

মেলাবেন তিনি ঝোড়োহাওয়া আর
পোড়ো বাড়িটার
ঐ ভাঙ্গা দরজাটা
মেলাবেন।
পাগল ঝাপটে দেবে না গায়েতে কাঁটা
আকাশে আগুনে তৃষ্ণায় মাঠ ফাটা
মারী কুকুরের জিভ দিয়ে খেত চাটা
বন্যার জল, তবু ঝরে জল,
প্রলয় কাঁদনে ভাসে ধরাতল-
মেলাবেন।
তোমার আমার নানা সংগ্রাম,
দেশের দশের সাধনা, সুনাম,
ক্ষুধা ও ক্ষুধার যত পরিণাম
মেলাবেন।

কে জানে, কবে তিনি আমাদের এসব অসম্ভব আকাংক্ষখা পুরণ করবেন! আমরা এখনও তার মেলানোর কোনো নিদর্শন দেখিনা এই পোড়া পৃথিবীর বুকে। কোথাও তেমন শান্তির সুবাতাস বইতে দেখিনা। পরবর্তীতে কবি শহীদ কাদরী এই কবিতার আন্তর্বয়ন করে বলেছিলেন “প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি পাবে না”।

বন্য শুকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা
মাছরাঙ্গা পাবে অন্বেষণের মাছ,
কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা
ঘন জঙ্গলে ময়ুর দেখাবে নাচ

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না ...

একাকী পথিক ফিরে যাবে তার ঘরে
শূন্য হাড়ির গহবরে অবিরত
শাদা ভাত ঠিক উঠবেই ফুটে তারাপুঞ্জের মতো
পুরনো গানের বিস্মৃত-কথা ফিরবে তোমার স্বরে

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না ...

ব্যারাকে ব্যারাকে থামবে কুচকাওয়াজ
ক্ষুধার্ত বাঘ পেয়ে যাবে নীল গাই,
গ্রমান্তরের বাতাস আনবে স্বাদু আওয়াজ
মেয়েলি গানের – তোমরা দু’জন একঘরে পাবে ঠাঁই

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিক-ই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না, পাবে না ...

সত্যিই তাই। শান্তি আর মিলে নি। শান্তির জন্য নোবেল পেলেন ইয়াসির আরাফাত। চুক্তির পর চুক্তি হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে, প্রেমিক মিলেছে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি মেলেনি। তাই আজকের উচ্চারণে সেই সংগতি প্রচন্ড অসঙ্গতি হয়ে দেখা দেয়। এখন মধ্যপ্রাচ্যের রক্তাক্ত প্রান্তর যেন মেতে উঠেছে ‘হোলি উৎসব’-এ।

প্রেমিক মিলেছে প্রেমিকার সাথে ঠিকই, কিন্তু শান্তি মেলেনিত কোনো ঘাটে
বৈরুত থেকে গাজা প্রান্তরে ছোটে ইয়াসির আর আরাফাতদের সংসার
হোলি উৎসবে বেজায় মেতেছে ইস্রিলি বোমারুরা - শিশু আজগর ছিন্ন করোটি
ধুলোবালি আর ভগ্নস্তুপে ফাতেমার পোড়া লাশ; শকুনেও ছুঁতে ভয়...

গাঢ় কনভয়, মিলিটারি ত্রুপ, কোথাওবা এরিকের চোখ লাল, বারুদ সুবাসে
নদীজল নয়, লোহুর প্লাবনে দজলা ফোরাত ভাসে – মৃত্যু আভাসে

কিলবিল করে আবাবিল নয়, বিমানের বোমা, মাথার উপরে, মরুতে-মারীতে
আয়েশার চোখ, ঢেকে রাখা শোক – লাশ খোঁজে বাড়ি বাড়ি, পাথরের ঝোঁপে
ভোরের আজানে শিশিরের রোদে শিশু হাসানের হাসির আগ্নেয়াস্ত্র ...
মোসলেম বুঝি এখনো চিবুকে ভালোবাসা পুষে রাখে, হাতের গ্রেনেডে প্রেম!

সেই অমিয় চক্রবর্ত্তীর ‘সংগতি’ থেকে শহীদ কাদরীর “সংগতি” পার হয়ে আজকের ‘হোলি উৎসব’ পর্যন্ত কবিতার আন্তর্বয়নে কবিতার অনুসংগ পালটে গেছে অনেক দূর। কিন্তু যে পরম্পরার মেল বন্ধন রচিত হয়েছে, তা কবিতার পাঠক হৃদয়ে এক ভিন্ন ব্যঞ্জনার সৃষ্টি করে বলে আমার বিশ্বাস। ‘হোলি উৎসব’ কবিতায় শুধু ‘সংগতি’কে আন্তর্বয়ন করেই ব্যাপারটা শেষ করা হয় নি। এখানে সমসাময়িক বিশ্ব রাজনীতির সাথে মহররম রাজনীতির উপমা ও আরবী মিথলজির আবাবিল পাখির ব্যবহারও কবিতাটির একটি চরিত্র লক্ষণ হিসেবে উঠে এসেছে।

আর একটি বিখ্যাত কবিতা আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের, যা ছেলে বুড়ো সকলেরই জানা – ‘যেতে নাহি দিব’। যেখানে কবি বুঝাতে চেয়েছিলেন, আমরা যতোই মুখে বলি না কেন, ‘যেতে নাহি দিব’, আমরা নিরুপায়, আমাদের যেতে দিতে হয়। এখানে কবিতাটি রচিত হয়েছিলো গৃহকর্তার কর্মস্থলে যাওয়ার প্রস্তুতিকালে, চার বছরের ছোট্ট মেয়েটির সামান্য উক্তি “যেতে আমি আমি দেব না তোমায়”, থেকে কবি আমাদের অনেক গভীর মর্মকথার ভেতরে নিয়ে প্রোথিত করেন যে, আমাদের এই জগতে ধরে রাখার এ বাসনা, তা অতি তুচ্ছ। আমরা যাওয়ার কালে, খড় কুটো আঁকড়ে বেঁচে থাকার অনেক চেষ্টা করি, সবাই চাই ধরে রাখতে, গর্ব ভরে বলি –“যেতে আমি দেব না তোমায়”, কিন্তু সব কিছুকে সব চেষ্টাকে ব্যর্থ করে সকলকেই যেতে হয়, যেতে দিতে হয়। আমাদের যুগের তরুণ ফটোগ্রাফার সেলিম হাসান, যে কিনা চেয়েছিলো সব অন্তত ছবিতে হলেও ধরে রাখবে, সেই সেলিমেরও ডাক এল অবেলায়, সেও চলে যায় –

দু’ভান্ড রাই আর সরিষার চেল
চিনিপাতা দই হিসেবের খাতা কেরামান কাতেবিন
যেতে যেতে থাকে ভালোবাসা স্মৃতি
স্মৃতি নিয়ে আজ পৃথিবীর বেলা গড়াবে প্রহর শত

দুয়ারে গাড়ির প্রস্তুতি কার দ্বিপ্রহরে জানা নেই
যেতে দিতে হলো ঊন-প্রস্তুত রথে
নিয়তিকে মানা দায়
যেতে তবু দিতে হয়
তবু চলে চলে যায়

এভাবেই উত্তর প্রজন্মের কবিতায় আন্তর্বয়নের মধ্য দিয়ে পূর্বজদের মহান সৃষ্টিকে স্মরণে রেখে ভিন্ন মাত্রায় প্রসঙ্গগুলো মূর্ত হয়ে ওঠে। তার সাথে যুক্ত হয় সময়ের বেদনা ও আনন্দের গাথা।
তেমনি কবি নির্মল হালদার ‘ধান ও জলের ধ্বনি’ কবিতায় যে বেদনাকে বিবৃত করেছিলেন, তার আন্তর্বয়নে বিরচিত হয়েছিলো ‘আব্রু’ কবিতা।

সে কার চোখের জল লোহা হয়ে যায় আজ? দুঃসময় ক্রমাগত টেনে যাচ্ছে
দেশ মাতৃকার শাড়ি। কে আজ শুনবে তবে ধান ও জলের ধ্বনি, খুঁজে ফিরবে
খ্যাপার মতো পরশ পাথর?

দরবারে সকলেই ধৃতরাষ্ট্র অথবা গান্ধারী। নির্বাক অমাত্য মাঝে শকুনির
কী অদ্ভুত চোখের বিদ্রুপ। স্তব্ধতার অবসরে শুধুমাত্র দ্রৌপদীর স্বর ঃ
​“কোথা কৃষ্ণ, রক্ষো আব্রু”
বিংশতি শতকে বুঝি কৃষ্ণ বাড়ায় দয়ার্দ্র সাহায্যের হাত?

আমাদের কৃষ্ণ হোক দ্রৌপদীর আপন সন্তান, সকালে সন্ধ্যায় যারা
মাটিকে নির্ভর করে। ধান ও জলের ধনি যাদের হৃদয়ে তোলে দোতারার সুর।
পরশ পাথর তাকে খুঁজতে দাও খ্যাপার মতন।

এই কবিতায় কেবলই নির্মল হালদারের ‘ধান ও জলের ধ্বনি’ কবিতার আন্তর্বয়নই হয় নি, তার সাথে সাথে রবিঠাকুরের পরশ পাথর কবিতারও আন্তর্বয়ন করা হয়েছে। তার সাথে যোগ দিয়েছে মহাভারতের উপমাতে সমকালীন বাস্তবতার নিরীক্ষণ।
কবিতার এই আন্তর্বয়ন কবিতার ব্যঞ্জনাকে সমৃদ্ধই করে না, নতুন ভাবনারও উদ্রেক করার কিছু উপযোগ রাখে। এই বাংলার হাটে মাঠে ঘাটে মনসা ও মনসা মংগল কাব্য বহুল পঠিত, আলোচিত আর পুজিত। কিন্তু মনসা কি সত্যিই পুজনীয় আমাদের সংগ্রামী মানুষের কাছে? আমাদের নায়ক হয়ে ওঠে সংগ্রামী চাঁদ সওদাগর। মনসা মঙ্গল কাব্য যেমন মনসার লোক কথা থেকে রচিত হয়েছে, তেমনই অনেক কবিতা, চিত্রকলা এই মনসা মঙ্গল কাব্যকে ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। আমরা জানি মনসার অভিশাপে চাঁদ সওদাগরের জাহাজ বারবার ডুবেছে, মৃত্যুর কবলে পড়েছে ছয় সন্তান, তবু তার সংগ্রামী চিত্ত ছিল অবিচল। আমাদের এই জাতি, যুগের পর যুগ মনসারূপী প্রকৃতির ছোঁবলে প্রতিনিয়ত আক্রান্ত হয়েছে। বার বার ঝড়, বন্যা, জলোচ্ছাস গ্রাস করেছে আমাদের সহস্র সন্তান, কিন্তু সুলতানের সবল পুরুষদের মতো আবার আমরা জেগে উঠি, আবার আমাদের মাঠে মাঠে ফসলের চাষ হয়। এ লড়াই যেন এক আত্মসম্মানের লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। তবু, বড় ভয়, কখন আবার আমাদের উপর ফুঁসে উঠবে সাগর, আবার সেই জলোচ্ছাস কেড়ে নেবে সন্তান। এভাবেই ‘জলপতন’ এর শব্দগুলো কবিতায় রূপান্তরিত হয় –

এ বেলা হবে না নাওয়া
জলপতনের শব্দে মূর্চ্ছা যাই

সাজানো বাসরে কালনাগিনীর ফণা
তবু এসো ভাত খেয়ে নিই ভাত

খিড়কি দুয়ার নড়বড়ে ঝড়ে কাঁপা ও শিথিল
চেঙমুড়িকানি অট্টহাস্যরত
ডিঙ্গা ডুবে যাক মান যেন থাকে জিতে

যে ফণা নামে না তাকে বড় ভয়
কালবৈশাখী তেড়ে আসে বন্দরে
ষড়সন্তান মৃত্যুকবলে ডিঙ্গা বাও মাঝি ডিঙ্গা

এ বেলা হবে না নাওয়া

এভাবেই মানুষের গভীর বেদনা থেকে কবিতা উচ্চারিত হয় প্রকৃতির প্রার্থনায়, আবার যূথবদ্ধ শ্রমে ও সংগ্রামে। কবিতা উচ্চারিত হয় প্রেয়সীর মিলনে বিচ্ছেদে, কবিতা আবর্তিত হয় সামাজিক আনন্দ বেদনায়। কবিতা কখনো সামষ্টিক চিন্তার প্রবল আধার হয়ে ওঠে, আবার যেন পরক্ষণেই কবিতা একান্ত আপনার, নিজস্ব বোধের শব্দ-শব্দ খেলা। আমার কবিতা এক সৌম্য সভ্যতার প্রাজ্ঞ সংস্কৃতির উত্তরাধিকার, আবার কখনো কোনো নারী, যে শ্বাশ্বত বেদনার ভালোবাসার সঞ্চার করে অনশ্বরতায়।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই নভেম্বর, ২০১৬ রাত ১:০২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা তার সাথে কিছু রুঢ় সত্য যা বদলে দিয়েছিলো দেশের রাজনীতি।

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৩৪





২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা সম্পর্কে আমরা সবাই মোটামুটি জানি। এই হামলায় কারা জড়িত ছিল সেটাও আজকের দিনে অজানা নয় একমাত্র নিতান্ত দলকানা ছাড়া। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:৪৪



ধানমন্ডি ৩২ যারা ভেঙেছিল, আর যারা বিচার চাওয়ার পথ বন্ধ করে দিল- তারা কি একই?

ধানমন্ডি ৩২ ভাঙা হয়েছিল- কে দেখেনি, কে জানে না, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।,... ...বাকিটুকু পড়ুন

গরীবের বউ সবার ভাবি

লিখেছেন অপলক , ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০২



৩৬ জুলাই আন্দোলনের পর অনেক আশায় ছিলাম। আশার গুড়ে বালি। তত্বাবধায়ক সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাঙ্ক গভর্ণর ড. আহসান এইচ মনসুর বুদ্ধিদীপ্ত প্ররিশ্রম করে ২০২৬ জানুয়ারীতে রিজার্ভে রেখে গেছেন ৩৫... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন থেকে যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসেন এখন তাদেরকে আওয়ামী লীগের প্রয়োজন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



ক্ষমতায় গেলে কোন দল যাদেরকে মনে রাখে না ক্ষমতায় গেলে তাদেরকেই তারা সবচেয়ে বেশী মিস করে। সেই নিখাঁদ দল প্রেমিকদেরকে এখন আওয়ামী লীগ খুঁজছে। তারা লগি বৈঠা নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ই আগস্ট ছিলো আরো একটি ১৫/২১শে আগষ্টের অপচেষ্টা।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ২১ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৫২



২১শে আগস্ট পালন করা অর্থে , আমার কাছে মনে হচ্ছে আবারো জঘন্য কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে। কারন আমরা ঐ নারকীয় হত্যাকাণ্ডের কোনো বিচার সম্পন্ন করতে পারিনি। আমরা যারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×