somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

লাগামহীন যান্ত্রিক প্রগতি এবং আমাদের ভবিষ্যৎ

১৫ ই অক্টোবর, ২০১৪ বিকাল ৩:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

জানিনা সবারই কি এমন মনে হয় কিনা বা কারো চিন্তায় এসেছে কিনা সেটাও বুঝতে পারছিনা । তবে এটা নিশ্চিত যে, যেহেতু আমার চিন্তায় ব্যাপারটা বারবার এসেছে সেহেতু সবারই না আসুক, সমগ্র পৃথিবী ঘুরে বেশ কয়েকজন পাওয়া যাবে যারা ব্যাপারটাকে আমার মতোই ভেবেছে বা ভাবছে । এ ভাবনা কতটুকুন বোকামির সেটাও আন্দাজ করতে পারছিনা । বোকারাইতো বোকামি করে । আমিও না হয় করলাম ।

বিজ্ঞান-প্রযুক্তি আমাদের অনেক দিয়েছে । প্রতিনিয়ত দিয়েই যাচ্ছে । অথচ তার হর্তা-কর্তা কিন্তু আমরাই । বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সরাসরি ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকগুলো প্রত্যাখান করে আমি মূলত সাময়িকভাবে আপনাদের দৃষ্টিভঙ্গিকে এর প্রগতির দিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছি । যে প্রগতির কথা বলছিলাম, তা আজ লাগামহীন ঊর্ধগামী পাগলা ঘোড়াতে রূপ নিয়েছে । আর সে পঙ্খীরাজ ঘোড়ায় চড়ে আমরা যে কোথায় যাচ্ছি, তা মুহূর্তেই ভুলে যাচ্ছি । কারণ কিছুই না, ঘোড়ার দ্রুততায় সময় স্থির হয়ে গেছে । অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যত মিশে একাকার । সে একাকারে আমাদের স্মৃতিশক্তি ঠাওর করতে পারছেনা । হ্যা, আমরা যে সভ্যতায় অবস্থান করছি, সেই সভ্যতারই যান্ত্রিক প্রগতির কথা বলছি ।

মেধা আর শ্রম; এ দুটোর উপরই বর্তমান সভ্যতা অহংকারে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে আছে । আজকের যে বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, সেটাও । মানুষ ব্যতীত পৃথিবীর বা ভিনগ্রহের অন্য কেউ সেই মেধা আর শ্রমের দাবির অধিকার রাখেনা । অর্থ্যাৎ আমাদের মেধা ও শ্রমের সমন্বয়ই হলো আজকের সভ্যতা (যদিও সভ্যতা বলা মোটেও যৌক্তিক নয়, কারণ আজকের দুনিয়ায় সভ্য ও সভ্যতার মধ্যে বিস্তর ফারাক, তবু বললাম বুঝার খাতিরে । বর্তমান সাপেক্ষে সভ্যতার পরিবর্তে যান্ত্রিক প্রগতি বলাই উত্তম) ।

আমাদের মেধা আর শ্রম দিয়েই আমরা কম্পিউটার আবিষ্কার করেছি । ইন্টারনেট আবিষ্কার করেছি । রোবট আবিষ্কার করেছি । এরকম আরো কী কী আবিষ্কার করেছি, তার হিসেব কি দেয়া সম্ভব? অবশ্যই না । প্রয়োজনীয়তার তাগিদে মানুষ নিত্যনতুন কলা-কৌশল আবিষ্কারের নেশায় মত্ত, আবিষ্কার করছেও । কিন্তু এখানেই থেমে থাকেনি উদ্ভাবন অভিযান । কোথায় গিয়ে ঠেকবে সেটাও কেউ জানে না ।

জীবনের অমূল্য সম্পদ হলো সময় । সেই সময়ের যথার্থ ব্যবহার ও সঞ্চয়ের জন্য আমরা কত কিছুই না করেছি এবং প্রতিদিনই করে যাচ্ছি! যানবাহন, অ্যাবাকাস, ক্যালকুলেটর, কম্পিউটার, মোবাইল, ফ্যাক্স, লিফট, স্যাটেলাইট, ইন্টারনেট এরকম আরো অজস্র কিছু আবিষ্কার করেছি । আবিষ্কার করেও ক্ষান্ত হইনি আমরা । জোরগতিতে চলছে সেগুলোর গতি ও সুবিধা বৃদ্ধি এবং সহজলভ্য হিসেবে গড়ে তোলার পদক্ষেপ ও কার্যক্রম । তাইতো সময়ের প্রেক্ষিতে আমরা দেখেছি এবং দেখে যাচ্ছি এসবের চেইন পরিবর্তনঃ স্লেজগাড়ি থেকে বাষ্পীয় ইঞ্জিনগাড়ি, বাষ্পীয় ইঞ্জিনগাড়ি থেকে পেট্রোল ইঞ্জিনগাড়ি, বাইসাইকেল থেকে মোটরসাইকেল, বাস-ট্রাক থেকে ট্রেন, ফানুস থেকে এরোপ্লেন, এরোপ্লেন থেকে রকেট, অ্যাবাকাস থেকে ক্যালকুলেটর, ক্যালকুলেটর থেকে কম্পিউটার, আর্পানেট থেকে ইন্টারনেট প্রভৃতি । এতো গেলো সময়কেন্দ্রিক আমাদের প্রচেষ্টার সাফল্য । আর একটু আরাম-আয়েশ আর ভোগবিলাসিতার জন্য আমরা আজ এমন কিছুর আবিষ্কার করেছি যা আমাদের পূর্বপুরুষেরাই তার অর্ধাংশ দেখেনি; আগের রাজ-রাজারা দেখবে তা বহুদূরের প্রসঙ্গ ! খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষা সবখানেই লেগেছে আধুনিক থেকে আধুনিকায়নেরর গভীর মনোযোগে তুলির শৈল্পিক ছোঁয়া । সর্বত্রই আজ বিজ্ঞান-প্রযুক্তির জয়জয়কার সাফল্য । কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, যান্ত্রিক প্রগতির এ সাফল্য শুধুই তার, প্রকৃত অর্থে আমাদের নয়? কেনো নয় তা জানার আগে আমাদের জানতে হবে, কেনো আমরা যান্ত্রিক প্রগতির সৃষ্টি করেছি? কেনো সেই প্রয়োজনীয়তা? উত্তর হলো সময় বাঁচানো ও জীবনকে সহজ-সরল করা সাপেক্ষে আরাম-আয়েশ-শান্তিতে জীবনকে উপভোগ করা । জানি উত্তরটা সবারই জানা, তবে সেই উত্তরের বোধগম্যতার সাথে গ্রহণযোগ্যতার বলতে গেলে কোনো সম্পর্কই নেই । নেই বলেই আজও আমরা অন্ধের ন্যায় যান্ত্রিক প্রগতির পিছনে অবিরত ছুটে সহজ-সরল জীবনটাকে কঠিনে পর্যবসিত করছি এবং প্রতিনিয়ত করে যাচ্ছি । এতোকিছুর পরেও আমরা না পেরেছি সময় বাঁচাতে, না পেরেছি প্রকৃত অর্থেই শান্তিতে জীবন উপভোগ করতে, বরং আমরা দিনেদিনে আরো বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ছি, জীবনযাত্রার ব্যায়ভারও বেড়ে চলেছে সমানতালে । যতোটুকুন প্রয়োজন তার সীমারেখা অতি্ক্রম করে স্বর্গের গন্ধক ফল ছেঁড়ার মতো অপরাধ করে ফেলেছি । সে অপরাধই হয়তো আমাদেরকে যান্ত্রিক প্রগতি কেন্দ্রিক সিস্টেমে নিক্ষেপ করেছে, যেভাবে স্রষ্টা নিক্ষেপ করেছিলো আদমকে এই পৃথিবীর মাঝে । সেই সিস্টেমের মধ্যে থেকে আমরাও পারছিনা নিজেকে যান্ত্রিক প্রগতির কড়ালগ্রাস থেকে ছাড়াতে ।

এভাবে চলতে থাকলে খুব বেশিদূর নয়, যেদিন কলকারখানা থেকে মানুষ শ্রমিককে লাত্থি মেরে বের করে দেবে রোবট সোসাইটি; যেদিন মেডিকেল কলেজ, হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডিসপ্যান্সারি, চিকিৎসা গবেষণাগার থেকে ডাক্তার-ফার্মাসিস্টদের মুখে থার্মোমিটার গুঁজে দিয়ে বের করে দিবে মেডিসিন ও সার্জারি প্রোগ্রাম্যাবল কম্পিউটার অর্থ্যাৎ রোবট চিকিৎসক; যেদিন ব্যাংক-বীমা-বিভিন্ন থানা-অফিস-কোর্ট-জেল-হাজত থেকে মানুষ নামক উচ্ছিষ্টদের ডাস্টবিনে নিক্ষেপ করবে প্রোগ্রাম্যবল কম্পিউটার; যেদিন সফটওয়্যার-মেকানিকাল-ইলেকট্রিকাল-রোবটিকাল-অ্যারোনিটিকাল-মাইনিং-শিপইয়ার্ডিং ইঞ্জিনিয়াররা হয়ে যাবে অচল,বেকার; যেদিন মানবশিক্ষকের মূর্তি লুভরের মিউজিয়ামে শোভা পাবে; যেদিন মানুষের কানে, হাতে এককথায় সারা শরীরে সেট করা হবে বায়োমেটালে তৈরি বিভিন্ন ডিভাইস; যেদিন মানুষ পাচ্য খাবারের পরিবর্তে ক্যাপসুল খেয়ে জীবনধারণ করবে; যেদিন মানুষ মেধাশূণ্য অলস-শ্রমহীন-নিস্তেজ হয়ে পড়ে রবে আইসিইউ-তে অথবা শুয়ে শুয়ে ফ্ল্যাট মনিটরে দেখবে অলিম্পিকের বিভিন্ন ইভেন্ট, যেখানে আয়োজক-উদ্যোক্তা-অংশগ্রহণকারী সবাই রোবট । সেদিন খুব দূরে নয়, সীমালঙ্ঘনের কারণেই আমরা মানুষ হবো রোবটের দাস, কাটাতে হবে কঠিন থেকে কঠিনতর ইহলৌকক জীবন; পারলৌকিক জীবনটা না হয় হিসেবের বাইরেই রাখলাম । সৃষ্টির দাস হওয়াটা কি স্রষ্টার কাছে খুব গর্বের?
*******
যদি কেউ এ পর্যন্ত এসে আমাকে প্রশ্ন করেন, এখন কি তার সমাধান নেই? কেবলমাত্র তাদের জন্য নিম্নোক্ত লেখাটিঃ

আমি বলবো আছে । প্রাকৃতিক হয়ে যাওয়া ছাড়া আমাদের দ্বিতীয়টি উপায় নেই । প্রাকৃতিক হয়ে যাওয়ার অর্থ এ নয় যে, আপনাকে আমাকে গুহায় গিয়ে গাছের ছালচামড়া বা উলঙ্গ হয়ে দিনাতিপাত করতে হবে । সেরকমটি আমি বলছিও না । কারণ, আমি কেনো, স্বর্গের দেবদূত এসে বললেও পৃথিবীর তাবৎ মানুষ বর্তমান বিজ্ঞান-প্রযুক্তির লাগামহীন যান্ত্রিক প্রগতি থেকে একচুল পরিমাণ সরে দাঁড়াবেনা । তাই ওরকমটি ভাবার অবকাশ নেই, বরং প্রাকৃতিক হয়ে যাওয়ার অর্থ হচ্ছে স্রষ্টার দেয়া জীবনব্যবস্থায় দিনাতিপাত করা । এখানে যেমন ভারসাম্য আছে, তেমনি আছে সীমারেখার চিত্র । এক স্রষ্টার দেয়া জীবনব্যবস্থায় আছে ইহলৌকিক চাওয়া-পাওয়ার সীমারেখা । কারণ যার লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই স্রষ্টার সন্তুষ্টি অর্জন, আর যাই হোক, সে পার্থিব ভোগবিলাসিতায় ডুবে থাকতে পারেনা, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কিছুর দাস হওয়াতো দুরের কথা । স্রষ্টার দেয়া জীবনব্যবস্থা মেনে নেয়ার কারণে এভাবেই মানুষ যান্ত্রিক প্রগতির হাত থেকে ছুটে তার দৃষ্টিগোচরে প্রকৃতির সাথে ধীরে ধীরে ভারসাম্যপূর্ণ হয়ে যাবে । তখন না ভয় থাকবে মেধাশূণ্য হয়ে যাওয়ার, না ভয় থাকবে সৃষ্টির দাস হওয়ার । এটাই মানুষের সত্যিকারের প্রাকৃতিক অবস্থা ।
৩টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

হায়ার সেলফ্‌

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৪১


শীতের সময়ে রাত ১০ টা অনেক রাত। আর তা যদি হয় শহর থেকে দূরে শহরতলীতে,আবাসিক এলাকার আশপাশে,তাহলে তো কথাই নেই। রাত আটটা বাজতে না বাজতেই পাড়ার সকলে সেখানে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এফএম রেডিও

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:২০

২০০৯ সাল। একটি ছেলে। সে তার নানা নানীর সাথে মুন্সীগঞ্জ এ থাকতো। নানা তার নাতিকে একটি মোবাইল উপহার দেয়। নকিয়া ১৬৬১। সেই মোবাইলে এফএম রেডিও ছিলো। সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিরনাম হীন

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৬ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৩৮

তুমি চাইলেই মুঠোর ভেতর
একটা গোটা চাঁদ লুকিয়ে রাখতে পারো,
ইচ্ছে করলেই মেঘের গায়ে
শুকোতে দিতে পারো তোমার ভেজা চুল।
পুরো পৃথিবীর বিস্ময়
তোমার কাছে এসে দাঁড়ায় হাতজোড় করে,
শুধু আমার বুকের কাঁপনে
তোমার এত ভয় কেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শাহজালাল রুমি দেশ ছেড়েছেন কার ভয়ে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:০৮


থাপ্পড়-কাণ্ডের পর দেশ ছেড়েছেন শাহজালাল রুমি। টঙ্গীতে নিজের মেয়ের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ করাই যেন কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে তাঁর জন্য। গণমাধ্যমের সামনে প্রকাশ্যে হত্যার হুমকি, ব্যক্তিগত বার্তায় ভয়ভীতি প্রদর্শন,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের ওসমান হাদী সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্যান

লিখেছেন এল গ্যাস্ত্রিকো ডি প্রবলেমো, ২৭ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৫০

এ আমি কী দেখলাম! ব্লগের প্রতিবাদী মুখ, ভারতের যম, ওসমান হাদীর মুখপাত্র, একাত্তরকা গণ্ডগোলের ব্যাপারে সচেতন মুখ সৈয়দ মশিউর রহমানের ব্লগটি স্থগিত অথবা বাতিল করা হয়েছে। দেশে যখন সামান্য চুমু... ...বাকিটুকু পড়ুন

×