
মুসলমানদের সবচেয়ে বড় উৎসব ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আযহা। তবে গ্রামাঞ্চলে এখনো কুরবানীর ঈদকে বড় ঈদ হিসেবে ডাকা হয়ে থাকে। এর একটা বড় কারণ এ ঈদের দিন আল্লাহর নামে পশু কুরবানী করা হয়। সামর্থ্য অনুপাতে কেউ এককভাবে অথবা কয়েকজন একসাথে মিলে পশু কোরবানী করার একটা রেওয়াজ আমাদের দেশে দীর্ঘদিনের। বিশেষ করে এদিন শহর কিংবা গ্রামে পশু কোরবানীর সময় ছেলে বুড়ো সবার আনন্দ আর উৎসবের সাথে অংশগ্রহন সবসময় চলে এসেছে ঐতিহ্যের মতো। আর তাই কালের পরিক্রমায় কুরবানী এবং কুরবানীতে সবার উৎসবের সাথে অংশ নেয়া আমাদের সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এদিন বাড়ি বাড়ি মুসলমানরা কুরবানী করে থাকেন। আর যাদের বাড়িতে কুরবানী দেবার মতো সেরকম জায়গা নেই তারা বড়ো কোনো মাঠে কিংবা রাস্তায় কুরবানী দিয়ে থাকেন। তবে বেশির ভাগই নিজের বাড়িতে কুরবানী দেবার বেলায় বেশি আগ্রহী হয়ে থাকেন।
মুসলিম প্রধান দেশগুলোতে এভাবেই কুরবানী চলে আসছে আবহমান কাল ধরে। তবে অমুসলিম দেশগুলোতে অবশ্য আলাদা চেহারা। এখানে কুরবানীর জন্য জায়গা নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়ে থাকে। সকলকে সেই নির্ধারিত জায়গায় কুরবানী দিতে হয়।
কিন্তু ইসলামবিরোধিদের কুমন্ত্রনায় বিভ্রান্ত সরকার এবছর পরিবেষ দূষনের নামে শত বছরের কোরবানির এই ঐতিয্য ভেঙে নির্দিষ্ট কয়েকটি স্থানে কোরবানির আদেশ জারি করেছে। উদাহরনস্বরুপ তারা সৌদি আরবকে দেখাচ্ছে। কিন্তু আসলে কি সৌদি আরব আর বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এক ? চলুন দেখে নেই
১) মক্কার হাজিরা বাইরের লোক, ওখানে যেহেতু ওদের ঘরবাড়ি বা কোরবানী দেওয়ার ব্যবস্থা কোনটাই নেই, তাই তারা সরকারের নির্ধারিত স্থানে ও সরকারি সিস্টেমেই কোরবানি দেয়।
২) সউদী অধিবাসীরা নিজ নিজ ঘরের আঙ্গিনা বা উঠানেই কোরবানী দেয়, সেটা নিয়ে সউদী সরকারের কোন বিধি নিষেধ নেই। প্রয়োজনে এ ভিডিওগুলো দেখতে পারেন:
ক) https://www.youtube.com/watch?v=QCL4Eypf4Mw
খ) https://www.youtube.com/watch?v=vg7gKlJ-1-o
গ) https://www.youtube.com/watch?v=oS5TtFNObx8
৩) হজ্জ করতে গেলে প্রত্যেক হাজী একভাগ করে কোরবানীর টাকা জমা দেয়, সেটা দিয়ে সরকারি সিস্টেমে কখন ৭ ভাগের টাকা যোগ করে উট কিংবা ১ ভাগ হিসেব করে ভেড়া কোরবানী দেওয়া হয়। এ বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারী উদ্যোগেই হয়। কোন হাজী কখনই জানতে পারে না, তার পশু কোনটি।
৪) হাজীরা কোরবানীর মাংশ আনতে পারেন না। সেটা তারা সউদী সরকারের জিম্মাদারীতে দিয়ে আসেন। এত কোরবানী থেকে সেটা হিসেব করে আনা সম্ভবও নয়। উল্লেখ্য, এত লক্ষ লক্ষ কোরবানী মাংশ সউদী সরকার আগে প্রসেসিং করতে পারতো না, বাধ্য হয়ে তারা সব মাংশ আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিতো। এটা নিয়ে অনেক দেশের প্রতিবাদ হওয়ার পর তারা গরীব দেশগুলোতে কোরবানীর মাংশ পাঠানো শুরু করে। বাংলাদেশে এরশাদের আমলে গ্রামগঞ্জে সউদীর পাঠানো কোরবানী উটের মাংশ পৌছেছিলো।
৫) সউদীর হজ্জের সময় কোরবানীর সাথে অন্য স্থানের কোরবানীর কখন মিল পাওয়া সম্ভব নয়। কেননা মক্কা নগরীতে তখন হজ্জমূখ্য এবং কোরবানী হজ্জের একটি অনুসঙ্গ। হাজীরা অনুসঙ্গ পালনে কোরবানী দেয়, তবে মাংশ খাওয়ার জন্য নয়। কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য স্থানে মানুষ কোরবানী দেয় এবং সেই কোরবানীর মাংশ খায় ও নিজ দায়িত্বে বণ্টন করে। তাই দু’টো বিষয় মিল করা বোকামি ছাড়া কিছু নয়।
এ ব্যাপারে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ইসলামী চিন্তাবিদ ও শিক্ষাবিদ সৌদি ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়ী শাহজালাল জামেয়া ইসলামিয়া কামিল মাদরাসার শায়খুল হাদীস ইসহাক আল মাদানী এবং উপমহাদেশের স্বনামধন্য বিদ্যাপীট জামেয়া কাসিমুল উলুম দরগাহ মাদরাসার মুহাদ্দিস মুফতি মুহিব্বুল হক গাছবাড়ি বলেছেন, এটা অবাস্তব আত্মঘাতি। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট এবং ইসলামী সংস্কৃতি আলাদা আলাদা ভাবে কুরবানীর বদলে একসাথে এক জায়গায় কুরবানী ঢালাওভাবে সমর্থন করে না। ইসলামে বরং বার বার আলাদাভাবে নিজের কুরবানী নিজে দেবার ব্যাপারে বলা হয়েছে। নিজের কুরবানী নিজে দেয়া এবং বন্টনের মাঝেই রয়েছে সওয়াব। তবে তারা এও বলছেন যে সকল এলাকায় লোকজনের সংখ্যা বেশি কিন্তু জায়গার অভাব অর্থাৎ যাদের কুরবানী দিতে গেলে রাস্তায় বা লোকজন চলাচলের জায়গায় কুরবানী দিতে হয়, তাদের জন্য ঐ এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে কুরবানী না দিয়ে একটা জায়গা প্রশাসন নির্ধারন করে দিতে পারে। এই নিয়ম কেবল তাদের বেলায় হলে মানায়। কিন্তু ঢালাওভাবে সবার জন্য এ নিয়ম এটা কখনোই ইসলাম সমর্থন করে না (http://goo.gl/50l1v4)।
ভারতসহ বিশ্বের কিছু দেশে একসাথে কুরবানীর নিয়ম সরকার নির্ধারণ করে দিয়েছে কিন্তু সেটা আলাদা ব্যাপার। কেন না ঐ সকল দেশ মূলত অমুসলিম প্রধান দেশ। ঐ সকল দেশ যেমন ইন্ডিয়ায় আলাদাভাবে কুরবানী দিতে গেলে বড়ো ধরনের দাঙ্গা বা মারামারির আশংকা রয়েছে। কাজেই এখানে আলাদাভাবে কুরবানীর বদলে নির্ধারিত জায়গায় কুরবানীর নিয়ম করে সেখানকার সরকার মূলত দেশবাসীকে একটা বড়ো দাঙ্গা থেকে বাঁচিয়ে রাখছেন। কিন্তু বাংলাদেশের চেহারা এর ঠিক উল্টো। এখানে বেশির ভাগ মানুষ মুসলমান। কাজেই যারাই এ সিদ্ধান্ত নিক তাদের দেশের সিংহভাগ মানুষের মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতির কথা মাথায় রাখা দরকার।
(সংকলিত)
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই সেপ্টেম্বর, ২০১৫ সকাল ৯:০১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


