somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অমিমাংসিত

০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



২০০৭ সালের শেষদিক।
ঢাকা কলেজে পড়ি। ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে। কলেজ জীবনের অনভ্যস্থতার চেয়েও আমার সামনে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিল বাস যাত্রার ধকল। ব্যাপার এমন ছিলনা, ঢাকায় নতুন এসেছি। সেই ছোট থেকেই প্রতিবছর দু একবার নগর ভ্রমনে আসাটা আমার জন্য ফরজ ছিল। খুলনা থেকে ঢাকায় তখন বেড়াতে আসতাম। নানাবাড়িতে।

কিন্তু ২০০৭ এ এসএসসি দিয়ে আমি ঢাকায় আসলাম পড়তে। মিরপুরে থাকি। যানজট পেরিয়ে কলেজ পৌছুতে রোজ ঘন্টা দেড়েক লেগে যায়। বাহন? ভিড়ভাট্টায় ভরপুর ঢাকা কলেজের বিখ্যাত বাস। যে বাস সম্পর্কে একটা ভয়ংকর গল্প হল, ছাত্ররা নাকি এই বাসের সিটে বসেনা। তারা বসে বাসের জানালায়। আর দরজায় ঝুলতে থাকে বাঁদরের মত। কয়েকদিনের মাঝেই ব্যপারটির সত্যতা বুঝে গেলাম। টের পেলাম, একদল বাঁদরের বিশাল খাঁচায় আমি নিজেও একজন নিরীহ বাঁদর হিসেবে ঢুকে গেছি!

এই বাসযাত্রাই আমি জন্য কাল হয়ে দাঁড়ালো। সাত সকালে ঘুম থেকে উঠে ক্লাসে যেতে হয়। আর যেতে হয় বিশাল যানযটের এক সমুদ্র পাড়ি দিয়ে। ফেরার সময় সেই জ্যাম আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করে। আমি আবিষ্কার করলাম, এই কালোধোঁয়া এবং অসহ্য রকম ভিড়ভাট্টা আমার ঠিক সহ্য হচ্ছেনা। ঢাকা কলেজে ভর্তি হবার ৬ মাসের ভিতর অসুখে পড়ে গেলাম। শেষ রাতে জ্বর আসে। মাথায় প্রচন্ড ব্যাথা নিয়ে কলেজে যাই। বাসায় ফিরি তার চেয়েও দ্বিগুণ মাথা ব্যাথা নিয়ে। ক্লাসের বই নিয়ে আর বসতে ইচ্ছা করেনা। এই প্রতি রাতের জ্বর আমাকে কতটা কাবু করে ফেলেছে টের পেলাম বছর খানিক পর।

ঢাকায় আসার পর প্রথমবার গ্রামে গিয়েছি। যার সাথেই দেখা হয়, সে জিজ্ঞেস করে- এমন কংকালের মত রোগা হয়ে গেছ কিভাবে? তাদের প্রশ্ন শুনে হতাশ লাগে। এক ধরণের মন খারাপে ভুগি। বাসায় ফিরে আয়নার সামনে দাঁড়াই। তখন আসল ব্যপারটা অনুভব করি। কি ভিষণ রোগাই না হয়ে গিয়েছি। আজ এতদিন পর ভাবি, এককালে আমার সাস্থ্যটা নেহায়েৎ মন্দ তো ছিলনা! (নার্সিসিজম অসুখ হতে পারে, তবে অসুখটা আনন্দদায়ক!! আমি আত্মপ্রেমে না ভুগলেও মাঝে মাঝে নিজেকে নিয়ে ভাবি। সে ভাবনায় আনন্দ যেমন আছে, বেদনাও আছে) ।

ছুটির দিনগুলো নিয়ম করে হাঁটতে বের হই। পায়ে হেঁটে যতটা ঘোরা যায়। চারপাশে যাই দেখি, বিরক্তি লাগে। হয়তো রাস্তা পার হব, গাদা খানিক রিকশার জন্য পার হতে দেরি হচ্ছে, বিরক্তি লাগে। চায়ের কাপ তিনটাকা, বিরক্ত হই। মানুষগুলো সব গোমড়ামুখো, ওতেও বিরক্তি ধরে যায়!

রোজ ভাবি, এলাকার চায়ের দোকানে বসে চা’অলার সাথে গল্প করবো। (তখন মনে হত, লেখকদের এই কাজটা করতে হয়! ) দিনের পর দিন কেটে যেতে লাগলো। একসময় দেখলাম, সি ব্লকের প্রায় সব চায়ের দোকানের চা খেয়ে যাচ্ছি ঘুরেফিরে। কিন্তু কোন চা’অলার সাথেই আমার খাতির জমছেনা।

ক্লাসে আমার বন্ধুবান্ধবের দঙ্গল হয়ে যাবার কথা এদ্দিনে। প্রথম বর্ষ যখন প্রায় শেষ পর্যায়ে, দেখা গেল আমার বন্ধু মাত্র একজন। ইউসুফ। আমরা নিউমার্কেটে একসাথে ঘুরি। মাঝে মাঝে চন্দ্রিমা মার্কেটের সাথে গাউসিয়াকে যোগ করা ওভার ব্রিজটার ওয়ালে পা ঝুলিয়ে বসে থাকি। নানান জিনিসপত্র দরদাম করি। কেনা হয়না। তবে ইউসুফ মাঝে মধ্যে চন্দ্রিমা থেকে শার্ট বা জিন্স কেনে। দরদামের মহান দ্বায়িত্ব পালন করি আমিই।

ঢাকা কলেজে এক বছর পার করার পর অল্প কয়টা ব্যাপারে আমি ভিষণ দক্ষ হয়ে গেলাম। সেগুলো হচ্ছে, ভেলপুরি খাওয়া। বাসভাড়া বাঁচানো টাকায় এই বস্তু আমি নিয়মিত খাই তখন কলেজের সামনে দাঁড়িয়ে। (ছ’সাত বছর আগের কথা। এখনো ভেলপুরি তিনটাকাই আছে। এর দাম বাড়েনি! ) এরপর গ্লাস ভরে কলেজ ক্যান্টিন থেকে পানি গেলা। সাপ্লাইয়ের দুষিত পানিতে ক্যান্টিনের জগ ভরে থাকতো তখন! নিয়ম করে চা খাওয়া। আর নিউমার্কেট বা ফুটপাথের আজুড়ে সব জিনিসপত্র অযথা দরদাম করা।

এই সময় আমি নীলক্ষেত যাওয়া শুরু করেছি। দশটাকা করে মাসুদ রানা কিনি। শেষ হলে ওটা ফিরত দিয়ে অন্য আরেকটা বদলে নেই। গল্পের বইয়ের দোকানে দোকানে ঘুরি। হাতে নিয়ে ফ্ল্যাপ পড়ে ফেলি এক নিঃশ্বাসে। মনে মনে কল্পনা করি, যখন আমার অনেক টাকা হবে, প্রিয় সব বই আমি কিনে ফেলব। বইয়ে বইয়ে ঘর ভরে যাবে। (এখন পর্যন্ত আমার অনেক টাকা হয়নি। কিন্তু বই দিয়ে আমি ঘর ভরে ফেলেছি। তারুণ্যের শুরুতে দেখা এই একটা স্বপ্নই আমি এখন পর্যন্ত সফল করতে পেরেছি।)

কলেজ জীবনে আমার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়ালো ম্যানেজমেন্ট আর একাউন্টিং ক্লাস মিস দিয়ে কলেজ লাইব্রেরীতে বসে থাকা। নিয়মিত। ওয়াকিফ ব্যক্তিদের জানার কথা, দুর্লভ সব গল্পের বইয়ে ঢাকা কলেজের লাইব্রেরী পূর্ণ ছিল তখন। মার্ক টোয়েন আর জুলভার্ণ শেষ করে ফেললাম ফার্স্ট ইয়ারে।
প্রতি দু-সপ্তাহ অন্তর রবীন্দ্রনাথের সঞ্চয়িতা রিনিউ করে নিয়ে যাই দেখে লাইব্রেরীয়ান ম্যাডাম একদিন বললেন- তুমি কি ঢাকা কলেজে ভর্তি হয়েছ সাহিত্য পড়ার জন্য? ক্লাসের পড়া নাই?

কি বলবো বুঝতে না পেরে মাথা চুলকাতে লাগলাম। ম্যাডাম বললেন- সঞ্চয়িতাটা একবারেই নিয়ে যাও। দুমাস পর আবার রিনিউ করে যাবে। এর বেশি দিতে পারছিনা। মাস দুয়েকের ভিতরেই বুকলিস্ট আপডেট করা হবে এই কারণে!

সেকেন্ড ইয়ারে ওঠার পর দেখলাম, সহপাঠিরা (সহপাঠিই, আমার প্রধান বন্ধুতো শুধু ইউসুফ) মোটামুটি টিউশন-মিউশন জোগাড় করে ফেলেছে। কেউ বা কোচিং এ ঢুকেছে। মোটামুটি গর্বের সাথেই বলছি, আমার সেসব সহপাঠিদের সিংহভাগই ছিল অত্যন্ত মেধাবী। যেমন পড়ালেখায়, তেমনি নানান দিক থেকে! আমাদের ফার্স্ট বয় ছেলেটা, যে দেখতে বকের ঠ্যাং এর মত লম্বা আর বাঁদরের মত রোগা ছিল সে তখন রিতিমত চারটা টিউশন করে। মাসে ইনকাম করে হাজার বারোর মত টাকা! সারা কলেজেই সে তখন জ্বলজ্যান্ত বিস্ময়!
এমনকি ইউসুফও একটা মেয়েকে পড়াচ্ছে। এ মুহুর্তে খেয়াল করতে পারছিনা, মেয়েটা তখন কোন ক্লাসে পড়তো। তবে মাস খানিকের মাঝে খবর পেলাম, সেই মেয়ে ইউসুফের প্রেমে পড়ে গেছে! আমি সেসবের কিছুই জোগাড় করতে পারলাম না।

যেহেতু কলেজ বাসে যাবার সুযোগ আছে, বাসা থেকে খুব অল্প কিছু টাকা দেওয়া হয় রোজ। সেই টাকা আমি চা আর ভেলপুরি খেয়ে শেষ করে ফেলি। এই মহান কর্মের কারণে একদিন পড়ে গেলাম মহান এক ফাঁপড়ে। ঢাকাইয়া কুট্টিরা যাকে বলে মাইনকা চিপা!

মাইনকা চিপার গল্প আরেকদিন করা যাবে। তবে বিমল দাশের গল্পটা বলতে ইচ্ছা করছে। আমি বলছি, এটা গল্প! সেও বিশাল এক মাইনকা চিপায় পড়েছিল।
এই নিয়মিত ক্লাস করা ছেলেটি টানা এক সপ্তাহ ক্লাসে আসলোনা একবার। স্যারেরাও চিন্তায় পড়লেন। হল কি? সাত আট দিন পর একদিন তাকে কলেজে আসতে দেখা গেল। ক্রাচে ভর দিয়ে। আমরা তাকে ঘিরে ধরলাম। কিন্তু সে কিছু বলতে চায়না। তবে বুঝলাম, সে এসেছে ছুটি নিতে। লুঙ্গি পরে বিমল প্রিন্সিপ্যালের রুমে ঢুকে গেল!

পুনশ্চঃ
বস্তুত আমরা আসল ঘটনা জেনেছিলাম আরও পরে। গ্রামের বাড়ি গিয়েছিল সে। তাদের বাসায় রাজহাঁস পালা হয়। পালে পালে রাজঁহাস। কোন এক অজানা কারণে সেই রাজহাঁস লুঙ্গির উপর দিয়েই তার বিশেষ যায়গায় কামড়ে দিয়েছে!

অনাকাংখিত খৎনার কারণে তার হাঁটাচলা এই এক সপ্তাহ বন্ধ ছিল! রাজহাঁস কেন এই কাজ করেছিল কে জানে! এ জগতের আর দশটা অমিমাংসিত রহস্যের মত এই ব্যাপারটাও আমাদের কাছে অমিমাংসিতই থেকে গেছে।
--------------------------------

এনামুল রেজার গল্প
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৬:৪০
১২টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মক্কা থেকে বদর: মুসলিম ভ্রাতৃত্বের ভূরাজনীতি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৫


মুসলিম বিশ্বে ঐক্যের নতুন অধ্যায় শুরু হয়েছে। অন্তত চুক্তিগুলোর নাম শুনলে তেমনটাই মনে হয়। মক্কা ও বদর। মুসলিম ইতিহাসের দুটি পরিচিত নাম। নাম শুনে মনে হতে পারে, বহুদিনের বিভেদ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ধর্মোন্মাদদের কল্পিত বাস্তবতা: "দি ম্যাট্রিক্স" এবং নীল বড়ি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:১৭


বাংলাদেশ ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গিদের কবলে পড়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধম্যের কল্যানে এই ধর্মোন্মাদনা দাবানলের মতো সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ছে।

ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে, কদিন আগে সাতক্ষীরায় একদল ধর্মোন্মাদ ও জঙ্গি ওয়াহিদুজ্জামান শামীম... ...বাকিটুকু পড়ুন

যারা ব্রয়লার মুরগী খায় তারা সমকামী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:৫৩


ওয়াজ শোনেন অথচ মুফতি কাজী ইব্রাহিম হুজুরকে চেনেন না, এমন মানুষ বাংলাদেশে খুব কমই আছেন। হুজুরের আরেকটি বড় পরিচয় হলো, তিনি করোনার ওষুধ স্বপ্নে পেয়েছেন বলে দাবি করেছিলেন। হুজুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেইপ শিফটার ৩ - মাছ কন্যা

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:১৯


২০১১ এর দিকে নর্থ –ইয়র্কে থাকাকালীন রুমার বাসার আশেপাশে তেমন কোন বাঙালি দোকান ছিল না ।সেই টরোন্টর নামকরা চাইনিজ সুপারমার্কেট –টা বেশ দূরে। পায়ে হেঁটে যাওয়ার পথ নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে পথ ধরে রথো রাফি হেঁটে যেতেন: চলে গেলেন ব্লগার রাফি

লিখেছেন শরৎ চৌধুরী, ২২ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:০৩

কবি, ব্লগার ও অনুবাদক রথো রাফির স্মরণ
রথো রাফি ব্লগ
রথো রাফি আর নেই—সত্যটি মেনে নেওয়া ভীষণ কঠিন। একজন মানুষের চিরপ্রস্থানের পর আমরা কেবল তার শারীরিক অনুপস্থিতিই টের পাই না, বরং গভীরভাবে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×