এটিএন টিভিতে ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল আওয়াল মিন্টুর একটা মন্তব্য শুনে এতোটা অবাক হয়েছি যে বলার অপেক্ষা নেই। উনি একজন বিরাট ব্যবসায়ী কিন্তু একাউন্টাস বুঝেন না সেটা কাউকে বললে বিশ্বাস করানো যাবে না। একটা সংস্থা - যেমনই হোক সেটা - তার আয় এবং ব্যয় থাকবে। যদি আয় দৃশ্যমান উৎস থেকে না আসে - সেটা অন্ধকার উৎস থেকে আসার সমূহ সম্ভাবনা থাকবে। সেটা হলো সকল অনিয়ম আর বিশৃংখলার জন্ম দেবে।
উনাকে জিজ্ঞাসা করা হলো - জলিল সাহেব প্রস্তাব দিয়েছেন ভোট প্রতি দলগুলোকে সরকার ৫ টাকা করে অনুদান দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। উত্তরে ভদ্রলোক বললেন - এটা একটা আব্দার নাকি- জনগনের পয়সায় রাজনৈতিক দলের লোকজন বসে বসে খাবে এটা হতে পারে না। উনি আরো বলেন যে পৃথিবীর কোথাও এই ব্যবস্থা নেই।
অবাক হয়ে ভদ্রলোককে কথা শুনলাম । উনিই একসময় দুই নেত্রীকে কোটি কোটি টাকা চাঁদা দিয়েছে এবং সেই সুবাদে সর্বোচ্চ ঋণলেলাপী হওয়ার পরও বেশ বহাল তবিয়তে ছিলেন।
যাই হোক। আমার বিশ্বাস উনি বিশেষ ভাবে ভেবে কথাটা বলেন নি। এটা বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ক্ষেত্রে সত্য বটে - খুব বেশী ভাবনার সময় কারো নেই। জলিল সাহেব বললে সেটা একদল বিরোধীতা করবে এবং একদল সমর্থন করবে। অন্যদিকে ভুইয়া সাহেব বললে এই দুই দলের শুধু স্থান বদলা করবে - এই ব্যবস্থা চলে আসছে গত ১৫ বছর যাবত। কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি।
আসুন - জলিল সাহেবের প্রস্তাবটা একটু গভীর ভাবে ভেবে দেখা যাক।
আমরা সবাই বাংলাদেশে গনতন্ত্র চাই এবং গনতন্ত্ররে জন্যে রাজনৈতিক দলের উপস্থিতি অপরিহার্য। এটা বাস্তবতা যে, একটা রাজনৈতিক দল থাকলে তার ব্যয় থাকবে। আর ব্যয় থাকলে আয় থাকতে হবে। বাংলাদেশের দলগুলোর এই সবই আছে - কিন্তু সেগুলো অসচ্ছ। সেই সুযোগে কালো টাকার মালিকরা তাদের আশ্রয় হিসাবে রাজনৈতিক দলগুলোকে ব্যবহার করে। ঠিকাদার থেকে শুরু করে সুবিধাবাদী রাষ্ট্রীয় কর্মচারীরা সবাই এই অর্থ সংগ্রহের চক্রের মধ্যে জড়িত হয়। ফলাফল আজকের দূর্নীতিতে ভারাক্রান্ত বাংলাদেশ।
আরেকটা কথা চিন্তা করা দরকার - একজন মানুষ ঘরের খেয়ে কেন বনের মোষ তাড়াতে আসবে - যদি তার ব্যক্তিগত সুবিধাগুলো সেখানে নিশ্চিত না হয় - সেই জন্যই দেখা গেছে ছাত্র বা শ্রমিক সংগঠন গুলোতে দূর্নীতি সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়েছে। একটা কথা আমাদের বুঝতে হবে যখন একটা সংগঠনের আর্থিক সচ্ছতা না থাকবে - সেখানে দূর্নীতিই হবে একমাত্র নীতি। তা ছাড়া আমরা যখন আশা করবো রাজনীতিকরা আমাদের কথা ভাববে বা আমাদের জন্য কাজ করবে - তখন তাদের জীবিকার ব্যবস্থাও আমাদেরই করতে হবে। এখানে একটা বিষয় পরিষ্কার ভাবে জানতে হবে - নাথিং ইজ ফ্রী ইন ক্যাপিটালিস্টিক সোসাইটি । সুতরাং সাভির্সের জন্যে পে করতে হবে। প্রকৃতপক্ষে মেধাবী মানুষের রাজনীতিতে আনার জন্যে রাজনৈতিক পদগুলোকে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পদ হিসাবে তৈরী করতে হবে। মেধাবী মানুষদের রাজনীতিতে অংশ গ্রহনে অনীহার ফলে “ছাগল দিয়ে হাল চাষ” করার ফলাফল নিশ্চয় বাংলাদেশের মানুষ হাড়ে হাড়ে উপলদ্ধি করতে পারছে।
এখন দেখা যাক - যদি ভোটার প্রতি ৫ টাকা দেওয়া তাহলে কি হবে। রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন কমিশনে আয় ব্যয়ের হিসাবে দিতে হবে। নিয়মিত অডিট হবে এবং মানুষ জানবে রাজনৈতি দলগুলো কিভাবে অর্থ ব্যয় করেন। অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো যেহেতু জনগনের অর্থে চালিত হবে - সেখানে সৎ রাজনীতিকরা প্রভাব বিস্তার করে দলকে নীতির উপর রাখতে পারবে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়নের ব্যবস্থা প্রচলিত। ক্যানাডায় গত দশ বছরে রাজনৈতিক দলের অর্থায়নের বিষয়ে তিন বার পরিবর্তন আনা হয়েছে। একসময় কর্পোরেশন গুলো চাঁদা দিতে পারতো - তার কোন সীমাবদ্ধ পরিমান ছিল না। সেক্ষেত্রে কর্পোরেশন গুলো দেয় চাঁদার ৬০% ট্যাক্স রেয়াত পেত। কিন্তু দেখা গেল কর্পোরেশন গুলো তাদের সুবিধামতো আইন তৈরী করার জন্যে রাজনৈতিক দলগুলোর উপর প্রভাব বিস্তার করে। একটু লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে তাদের চাঁদার ৬০% কিন্তু জনগনই বহন করছে। পরবর্তীতে কর্পোরেশনে চাঁদার একটা লিমিট কর হয় এবং ব্যক্তিগত ভাবে চাঁদা দেওয়ার আইন করা হয়। সেখানেও দেখা যায় কর্পোরেশনের মালিকরা নামে বেনামে রাজনৈতিক দলগুলোকে চাঁদা দিয়ে একই কর্ম করছে। অবশেষে কর্পোরেশনে চাঁদা বিষয়টা একটা নামমাত্র পরিমানে সীমিত করে ভোট প্রতি ২ ডলার ৫০ সেন্ট প্রদানের সিন্ধান্ত নেওয়া হয়। শর্ত হলো কমপক্ষে সর্বমোট ভোটের ৩% একটা দল পেলে সে সেই অনুদানের যোগ্যতা লাভ করবে। এখন ক্যানাডার মানুষের কাছে রাজনীতিবিদরা জবাবদীহিতার একটা চরমে পৌছেছে এবং ভোট প্রদান সহ রাজনীতিতে জনগনের সম্পকৃক্ততা বেড়েছে।
অন্যদিকে আমেরিকায় এখন কর্পোরেট চাঁদার ফলাফল হিসাবে আমরা দেখছি সেই দেশের অধিকাংশ মানুষ যুদ্ধ না চাইলেও কর্পোরেশনের চাপে সরকারকে যুদ্ধ করতে হয়। আমেরিকার জনগন মূলত রাজনীতি বিমুখ এই কারনেই - কারন রাজনীতি একটা বিরাট ব্যয়সাপেক্ষ বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। উদাহরন হিসাবে বলা যায় - গত সিনেট নির্বাচনে একটা সীটে দুই দলের প্রার্থীদের মোট ব্যয় হয়েছে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার। সেই অর্থ সম্পূর্ন এসেছে কোন না কোন গোষ্ঠী থেকে । ফলাফল হিসাবে কর্পোরেশন গুলোর কাছে জিম্মী হয়ে আছে পুরো দেশ।
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক দলের অর্থায়নে পথ যদি বলি অবৈধ চাঁদাবাজী - তা হলে আমেরিকারটা বলবো বৈধ চাঁদাবাজী। ২০০৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের খবর যদি একটু লক্ষ্য করা যায় - দেখা যাবে খবরে জনসমর্থনে পাশাপাশি কে কতো অর্থ সংগ্রহ করেছে তা ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে। এই বিরাট অংকের অর্থ কিন্তু দাতারা এমনিতেই দেয় না - একটা এজেন্ডা থাকে এর পিছনে । এই বিষয়ে দুইটা উদাহরন দেওয়া যাক। আমেরিকান ফার্স্ট ফুড শিল্প বিশ্বখ্যাত। কিন্তু পুষ্টিবিবেচনায় এগুলো হলো অখাদ্য। এই সত্যটা আমেরিকার সবাই জানে - কিন্তু খাদ্য শিল্পের মালিকপক্ষের রাজনীতির উপর বিরাট প্রভাব থাকায় সরকার শুধু আলোচনার মধ্যেই বিষয়টা সীমাবদ্ধ রাখে আর দিনে দিনে অবিস (স্থুলকায়) মানুষে আমেরিকা ভরে যাচ্ছে এবং আমেরিকার জনস্বাস্থ্য মারাত্বক হুমকীর মুখে। আরেকটা উদাহরন হলো - আমেরিকান স্মল গান শিল্প। প্রতিটি নির্বাচনে “রাইফেল এসোসিয়েশান” রিপাবলিকানদের প্রচুর চাঁদা দিয়ে এটা নিশ্চিত করে যেন আমেরিকায় খোলা বাজারে অস্ত্র বিক্রয়ে উপর কোন ধরনের নিয়ন্ত্রন না আনা হয়। এমনকি ভার্জিনিয়া টেক ইউনিভার্সিটি বা কলোম্বাইন স্কুলে সুটিংএর মতো ভয়াবহ হত্যাকান্ডও নীতি নির্ধারকদের উপর প্রভাব ফেলতে পারে না। এই বিষয়ে অনেক উদাহরন দেওয়া যাবে। মজার বিষয় হলো আমেরিকার ভুল নীতিগুলো থেকে ইউরোপ এবং ক্যানাডা শিক্ষা নিয়ে দ্রুত তাদের আইনকানুন বদলায় - কিন্তু আমেরিকা পুঁজির কঠিন থাবা থেকে নড়তে পারে না।
যারা আমেরিকান রাজনীতির অসহায় অবস্থা সম্পর্কে আরো জানতে আগ্রহী তাতের জন্য দুইটা ডকুমেন্টারী ভাল সোর্স হতে পারে। হয়তো মুভি দুইটি দেখার পুঁজিবাদী গনতন্ত্র সম্পর্কে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলেও যেতে পারে।
১) মাইকেল মুরের “বোলিং ফর কলম্বাইন (Bowling for Columbine)
2) ফার্স্ট ফুট বিষয়ক ডকুমেন্টারী - (Super Size Me)
শেষ কথা হলো - নিজেদের দেশের ভাল মন্দ নিজেরা বুঝতে ব্যর্থ হলে এই পুঁজির মালিকরাই কনসালটেন্ট হিসাবে গিয়ে তাদের হিস্যা নিশ্চিত করে আসবে। ফলে দেশে অবস্থা যেখানে আছে সেখানেই থাকবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের দিকে তাকালেই এই বাক্যের সত্যতা উপলদ্ধি সম্ভব। পিছন দিয়ে হাতি যাওয়া বন্ধ করার প্রচেষ্ঠা হিসাবে চোখের সামন দিয়ে মশা যেতে দেওয়া ছাড়া আপাতত কোন বিকল্প নেই।
ভোট প্রতি ৫ টাকা - আব্দার না কি যৌক্তিক প্রস্তাব!
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
তারেক রহমানের চীন সফর, অশ্বডিম্ব।
বাংলাদেশী মিডিয়া সোসাল মিডিয়াতে তোলপার
তারেক রহমানের চীন সফরে ভারত উদ্বিগ্ন।
এখন তো দেখলাম অশ্বডিম্ব।
কোন অর্থায়ন চুক্তি নেই, নতুন কোন ঋন দিবে না
বহুল আলোচিত তিস্তা প্রকল্প নিয়ে কোন চুক্তি বা মামুলি সমঝোতা... ...বাকিটুকু পড়ুন
অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন
তুরাগের বুকে আমার ছোট ভাইদের লাশ ২০২৪-এর উপহার ‼️

২০২৪ আমাদের নতুন করে শত্রু মিত্র চিনতে শিখিয়েছে। আমি কোনো করুনা, সান্ত্বনা কিংবা বিচারের দাবি নিয়ে আজকের এই ক্ষুদ্র পোস্ট লিখতে চাই না।শুধু সময়ের স্বাক্ষী হিসেবে একটু আচর কেটে... ...বাকিটুকু পড়ুন
আম গেল ছালাও গেল

আমিনুল ইসলাম বুলবুল বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের এমন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, যার নাম মুছে ফেলা অসম্ভব। ১৯৯৯ সালে ইংল্যান্ডের মাটিতে শক্তিশালী পাকিস্তানকে হারিয়ে বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের মাথা উঁচু করেছিলেন এই... ...বাকিটুকু পড়ুন
সৌর বিদুৎ।

আমি বিটিভি দেখতে ভালোবাসি। একদিন বিটিভিতে একটি জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞাপন দেখেছিলাম। এটি কোনো বাণিজ্যিক বিজ্ঞাপন ছিল না। সেখানে তৎকালীন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী/মন্ত্রী সোলার বিদ্যুৎ সম্পর্কে সংক্ষেপে বলছিলেন।... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।