somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

খেলাঘর: যুদ্ধ, ভালবাসা ও প্রকৃতির গল্প

২৫ শে অক্টোবর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খেলাঘর ছবিটিকে ঘিরে কোনো রকম আলোড়ন সৃষ্টি না-হওয়াটা বিস্ময়ের উদ্রেক করে। না দর্শক, না সমালোচক কেউই গ্রহণ করলো না ছবিটিকে। অথচ উভয়কেই আকৃষ্ট করার মতো যোগ্যতা ছবিটির ছিলো। মাটির ময়না (২০০২), ব্যাচেলর (২০০৪) কিংবা কোটি টাকার কাবিন (২০০৬)Ñ তিন ছবির তিন শ্রেণীর দর্শক; যে যার রুচিমতো এই তিনটি ছবিকে সা¤প্রতিক সময়ে দর্শক গ্রহণ করেছে। কিন্তু খেলাঘর-এর প্রতি কোনো ধরনের দর্শকই সাড়া দিলো না। অথচ চাকার (১৯৯৩) পর দুখাই (১৯৯৭), বৃষ্টি (২০০০), দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬), দূরত্ব (২০০৪) ইত্যাদির মধ্যে এটাই মোরশেদের সবচাইতে সুনির্মিত ছবি। দর্শক-মনস্তত্ত্বের ওপরে কারও হাত নেই, সমালোচকদেরও প্রশ্ন করার কোনো সুযোগ নেই। তবে এধরনের অভিজ্ঞতা নির্মাতাকে হতাশ করে দেবার সম্ভাবনা থাকে।

যেকোনো যুদ্ধের অবশ্যম্ভাবী শিকার হয় নারী, তার শরীর হয় হানাদারের সহজ ল্যস্থল, সেই নারীর মনোবিকলন হয়ে দাঁড়ায় অন্যতম ফলাফল। খেলাঘর ছবির কাহিনী তেমন একজন নারীর। তবে ছবিটিতে তার আক্রান্ত হবার দৃশ্যায়ন নেই, আক্রমণ-উদ্ভূত মনোবিকলনেরও সচেষ্ট বর্ণনা নেই, রয়েছে বিকলন-পরবর্তী তার স্বপ্নময় কয়েকটি দিন, এক যুবার সঙ্গে তার গড়ে তোলা খেলাঘর Ñ এবং যেকোনো খেলাঘরের েেত্র যা ঘটে Ñ তার ভাঙ্গনের বর্ণনা। কিন্তু ছবিটি দেখা শেষে দর্শকের মনে কীসের রেশ জিইয়ে থাকে? মেয়েটির ট্র্যাজিক চলে যাওয়া? দ্বিধাগ্রস্ত নায়কের কাক্সিত পরিবর্তন? না, ছবিটি দেখা শেষ করলে দর্শকের মনে ভেজা-ভেজা, সবুজ-সজীব এক অনুভূতি আচ্ছন্ন করে রাখে। রেহানা ও ইয়াকুব আদিনাথের পরিত্যক্ত যে-ভিটায় খেলাঘরটি সাজিয়ে তোলে, সেই ভিটায় গজিয়ে ওঠা জমাট-ঘন সবুজ গাছপালা ও তাকে ঘিরে রাখা বর্ষাকালীন জলাশয়েরই জয় হয় শেষ পর্যন্ত, অপূর্ব সিনেমাটোগ্রাফিতে সেই প্রকৃতির শাসনই দেখা গেল পুরো ছবি জুড়ে। বাংলাদেশের কোনো ছবিতে প্রকৃতি এত প্রধান হয়ে ওঠেনি, এতটা দাপট দেখায়নি। মোরশেদুল ইসলামেরই দুখাই ছবিতে প্রকৃতিই ছিলো প্রধান চরিত্র, দুখাই ছিলো তার অসহায় ক্রীড়নক। আর সেখানে সে বিনাশক। কিন্তু এখানে প্রকৃতি প্রধান চরিত্র নয়, অথচ সে ঘটনাকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। আর এখানে সে মা-প্রকৃতি, খেলাঘর গড়ে তোলার জন্য রেহানা ও ইয়াকুবকে সে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে। মাহমুদুল হকের উপন্যাসে যে-মেসেজ ছিলো তাকে ছাপিয়ে চলচ্চিত্রে প্রকৃতিই প্রধান হয়ে উঠলো! পরিচালক মোরশেদুল ইসলাম ও ক্যামেরাম্যান এল. অপু রোজারিওর এটা কি সচেতন প্রয়াস ছিলো? নাকি ক্যামেরাযন্ত্রের উৎকর্ষের কারণে বাংলার প্রকৃতিতে সৌন্দর্যের আরেক প্রস্থ প্রলেপ পড়েছে মাত্র।

যুদ্ধে জড়িয়ে পড়লে একটি দেশের মানুষকে অন্তঃত তিনটি শ্রেণীতে চিহ্নিত করা যায়Ñ একদল আক্রমণের শিকার হয়, আরেকদল প্রতিরোধ গড়ে আর তৃতীয় দলটি কনফিউজড্ হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রোপটে নির্মিত খেলাঘর ছবির তিনটি চরিত্রের মধ্যে রেহানা আক্রান্ত, স্কুলমাস্টার মুকুল প্রতিরোধ গড়ছে আর তারই বন্ধু কলেজ-শিক ইয়াকুব দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। একারণে মুকুল চরিত্রটি খুব স্পষ্ট Ñ তার চোখ ভরা স্বপ্ন, বুক ভরা সাহস Ñ দেশ স্বাধীন হবেই, গেরিলারা পাক-সেনাদের পরাজিত করবেই। ইয়াকুব চরিত্রটি শুধু দ্বিধাগ্রস্তই নয় অস্পষ্টওÑ তার দেশপ্রেম আছে অথচ মনে করে এই পরিস্থিতি চুপচাপ বসে থাকা ছাড়া আর কীইবা করার আছে। এক দৃশ্যে তাকে বেশ দার্শনিকের মতো কথা বলতে শোনা যায়; আদিনাথের ভিটেকে নির্দেশ করে সে বলে, কেন যে মানুষ জায়গা-জমি করে, এখন এখানে বাতি জ্বালাবার কেউ নেই, ক’দিনরই বা সব ইত্যাদি। কিন্তু আর কোথাও তার দার্শনিকতার নিদর্শন পরিচালক দেখাননি। ইয়াকুব চরিত্রটি অসম্পূর্ণভাবে চিত্রায়িত। আর পুরো ছবি জুড়ে রেহানা চরিত্রটি দুর্বোধ্য, তার আচরণ দেখে ইয়াকুবের পাশাপাশি দর্শকও বুঝে উঠতে পারে না, সে মাঝে মাঝেই অযৌক্তিক আচরণ কেন করে। অবশ্য ছবির একেবারে শেষের দিকে তার কার্যকারণসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়।

ছবির কাহিনী সংক্ষেপে এই: ঢাকায় উচ্চশিক্ষা নিলেও ইয়াকুব এখন গ্রামের একটি কলেজে শিকতার চাকরি নিয়েছে। এখানে আছে তার বাল্যবন্ধু স্কুলশিক মুকুল। স্কুল-কলেজ বন্ধ, মুকুল গোপনে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাজ করে আর দ্বিধাগ্রস্ত ইয়াকুব প্রকৃতি দেখে, শুয়ে-বসে সময় পার করে। এরইমধ্যে ঢাকা থেকে বন্ধু টুনুর একটি চিঠি আসে, চিঠির সঙ্গে টুনুর কাজিন রেহানাও আসে। যুদ্ধের ডামাডোলে তাকে ঢাকা থেকে সরিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে, ইয়াকুবের দায়িত্ব তাকে কয়েকটা দিন আশ্রয় দেয়া। মুকুল বাস করে মাতবর পিয়ার মোহাম্মদের দখলে থাকা চারশ বছর আগের পরিত্যক্ত এক বাড়িতে, আদিনাথের ভিটায়। সেখানেই রেহানার থাকার জায়গা হয়, রেহানার আব্দার অনুসারে ইয়াকুবও সেখানে থাকে। তারা দু’জন সেখানে চুলা ধরিয়ে রান্না করে, পুকুরে গোসল করে, ফুল কুড়ায়, বাঁশি বাজায় Ñ একটা অস্থায়ী সংসার গড়ে তোলে Ñ যাকে ঔপন্যাসিক ও পরিচালক উভয়েই বলছেন খেলাঘর। এক পর্যায়ে, তৃতীয় দিনে, তাদের মধ্যে প্রেম হয়। পরদিন সকালে টুনু আসে, টুনুর কাছ থেকে ইয়াকুব জানতে পারে পঁচিশে মার্চ রাতে রেহানাকে রোকেয়া হল থেকে মিলিটারিরা ক্যাম্পে ধরে নিয়ে যায়, দশদিন আটকে রেখে নির্যাতন করে, এরপর থেকেই রেহানার মনোবৈকল্য দেখা দেয়। দর্শক ও ইয়াকুব একসঙ্গে বুঝতে পারে রেহানার হঠাৎ-অযৌক্তিক আচরণের কারণÑ কেন সে হঠাৎ হঠাৎ কেঁদে উঠতো, কেনইবা চোখের জল শুকানোর আগেই হেসে ফেলতো। ইয়াকুব এসব কাহিনী জানার পর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে, আর রেহানা ফিরে যায় টুনুর সঙ্গে। রেহানার প্রস্থান ইয়াকুবের মধ্যে পরিবর্তন আনে, সে মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে যোগ দেয়।

আগেই বলেছি খেলাঘর সুনির্মিত ছবি। এবারে তাহলে সুনির্মিতির সূত্র ধরিয়ে দেয়া যাক। পরিচালকের প্রধান কৃতিত্ব যুৎসই লোকেশন বাছাই। আর তার সঙ্গে ক্যামেরা ও শব্দের সুসমন্বয়। গাছপালা ঝোপঝাড়ে আকীর্ণ পানামনগরের বাড়িটি ভরা বর্ষার জলাশয়ে ঘেরা, নৌকাই এখানে যাওয়া-আসার একমাত্র বাহন, যা জুলাইয়ের একাত্তরের সঙ্গে মিলিয়ে নিতে কোনো অসুবিধা হয়না। মূল গ্রাম থেকে বেশ দূরের এই নির্জন বাড়িটি যেমন ধীরলয়ের গ্রামীণ নিস্তরঙ্গ জীবনকে বোঝায়, তেমনি ক্যামেরা মুভ করে ধীরে ধীরে, বলা যায় নৌকার গতিতে। কিন্তু দ্বন্দ্ব হলো চলচ্চিত্র সংগঠনের মূল কথাÑ তাই এই নিস্তরঙ্গ প্রকৃতির বিপরীতে দ্বান্দ্বিক ভূমিকা রেখেছে রেহানার দ্রুতলয়ে ও একটানা কথা বলার ভঙ্গী। আর এই শান্ত, নিরুপদ্রব জীবনের সঙ্গে দূরে কোথাও বাজতে থাকা যুদ্ধের দামামার দ্বন্দ্ব তো কাহিনীরই কেন্দ্রে রয়েছে। দ্বান্দ্বিক দৃশ্যও রয়েছে। যেমন রেহানা যখন একপর্যায়ে ইয়াকুবের ভালবাসায় সাড়া দিলো, সকালে দেখানো হলো এই প্রথম তারা রাতে একসঙ্গে ঘুমিয়েছে, ঠিক তার পরের দৃশ্যেই টুনুর প্রবেশ কাহিনীতে। অর্থাৎ উভয়ের প্রেমের সম্মতির পরপরই বিচ্ছেদ। আর শৈলী-বিবেচনায় প্রথমেই মনে পড়ে যায় বেশ কয়েকটি 'ফ্রেম উইদিন ফ্রেম' শট। পুরনো বাড়িটিতে কোনোক্রমে-টিকে-থাকা কিংবা ভেঙ্গে-পড়া দেয়ালে দেয়ালে নানাবিধ ফ্রেম Ñ কোনোটা জানালার মতো, কোনোটা দরোজার মতো, কোনোটা আয়তত্রোকার Ñ পরিচালক চরিত্র দু’জনকে সেইসব ফ্রেমে বা ফ্রেমের পেছনে দাঁড় করিয়ে দেন এবং ক্যামেরাকে ফ্রেমের এপারে রাখেন, ক্যামেরার ভেতরে আরেক ক্যামেরা কাজ করে। এপারে অপোকৃত অন্ধকার আর ওপার থেকে দেয়ালের ফ্রেম দিয়ে প্রচুর আলোÑ তাতে নোনাধরা দেয়াল-শ্যাওলা মিলে চমৎকার 'ফ্রেম উইদিন ফ্রেম' শট তৈরী হয়ে যায়। অনেক পুরাতন প্রাসাদসদৃশ বাড়িতে সারিবদ্ধ উঁচু খিলানগুলো শুধু মিজ-অঁ-সেনকেই সমৃদ্ধ করেনি, দু’টি নারী-পুরুষ তাদের খেলাঘরে কতখানি মগ্ন তা বোঝাতে প্রতীকী দূরত্বও তৈরি করেছে। পরিচালক পুরো ন্যরেটিভকে সজীব রাখতে ব্যাকগ্রাউন্ডে প্রয়োজনমতো মানুষ বা প্রকৃতির মুভমেন্টকে সচেতনভাবে ব্যবহার করেছেন। যেমন ভোলানাথ কবিারাজের বাড়ির বাইরে রেহানা ও ইয়াকুব কথা বলছে, পেছনের খাল দিয়ে তখুনি একটা নৌকা চলে গেল। রেহানা ও ইয়াকুব নৌকাযোগে মিঠুসারের পরিত্যক্ত বাড়িতে আসছে, পেছনে দেখা গেল গ্রামের কয়েকজন ছেলেমেয়ে নৌকায় করে শাপলা ফুল তুলছে। দ্বিতীয় দৃশ্যে গ্রামের রাস্তা দিয়ে মুকুল চায়ের দোকানে আসছে, তাকে অতিক্রম করে গেল একজন ফেরিওয়ালা। তবে এধরনের জীবন্ত চিত্র তুলতে গিয়ে সবসময় সুপ্রযোজ্য হয়নি। যেমন মুকুল ও ইয়াকুব যখন টুনুর চিঠির খবর শুনে ঘাটে আসছে গ্রামের রাস্তা দিয়ে, তখন তাদের অতিক্রম করে যায় তিন জোড়া গ্রামের মানুষ Ñ বাবা সঙ্গে মেয়ে, দুই যুবক ইত্যাদি। তাদের প্রত্যেকের গতি একরকম, দ্রুতলয়ের। কিন্তু তাদের যাওয়া দেখে মনে হবে দম দেয়া পুতুল তারা। তাদের কাউকে এই দুই শিকের একজনকে সালাম দেবার মাধ্যমে তৈরী-হওয়া যান্ত্রিকতা ভেঙ্গে দেয়া যেত। ছবির প্রথম দিকে যুদ্ধের কারণে বহু মানুষ গ্রামের রাস্তা দিয়ে নিজেদের এলাকা ছেড়ে অন্যত্র চলে যাচ্ছে, লঙ শটে ক্যামেরা তাদের ধরে রেখেছে। চায়ের দোকানদার চিৎকার করে জিজ্ঞেস করলো, ও মিয়াভাইরা কোনখানে যাও? জনতার কাফেলাদের মধ্য থেকে কেউ কোনো সাড়া দিলো না। এখানেও খানিকটা যান্ত্রিকতার বোধ তৈরী হয়।

এই ছবির প্রধান সম্পদ এর সিনেমাটোগ্রাফি। মোরশেদের সঙ্গে অপু রোজারিও এর আগে দূরত্ব ছবিতেও কাজ করেছেন, দূরত্বে কোজ শটেই তাকে বেশি কাজ করতে হয়েছে, কাহিনীর প্রয়োজনে। কিন্তু খেলাঘর-এ প্রকৃতির কোলে লঙ শটে কাজ করতে গিয়ে ক্যামেরাম্যান তার প্রতিভার প্রকাশ ঘটাতে পেরেছেন। কাহিনীর ধীরগতির সঙ্গে, কাহিনীর প্রোপট নিস্তরঙ্গ গ্রামের সঙ্গে সুসমন্বিতভাবে কাহিনীতে বহুব্যবহৃত নৌকার গতির মতো করে ক্যামেরাকে পুরো ছবি জুড়ে সঙ্গতি রা করে চালনা করাÑ এ এক বিরাট সাফল্য। তার ক্যামেরায় সবুজ-জমাট প্রকৃতি সবকিছুকে ছাড়িয়ে অপূর্ব সৌন্দর্য আকারে দেখা দিয়েছে। ওয়াইডস্ক্রিনের জন্য নির্মিত এই ছবির চমৎকার প্রিন্টের কৃতিত্ব ক্যামেরাম্যানের পাশাপাশি মাদ্রাজের প্রসাদ ল্যাবরেটরির টেকনিশিয়ানদেরও। বলা যায়, এই ছবির মধ্য দিয়েই এল. অপু রোজারিও যুক্ত হলেন বেবী ইসলাম কিংবা আনোয়ার হোসেনের মতো স্বনামধন্য ক্যামেরাম্যানদের সারিতে।

খেলাঘর-এর আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো শব্দসমন্বয়। রতন পাল তার নামের প্রতি সুবিচার করেছেন এছবিতেও। প্রথম দৃশ্যের কথাই ধরা যাক। মুকুল নৌকাযোগে এগিয়ে আসছে, যত সে ক্যামেরার কাছাকাছি আসছে, তত পানিতে বৈঠা-ঠেলার শব্দ বাড়ছে। আর যথাযথ মাত্রায় পাখির ডাক, ঝিঁঝিঁর শব্দ নির্জন প্রকৃতিকে বিশ্বাসযোগ্য করে তুলেছে। প্রত্যন্ত ও নির্জন লোকেশন হবার কারণে ambience sound এই ছবিতে অবাঞ্ছিত নয়, বরং তা বাঞ্ছিত ব্যঞ্জনা এনে দিয়েছে। প্রাকৃতিক শব্দমুক্ত শট এছবিতে খুব কমই রয়েছে। শব্দধারণের পাশাপাশি আজকাল রতন পাল সম্পাদনার দায়িত্বও পালন করছেন, খেলাঘর-এর সম্পাদকও তিনি। জরুরি এই দায়িত্বটি পালনেও তিনি উৎরে গেছেন।

আলোকসম্পাতেও পরিমিতিবোধ দেখা গেছে। বেশ সময়জুড়ে রাতের দৃশ্য রয়েছে এবং সবই ঘরের ভেতরে। ঘরের ভেতরে জ্বলছে হারিকেন, এই হারিকেনের আলোর মাত্রাকে মানিয়ে দৃশ্যধারণ একটা চ্যালেঞ্জই বটে। মাঝে মাঝে তাতে বিচ্যুতি ঘটেছে। যেমন ছবির প্রথম দিকে মুকুল ঘরে ফিরে বই পড়ছে, সে এমনভাবে বইটা ধরেছে, হারিকেনের আলো তাতে পড়ছে না। অথচ দেখা গেল সে মনোযোগ দিয়ে বই পড়ছে। হারিকেনের আলো বইতে না-ফেলে বই পড়তে গেলে বইয়ের পৃষ্ঠায় অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই দেখা যায় না। এরকম দুয়েকবারের ত্রৃটি অন্য অনেক বারের সাফল্যকে ম্লান করে দেয়।

ইমন সাহার আবহসংগীত লাগসই হয়েছে। আবহসংগীতের ব্যবহার ছবির শেষের দিকেই বেশি হয়েছে। পুরো ছবির বিবেচনায় আবহসংগীতের ব্যবহার সামান্যই, কিন্তু ততটুকুতেই ইমন সাহা মুন্সিয়ানার স্বার রেখেছেন। শেষ দৃশ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের আগমণের সময় তবলার ব্যবহার অপূর্ব লেগেছে। এছাড়া সরোদ, বাঁশি ও জলতরঙ্গের উল্লেখযোগ্য ব্যবহার সংগীতকার করেছেন। মন্দিরা, তানপুরা ও গিটারের সামান্য ব্যবহারও রয়েছে। রেহানার প্রস্থানের পর আজিজুর রহমান তুহিনের কণ্ঠে 'তুমি তো যাবেই চলে' গানটির ব্যবহার লাগসই হয়েছে। তবে রেহানার ঠোঁটে বন্যার গাওয়া 'আলোকেরই ঝর্ণাধারায় ধুইয়ে দাও' গানটির ব্যবহার বাহুল্য মনে হয়েছে।

রেহানার মতো জটিল চরিত্রে নতুন অভিনেত্রী সোহানা সাবা সাফল্যের সঙ্গে উৎরে গেছেন। মুখরমুহূর্তে তার কণ্ঠ যেমন চঞ্চল, বিষাদমুহূর্তে কণ্ঠ তেমনই বিষাদাক্রান্ত। কিন্তু ইয়াকুব চরিত্রে রিয়াজ মাঝে মাঝে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। এই ছবিতে পরিচালক যতটা সম্ভব কম সংলাপ ব্যবহার করার চেষ্টা করেছেন। রেহানা চরিত্রটিই এমন যে তাকে প্রচুর কথা বলতে হয়। মুকুলকেও কথা বলতে হয়, দেশ স্বাধীন হবার স্বপ্নের কথা ইয়াকুবকে শোনাতে হয়। কিন্তু ইয়াকুবের ভেতরের দ্বিধাগ্রস্ততা, ভীরুতা তাকে যতটা ভাবায়, তার প্রকাশ ততটা নেই। আবার তার মধ্যে দার্শনিক অনেক বোধ কাজ করে, দুয়েকবার ছাড়া তার প্রকাশও আমরা দেখিনি। তার চাইতে বড়ো কথা, রেহানার যত কথা, তা চুপচাপ ইয়াকুবকেই শুনতে হয়। তাই ইয়াকুবের ভাগ্যে পড়েছে কম কথা বলার দায়িত্ব, মূলত নির্বাক এক্সপ্রেশনের ওপরে ভিত্তি করেই তার চরিত্রটা দাঁড়িয়ে। এই জায়গায় এসে রিয়াজ মাঝে মাঝে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন, কখনো কখনো তার এক্সপ্রেশন, এমনকি কণ্ঠের প্রপেণ, পরিস্থিতি অনুযায়ী যথাযথ হয়নি। তবে মুকুল চরিত্রে আরমান পারভেজ অসামান্য অভিনয় করেছেন। ছোট্ট চরিত্র হলেও মাতবর চরিত্রে সালেহ আহমেদ ও টুনু চরিত্রে গাজী রাকায়েত ভালো অভিনয় করেছেন।

কিছু অসঙ্গতির দিকেও ইঙ্গিত দেয়া দরকার। ইয়াকুব রেহানাকে নিয়ে নৌকা করে মিঠুসারের পরিত্যক্ত ভিটায় নিয়ে যাবার দৃশ্যটির প্রথম দিকে ইয়াকুব বললো, আমরা কিন্তু পৌঁছে গেছি, এটাই মিঠুসার। অথচ নৌকা তখনই ভিটায় ভেড়েনা, ইয়াকুব-রেহানা কথা বলে দীর্ঘণ ধরে, কথা বলেও না অনেকণ। 'আমরা কিন্তু পৌঁছে গেছি' বলার ছয় মিনিট পরে নৌকা আদিনাথের ভিটায় ভেড়ে। বাস্তব সময়ের এই ছয় মিনিট, সিনেমার সময়ে অনেকণ। আমরা কাছাকাছি পৌঁছে গেছি কিংবা প্রায় পৌঁছে গেছিÑ এধরনের কিছু একটা বললে সুপ্রযোজ্য হতো। পোশাক নির্বাচনে আরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন ছিলো। রেহানাকে গামছা-প্রিন্টের শাড়ি পরতে দেখা গেছে, যা বিবি রাসেল প্রবর্তিত একটি হালফ্যাশন। রেহানার লো-কাট ব্লাউজও চরিত্রটির সঙ্গে মানানসই হয়নি। প্রথম দুপুরে রেহানা যখন চুলা জ্বালাতে যায় তখন দেখা যায় খড় থেকে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। অর্থাৎ সকালে চা-করার যে-দৃশ্যটি ছিলো তার পরপরই একসঙ্গে এই দৃশ্যটি ধারণ করা হয়েছে। অথচ পাত্র-পাত্রী এরই মধ্যে কয়েকটি দৃশ্যে অভিনয় করেছেন, সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। খড়ে সকালের আগুনের ধোঁয়া থাকার প্রশ্নই আসে না। ফ্যাশব্যাকে দাদার সঙ্গে রেহানার দৃশ্যটি না-দেখালেই ভালো হতো। রেহানাকে জড়িয়ে ধরে দাদার কান্নাকাটির সত্যতা হয়তো আছে, কিন্তু দৃশ্যটি বিরক্তিকর লেগেছে।

মোরশেদুল ইসলাম লিটল থিয়েটার করেছেন, বাচ্চাদের নিয়ে কাজ করতে তার বিশেষ আগ্রহ আছে, বোঝা যায়। দু’টি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি তার প্রতিটি ছবিতেই উল্লেখযোগ্য শিশু-কিশোর চরিত্র রাখেন তিনি। এই ছবিতেও রেহানা যেহেতু ছোটবেলার গল্প খুব বলে, তাই শৈশবের ফ্যাশব্যাক স্বাভাবিকভাবেই এসেছে। কিন্তু তিনি যেন আজকাল শিশুদের কাছ থেকে অভিনয় আদায় করে নেয়ার েেত্র ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছেন। দীপু নাম্বার টুতে কিশোর-চরিত্রগুলো সাবলীল অভিনয় করেছিলো, কিন্তু দূরত্ব কিংবা এই ছবিতেও শিশুচরিত্রগু
৩টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×