
- রঞ্জু ভাই ও রঞ্জু ভাই!
মেয়েলী কণ্ঠে ডাক শুনে থমকে দাঁড়ালো রঞ্জু। দীর্ঘদিন পর নিজের পরিচিত শহরে ফিরেছে সে। বেশ ভূষা পাল্টে গিয়েছে, বয়সের ছাপ পড়েছে। সহজে কেউ চিনে ফেলবে এমন হবার কথা নয়। শহরের অলিতে গলিতে, মোড়ে মোড়ে ফেলে যাওয়া ছাপ, স্মৃতিগুলো খুঁজতে বেড়িয়েছে সে সন্তর্পণে। বাসা থেকে বেরিয়ে নিউমার্কেট পর্যন্ত হেঁটে এসেছে। মহল্লার দোকান থেকে সিগারেট কিনেছে অথচ দোকানি তাকে চিনতে পারেনি।
মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো কিন্তু ভীড়ের মধ্যে পরিচিত কাউকে চোখে পড়লো না। সম্ভবত ভুল শুনছে। হয়তো দীর্ঘদিন আগে এভাবেই কেউ ডেকেছিল, শব্দটা সময় পরিভ্রমণ করে আজ এসে পৌঁছালো। ধীর গতিতে কয়েক কদম এগিয়ে অপেক্ষাকৃত ফাঁকা একটা স্থান দেখে দাঁড়ালো রঞ্জু। চারপাশে চোখ বুলালো সময় নিয়ে। ব্যস্ত মানুষেরা কেটাকাটা করছে। কেউ কেউ হয়তো নিতান্তই কালক্ষেপণ করার জন্য এসেছে। কপোত কপোতীর সংখ্যাও নেহাত কম নয়। একটি শিশু মায়ের হাত ধরে হাঁটছে। রঞ্জু লক্ষ্য করলো, শিশুটি ছলছল চোখ নিয়ে অনিচ্ছাকৃতভাবে মায়ের পথ অনুসরণ করছে। এরকম একটা বয়স তো ওর নিজেরও ছিল। মায়ের হাত ধরে নিউমার্কেটে কত ঘুরেছে! এক সন্ধ্যার কথা মনে পড়লো, সেদিন মা’র সাথে এই নিউমার্কেটেই এসেছিল। মা কাপড় কিনবেন আর ওর জন্য মিমি চকলেট। কিন্তু মার্কেটে এসে জুতার দোকান দেখে স্যান্ডেল কেনার জন্য বায়না ধরে সে। বাধ্য হয়ে মা বলেছিলেন, আজ স্যান্ডেল পছন্দ করে যাবো, কিনবো না। আরেকদিন কিনে দিব। ঠিক আছে?
ছোট্ট রঞ্জু মা’র প্রস্তাবে রাজী হয়ে জুতার দোকানে ঢুকে। মা-ছেলেতে কয়েক জোড়া সান্ডেল পছন্দও করে, কিন্তু তারপর ছেলের বায়নায় মা’কে তাঁর পূর্ব-পরিকল্পিত কাপড় কেনা থেকে সিদ্ধান্ত ফেরাতে হয়। ছেলেকে কিনে দিতে হয় পছন্দ করা নতুন চামড়ার স্যান্ডেল।
পুরোনো স্মৃতি হাতড়াতে গিয়ে রঞ্জুর মন খারাপ হয়ে যায়। অর্থ কষ্টে বেড়ে ওঠা নি¤œ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটা পরিবারের কাছে নিউমার্কেটটা নিতান্তই বিলাসী ছিল তখন। তবুও বারবার এখানে এসেছে। সেবা প্রকাশনীর পুরোনা বই ভাড়া নেয়া কিংবা দিনের আলো কমতে থাকা সন্ধ্যার মুহূর্তগুলোতে বন্ধুদের সাথে লুকিয়ে লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার দিনগুলো কিংবা দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর খুব অল্প সময়ের জন্য প্রেমিকাকে দেখা! কী অস্থির ছিল দিনগুলো।
প্যাকেট বের করে একটা সিগারেট জ্বাললো রঞ্জু। পেছন থেকে সেই কণ্ঠটা বললো, আপনি রঞ্জু ভাই না?
ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে ফিরতেই হাত ভর্তি শপিং ব্যাগ নিয়ে দুইজন মহিলাকে দেখলো। চমকে উঠলো রঞ্জু। পরী! র্দীঘদিন পর পরীর মুখোমুখি। বয়সের ছাপ কি পড়েছে চেহারায়? না, ততোটা নয়। তবে রোগা হয়ে গেছে অনেক। পরীও ওর দিকে তাকিয়ে আছে কিন্তু কেমন যেন নির্লিপ্ত চাহনি! এই পরীকে কি সে চেনে? পাশের জন বললো, আপনি রঞ্জু ভাই না?
খানিকটা মাথা কাত করে হ্যাঁ সূচক একটা অভিব্যক্তি প্রকাশ করলো সে।
- কেমন আছো রঞ্জু ভাই?
কিছু একটা বলা দরকার। কিন্তু গলা ধরে এসেছে, মনে হচ্ছে কথা বলতে চাইলেও শব্দ বের হবে না। একটু সময় নিল নিজেকে সামলাতে। বললো, হ্যাঁ, ভালো।
- আমাকে চিনতে পারোনি?
রঞ্জু আসলে এতক্ষণ ওর দিকে মনোযোগই দেয়নি। তাই হঠাৎ তাকাতে চিনতে পারলো না।
- চিনবে কী করে? কতকাল পরে দেখা! সীমা।
লাজুক ভাবে একটু হাসলো রঞ্জু। আসলেই তো পরীর সাথে তো ওর বান্ধবীরাই থাকবে। সীমা তো ওর খুব কাছের বান্ধবী। বললো, কেমন আছো সীমা?
- খুব ভালো আছি। এতোদিন পরে তোমাকে দেখে খুবই ভালো লাগছে।
রঞ্জু পরীর দিকে তাকাচ্ছে না। পরীর সাথে ওর কোনো কথা নেই। কোনো কালেও ছিল বলে ভাবতে ইচ্ছা করছে না। আঙ্গুলের ফাঁকে সিগারেটটা পুড়ছে দেখে ঠোঁটে ছুঁইয়ে একটা টান দিয়ে ফেলে দিল।
- সেই যে গেলে, তারপর কত কিছু ঘটে গেলো আর ফিরলে না! আমাদের কথা, বাড়ির কথা মনে পড়ে না?
আবারো লাজুক ভাবে হাসলো রঞ্জু। বললো, থাক না সেসব কথা!
- ঠিক আছে, থাক। আচ্ছা ওর সাথে তো পরিচয় করানো হলো না। ও হলো পরীর ছোট বোন- জরী! আর উনি হচ্ছেন, আমাদের এক ব্যাচ সিনিয়র, কলেজের সবমেয়ের ক্রাশ- রঞ্জু ভাই!
রঞ্জু একটা বড়ো ধরনের ধাক্কা খেলো মনে মনে। এতক্ষণ যাকে পরী বলে ভাবছিল সে আসলে পরী নয়? জরী! পরীর ছোট বোন জরীর কথা মনে করার চেষ্টা করলো। কিন্তু মনে করতে পারলো না। দুই বোনের চেহারায় এতো মিল হয়? অবিকল পরীর মতো দেখতে! যে কেউ ভুল করতে বাধ্য! অথচ রঞ্জুর তো এই ভুল হবার কথা নয়। ঘন্টার পর ঘন্টা কলেজ ক্যান্টিনে মুখোমুখি বসে কাটিয়েছে ওরা দু’জন, রেললাইন ধরে হেঁটেছে মাইলের পর মাইল! সমান্তরাল পথ, তাই হয়তো কেউ কারো সাথে মিলতে পারলো না।
জরীও তাকালো রঞ্জুর দিকে। এক সময়ের কলেজের সব মেয়েদের ক্রাশ রঞ্জু ভাই, যাকে এখন দেখলে খুব সাধারণ আটপৌড়ে মাঝবয়েসী মানুষের বেশি কিছু ভাবা যায় না। হাটু অবধী ঝোলা পাঞ্জাবী, গাল ভর্তি কাঁচা পাকা দাঁড়ি! জরী মিষ্টি হেসে হাত নাড়লো সামান্য।
রঞ্জু ভাবতে চাইলো পরীর কথা! পরী কেমন আছে? হাসলে কি এখনো গালে টোল পড়ে? এখনো কি আগের মতো অভিমানী রয়ে গেছে? মুূষলধারে বৃষ্টির সময় যাত্রী ছাউনীতে বসা পরীর কথা মনে পড়ে ওর, যে কি না সামান্য দুষ্টুমিতে অভিমানে গাল ফুলিয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে একা বাড়ির পথ ধরেছিল।
সীমাকে কি জিজ্ঞেস করবে ওর কথা? নিজের চারপাশে এতোদিন যে দেয়াল তুলে রেখেছে, যে দেয়ালের আটকে দিয়েছে অতীতকে, পরীকে; আজ কি সেই দেয়াল ভেঙ্গে ফেলবে? অথচ শুরুটা তো এমন ছিল না। কলেজের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে সেই যে নীল শাড়িতে পরীকে দেখা, তারপর থেকেই সব গণ্ডগোলের শুরু। পড়াশোনার প্রতি অনীহা আসতে লাগলো। একবার দেখার জন্য পড়ে থাকতো ফার্স্ট ইয়ারের ক্লাশরুমগুলোর আশে পাশে। অথচ তখনো পরীর সাথে কথাই বলা হয়নি। ক্লাশরুমে বসে অন্যরা যখন ক্লাশ লেকচার তুলছে তখন সে খাতা ভড়তে থাকে কবিতায়। এভাবে চলতে চলতে প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় দুই সাবজেক্টে পাশ করতে পারলো না। তখন সবাই ধরেই নিয়েছিল যে এই ছেলের ভবিষ্যত বলে আর কিছু থাকলো না।
একদিন ঘটে যায় অঘটন। কবিতার খাতাটা হারিয়ে যায়। বেশ কিছুদিন পরে জানতে পারে কবিতাগুলো পরীর কাছে অতি যত্নে সংরক্ষিত আছে। অপেক্ষার প্রহর শেষ হয়। একদিন কথা হয়, তারপর আবার আরেকদিন কথা হয় দু’জনের। তারপর বারবার কথা হয়। রঞ্জু কবিতা লেখে আর পরী আবৃত্তি করে। এক নতুন সম্পর্কের জন্ম নেয়।
- কবে এসেছো? কয়দিন থাকবে?
সীমার ডাকে বাস্তবে ফিরে এলো। বললো, দেখি যতদিন ভালো লাগে, থাকবো।
- পুরোনো দিনের কত কথা মনে পড়ে যাচ্ছে।
- হুম, মনে পড়াটাই তো স্বাভাবিক।
- কবিতা লেখো না আর?
- কবিতাটাই লিখি।
- কেন প্রাকটিস করো না? চাকরি বাকরি?
- না, ভালো লাগে না।
- বিয়ে করেছো? ছেলে মেয়ে ক’টা?
উত্তর না দিয়ে মৃদু হাসলো। এ প্রশ্নের উত্তর সে দিতে চায় না, কারণ এর পরের প্রশ্নটাই হলো- কেন বিয়ে করোনি?
- এখনো আগের মতোই আছো।
- হয়তো তাই। কিন্তু সব কি আগের মতো আছে?
জরী সঙ্গে থাকায় সীমা খানিকটা অস্বস্তিবোধ করে। বললো, চলি।
- হুম।
- সময় পেলে বাসায় এসো, আমরা আগের বাসাতেই থাকি।
রঞ্জু মাথাটা সামান্য কাত করে মৃদু হাসি ধরে রাখলো মুখে। অদৃশ্য দেয়াল ভেঙ্গে জিজ্ঞেস করতে পারলো না পরীর কথা। নীরবে ওদের প্রস্থান দেখলো। এভাবে চলে যাওয়া দেখে সে অভ্যস্থ। শেষবার পরী যখন চলে যায় তখনও সে কেবল চেয়ে থেকেছে। যাবার আগে পরী বলে গিয়েছিলো, এভাবে এক তরফা সম্পর্ক টিকে না। তুমি আমার প্রতি যে অবহেলা দেখিয়েছো তাতে স্পষ্ট যে, তুমি আমাকে ভালোবাসো না।
পরীর প্রতি ওর কোনো অবহেলা ছিল না। অন্তত নিজে এমনটাই বিশ্বাস করে। নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একটা ছেলে যখন প্রি-টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করার পরও মূল পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করে সরকারী মেডিকেল কলেজে ভর্তির সুযোগ পায়, তখন নিজ শহর ছেড়ে দূরের অন্য এক শহরে যেতে বাধ্য হয়। সফলতার পেছনে যে পরীর ভূমিকা ছিল- তা না মেনে উপায় নেই। কিন্তু এই সফলতাই ওর জন্য বয়ে আনে নতুন অসুখ। পরীকে হারানো অসুখ। লং ডিসটেন্স রিলেশনশীপ বিষয়টা পরী মানতে পারেনি। পড়াশোনায় ডুবে যাওয়া রঞ্জু আলাদাভাবে সময় বের করতে না পারলেও প্রতি সপ্তাহে চিঠি লিখতো। পরীও নিয়মিত লিখতো। তবে পরীর শেষ যে চিঠিটা সে পেয়েছিল, সেটাতে কিছু লেখা ছিল না, ধবধবে সাদা একটা কাগজ। দু’দিন পর মানিব্যাগে কাগজের ভাঁজে পেল ওরই লেখা পরীকে পাঠানো শেষ চিঠিটা! মুহূর্তেই নিজের ভুল বুঝতে পারলো। ভুল করে চিঠির পরিবর্তে অন্য একটা কাগজ পাঠিয়ে দিয়েছিল সে, হয়তো সেটাও সাদা কাগজ ছিল। পরী নিশ্চয় খুব অভিমান নিয়ে সাদা কাগজেই প্রতিউত্তর পাঠিয়েছে। আর এই অভিমান ভাঙ্গানোর একমাত্র উপায় হলো- মুখোমুখি কথা বলা। আরেকটা চিঠি না পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল সে। ইচ্ছে ছিল- দিন দুয়েকের ভেতর বাড়ি যাবে কিন্তু পড়াশোনার চাপে সময়টা দীর্ঘায়িত হয়। ততদিন পরীর মন আরো ভারী হতে থাকে। দানা বাঁধতে থাকে অবহেলার অভিযোগ, যা রঞ্জু খণ্ডাতে পারেনি।
ভেবেছিল পরীর অভিমান একদিন ভেঙ্গে যাবে, আবার ফিরে আসবে। কিন্তু সেই পথও বন্ধ হয়ে যায় পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে। আমেরিকা প্রবাসী ধনী এক সুপুরুষের সাথে পরীর বিয়ে সংবাদ পায় সে।
সীমা চলে গেল, অথচ কত কথা জমে আছে, বলা হলো না। অদৃশ্য দেয়ালটাও ভাঙ্গা গেল না, কেবল ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে বের হয়ে চাইছে স্বপ্ন-ব্যর্থতা-কষ্ট-ভালোবাসাময় কিছু স্মৃতি।
এক ধরনের উত্তেজনা বোধ করে রঞ্জু।
ছবি: গুগল মামা।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০২০ দুপুর ১:৫৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


