১৭৫৩-১৯৪৭। এই ১৯৪ বছর ব্রিটিশরা আমাদের শাসন করেছে, শুধু যে শাসন করেছে তাই নয় শোষণও করেছে অনেক। করেছে অনেক অত্যাচারও। তার অনেক উদাহরনও অনেকের জানা আছে। আমি ইতিহাসের ছাত্র না বিধায় ঐ ভাবে কোন উদাহরন দিতে পারছি না। পাঠকরা নিজ গুনে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন আশা করি। শুধু ছোট বেলায় পড়া কিছু ক্লাসের বইই যা ভরসা।
ব্রিটিশদের কিছু নিকৃষ্ট কাজের মধ্যে নীল চাষ ও জমিদার প্রথা চালু উল্ল্যেখযোগ্য। আমি ২য় টা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। হ্যাঁ জমিদার প্রথা। এই জমিদার প্রথা দিয়ে বাংলার মেহনতি মানুষ কি পেয়েছে? বছর বছর খজনা দেয়া আর নীল চাষের পর চাষ অযোগ্য পতিত জমি ছাড়া? এই জমিদাররা ছিল ব্রিটিশদের পা চাটা গোলাম। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যখন অনেক মানুষ লড়ছে, মরছে আর বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম যখন বিদ্রোহী কবিতা লিখছেন ঠিক সেই সময় কিছু কিছু জালিম জমিদার শুধু ব্রিটিশদের খুশি রাখার জন্য অনেক মানুষকে ধরে এনে ফাঁসি দিয়েছে। এ যেন অনেকটা ১৯৭১ এর রজাকারদের মত। থাক সে বিষয়।
আমি উপমহাদেশের কোন জমিদারকে ব্যাক্তিগত ভাবে খারাপ বলছি না। অনেক জমিদার অনেক ভাল ছিলেন, অনেক ভাল কাজ করে গেছেন। আমি শুধু এই প্রথার সুদূর প্রসারি ফলাফলের কথা বলছি। ওরা ২০০ বছর উপমহাদেশ শাসন করলেও এর বিরুপ প্রভাব আরও ২০০ বছর পর্যন্ত থাকবে।
ব্রিটিশদের মধ্যেও জমিদারি প্রথা হয়তবা এককালে ছিল, রাজা ত ছিল অবশ্যই। তাদের রাজ্য ছিল। কিন্তু তাদের ঐ কৃ্তকর্মের ফল তাদের জাতি আজ ভোগ করছে। সেটা ভাল না খারাপ তা বিশ্ববাসি তথা আমরাও জানি। কিন্তু আমাদের রাজা-জমিদারদের কর্মের ফল আমাদের উপর কিভাবে পড়ল? শ্রেনিবিভক্তি, ইনি বড়লোক ত ঐ বেটা ছোটলোক, ওই কুলি, সে সাধারন স্কুল মাস্টার, উনি চেয়ারম্যান সাহাব ত ইনি চৌধুরী বংশের লোক। ইউরোপ আমেরিকায় কাজের শ্রেনীবিভাগ আছে কিন্তু মানুষের মধ্যে কোন শ্রেনীবিভাগ নেই। হ্যাঁ একসময় বর্নবাদ প্রকট ছিল। কিন্তু এখন সেটাও আস্তে আস্তে কমে আসছে। ওদের দেশে একে অপরকে ছ্যার/ম্যাম বলে সম্বোধন করে আর আমাদের দেশে “আপনার বাবার যেহেতু মুক্তিযুদ্ধের সার্টিফিকেট নেই তাই আপনাকে আরও ১০ হাজার টাকা বেশি দিতে হবে।’’ এই হচ্ছে আজকের আমাদের দেশ, রবীন্দ্রনাথের সোনার বাংলা আর কাজী নজরুলের বাংলাদেশ।
ব্রিটিশরা যখন জমিদার প্রথা চালু করল তখন কেন জমিদাররা তা মেনে নিল? তারা কি ভেবেছিল ইংরেজদের সাথে উঠাবসা করলে ওদের সম্মান বেড়ে যাবে? তারা কি জানত না, যে ইংরেজদের আদেশ তারা পালন করত তাদের নামের আগে কি উপাধি ছিল? তাদের উপাধি ছিল লর্ড। বাংলা ভাষায় যা হচ্ছে ‘প্রভু’। তাহলে ওরা কাদের প্রভু ছিল!! জমিদাররা এটা বুঝেও কেন ওদের দাসত্ব মেনে নিলেন? তাইলে কি আমরা ধরে নেব ওরা শুধু প্রতাপ এবং প্রতিপত্তির জন্য সাধারন মানুষের কথা ভুলে ওরা জমিদার হয়েছিলেন। তাইলে ধিক জানাই সেসব জমিদারদের প্রতি।
আর যদি তারা মনে করতেন জমিদার প্রথা তথা ইংরেজদের আগ্রাসন ঠিক ছিল তাহলে কেন নীল বিদ্রোহ হল? কেন ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ হল? কেন সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর এর মত সাহসী বাঙালীরা শহীদ হলেন? কার বিরুদ্ধে কবিতা লিখে কাজী নজরুল ইসলাম বিদ্রোহী হলেন? কিসের জন্য স্যার নওয়াব ছলিমুল্লা নিজের জীবন উৎসর্গ করেছিলেন? জবাব চাই আজ তাদের কাছে যারা পূর্বপুরুষদের কৃ্তকর্মের জন্য আজও অনুতপ্ত নয়। বরং সমাজে বুক ফুলিয়ে হাঁটে।
আমার বংশও জমিদারি বংশ। বাবার মুখে শুনেছি উনার দাদা যখন খবার খেতে বসতেন তখন নাকি ৮/১০ পদের তরকারি আর কোরমা পোলাও ছাড়া খাবার হত না। আর অন্য দিকে কত মানুষ না খেয়ে না থাকলেও সচ্ছল যে ছিল না সেটা সহজেই অনুমেয়। সঙগত কারনেই সেই আমল থেকেই আমাদের নামের শেষে একটা টাইটল আছে। আর সেটা হচ্ছে ‘চৌধুরী’। এই টাইটল নিয়ে এতদিন চিন্তা ছিল না কিন্তু যত বড় হচ্ছি আর ইতিহাস সম্পর্কে জানছি ততই এই টাইটল বাদ দেয়ার চাপ অনুভব করছি। হয়তবা আমার বংশের জমিদাররা ভাল ছিল, মানুষদের আনেক উপকার করেছেন কিন্তু তারপরও আমি মনে করি মানুষ ব্যাক্তিগত ভাবে যতই ভাল হোক না কেন যদি সে একটি খারাপ নেটওয়ার্ককে সাপোর্ট করে সেই নেটওয়ার্ককের অংশ হয়ে যায় তাহলে সেও ত ঐ একই পাপে পাপী। আর ইসলামেও আছে যে অন্যায় করে আর যে আন্যায় সয় তারা উভয়ই সমান। তাই আর কেউ বলুক আর নাই বলুক, চাক বা নাই চাক, আমি অন্তত জাতির কাছে ক্ষমা চাইব যে আপনারা দয়া করে আমার পূর্বপুরুষ তথা জমিদার বংশের সবাইকে মাফ করেন যাতে ওরা ওদের পরকালে কবরে শান্তিতে থাকতে পারেন ।।
বিঃ দ্রঃ এই লেখাটা কোন ব্যাক্তি বা বংশকে আঘাত করে লেখা নয়। এটাকে একটি বিদ্রোহ মনের ব্যাক্তিগত উদ্গীরন বলতে পারেন। ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তখন লড়তে পারিনি কিন্তু এখন লড়ব। আমি ব্রিটিশ বলতে যেকোন অনিয়ম দুর্নিতীকে বুঝি। যেখানেই ব্রিটিশ সেখানেই বিদ্রোহ। বিদ্রোহিরা আছে থাকবে এবং যোগে যোগে জন্ম নেবে। ইনশাল্লাহ ।।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

