somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সিলেটি ভাষা ও কিছু কথা

২৭ শে মার্চ, ২০১৭ সকাল ১০:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বাংলাদেশের ভিবিন্ন আঞ্চলিক ভাষার প্রতি বরাবরই আমার অন্যরকম একটা টান এবং আগ্রহ। ভিবিন্ন এলাকায় ঘুরতে গেলেই আমি তাদের ভাষা এবং সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার চেষ্টা করি। বাংলাদেশের বিশেষত চট্টগ্রাম, রংপুর, খুলনা, বরিশাল,ঢাকা, ময়মনসিংহ, রাজাশাহী ও সিলেটে অঞ্চলে রয়েছে আলাদা আলাদা আঞ্চলিক ভাষা ও সংস্কৃতি। তবে এর মধ্যে সিলেটের ভাষা এবং চট্টগ্রামের ভাষা আমার কাছে সবচেয়ে ব্যাতিক্রম লেগেছে। সেই আগ্রহ থেকে সিলেটি ভাষা সম্পর্কে পড়া শুরু করি। যার সারমর্ম এরূপ,

সিলেটি ভাষা একটি পরিপূর্ন সাবলীল ভাষা যা লিখা হয় নাগরী লিপি দিয়ে। সিলেটি ভাষা যা অনেকে কেবল সিলেটিদের ভাষা বলে মনে করেন আসলে সিলেট ছাড়াও আসামের কাছাড় জেলা, মেঘালয় ও ত্রিপুরা রাজ্যের অধিকাংশ মানুষের মুখের ভাষা সিলেটি তাছাড়া প্রবাসী বিরাট এক অংশ তো আছেই ।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে সিলেটি ভাষা কি বাংলারই বিকৃত রূপ না সম্পূর্ন পৃথক একটি ভাষা এ নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে আমি কেবল আমার লব্দ জ্ঞান টুকু তুলে ধরব আমি সিলেটী ভাষাকে আলদা একটি ভাষা বলব এই জন্য যে, সিলেটি ভাষাই একমাত্র আঞ্ছলিক ভাষা যে ভাষার সম্পূর্ন আলাদা ব্যাকরন ও অক্ষর লিপি রয়েছে যার নাম নাগরী লিপি যেখানে পৃথিবীতে এমন অনেক দেশ রয়েছে যাদের নিজস্ব লিপি নেই যেমন মালয়শিয়ার ভাষা মালয় যা শুধুমাত্র কথ্যভাষা যার কোন নিজস্ব অক্ষরলিপি নেই,তারা ল্যাতিন অক্ষর লিপি্ রুমি ও আরাবিক অক্ষর লিপি জুয়ালি। ভাষা গবেষক সৈয়দ মোস্তফা কামাল ও অধ্যাপক মুহম্মদ আসাদ্দর আলীর মতে “জটিল সংস্কৃত প্রধান বাংলা বর্ণমালার বিকল্প লিপি হিসেবে ‘সিলটী নাগরী’ লিপির উদ্ভাবন হয়েছিল খ্রিষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দির মাঝামাঝি সময়ে”। গবেষকদের ধারণা, ইসলাম প্রচারক সুফী দরবেশ এবং স্থানীয় অধিবাসীদের মনের ভাব বিনিময়ের সুবিধার জন্যে নাগরী লিপির উদ্ভাবন হয়েছিল।ডক্টর সুনীতিকুমার চট্রোপাধ্যায়ও “খৃষ্টীয় চতুর্দশ শতাব্দীকে সিলেটে এই লিপির প্রচলনকাল বলে অনুমান করেন”।আবার কেউ কেউ হযরত শাহজালালের সাথে এই লিপির সিলেটে আগমনেরও ধারনা করে থাকেন।অধ্যাপক শিব লাহিরীর মতে “এ লিপি উর্দুলিপির থেকেও অনেক প্রাচীন ৩ টি অক্ষর ছারা সেখানে কোন যুক্তাক্ষর নেই।সিলেটি ভাষার লিখিতরূপ প্রদানকারী এই নাগরী লিপির মাত্র ৩২টি অক্ষর বা বর্ণ রয়েছে। বর্ণগুলো হচ্ছে আ ই উ এ ও ক খ গ ঘ চ ছ জ ঝ ট ঠ ড ঢ ত থ দ ধ ন প ফ ব ভ ম র ল ড় শ হ”। অনেকের মতে সিলেটী নাগরী লিপির ব্যবহার শুধু মুসলমানদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। নাগরী সাহিত্যে ছাদেক আলী সত্তাধিক জনপ্রিয় কবি। তিনি ১৭৯৮ সালে কুলাউড়ায় জন্ম গ্রহণ করেন। ইসলাম ধর্ম গ্রহণের আগে তার নাম ছিল গৌর কিশোর সেন। ১৮২৩ সালে তিনি মৌলভীবাজারের মুনসেফ ছিলেন।নাগরী পুঁথি রচয়িতাদের মধ্যে এ পরযন্ত মুন্সী ইরফান আলী,দৈখুরা মুন্সী, আব্দুল ওহাব চৌধুরী, আমান উল্যা, ওয়াজি উল্যা, শাহ হরমুজ আলী, হাজী ইয়াছিনসহ ৫৬ জনের পরিচিতি পাওয়া গেছে।তাছারা ঐ সময়ে জনশ্রুতি আছে যে,নাগরি লিপি মাত্র আড়াই দিনে শেখা যায়।তাই এ ভাষা আঠার ও উনিশ শতকে সিলেটের বাইরে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, ময়মনসিংহ ও কাছাড় অঞ্চলে প্রচার ও প্রসার লাভ করেছিল।
নাগরী হরফে লিখা এক বিরাট সাহিত্য সম্ভার রয়েছে, ভিন্ন ভিন্ন সুত্র থেকে এ পর্যন্ত ‘সিলটী নাগরী হরফ’-এ লেখা ১৪০ খানা গ্রন্থের সন্ধান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৮৮ টি প্রকাশিত। এসবের অনেক বই সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদে এখন পাওয়া যায়।
সিলেটি ভাষা নিয়ে দেশ- বিদেশে চলছে গবেষণা ।সিলেটি ভাষার উপর এ পর্যন্ত বেশ ক’জন পিইএচডি ডিগ্রী অর্জন করেছেন। এর মধ্যে বৃটিশ নাগরিকও আছেন।বিদেশীদের মধ্যে ব্রিটিনের সোয়াস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লয়েড উইলিয়াম সিলেটি ভাষার উপর পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন এছারাও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন রুপা চক্রবর্তী ও মতিয়ার চৌধুরী।শুধুমাত্র তাই নয় ‘সিলেটী নাগরী” লিপি, ভাষা ও সাহিত্য’ নিয়ে গবেষণার পর জনাব গোলাম কাদির ১৯৮৩ খৃষ্টাব্দে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন।তাছারও ভারতের গোহাটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ‘সিলেটী নাগরী” লিপি, ভাষা ও সাহিত্য’ নিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেছেন ড.আব্দুল মুছাব্বির ভূঁইয়া ও ড. মোঃ সাদিক।
নিম্নে সিলেটি ভাষার কিছু প্রবাদ ও প্রবচন দেয়া হলঃ
 আইতে জাইতে পচার বাপ, আম পাকলে মৌয়া– অর্থাৎ এমনিতে আমাকে ডাকে পচার বাপ বলে, আর আমার কাছে কোনো প্রত্যাশা নিয়ে এলে বলে মেশো।
 জমানারে ধরছে ভুতে, যুবা নারীয়ে চাটিত মুতে– অর্থাৎ সবকিছু উলট পালট হয়ে গেছে।
 চিনেনা ভুবির গুড়ি বিয়া করতে চায় মৌলবির পুড়ি– কোন কাজের নয়, আবার শখ আছে।
 আন্দুদুন্দু পলো বায়, আল্লায় দিলে মাছ পায়– বুড়বাকের মতো কাজ করা, ভাগ্যে থাকলে ফল হয় নয়তো বৃথা পরিশ্রম করে।
 চেংও উজাইন, ব্যাংও উজাইন, কৈয়া পুটি তাইনও উজাইন– সবার দেখাদেখি এগিয়ে যাওয়া।
 যার পড়ে গাই উড়ো (গরু কাদায় পড়েছে) তাইন ধরইন লেঞ্জো মুড় (লেজ আর মাথা)– যার বিপদ তিনিই সবচেয়ে বেশি সচেষ্ট।
 যাচতে জামাই খাইন না, খুজতে জামাই পাইন না– সাধাসাধি করা হল গ্রহণ করলেন না, এখন প্রার্থনা করেও পাচ্ছেন না।
 অবাগা যেবায় চায়, সাগর হুকাইয়া যায়– অভাগা যেদিকে যায় সাগর শুকিয়ে জায়
 হাই মরলো হাঞ্জা বেলা, কান্দি উঠল পতাবেলা– সময় মতো কোন প্রতিক্রিয়া নেই, অসময়ে তর্জন গর্জন।
সিলেটি নাগরী লিপি আজ প্রায় বিলুপ্ত এর ব্যবহার আজ আর লক্ষ্য করা যায় না।যেরকম ভাবে চলছে হয়তো তা একসময় সম্পূর্ণ হারিয়ে যাবে। তবুও ইহা সিলেটিদের তথা একটি জাতিগোষ্ঠির ভাষার নিদর্শন।
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে মার্চ, ২০১৭ সকাল ১০:৩৮
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কিছু খাতের চাকুরী বেতন-ভাতামুক্ত ঘোষণা করা যেতে পারে

লিখেছেন এমএলজি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:২৮

এক সমীক্ষায় জানা যায়, বাংলাদেশে সরকারি চাকুরেদের প্রায় ৯১ শতাংশ ঘুষ গ্রহণ করে। এছাড়া, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের অনেকেও মনে করেন বাংলাদেশে দুর্নীতি নির্মূল সম্ভব নয়; যার অর্থ দাঁড়ায়, দুর্নীতিকে আমরা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাংসের ভুলচুক

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:০৬


বারে কুত্তার চোখ রঙিন
স্বপ্ন দেখে তাই ঘিন ঘিন
তাই দেখে হাড্ডি হাসে
পিন পিন, নাকের পুহান ঘুম
রক্ত হবে সুরেশ এই চুম;
ঐ গুরুজনে কইছে কথা
কুত্তার পেটে ঘি করে ব্যথা
স্বপ্ন তো দেখবেই ভুক... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:২৩



দ্বিচারিতার এক অদ্ভুত মহাকাব্য

যতদিন যাচ্ছে, ততই মনে হচ্ছ -এই দেশের তরুণ প্রজন্মের একটা বড় অংশকে নিয়ে আশাবাদী হওয়াটা রীতিমতো বিলাসিতা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
সেদিন দেখলাম, এক ছাত্রশিবির নেতা মঞ্চে দাঁড়িয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

=আয় সখিরা ফিরে যাই মেয়ে বেলা=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ১৯ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯


যাবি নাকি তোরা সখি
আমার সাথে মেয়েবেলা;
যেখানটাতে বসতো যে রোজ
কানামাছি বউছি খেলা।

ভাইবোনেরা রোজ বিকেলে
মাঠে হতাম সমবেত,
ডাংগুলি আর গোল্লাছুটে
বিকেল-খেলায় কেটে যেত।

খেলার আসর উঠোনজুড়ে
তোরাও কী খেলতি এমন?
করলে স্মরণ অতীতের দিন
বুকে লাগে কেমন কেমন।

আয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমি মাস্টার্স পাস করে ড্রাইভিং পেশা বেছে নিয়েছি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২০ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৪৩


পিংক বাস সার্ভিসের একজন নারী চালক, নাম রাবেয়া খাতুন। তিনি মাস্টার্স পাশ করে বাস চালাচ্ছেন। খবরটা পড়ে অনেকেই বাহবা দিচ্ছেন, কেউ কেউ বলছেন বাংলাদেশ এমন প্রতিভাকে ধরে রাখার যোগ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

×