somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিখ্যাত পলাশউদ্দিন পাগাম সাহেবের প্রথম বই

১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১১:২৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বিখ্যাত পলাশউদ্দিন পাগাম সাহেবের প্রার্থনা, তাঁর প্রথম বইটি প্রকাশিত হবার পর ওটি যেন কোনো উঁচুদরের পাঠকের হাতে না পড়ে। তিনি জানেন, কয়েকটা লাইন বা অনুচ্ছেদ পড়েই এঁরা ধরে ফেলবেন - তাঁর লেখক-সত্তা খুবই দুর্বল, হয়ত-বা নাই-ই। তিনি শখের বশে মনের আনন্দ মেটানোর জন্য লিখছেন, তাঁর ভেতরে কোনো ‘মাল’ নেই, পাঠকের এতদ্‌বিষয়ক ‘খোঁচা’ তাকে খুব অস্থির ও ঘায়েল করবে। তা তিনি চান না, কিন্তু বইটি প্রকাশিত হোক, এটা তিনি মনেপ্রাণে চান। তাঁর একটা লেখক-সত্তা আছে; সেই সত্তার প্রকৃত মানদণ্ডটাই তিনি নিক্তিতে মেপে যাচাই করতে চান।

তিনি এটাও মনেপ্রাণে কামনা করছেন, তাঁর বইটা যেন কোনো তোষামোদকারীর হাতে না পড়ে। তিনি জানেন, তোষামোদকারীরা না পড়েই তাঁকে হুমায়ূন আহমেদ কিংবা রবীন্দ্রনাথ বানিয়ে ফেলবেন, কেউবা কয়েক ডিগ্রি সরেস- তাদেরকেও ছাড়িয়ে আরো উপরে উঠিয়ে দিবেন, হয়ত।

যাদেরকে তিনি ঘন ঘন দাওয়াত দিয়ে খাওয়ান, হাই-ফাই রেস্টুরেন্টে ডিনার করিয়ে থাকেন, তাদের জন্যও কোনো সৌজন্য কপি হবে না। তাঁরা তাঁর প্রতিভা ও বইয়ের প্রশংসায় ফেটে পড়বেন, যেন এমন প্রতিভা ও বই পৃথিবীতে তিনিই প্রথম। তিনি এটা জানেন, পরোক্ষভাবে সবাই তাঁর দাওয়াত ও পার্টির প্রশংসা করবেন। তাঁর স্ত্রীর রূপ ও অলঙ্কারের প্রশংসা করবেন নানান উপমায়। কেনা প্রশংসার অন্য নাম চাটুকারিতা। ‘আখাইক্ক্যারা’ শুধু খাওয়ার জন্যই খাওয়ানেওয়ালার গুণকীর্তন করে, ‘সাড়াজাগানো বুদ্ধিজীবী’ বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলে; তারা কখনো ‘গুণের’ মর্যাদা বোঝে না। ভদ্রলোকদের সামনে এসব বিষয় আলোচনা করা ভদ্রলোকদের জন্য লজ্জাকর ও বিব্রতকর, হৃদয়বিদারকও বটে।

যেখানে তাঁর পরিচিতি ও জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী, যেমন তিনি একটা বিরাট ফেইসবুক গ্রুপের চীফ অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, একটা ভাইবার গ্রুপ, ওয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ও ব্লগ – যেখানে তিনি অন্যতম কর্ণধার, সেখানেও কাউকে বইটি দেয়া হবে না। তিনি একবার তার মেয়ের বেসুরো গলার গান শেয়ার করেছিলেন। ওরে বাপরে বাপ, ‘বাংলাদেশের ম্যাডোনা’, ‘বাংলার শাকিরা’, ‘দ্বিতীয় রুনা লায়লা’, ইত্যাদি অভিধায় শত সহস্র কমেন্টে সবাই গ্রুপ হ্যাং করে ফেলেছিল। কিছু মাথামোটা গর্দভ আছে, না বোঝে সঙ্গীত, না বোঝে সাহিত্য, পোস্ট দেখামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ে বলে ওঠে – ‘এমন ট্যালেন্টেড মেয়ে আমি জীবনে দেখি নি।’ অথচ, শামান আর মল্লিক সাহেব কিছুদিন পর পর গান আর কবিতা দেন। এত মার্জিত, সাবলীল! সুললিত সুর! কিন্তু কদাচিৎ তাঁদের পোস্টে ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’ দেখা যায়। এটা তাঁদের জন্য হৃদয়বিদারক ব্যাপার। তাঁদের কোনো পরিচিতি নেই। তাঁরা কোথাও পার্টি দিতে পারেন না, লেখালেখি বা গান দেয়া ছাড়া।

পরিচিতরা ‘অখাদ্য’কেও উপাদেয় সাব্যস্ত করেন, অশ্রাব্যকেও স্বীকৃতি দেন ‘অনুপম’ সঙ্গীত হিসাবে। আক্কাস সাহেব আর তাঁর স্ত্রী সেদিন যুগল কণ্ঠে গান গাইলেন বর্ষাবরণ অনুষ্ঠানে। মানুষের চক্ষুলজ্জা বলতে কি কিছু থাকতে নেই? তাদের অনাবশ্যক নর্তন-কুর্দন খুবই কদর্য ছিল, পরিবেশনা ছিল অশৈল্পিক ও ভাঁড়ামোতে ভরপুর। অথচ পাগাম সাহেবের প্রতি হিংসায় জ্বলেপুড়ে সদা-অঙ্গার, আক্কাস সাহেবের এমন কতিপয় হিংসুটে দোসর তাদের পরিবেশনাকে এমন বাহবায় ভরে তুললেন, যেন সাক্ষাৎ চিত্রা-জগজিৎ দম্পতি গান পরিবেশন করলেন। এদের একটা খাসলত খুব ঘৃণা করেন পাগাম সাহেব। হোক সামাজিক, হোক সাংস্কৃতিক- সবকিছুতেই এরা স্বজনপ্রীতি ও দলাদলি করে সাদাকে টুকটুকে লাল আর কালোকে দুধে-ধোয়া ফর্সা বানিয়ে ফেলেন।

গ্রামের মোড়ল একদিন কী করলেন, একটা গবেট ধরনের লোককে কয়েকজন শিক্ষিত ছেলের সামনে তার বুদ্ধিমত্তার প্রশংসায় মুখে খই ফোটালেন। আপনি যদি সেই শিক্ষিত ও ভদ্রোচিত যুবকের একজন হয়ে থাকেন, আপনার কেমন লাগবে এরূপ প্রশংসাবর্ষণ দেখে? ক্লাসের মিস কী করলেন, ক্লাসের অন্যতম দুর্বল ছাত্রের হোম ওয়ার্কের খাতাটা সবাইকে দেখিয়ে বললেন, দেখো দেখো- আরিয়ান কত সুন্দর লিখেছে! ছেলেরা অবাক হয়ে দেখলো, আরিয়ানের সমুদয় খাতা কাকের ঠ্যাং আর বকের ঠ্যাঙে ভর্তি।

পাগাম সাহেব বিস্ময় ও বেদনার সাথে লক্ষ করেছেন, একটা গোত্র আছে, তারা ভিন্নগোত্রীয় কবির কবিতাকে ‘কোনো কবিতাই হয় নি’ প্রমাণ করার উদ্দেশ্যে স্বগোত্রীয় কবির লাবছাল কবিতাকে ‘কালোত্তীর্ণ কবিতা’, ‘অসাধারণ কবিতা’, ‘ব্রিলিয়ান্ট কবিতা’, ইত্যাদি উপচে পড়া মন্তব্য দিয়ে ভরে ফেলে শত্রুপক্ষকে মাটিতে মিশিয়ে দিচ্ছেন।

ধরুন, কবি ম্যাকবেল পাটোয়ারী তাদের পছন্দের কবি নন। অতএব, তাঁর কোনো লেখা দেখামাত্র তারা উপর্যুপরি ভর্ৎসনাবর্ষণে পাটোয়ারী কবির চামড়া ছুঁলে ফেলবেন। তেমনি, পাটোয়ারীর কবিত্বকে অসাড় প্রমাণ করার জন্য কবি কুদ্দুস তালুকদারের পুরীষসুলভ লেখাকেও ক্লাসিক কবিতা, তার রাসভতুল্য মেধাকেও ‘অনন্য প্রতিভা’য় আখ্যায়িত করে আনন্দে খেমটা নৃত্য শুরু করেন। এসব দেখতে দেখতে, ভাবতে ভাবতে বিখ্যাত পলাশউদ্দিন পাগাম সাহেবের গায়ে জ্বালা ধরে গেছে; এবং তিনি প্রায়শ ক্ষিপ্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েন। নিজের অজান্তেই তাঁর বুকের ভেতর ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত হয় তাঁর চিরায়ত বাণী – এরা না বোঝে সাহিত্য, না বোঝে সঙ্গীত, এরা যা বোঝে তা সত্যিই নিখাদ লাবছাল। এই গোষ্ঠিপাতানো দলের কেউ তাঁর বইটি পড়ুক, পাগাম সাহেব কস্মিনকালেও তা চান না। এদের হাতে সাহিত্য পড়লে কি নিজের সাহিত্য সম্পর্কে সত্যিকার কোনো মতামত পাওয়া যাবে? যা পাওয়া যাবে তা হবে একচেটিয়া ধনাত্মক, অথবা একচেটিয়া ঋণাত্মক।

পাগাম সাহেব ঐসকল বন্ধুদের হাতেও নিজের বইটি না দেয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকবেন - যারা এক কলম লিখতে পারে না, কিন্তু ১০ পাতার একটা গল্প বা প্রবন্ধ থেকে র‍্যানডম দু-একটা লাইন সামনে ছুঁড়ে বলবে – এখানে ‘হ্যাজ’ হবে না, ‘হ্যাভ’ হবে। এরা বোঝে না যে, বাঙালি হলেই সব লেখা শুদ্ধ হবে না, ইংলিশম্যান হলেই সব লেখা ‘কারেক্ট’ হবে না। এজন্য সবারই মাতৃভাষার ব্যাকরণে ‘অশুদ্ধ থেকে শুদ্ধকরণ’ নামে একটা চ্যাপ্টার থাকে। আর আছে ‘টাইপিং মিস্টেক’, ‘চোখে না পড়া’র মতো নানাবিধ ‘বাগ’। এসব বোধাইরা ছোটোখাটো ‘বাগ’গুলো বের করে লেখকের চোখে আঙ্গুল ঢুকিয়ে দিতে উদ্যত হয়, পাণ্ডিত্যের প্রসাদে বিভোর হয় এই ভেবে, ওরা লেখকের চাইতেও বড়ো লেখক; এতে যে ওদের ‘বোধাইগিরি’ আরো প্রকট হয়, এটা বুঝতে পারে না, হালার বোধাইবর্গ।

তাহলে তিনি কার হাতে দেবেন বইটি? এত বাছাবাছি করলে দুনিয়ায় আর কোনো পাঠকই তো অবশিষ্ট থাকবে না। তিনি চান, নিরঙ্কুশ, নির্মোহ, নিরহঙ্কার, নিরপেক্ষ, খুব সাধারণ মানের কিছু পাঠক তাঁর বইটি পড়ুন, তাঁদের দৃষ্টিতে তিনি যেভাবে প্রতিভাত হবেন, তিনি মনে করেন, প্রকৃত পাগাম-সাহিত্য সেটাই।

অনেক ভাবাভাবির শেষে বিখ্যাত পলাশউদ্দিন পাগাম সাহেব দুটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। প্রথমত, তিনি কাউকেই জানাবেন না তার একটি বই প্রকাশিত হতে যাচ্ছে। এবং স্ট্রাইকিং সিদ্ধান্তটি হলো, বইটি বের হবে বেনামে। ‘শীতের কবলে বসন্ত’ লেখার নীচে সাধারণ ফন্টে লেখকের নাম উঠবে – আব্দুল সোনামিঞা

তসলিমা নাসরিনেরব প্রথম বইটির মাত্র একটি কপি বিক্রি হয়েছিল। ঐ পাঠকই ছিলেন তসলিমা নাসরিনের প্রকৃত পাঠক; আর ঐ বইতেই তিনি ছিলেন অর্গানিক তসলিমা নাসরিন।

লেখককে না চিনে যে পাঠক বইটি পড়বেন, তিনিই প্রকৃত পাঠক; লেখককে না জেনে যে পাঠক পাঠ-প্রতিক্রিয়া জানাবেন, সেটিই হলো একজন লেখক হিসাবে নিজেকে জানার জন্য প্রকৃত চিত্র।

১০ ফেব্রুয়ারি ২০২২
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ রাত ১১:২৯
৬টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মানুষের জন্য নিয়ম নয়, নিয়মের জন্য মানুষ?

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ বিকাল ৫:৪৭



কুমিল্লা থেকে বাসযোগে (রূপান্তর পরিবহণ) ঢাকায় আসছিলাম। সাইনবোর্ড এলাকায় আসার পর ট্রাফিক পুলিশ গাড়ি আটকালেন। ঘটনা কী জানতে চাইলে বললেন, আপনাদের অন্য গাড়িতে তুলে দেওয়া হবে। আপনারা নামুন।

এটা তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

একটা গাছ কাঠ হলো, কার কী তাতে আসে গেলো!

লিখেছেন নয়ন বড়ুয়া, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ৮:০৬



ছবিঃ একটি ফেসবুক পেইজ থেকে

একটা গাছ আমাকে যতটা আগলে রাখতে চাই, ভালো রাখতে চাই, আমি ততটা সেই গাছের জন্য কিছুই করতে পারিনা...
তাকে কেউ হত্যা করতে চাইলে বাঁধাও দিতে পারিনা...
অথচ... ...বাকিটুকু পড়ুন

শাহ সাহেবের ডায়রি ।। কালবৈশাখী

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ৮:২৪



গত পরশু এমনটি ঘটেছিল , আজও ঘটলো । ৩৮ / ৩৯ সে, গরমে পুড়ে বিকেলে হটাৎ কালবৈশাখী রুদ্র বেশে হানা দিল । খুশি হলাম বেদম । রূপনগর... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন খাঁটি ব্যবসায়ী ও তার গ্রাহক ভিক্ষুকের গল্প!

লিখেছেন শেরজা তপন, ১৭ ই এপ্রিল, ২০২৪ রাত ৯:০৪


ভারতের রাজস্থানী ও মাড়ওয়ার সম্প্রদায়ের লোকজনকে মূলত মাড়ওয়ারি বলে আমরা জানি। এরা মূলত ভারতবর্ষের সবচাইতে সফল ব্যবসায়িক সম্প্রদায়- মাড়ওয়ারি ব্যবসায়ীরা ঐতিহাসিকভাবে অভ্যাসগতভাবে পরিযায়ী। বাংলাদেশ-ভারত নেপাল পাকিস্তান থেকে শুরু করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছিঁচকাঁদুনে ছেলে আর চোখ মোছানো মেয়ে...

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৮ ই এপ্রিল, ২০২৪ সকাল ১১:০৯

ছিঁচকাঁদুনে ছেলে আর চোখ মোছানো মেয়ে,
পড়তো তারা প্লে গ্রুপে এক প্রিপারেটরি স্কুলে।
রোজ সকালে মা তাদের বিছানা থেকে তুলে,
টেনে টুনে রেডি করাতেন মহা হুলস্থূলে।

মেয়ের মুখে থাকতো হাসি, ছেলের চোখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×