somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্বৈরাচারী পরিচালকের ব্যর্থ সেবা প্রতিষ্ঠানের প্রতিচ্ছবি ওয়াসা!

২৪ শে জুলাই, ২০২০ রাত ৯:২৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ওয়াসার এমডি ১১ বছরে কী করেছেন?
ঘণ্টাখানেকের বৃষ্টিতেই জনপদ হাঁটুপানি থেকে কোমরপানিতে ডুবে থাকা ঢাকা ও চট্টগ্রামের সাংবাৎসরিক চিত্র। কেননা, নগরের নালাগুলো পরিষ্কার ও সংস্কারের চর্চা নেই। নালা ও নর্দমা থেকে ময়লা উঠিয়ে ফেলে রাখা হয়, যা আবার নর্দমাতেই গিয়ে পড়ে। এতে যান চলাচলে বিঘ্ন হয়, বিপুল কর্মঘণ্টা নষ্ট হচ্ছে এবং মশার বিস্তারসহ জীবাণু সংক্রমণ বাড়ছে। ক্ষতি হচ্ছে অর্থনীতির। পানি ও পয়োনিষ্কাশনের একক দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান ওয়াসা। এদের জন্য সরকারি বরাদ্দ বছর বছর বাড়ছেই, কিন্তু জলাবদ্ধতা থেকে মহানগর মুক্তি পাচ্ছে না। সিটি করপোরেশন, ওয়াসা এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) মধ্যে চলে চক্রাকার কাদা–ছোড়াছুড়ি এবং চিঠি–চালাচালি। কিন্তু নগরবাসীর কষ্টের কোনো সমাধান হয় না।

ওয়াসা প্রধানের ব্যর্থতা
ওয়াসার ব্যর্থতা এর প্রধানের ব্যর্থতা হিসেবেই দেখতে হবে। বর্তমান প্রধান টানা পাঁচ মেয়াদে ১১ বছর ধরে দায়িত্বে আছেন। ‘ঘুরে দাঁড়াও ঢাকা ওয়াসা’ কর্মসূচিতে কাজ শুরুর ১০ বছর পর দেখা যাচ্ছে, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহকৃত পানি এতই আবর্জনা ও দুর্গন্ধময় যে সেটা পানীয় হিসেবে তো দূরের কথা, স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার করাও মুশকিল। প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবার মান তো বাড়েনি, বরং গ্রাহক পর্যায়ে পানির মান নিয়ে ব্যাপক অসন্তোষ জমেছে, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বেড়েছে, সময়ে নগরে জলাবদ্ধতা বেড়েছে, পয়োবর্জ্য নিষ্কাশন না হওয়ায় নদীদূষণ বেড়েছে এবং পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পানির মূল্য। গত বছরই ওয়াসার পানি কতটা ‘সুপেয়’, তা দেখানো এবং সেই পানি দিয়ে ‘শরবত’ তৈরি করে এমডিকে পান করানোর জন্য কর্মসূচি পালিত হয়েছে।

ওয়াসার হিসাব বলছে, ঢাকার ৮০ শতাংশ এলাকায় এখনো পয়োবর্জ্য নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। সামান্য বৃষ্টি হলেই ঢাকা ও চট্টগ্রাম নগরের ডুবে যাওয়া নিয়মিত ঘটনা। ওয়াসা এমন ঘুরে দাঁড়িয়েছে যে খোদ সংস্থাটির প্রধান কার্যালয়ের সামনেই সামান্য বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা হয়। পানির মান নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও গত ১২ বছরে অন্তত ১৩ বার পানির দাম বেড়েছে। ২০০৯ সালে যে পানির দাম ছিল পৌনে ৬ টাকা, এখন তা ১৪ টাকা ৪৬ পয়সা। ২০১৯ সালে ঢাকা ওয়াসা ২৫ শতাংশ মূল্য বৃদ্ধি করেছে, যেখানে আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ ৫ শতাংশ বাড়ানোর এখতিয়ার রয়েছে।

২ অক্টোবর ২০১৯ প্রথম আলোর প্রতিবেদন বলছে, ‘২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ঢাকা ওয়াসা জলাবদ্ধতা মোকাবিলায় অন্তত ৫২৩ কোটি টাকা খরচ করেছে। এর মধ্যে তিনটি পাম্প স্টেশনের (পানিনিষ্কাশনের জন্য) জন্য ব্যয় করেছে ৩৩৮ কোটি টাকা। কিন্তু সমস্যা না কমে বরং আরও বেড়েছে। ভারী বৃষ্টি হলেও যাতে জলাবদ্ধতা না হয়, সে জন্য গত অর্থবছরে সরকারের কাছ থেকে ঢাকা ওয়াসা বরাদ্দ পেয়েছিল ৪০ কোটি টাকা।’

আদালতে মিথ্যাচার

ঢাকা নগরীতে ৩৮টির বেশি খাল ছিল, খালগুলো দখলমুক্ত এবং ভরাটমুক্ত রাখতে ওয়াসা ও পাউবো দশকের পর দশক ব্যর্থতা দেখিয়েছে। গত ৮ ডিসেম্বর হাইকোর্ট যেসব সুয়ারেজ লাইন দিয়ে বুড়িগঙ্গায় বর্জ্য পড়ছে, সেগুলো ছয় মাসের মধ্যে বন্ধে ওয়াসার যে অঙ্গীকার, তা বাস্তবায়ন করতে বলেছেন। নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি জানিয়ে ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে হলফনামা আকারে আদালতে প্রতিবেদন দিতেও বলা হয়। পরে দেখা গেছে, ওয়াসা এমডির পক্ষে বুড়িগঙ্গায় সুয়ারেজ সংযোগ থাকা বিষয়ে দৃশ্যত অসত্য তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০ জানুয়ারি হাইকোর্ট বুড়িগঙ্গাসহ ঢাকায় নদীতীরে থাকা পরিবেশগত ছাড়পত্রবিহীন ২৩১টি শিল্পকারখানা ও প্রতিষ্ঠান অবিলম্বে বন্ধ করতে নির্দেশ দেন। এটা দৃশ্যমান যে ওয়াসা তার ড্রেনেজ সার্কেল দিয়ে নগরীর বৃষ্টির পানিনিষ্কাশনের খালগুলোকে বক্স কালভার্ট নালায় পরিণত করেছে এবং নগরীর পয়ো ও শিল্পবর্জ্য প্রক্রিয়াকরণ না করেই সেখানে ঢেলে দিচ্ছে। বৃষ্টির পানির নালায় পয়োবর্জ্য ও শিল্পবর্জ্য ফেলা নিশ্চিতভাবেই কোনো ভালো ব্যবস্থাপনা নয় এবং পরিবেশের জন্য অনুপযোগী।

চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বৈধতা
ওয়াসায় পদ শূন্য রেখে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অপসংস্কৃতি চালু করেছেন ওয়াসার এমডি তাকসিম এ খান।নিয়োগে ২০ বছরের পানি ও পয়োনিষ্কাশন অভিজ্ঞতার কথা থাকলেও এইকাজে পূর্ব অভিজ্ঞতাহীন ঢাকা ওয়াসার বর্তমান তাকসিম এ খান নিয়োগ পান ২০০৯ সালে। তাঁর টানা পাঁচ মেয়াদে নিয়োগ ও পুনর্নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে টিআইবি। টিআইবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালকের প্রশ্নবিদ্ধ নিয়োগ ও অব্যাহত পুনর্নিয়োগ বিষয়ে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। পাশাপাশি ওয়াসার সব পর্যায়ের কর্মকর্তা–কর্মচারীর বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদের সুষ্ঠু তদন্ত করে অনিয়ম ও দুর্নীতির জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে ও অন্যান্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা যায়, প্রতিবারই তাঁর নিয়োগ নবায়নের ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে আইন ও নিয়মের ব্যত্যয় হয়েছে।’

সব মিলিয়ে অযোগ্য ও দুর্নীতিগ্রস্ত এমডিকে বরখাস্ত করা দরকার। পানি বাণিজ্যিকীকরণ থামিয়ে নিরাপদ পানি সরবরাহে ওয়াসার সঠিক মনোযোগ আনা দরকার। দরকার গ্রাহক অভিযোগ সমাধানের চর্চা। পয়োনিষ্কাশনের নামে নদীতে বর্জ্য উন্মুক্তকরণ বন্ধ করা দরকার। দরকার নর্দমা ও নালা সংস্কারের টেকসই ব্যবস্থাপনা প্রবর্তন। সবার জন্য নিরাপদ পানি ও পয়োনিষ্কাশন নিশ্চিত করতে টেকসই পরিকল্পনার পাশাপাশি দুর্নীতিমুক্ত বাস্তবায়ন জরুরি।

নিম্নমান পানি, জ্বালানি অপচয় এবং পানি বাণিজ্যিকীকরণ
১৭ এপ্রিল ২০১৯ ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) গবেষণায় জানা যায়, ‘ঢাকা ওয়াসার পানির নিম্নমানের কারণে ৯৩ শতাংশ গ্রাহক বিভিন্ন পদ্ধতিতে পানি পানের উপযোগী করেন। ৯১ শতাংশ গ্রাহকই পানি ফুটিয়ে বা সেদ্ধ করে পান করেন। গৃহস্থালি পর্যায়ে পানি ফুটিয়ে পানের উপযোগী করতে প্রতিবছর আনুমানিক ৩৩২ কোটি টাকার গ্যাসের অপচয় হয়।’ এ অবস্থায় দেশে বাজারজাত পানি ও শোধনের ফিল্টার ব্যবসা প্রসারিত হয়েছে। ময়লা ও দুর্গন্ধময় পানির অভিযোগগুলো আমলে নিয়ে ‘সমস্যা’ সমাধান করার চেষ্টা না করে ওয়াসা এমডি সরবরাহকৃত পানি ‘সুপেয়’ দাবি করেছেন। সরবরাহ নিরাপদ করার বিপরীতে, নিরাপদ পানি সরবরাহ থেকে মনোযোগ সরিয়ে খোদ ওয়াসাই ‘ড্রিংক ওয়েল’ নামে শোধিত পানির ব্যবসায় নেমেছে। অত্যন্ত আপত্তিজনক যে ‘ড্রিংক ওয়েল’ ফিল্টারের জন্য ‘এটিএম’ আদলে প্রি–পেইড ডিসপেনসার করেছে, তার জন্য অপ্রয়োজনীয় ও খরুচে পেমেন্ট কার্ড চালু করেছে। যদিও ডিজিটাল পেমেন্টের যুগে প্রচলিত ব্যাংক কার্ড ও মোবাইল ব্যাংকিং সংযোগ দিয়ে পেমেন্ট অবকাঠামো করাই যুক্তিযুক্ত ছিল। একদিকে রাষ্ট্রের অর্থ অপচয় হলো, অন্যদিকে শোধিত পানির নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে নিরাপদ পানি সরবরাহের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নিম্ন ও মধ্যম আয়ের মানুষ। এতে নগরে জীবনযাপনের খরচ বাড়ছে।


২৪ জুলাই ২০২০, দৈনিক প্রথমআলোতে প্রকাশিত।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে জুলাই, ২০২০ রাত ৯:২৬
৫টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

০১টি ভাপাপিঠাময় ছবিব্লগ

লিখেছেন মোঃ মাইদুল সরকার, ২৩ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১০:১৫

ঐতিহ্যগতভাবে এটি একটি গ্রামীণ নাশতা হলেও বিংশ শতকের শেষভাগে প্রধানত শহরে আসা গ্রামীণ মানুষদের খাদ্য হিসাবে এটি শহরে বহুল প্রচলিত হয়েছে। রাস্তাঘাটে এমনকী রেস্তোরাঁতে আজকাল ভাপা পিঠা পাওয়া যায়। এই... ...বাকিটুকু পড়ুন

পবিত্র বাইতুল্লাহ এবং মসজিদে নববী আধুনিকিকরণের পেছনের অজানা কিছু কথা -সংশোধিত পুন:প্রকাশ

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১১:০৪

বাইতুল্লাহিল হারাম, মক্কাতুল মুকাররমাহ, ছবি: অন্তর্জাল।

পবিত্র বাইতুল্লাহ এবং মসজিদে নববী আধুনিকিকরণের পেছনের অজানা কিছু কথা

প্রাককথন:

হারামাইন শরিফাইন অর্থাৎ, মক্কাতুল মুকাররমা এবং মদীনাতুল মুনাওওয়ারায় অবস্থিত পবিত্র দুই মসজিদ বাইতুল্লাহ এবং... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাতের গোলাপ

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৩ শে জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১২:১৮

গোলাপকে ফুলের রাণী বলা হয়। গোলাপ পাঁপড়ির গড়ন ও বিন্যাসের নান্দনিকতা মানুষকে আকৃষ্ট করে। সুগন্ধী গোলাপের ঘ্রাণও মানুষের ভালোবাসার কারণ। ফুলের সৌন্দর্য ও সুবাসের জন্য গোলাপ বিশ্বজুড়ে বিখ্যাত।



পৃথিবীতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

" নারী " - তুমি আসলে কি ? স্রষ্টার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ,বংশগতির ধারক-বাহক , পুজারীর দেবী , নাকি শুধু পুরুষের ভোগেরই সামগ্রী? (মানব জীবন - ২৩)।

লিখেছেন মোহামমদ কামরুজজামান, ২৩ শে জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ২:২৭


ছবি - unsplash.com

"সৃষ্টি থেকে শেষ অবধীর কেন্দ্রে রয়েছে নারী
হাজার রূপ একটি নারীর, যেন রহস্যের ভান্ডারী,
কখনো মা, বোন, নানী বা প্রিয়তমা স্ত্রী
তাদের জন্যই সুন্দর ধরনী, স্রষ্টার করিগরী"।

নারী স্রষ্টার... ...বাকিটুকু পড়ুন

=তোদের আর আমাদের কাল=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৩ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৫:৪৩



©কাজী ফাতেমা ছবি
#একাল_সেকাল
তোরা থাকিস ঘরের কোণে, সময় কাটাস গেইম খেলে
আমরা ছিলাম ঘরের বাইরে, ওড়ছি স্বাধীন ডানা মেলে,
রুমাল চুরি বউচি মারবেল, দাঁড়িয়াবান্ধা ডাংগুলি,
দাবা ক্যারাম আর গোল্লাছুট, খেললে পথে উড়তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×