বর্তমান ঠাকুরগাঁও জেলার হরিপুর উপজেলার ভাতুরিয়ায় ছিল রাজা গণেশের গড় বা তার শাসন প্রাসাদ । মুসলিম ঐতিহাসিকদের রচনায় তিনি ‘কন্স’ হিসেবে উপস্থাপিত। মধ্যযুগের ইন্দো-পারসিয়ান ইতিহাসবিদরা তাকে একজন কাফির দখলদার বলে অবিহিত করেছেন। আধুনিক কিছু পন্ডিত তাকে দানুজামারদানদেব বলে উল্লেখ করলেও এই পরিচয়টি সর্বত্র স্বীকৃত নয়। পনের শতকের প্রারম্ভে ইলিয়াসশাহী বংশের দুর্বল সুলতানের নিকট থেকে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করে বাংলার রাজা হন। তার প্রতিষ্ঠিত রাজবংশ ১৪১৫-১৪৩৫ সময়কালে বাংলা শাসন করে।
তাঁর জন্ম ও বংশ পরিচয় সম্পর্কে সঠিক কিছু জানা যায় না। গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের রাজত্বকালের শেষের দিকে ফিরুজাবাদের ( পান্ডুয়া) ইলিয়াসশাহী রাজদরবারে যেসকল অমাত্য প্রভাবশালী হয়ে ওঠেন, গণেশ তাঁদের অন্যতম। তিনি সাইফুদ্দীন হামজাহ শাহ, শিহাবউদ্দীন বায়েজীদ শাহ ও আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহের রাজত্বকালে বাংলার রাজনীতিতে ষড়যন্ত্রমূলক ভূমিকা পালন করেন এবং কম করে হলেও চার বছর (১৪১০-১৪১৪) রাজ্যের প্রকৃত ক্ষমতা তাঁর হাতে কেন্দ্রীভূত ছিল। তিনি রাজ্যের শাসন কর্তৃত্ব কুক্ষিগত করেন এবং বিশৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক গোলযোগের সুযোগে আলাউদ্দীন ফিরুজ শাহকে সিংহাসনচ্যুত (সম্ভবত হত্যা) করে ১৪১৪ খ্রিস্টাব্দে বাংলার সিংহাসন দখল করেন।
রাজা গণেশ বাংলায় মুসলিম শাসন উৎখাতের জন্য মুসলমানদের নির্যাতন ও উচ্ছেদ করার নীতি গ্রহণ করেন। নির্যাতিত মুসলমানগণ শেখ নূর কুতুব আলমের শরণাপন্ন হয়। তিনি জৌনপুরের সুলতান ইবরাহিম শাহ শর্কীকে মুসলমানদের উদ্ধারে এগিয়ে আসার অনুরোধ জানান। সুলতান ইবরাহিম শাহ শর্কী বাংলায় অভিযান করে সরাই ফিরুজপুরে শিবির স্থাপন করেন। রাজা গণেশ নূর কুতুব আলমের কাছে আত্মসমর্পণ করলে তিনি তাঁকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হওয়ার দাবি জানান। গণেশ নিজের স্থলে তাঁর পুত্র যদুকে ধর্মান্তরিত করার প্রস্তাব দেন। যদু ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তাঁকে সিংহাসনে অধিষ্ঠিত করা হয়। তিনি তাঁর নতুন নাম জালালুদ্দীন মুহম্মদ শাহ নামে মুদ্রা প্রচলন করেন। কিন্তু জৌনপুর সেনাবাহিনীর প্রস্থানের পর গণেশ তাঁর পুত্রকে সিংহাসনচ্যুত ও বন্দি করেন। তিনি দনুজমর্দনদেব উপাধি ধারণ করে নিজ নামে মুদ্রা জারি করে রাজকীয় ক্ষমতার প্রয়োগ শুরু করেন। তিনি পুনরায় মুসলিম নির্যাতন শুরু করেন, শেখ আনোয়ারকে হত্যা করেন এবং শেখ জাহিদকে সোনারগাঁওয়ে নির্বাসন দেন। কিন্তু শীঘ্রই ১৪১৮ খ্রিস্টাব্দে গণেশ তাঁর পুত্র জালালুদ্দীন কর্তৃক সিংহাসনচ্যুত এবং সম্ভবত নিহত হন । ১৪৩৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জালালুদ্দীন বাংলার রাজা ছিলেন।
রাজা গণেশ তাঁর স্বল্পকালীন শাসনে প্রায় সমগ্র বাংলার ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যক্তিত্বের অধিকারী রাজা গণেশ ছিলেন একজন চতুর কূটনীতিক। তিনি দেবী চন্ডীর ভক্ত ছিলেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



