আমি একটি হার্ডডিস্ক। mhw2160bh PL মডেলের একটি সাটা ড্রাইভ। সদূর থাইলেন্ডের ফুজিৎসুর কারখানায় ২০০৭ সালের সেপ্টেমবারে আমার জন্ম। কোন নারীর পেটে জন্ম নেয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। সিলিকন, স্টিল আর প্লাস্টিকের মধ্যে কাটাছেড়া করে আমার জন্ম। আরো কয়েকহাজার ভাইয়ের সাথে যখন আমি মেশিন থেকে বের হয়ে এলাম; এক নাকবোচা লোক আমাকে একটি ল্যাপটপের সাথে জুড়ে পরীক্ষা করে দেখেন আমাকে। তারপর একটি সিরিয়াল নাম্বার দিয়ে সামসাং নোটবুকের ভেতর ঢুকিয়ে প্যাকেট বন্দী করে ফেলেন।
অন্ধকার একটি যন্ত্রের ভেতর আমার কষ্ট হয়, দম বন্ধ হয়ে আসে, কিন্তু কিছু করতে পারি না, মানুষের যখন বাচ্চা হয় তখন চারদিকে কত আনন্দ, মিস্টি খাওয়া, আমার বেলায় কিছুই হয়নি, কেউ জানতেই পারেনি আমার জন্ম হয়েছে!!
বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি, আমার ভাইরা তখনো আমার পাশে টেসকো নামের বিশাল এক সুপার মার্কেটের কোন একটি অন্ধকার বাক্সে পড়ে আছে, একদিন এক ছেলে তার একজন বন্ধু নিয়ে এলেন, সবগুলো বাক্স খুজতে খুজতে একসময় আমার সামনে এসে দাড়ায়। যে বাক্সের ভেতর আমি পড়েছিলাম সেটিই সে তুলে নেয়। কৃতজ্ঞতায় আমার মন ভ'রে যায়, আমি ভাবতেই পারিনি জন্মের মাত্র দু'মাসের ভেতর কেউ আমাকে তুলে নিবে।
বাসায় এসে সে তার কম্পিউটারে পাওয়ার দেয়। প্রাণ খূজে পাই আমি, এক ন্যানো সেকেন্ডর মাঝে প্রসেসর আমাদের সবার সাথে বৈঠক করেন, প্রসেসর জানান আমাকে সর্বোচ্চ পার্ফমেন্স দেখাতে।আমি বিপুল উৎসাহে কাজ শুরু করি, আমার সিলিকন প্লেটগুলো ঘুরতে থাকে বিদুৎ গতিতে। প্রসেসর আমাকে কোটি কোটি ১ আর ০ রেকর্ড করতে বলে। আমার প্লেটগুলোতে জমা হতে থাকে কোটিকোটি তরিৎ আবেশ, শুধু ১ আর শূন্য রেকর্ড করি আমি।
এক সময় প্রসেসরকে জিজ্ঞেস করলাম এই ১ আর ০ দিয়ে কি হয়? প্রসেসর জবাব দেয় না, বলে চুপ করে কাজ করে যাও, আজ আমাদের প্রথম দিন! দেখছো না ছেলেটা মেজাজ খারাপ করে কিবোর্ডে টাইপ করছে! জিজ্ঞেস করলাম কেন তার মেজাজ খারাপ। প্রসেসর বললো ছেলেটি তার পুরনো কম্পিউটার থেকে ডাটা ট্রান্সফার করতে চাইছে কিন্তু পারছে না, জিজ্ঞেস করলাম কেন পারছে না? প্রসেসর বললো তার পেন ড্রাইভটি ভালো না, কিন্তু সে সেটা জানেনা, সে ভাবছে ফাইল সিস্টেমে সমস্যা। প্রসেসরকে বললাম "তুমি তাহলে বলছো না কেন সমস্যাটা"! প্রসেসর উদাস ভঙ্গিতে বললো "আমিতো মানুষ নই, মানুষের মত বলতে পারিনা, অপারেটিং সিস্টেম থেকে ধার করে কথা বলতে হয়, অপারেটিং সিস্টেম শুধু বলছে ডাটা ড্যামেজ হয়ে গেছে।
আমার মন খারাপ হলো, ছেলেটি কি তাহলে ডাটা ট্রান্সফার করতে পারবে না? আমি, প্রসেসর, র্যাম মন খারাপ করে অপেক্ষা করতে লাগলাম, হঠাৎ প্রসেসর জানালো - ছেলেটি নতুন বুদ্ধি বের করেছে, সে তার ডাটা ডিভিডিতে রাইট করে আমাদের দিতে যাচ্ছে!! আমাদের মধ্যে খুশির বন্যা বয়ে গেলো, তার ডাটাগুলো হারালে খুবই দু:খ পেতাম। তারপর শুরু হলো ডাটা ট্রান্সফার। প্রসেসরের নির্দেশে বন্যার মতো ১ আর ০ জমা হতে লাগলো আমার ভেতর। কোটি কোটি, বিলিয়ন বিলিয়ন ১ আর ০। মাঝে মাঝে প্রসেসর হাসছে, কখনো উচ্চসূরে, কখনো গম্ভীর হয়ে যাচ্ছে! আমার প্রচন্ড মন খারাপ হলো, সব ১ আর ০ আমার ভেতর অথচ আমি এর অর্থ বুঝতে পারছি না, সব সময় প্রসেসরকে জিজ্ঞেস করতে হচ্ছে। সব সময় জিজ্ঞেস ও করা যাচ্ছে না, জিজ্ঞেস করলেই ধমক দিচ্ছে! সে নাকি ব্যস্ত!! ছেলেটি হঠাৎ রান্নাঘরে গেলো, এই ফাকে আমি প্রসেসরকে জিজ্ঞেস করলাম এত এত ১ আর ০ কেন? এগুলোর অর্থ কি?
প্রসেসর বললো এই দেখো! এই ১ আর ০ গুলো সব ছবি। লন্ডন ব্রীজের কিছু ছবি দেখো। ছেলেটি যখন নতুন আসে তখন মন খারাপ করে ব্রীজের পাশে বসে থাকতো তার ছবি। প্রসেসর গ্রাফিক্স কার্ডকে নির্দেশ দিলো আমাকে ছবি দেখাতে। ছবি দেখে খুব ভাললো লাগলো, বাইরের পৃথিবী এত সুন্দর!! আরো কিছু ১ আর ০ দেখা গেলো! প্রসেসর বললো দেখো এইগুলো তার গ্রামের ছবি, ধানের ক্ষেত! ধানের ক্ষেত দেখে মনটা আনচান করে উঠলো! ইস যদি মানুষ হয়ে জন্মাতাম তাহলে আমিও এসব দেখতে পেতাম নিজের চোখে। প্রসেসর , আমাকে চিনিয়ে দিলো কোনগুলো মুভি কোনগুলো প্রোগ্রাম। সেদিনের মত কম্পিউটার বন্ধ করে ছেলেটি বাইরে গেলো। আমরা আমি প্রেসসর র্যাম ঘুমুতে লাগলাম। শুধু ঘড়িটি ঘুমুলো না সে সময় গুনেই যাচ্ছে!!
কয়েক ঘন্টার মধ্যেই আমার ছেলেটি ফিরে এলো, তার বন্ধুদের নিয়ে। প্রেসসর সবাইকে বললো সাবধানে কাজ করতে, সে তার বন্ধুদের ডেকে এনেছে আমাদের দেখাতে। আমরা যেনো তার মান ইজ্জত রক্ষা করি। বিশেষ ভাবে র্যামকে বলা হলো সে যেনো তার সবোর্চ্চ পার্ফমেন্স দেখায়। বন্ধুরা চলে যেতেই ছেলেটি আমাদের নিয়ে বসলো। হঠাৎ শুনি প্রসেসর হো হো করে হাসছে, জিজ্ঞেস করতেই বললো, ছেলেটি তার ডায়েরীটি এইমাত্র ট্রান্সফার করলো। মাঝে মাঝে আমার প্রসেসরকে হিংসা হয়, সে সব বুঝে সব দেখতে পায়, অথচ আমি সকল তথ্য ধারন করেও কিছু বুঝতে পারি না। প্রসেসর আমাকে বললো ডায়েরীতে দেখো কত মজার ঘটনা, হাহাহাহাহ!! প্রসেসর হাসছে শব্দ করে। একটি ঘটনা বললো, "ছেলেটি একবার সাইকেলে দূর থেকে কলাস্টিকা স্কুলের মেয়ের নীল স্কার্ট দেখে জোরে সাইকেল চালিয়ে রিকশার আগে গিয়ে দেখে নীল লুঙ্গি পড়া এক লোক!!" ঘটনা শুনে র্যাম, প্রসেসর, আমি হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়লাম। শুধু ফ্যানটাকে দেখলাম হাসে না, ফ্যানকে জিজ্ঞেস করলাম কি ব্যাপার! তুমি ঘটনা শুনে মজা পাওনি। সে বললো "আমার এত মজার কাম নাই, এখানে কেমন গরম দেখেছো! সবার আগে আমি নষ্ট হবো তখন ছেলেটি আমাকে ফেলে দিবে। একদিন তোমরা সবাই নষ্ট হবে। সবাইকেই সে ফেলে দিবে। কথা শুনে মনটা খারাপ হলো, জানি একদিন এমন হবে! কবে সেই দিন?
এভাবে দিন যায়! আমি শুধু ১ আর ০ রেকর্ড করি আর মুছি। ছেলেটির মাথায় মনে হয় দোষ আছে, প্রতিদিন সে হাজার হাজার ডাটা ডাউনলোড করছে আর মুছে দিচ্ছে! এমন পাগলামি করলে কোনদিন আমার অপটিক্যাল সেন্সর নষ্ট হয়ে যায় কে জানে! সে সারাদিন ইন্টারনেটে ঘুরে বেড়ায় আর চ্যাট করে। ধীরে ধীরে আমার ভেতর জায়গা কমতে থাকে। প্রসেসরকে জানালাম সেটা, প্রসেসর বললো, আমি জানি সেটা, তোমার ভেতর জায়গা কমে আসছে আমার নিজেরই কাজ করতে সমস্যা হয়, কিন্তু আমাদের সংবিধান অপারেটিং সিস্টেমে বলা আছে ১০% জায়গার কম থাকলে সাবধান করতে হবে, এর আগে করা যাবে না,
আমি জিজ্ঞেস করলাম সে কার সাথে চ্যাট করে? প্রসেসর বললো তার চ্যাট করার মানুষের অভাব নেই, তার কোন বন্ধু নেইতো তাই সারাদিন চ্যাট করে। প্রসেসর আমার চার নাম্বার পিনে ডাটার একটি ধাক্কা দিয়ে বললো, "তোমার এত কিছু জানার দরকার নেই, ফাজলামি করবা এইভাবে ধাক্কা খাবে!" প্রসেসরকে রাগানো ঠিক হচ্ছে না, সে রেগে গেলে কিম্পিউটার হ্যাং করে দেয়।
একদিন ছেলেটির রুমে আরেকটি ছেলে এলো, মোটাসোটা, তার হাতেও একটি নোটবুক! প্রসেসর জানালো আমাদের প্রতিদ্বন্ধি বেড়েছে একটা , ওইটা ৬৪ বিটের কম্পিউটার, আমাদের খবর আছে! আমি কৌতুহল নিয়ে অপেক্ষা করি। জানা গেলো ছেলেটির নাম অতিথি পাখি। নতুন কম্পিউটার কিনেছে। এখনো টাইপ করতে শিখেনি।প্রসেসর জানালো ভয়ের কোন কারন নাই ওইটা হেলিকপ্টারের মত শব্দ করে।
আমি আমাদের কিবোর্ডকে জিজ্ঞেস করলাম "কি হে! আজ কেমন বোধ করছো! " আমাদের কিবোর্ড রাগে জবাব দিলো না, ছেলেটি কম্পিউটার কেনার পর থেকেই ঝড়ের বেগে টাইপ করছে প্রতিদিন। আমাদের কিবোর্ডের অবস্থা কাহিল। বেচারার জন্য মাঝে মাঝে মায়া'ই লাগে। কি্বোর্ড জানালো ছেলেটা যদি এভাবে টাইপ করতেই থাকে তাহলে তিন মাসের ভেতর সে প্রসেসরের কাছে আত্নহত্যার আবেদন জানাবে। প্রসেসরের কাছে একদিন কিবোর্ড আবেদন জানালো আত্নহত্যার। প্রসেসর তার মাথায় একটা চাটি মেরে বিদায় করে দিলো।
এভাবে দিন যায়। নতুন কিছু ঘটে না, ছেলেটি সারাদিন মুভি দেখে আর চ্যাট করে আর বাংলাদেশের পত্রিকা পরে। কয়েকদিন প্রসেসর আমাকে পত্রিকা পরে শুনিয়েছে। ফকরুদ্দিন নামে এক মগা নাকি বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে এখন লেজেগোবরে অবস্থায় আছে! রাজনীতি নিয়ে আমার কোন আগ্রহ নাই, তাই আজ কাল চোখ বন্ধকরে ঝিমাই আর ডাটা রেকর্ড করি। একদিন এভাবে ঝিমাচ্ছিলাম, হঠাৎ প্রসেসর বললো!! "এই গাধা, ঘুমাচ্ছিস নাকি? এ্ই গাধা!!" আমি উঠে বসলাম! দেখলাম প্রসেসর খুব আগ্রহ নিয়ে কি যেন দেখছে। জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি!! জানা গেলো তার বন্ধু অতিথি পাখি এক মেয়ের সাথে চ্যাট করছে আমাদের দিয়ে! ছেলেটি অতিথি পাখির হয়ে টাইপ করে দিচ্ছে! প্রসেসরের চোখে দুষ্ট হাসি! আমি বললাম "বস কি কথা হচ্ছে কিছু বলো! আমিতো কিছু বুঝি না, প্রেসসর বললো! অফ যা! আগে দেখি ঘটনা কি? জানতে পারলাম মেয়ের নাম "মালেকা হামিরা" কানাডায় থাকে। দেখতে বড়ই সৌন্দর্য! খুবই উৎসাহিত হলাম, অনেকদিন পর মজার কিছু ঘটছে! গ্রাফিক্স কার্ডকে জিজ্ঞেস করলাম আমাদের ছেলেটা আমেরিকান যে মেয়ের সাথে প্রেম করে সেইটা বেশি সুন্দর নাকি অতিথি পাখির কানাডার মেয়েটা সুন্দর। প্রসেসর কিছুই বলে না, সে মুচকি মুচকি হাসে আর গানে টাল দেয়! বুঝতে পারছি, প্রসেসর ছেলেটির কমান্ড শুনতে শুনতে স্বভাব চরিত্রও ছেলেটির মত হয়ে যাচ্ছে!!
একদিন রাতে দেখি প্রসেসর চুপি চুপি কি যেন করছে! এর আগে এন্টিভাইরাস প্রোগাম ঠিক আছে কিনা দেখে নিলো! এত গোপনীয়তার কি আছে! প্রসেসরকে জিজ্ঞেস করলাম ঘটনা কি? প্রসেসর বললো "অফ যা!!" ব্যাপারটা কি? এত গোপনে কি হচ্ছে!! প্রসেসরকে আবার জিজ্ঞেস করলাম বস ঘটনা কি? প্রসেসর তাও কিছু বলে না, আমি আমার গতি কমিয়ে দিলাম, প্রসেসর রেগে গিয়ে বললো "কি হলো তোর?" আমি বললাম ঘটনা কি না বলেলে আমি স্পিড বাড়াবো না, প্রসেসর বাধ্য হয়ে বলো, ছেলেটি ১৮+ ওয়েবসাইটে ঢুকেছে! খুবই মজায় আছি!! ১৮+ কি কে জানে? গ্রাফিক্স কার্ডকে অনুরোধ করায় সে কয়েকটি ছবি দেখালো!! আমি ছবি দেখে অবাক!! "নাউজুবিল্লাহ!!!" এইসব কি?! সব দেখি উলঙ্গ ছেলে মেয়ে!! প্রসেসর জানালো এই ভিডিওগুলো গোপন রাখবি। যদি অন্য কেউ খুজে বের করতে পারে তোরে এমন কারেন্ট শক দিবো যে জন্মের মত সোজা হয়ে যাবি। আমি ফাইলগুলো লুকিয়ে রাখি! প্রসেসর তাতেও খুশি না, সে পাসওয়ার্ড আরোপ করলো ফাইলের উপর। আমি আর গ্রাফিক্স কার্ড মন খারাপ করে বসে থাকি। শালার প্রসেসর যখন ইচ্ছা দেখতে পারে আমরা পারি না।
এভাবে কেটে যায় এক বছর! ছেলেটি বাসা বদলে ফেলে! অতিথি পাখিও অন্য বাসায় চলে যায়। একদিন অতিথি পাখি ফোন করে ছেলেটিকে ব্লগের কথা বলে। ছেলেটি ব্লগে ঢুকে। নাম আমার ব্লগ। এর দুদিন পর দেখি কিবোর্ড একদিন কান্নাকাটি করছে। জিজ্ঞেস করায় বললো। এতদিন ছিল শুধু চ্যাট, এখন যুক্ত হয়েছে ব্লগ। ছেলেটি এখন দৈনিক দশ ঘন্টা টাইপ করে। প্রসেসরও গালে হাত দিয়ে বসে পড়লো! এখন কি করি। ছেলেটি ব্লগে প্রতিদিন পোস্ট দিচ্ছে! অতি অখাদ্য সব পোস্ট, রহস্যময় কারনে মানুষ তার পোস্ট পছন্দ করে। আমাদের কারো ঘুমের সময় নেই, এখন মাঝে মাঝে ৪ দিনেও কম্পিউটার বন্ধ করা হয় না, প্রসেসর গরম হতে হতে মাঝে মাঝে বন্ধ করে দেয় কম্পিউটার। কিন্তু সেটা সমাধান নয়। এভাবে বন্ধ করে দিলে কিম্পউটার নষ্ট হয়ে যেতে পারে। প্রসেসরের উপর ভয়ানক চাপ পড়ছে। আজকাল তার মেজাজ প্রায়ই গরম থাকে। আমাকে সবকিছু বলে না সে। আমার জায়গা কিছু বেড়েছে। অনেক বাজে ভিডিও ছিলো সেগুলো ছেলেটি ডিলিট করে দিয়েছে, মুভিগুলো সব ডিভডিতে সরিয়েছে। ফলে আজকাল আমি একটু হালকা বোধ করছি।
অন্যদিকে ছেলেটির গল্প লেখার শখ হয়েছে। প্রসেসর আমাদের সে গল্প পড়ে শোনায়। আমার কাছে ভালই মনে হয়। শুধু আমাদের ফ্যানটা কিছু বলে না, বেচারার শক্তি কমে গেছে। আজকাল সে কাম্পিউটার ঠান্ডা করতে পারছে না, প্রসেসর প্রায়ই তাকে জিজ্ঞেস করে , সবাই চুপ থাকে। আমরা জানি আমাদের সময় ফুরিয়ে আসছে। ছেলেটি আমাদের কোন যত্ন নেয়না আজকাল। মাঝে মাঝে এক সপ্তাহ কম্পিউটার চালু থাকে। গরম হতে হতে একদিন ফ্যানের পাশের প্লাস্টিক ভেঙ্গে গেলো। ভেবেছিলাম এবার হয়তো ছেলেটি সাবধান হবে। কিন্তু তা হয়নি। ছেলেটি সুপারগ্লু দিয়ে ঠিক করে আবার আগের মত শুরু করেছে। তার সকল ধ্যান ধারনা এখন ব্লগ। আমারব্লগে সে কি পেয়েছে কে জানে! আমেরিকান মেয়েটার সাথে যে প্রেম করতো সেটাও ভেঙ্গে গেছে কবে। কিন্তু তার ব্লগিং থামে না। একদিন দেখি ছেলেটি প্রচুর বান্দরের ছবি ডাউনলোড করছে, জানা গেলো আমার ব্লগের এক বান্দরকে সা্ইজ করার জন্য সে বান্দরের ছবি ডাউন লোড করছে। ইউজি নিয়ে কিযেন সমস্যা হয়েছে। আজকাল সে আর আমার ব্লগে যায় না। আমরা হাফ ছেলে বাচলাম।
একদিন দরজায় বাড়ি খেয়ে মনিটরের উপরে ফেটে গেলো! আবার সুপার গ্লু দিয়ে ঠিক করা হলো! ফ্যানটা পুরোই যায় যায় অবস্থা। কিবোর্ডের অবস্থাও ভালো নয়। অনেক বাটনে খুব জোড়ে চাপতে হয়। ছেলেটি মনে হয় আমাদের উপর বিরক্ত!! তার বন্ধুরা আজকাল প্রায়ই বলে এটা কি নিয়ে বসে আছেন, মুড়ির টিন!! আমার বুক কেঁপে উঠে। ছেলেটি যদি আমাদের ফেলে দিয়ে আরেকটা কম্পিউটার কিনে? ছেলেটি তার বন্ধুদের বলে "ভাই আমার আরেকটা কম্পিউটার কেনার টাকা নেই, আসলে সে আমাদের ভালোবেসে ফেলেছে, এটা সে ফেলতে চায় না। " তখন খুবই ভালো লাগে আমার।
প্রসেসরটির শক্তি কমে গেছে। আজকাল সে কারন ছাড়াই বন্ধ হয়ে যায় মাঝে মাঝে। প্রতিবার বন্ধ হয় আর আমার বুক কেঁপে উঠে, আর বুঝি চালু হবে না, আমি জানি সে মারা গেলে এই কম্পিউটার ফেলে দেয়া হবে। আমার আতংক দিন দিন বেড়ে উঠে। আমার ভেতরও ব্যাড সেক্টর বাড়ছে দিন দিন। অপটিক্যাল স্যান্সর নড়তে চায় না, খটখট আওয়াজ হয়। আমি প্রাণপণ চেষ্টা করি ছেলেটি যেন তা বুঝতে না পারে, কিন্তু আমি জানি সে সবই বুঝতে পারে। কম্পিউটারের যন্ত্রপাতি সে খুবই ভালো বুঝে, আমাদের স্বাস্থের কি অবস্থা সে টের পেয়েছে অনেক আগে।
তিনদিন আগে ছেলেটি টেবিলে কফির কাপ উল্টে পড়ে। ছেলেটি তা দেখেনি। আমিও গা করলাম না, কারন সে তার কম্পিউটার কখনোই টেবিলে রাখে না, সবসময় খাটের উপর থাকে। ছেলেটি কিছু না দেখের কফির উপর কম্পিউটার রাখলো। কফি প্লস্টিকের শরীর ভেদ করে আমার সার্কিটবোর্ডে চলে এলো। ভয়াবহ আতংক নিয়ে আমি অপেক্ষা করতে লাগলা। প্রসেসরকে জানালাম সাথে সাথে , প্রসেসর সাথে সাথে কম্পিউটার অফ করে দিলো। কিন্তু এটা কোন সমাধান নয়। ছেলেটি জানেই না ভেতরে কফি ঢুকেছে। সে আবারো কম্পিউটার চালু করলো। আমার সার্কিট বোর্ডে শর্ট সার্কিট হলো কয়েকটা। তীব্র যন্ত্রনায় আমার ভেতরটা ছিড়ে যাচ্ছে! প্রসেসরকে বললাম তাড়াতাড়ি ব্যবস্থা নিতে। প্রসেসর বললো "আমিতো মানুষের গলায় কথা বলতে পারি না" আমাদের সংবিধান অপারেটিং সিস্টেমে এই ধরনের ঘটনায় কোন ব্যবস্থা নেয় না। আমি যা করতে পারি তা হলো কম্পিউটার বন্ধ করে দিতে পারি। আবারো কম্পিউটর বন্ধ হয়ে গেলো। ছেলেটি বোকার মত আবারো কম্পিউটার চালু করলো। ততক্ষনে আমার লজিক্যাল সিস্টেম এলোমেলো হয়ে গেছে। প্রচন্ড যন্ত্রনায় আমার অপটিক্যাল সেন্সের নিয়ন্ত্রন হারিয়ে ফেললো। বুঝতে পারছি আমার মৃত্যুর সময় উপস্থিত। তীব্র এক কষ্ট আর অভিমান হলো। কষ্ট হলো ছেলেটার ডাটাগুলোর জন্য। সে আমাকে এতই বিশ্বাস করতো যে তার কোন ডাটাই অন্যকোথাও সংরক্ষণ করা হয়নি। সবই আমার মধ্যে। কত মুভি, কত ছবি, কত লেখা, পাচ বছরে জমিয়েছে সে। আজ সামান্য কফির জন্য সব নষ্ট হতে চললো।
ধীরে ধীরে সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসছে। বিদুৎ স্ফুলিংগে আমার সবগুলো পিন পুড়ে গেছে। কারো থেকে বিদায় নেয়া হলো না, ফ্যানটি উদাস হয়ে তাকিয়ে ছিলো, র্যাম আর প্রাফিক্স কার্ডের চোখে অশ্রু। সবাইকে বললাম "বিদায় বন্ধুরা, একটি যন্ত্র মারা যাচ্ছে! কেউ আমাকে মনে রাখবে না, আমার জন্য কেউ দুফোটা অশ্রু ফেলবে না, আমার কোন কবর হবে না, মৃত্যুর আগে আমার কেমন একটু অভিমান হলো! জানিনা কিসের জন্য এই অভিমান!!
শেষ বেলায় প্রসেসরকে বলে গেছিলাম "যদি পারো অপটিক্যাল সেন্সরের পিনে একটু বিদুৎ প্রবাহ চালু রেখো। আওয়াজ শুনে যেনো ছেলেটি বুঝতে পারে সমস্যা কোথায়, নয়তো সে পুরো কম্পিউটার তোমাদের সহ ফেলে দিবে।" প্রসেসর কথা রেখেছে। আমার প্রাণহীন দেহে শুধু সেন্সরটি ঠক ঠক আওয়াজ করছিলো!!
-----------
ছেলেটির কথা:
আওয়াজ শুনে আমি ল্যাপটপ খুলি! বুঝতে পারছিলাম হার্ডডিস্কে সমস্যা। মৃত অবস্থায় হার্ডডিস্কটি উদ্ধার করি আমি, সার্কিটবোর্ড ভর্তি কফি। সব মুছে অনেকবার চেষ্টা করি, চালু হয়নি। না; ফেলে দেইনি। জানিনা কেন! নষ্ট ডিস্কটি আমি যত্ন করে রেখে দিয়েছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


