
হ্রদের উপর পতনশীল বৃষ্টির ফোঁটাটি মৃত্যুকে ক্রমশ এগিয়ে আসতে দেখছিল, সে ভয় পাচ্ছিল তার পরিচয় হারানোর। বাঁচতে চাইছিল সে, অন্ততঃ আরও কিছুক্ষণ। প্রাণপণে চেষ্টা করছিল ক্রমবর্ধমান গতিকে রোধ করার। মরিয়া হয়ে অবলম্বন খুঁজছিল সে, বাতাসের কাছে আকুল প্রার্থনা জানিয়েছিল তাকে ভাসিয়ে রাখার জন্য, অন্ততঃ আরও কিছুক্ষণ। স্নেহের হাসি হেসেছিল বাতাস, বলেছিল, "ওহে বৃদ্ধ, মৃত্যুকে রোধ করতে পারে কে? ভেবে দেখো, তোমার জীবন কি তোমার মায়ের জীবনের বিনিময়ে প্রাপ্ত নয়?" শুনে উর্ধ্বপানে চেয়েছিল সে, অবাক হয়ে দেখেছিল মৃত্যুকে, ক্রম-বিলীয়মান কালো মেঘখণ্ডটিকে, আবার জন্মকেও, নবজীবনের উচ্ছ্বাসে পথ চলতে শুরু করা কয়েকটি সদ্য-জন্মানো অনুজদের। জন্ম কি? মৃত্যুই বা কি? আশ্চর্য হয়ে ভাবছিল সে। অমীমাংসিত রয়ে গিয়েছিল রহস্য, অমোঘ নিয়মে অবশেষে এসেছিল মৃত্যু। হ্রদে পতনের সঙ্গে সঙ্গেই সে হারিয়েছিল তার পরিচয়, স্বাতন্ত্র্য। পেয়েছিল নতুন পরিচয় -- সে এখন একটি হ্রদ। আবারও শুরু হয়েছিল ভয়, ক্ষয়ের, মৃত্যুর। ক্রমে মেঘ কেটে গিয়ে প্রকাশিত হয়েছিল ঝলমলে সূর্য। সূর্যতেজে হ্রদ থেকে উঠতে শুরু করেছিল বাষ্প। সভয়ে আর্তনাদ করে উঠেছিল হ্রদ, প্রার্থনা জানিয়েছিল সূর্যের কাছে -- "দোহাই আপনার, তেজ সম্বরণ করুন। ক্ষয়, মৃত্যু কি ভয়ঙ্কর!!"
স্মিত হেসে বলেছিল প্রাচীন সূর্য, "মৃত্যুপথযাত্রী তো আমিও, প্রত্যেকের মতোই। যতক্ষণ সসীমতা, ততক্ষণ স্বাতন্ত্র্য, পরিচয়। এবং তা হারানোর ভয়ও, জন্ম-মৃত্যুও। জন্ম আর মৃত্যু দুটো বিপরীত দিক থেকে দেখা একটাই রেখা বৈ তো কিছু নয়। অতঃপর বিলাপ কিসের? যা সসীম নয়, যার নেই কোনো পরিচয়, কোনো স্বাতন্ত্র্য, তার জন্মও নেই, মৃত্যুও নেই।"
অবশেষে সমাধান হল রহস্যের, সে বুঝতে পারল, জীবন-মৃত্যু আসলে ক্রীড়ামাত্র। মহানন্দে সে শুরু করে দিয়েছিল খেলা। ক্রমশঃ ক্ষয় হতে থাকা সূর্যের আলো গ্রহণ করে বেড়ে উঠছিল তীরে সদ্য জন্মানো একটি ঘাস। জীবনের আনন্দে মৃদুমন্দ হাওয়ায় দুলছিল তার শরীর, সূর্যালোকে চকচক করছিল তার পাতা দুটি। হ্রদ ধীরে ধীরে আলতো ভাবে নিজেকে এগিয়ে দিয়েছিল তার শিকড়ের দিকে, নির্ভয়ে, নিঃসংশয়ে। কারণ সে জেনেছিল অমরত্বের রহস্য, সে দেখেছিল অনন্ত জীবন, পেয়েছিল মুক্তি।
.
নিত্যোহনিত্যানাং চেতনশ্চেতনানামেকো বহূনাং যো বিদধাতি কামান্ ।
তমাত্মস্থং যেহনুপশ্যন্তি ধীরাস্তেষাং শান্তিঃ শাশ্বতী নেতরেষাম্ ॥

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

